মনের অলিগলি

রেজওয়ানা কবির ১৪ অক্টোবর ২০২০, বুধবার, ০৮:৩১:০৯অপরাহ্ন গল্প ২২ মন্তব্য

ফেব্রুয়ারিতে প্লান করেছিলাম কক্সবাজার  ঘুরতে যাব,সে অনুযায়ী টাকাও জমিয়েছিলাম,কিন্তু নিয়তির কি পরিনতি? করোনার ভয়াবহ ছোঁবল এসে আমাদের সব প্লান ভেস্তে দিল। যে টাকা জমিয়েছিলাম সেটাও অকারণে নষ্ট হয়ে গেল। অগত্যা কি আর করার,কাঁধে কলসী আর হাতা খুন্তি নিয়ে রান্নায় ঝাঁপায় পরা ছাড়া আর তো কোন কাজ নেই???আর একটা নতুন কাজ যোগ হয়েছে, সেজেগুজে অনলাইন ক্লাস নেয়া😋😋

হঠাৎ রুকু আপুর ফোন,দীপ্তি বনু,,, তুইতো ককক্সবাজার ঘুরবার যাবার চাছিস পালু না যাবার, তা এক কাজ কর মনের অলিগলি নামক এক জায়গা আছে, ঘুরে আয় ভাল লাগবে।
আপুর অট্টহাসিতে গা জ্বালা করা শুরু করল,এ যেন বিস্ফোরার ব্যথা,এমনি মেজাজ খারাপ তারউপর আপুর এই আগুনে ঘি ঢালা!
সবমিলিয়ে কোনভাবেই নিজেকে নিয়ন্ত্রন করে ভাত ঘুম দেয়ার আয়োজন শুরু করলাম,পাশে পুতুল বাবুকে নিয়ে। ভাবলাম রুকু আপুর কথাটাই শুনি,করোনা যাক তারপর না হয় কক্সবাজার যাব,এখন ঐ মনের অলিগলি যায়গাটা থেকেই ঘুরে আসি! ।
যেই ভাবা সেই কাজ, মনের অলিগলি তো অচেনা শহর,কোথায় কি আছে বুঝব  কেমনে?
আবার রুকু আপুর ফোন,,,,  যাবি না মনের অলিগলি, এবার আমি ধুমচে বকা,,, এই আপু কাটাচামচ দিয়ে চোখ গালায় দিব কিন্তু।
বেচারী বাবু সোনা আমার রাগ হয়েই ফোন রাখল।
এবার গুগলে সার্স দেয়া শুরু করলাম মনের অলিগলি দিয়ে। কিন্তু কই এই নিয়ে হাজার কবিতা,যায়গার নামতো উল্লেখ নেই। মেজাজ এবার ৫০০ ডিগ্রি হাই হয়ে গেল। এরপর মনের অলিগলির একটা ম্যাপ নিজেই বানালাম,এবার শান্তি!  আজাদ কে বললাম নতুন একটা শহরে যাব,যে শহরের নাম ‘মনের অলিগলি ‘। টাকাপয়সা বেশি নাই তাই তোমাকে আর রুকু আপুকে নিয়ে যেতে পারছি না,আগে আমি ঘুরে আসি,,,,,,,,আজাদ আমার ব্যাগ গুছিয়ে দিল,ফোনের চার্জার থেকে শুরু করে নেলপালিশ পর্যন্ত গুছিয়ে দিল। বিদায় নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম।
নতুন জায়গায় যাচ্ছি তাই ভাবলাম প্লেনের টