ক্ষাণিক থেমে অর্ক অথইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

– আমরা একজন আরেকজনকে কতটুকুই বা চিনি জানি?

– সামান্য সময়ে সামান্যইতো চেনার কথা।

– আচ্ছা, যদি অনেক বেশি সময় পেতাম। ধরো, সহস্র বছর! তাহলে? তবুও কি চিনতে পারতাম?

– হয়তো না। শ্বাস-প্রশ্বাসের মাঝের সময়টুকুতেও মন বদলে যেতে পারে। এক মানুষ হতে পারে অন্য মানুষ।

– বদলানোটা কি এতোই সহজ?

– নাহ্। সহজ না।

– তাহলে?

– আসলে তুমি যেমন আমাকে পুরোপুরি চিনোনা,আমিও ঠিক তেমনি। আমি প্রতিদিন তোমার গতানুগতিক কিছু বিষয় দেখে ভেবে নিয়েছি তুমি হয়তো এমন। কিন্তু এটাও তো হতে পারে, তুমি দিনের পর দিন আমার কাছ থেকে কিছু লুকিয়ে রাখছো। হঠাৎ একদিন প্রকাশ হয়ে গেলো। তখনি আমার কাছে মনে হতে পারে, তুমি বদলে গেছো। অথচ তুমি যা ছিলে তাই আছো।কিন্তু আমার ভাবনার সাথে মিলেনি বলে, আমার মনে হয়েছে, তুমি আর তুমি নেই! হয়ে গেছো অন্য কেউ!

– হুমম।কখনো আবার পরিস্থিতির চাপে পড়েও নিতান্ত অনিচ্ছা সত্বেও অনেক কাজ করতে হয়। তখন এই অনিচ্ছাকেও সেই মানুষটার ইচ্ছা ভেবে আমরা তাকে ভুল বুঝে বসি।

– সেটাও হতে পারে। তবে বদলানোটা খুব সহজ না হলেও মানুষকে বদলাতে হয়। ‘Survival for the fittest’ জানো তো?বেঁচে থাকার তাগিদেই চারপাশের সাথে খাপখাওয়াতে হয়। সবকিছু মেনে নিয়ে নিজেকে নতুন করে গড়ে নিতে হয়। বদলাতে হয়।

– আর এই বদলে যাওয়ার প্রক্রিয়ার মাঝেই কি আমরা একজন আরেকজন থেকে আরো দূরে সরে যাই? অপরিচিত হই?

– নাহ্। আমরা দূরে যাই, মনের দূরত্বের কারণে। বেঁচে থাকার জন্য যে পরিবর্তনটা সেটার জন্য কেউ দূরে যায়না। বরং নতুন করে বাঁচার প্রেরণা পায়। দেখো অর্ক, আমরা দুজন দুজনকে খুব সামান্যই চিনি, তারপরও কত কাছে! কারণ আমাদের মনের মিল আছে। আমরা মন থেকে দূরে যাইনি।

– কিন্তু তুমি তো বললে, মন প্রতিমুহূর্তে বদলায়!

– হ্যাঁ, সেটাও ঠিক আছে। মন প্রতিমুহূর্তে বদলায়। কিন্তু মন তো মনই। এর নিজস্ব কিছু ধর্ম আছে। সে চাইলেই সবকিছু বদলাতে পারেনা। হয়তো কিছু ক্ষেত্রে কিছু চিন্তাধারার পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু কোনো প্রচন্ড আঘাত বা অন্য কোনো জটিল প্রক্রিয়ায় না যাওয়ার আগ পর্যন্ত মনে বড় কোনো পরিবর্তন আসতে পারেনা। ছোটখাটো ব্যাপারে মন পরিবর্তনের স্বাধীনতা প্রকাশ করলেও, বড় বিষয়ে স্বাধীনতা প্রকাশ করার ক্ষেত্রে মনকে বিবেকের কাছে যেতে হয়। কখনো আবার প্রবল আবেগের তাড়নায় ভুল পথে যাওয়ার কারণে মনে বড় ধরণের পরিবর্তন আসতে পারে।

– তারমানে তুমি বলতে চাইছো, মানুষের মনের পরিবর্তনটা দুইরকম।প্রতিমুহূর্তে যে পরিবর্তনটা হয়, সেটা ছোটখাটো ব্যাপারে কিংবা পরিস্থিতির সাপেক্ষে অথবা স্বভাবজাত কোনো কারণে। কিন্তু দীর্ঘসময় নিয়ে যে পরিবর্তন, সেটার পেছনে অবশ্যই বড় কোনো কারণ থাকে।

– অনেকটা তাই। শুনো অর্ক, মানুষ বড় জটিল প্রাণী। তার ইচ্ছা- অনিচ্ছা,আকাঙ্খা

,অভিলাষ, স্বপ্ন সবই মনের পরিবর্তনের নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। আমরা সবটুকু বুঝতে পারি না, কারণ আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে পুরোপুরি চিনতে পারিনা কখনো। নিজেকে চেনাটাই যখন দুরূহ,তখন অন্য আরেকজনকে পুরোপুরি চেনার চেষ্টা করাটাও বোকামিই হবে হয়তো।

– হুমম। পুরোপুরি কাউকে চেনা সম্ভব না আসলে।

– সেটাই। তবে পুরোপুরি না চিনতে পারলেও খুব একটা ক্ষতি নেই,বরং লাভই আছে।তখন একটা রহস্য থাকে!একটা একঘেয়েমী মানুষের মাঝেও হুট করে নতুন কিছু পাওয়া যায়।

– হুমম। কিন্তু সেই নতুনত্বটা যদি আবার কারো অপছন্দের হয়?

– তোমার মনই বিবেচনা করবে, অপছন্দের বিষয়টাকে সে কিভাবে গ্রহণ বা বর্জন করবে। এই যে চারপাশে কত মানুষ। সবাই তো প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো কারণে বদলাচ্ছে।তাই কি সব একেবারে উলট পালট হয়ে গেছে? নাকি মোটামুটি আগের মতোই আছে?

– পরিবর্তনের কারণে একটু এদিক সেদিক হয়েছে হয়তো, তবে দুই একজন বাদে কারোরই খুব একটা উলট পালট হয়না তেমন।

– হ্যাঁ, সেটাই। মানুষকে পুরোপুরি চেনা যেমন যাবেনা, তাই তার কতটুকু পরিবর্তন হলো, কেন পরিবর্তন হলো, এসব ভেবে সময় নষ্ট করার চেয়ে, তার নতুনত্বকে গ্রহণ করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। আমাকে তুমি কতটুকু চেনো, সেটা জানার চেয়ে, আমাকে কতটুকু মেনে নিতে পারো,সেটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। হয়তো আমরা সহস্র বছরেও একজন আনেকজনকে পুরোপুরি চিনতে পারবোনা, কিন্তু ভালোবাসতে তো পারবো। দুটি মন কাছাকাছি থাকলে সব পরিবর্তনই সহজভাবে নেয়া যায়।

– কিন্তু তাই বলে কি, একজন অন্যজনকে চেনার প্রয়োজনই নেই?

– অবশ্যই প্রয়োজন আছে। না চিনতে পারলে বিশ্বাস জন্মাবে কি করে?ভালোবাসা গভীর হবে কি করে?দুটি মনকে কাছাকাছি আনতে হলে সেই মন দুটির একে অপরের চেনাজানা হতে হবে আগে। তবে কথা হলো, চেনার সময় যে পরিবর্তনটা সামনে আসবে সেটাকেও মেনে নিতে হবে।কারণ পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক বিষয়।স্বাভাবিক বিষয়কে অস্বাভাবিকভাবে নিলেই তৈরি হবে সমস্যা।

– হুমম। এখন তো মনে হচ্ছে,চেনার জন্য সহস্র বছর না হলেও চলে!

– তা কেন?

– কারণ এখন আমার ভালোবাসার জন্য লক্ষাধিক মুহূর্ত দরকার..

২১২জন ৫৪জন
0 Shares

২৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

  • আতকিয়া ফাইরুজ রিসা-এর "দোপাটি" পোস্টে
  • আতকিয়া ফাইরুজ রিসা-এর "দোপাটি" পোস্টে
  • আতকিয়া ফাইরুজ রিসা-এর "দোপাটি" পোস্টে
  • আতকিয়া ফাইরুজ রিসা-এর "দোপাটি" পোস্টে
  • আতকিয়া ফাইরুজ রিসা-এর "দোপাটি" পোস্টে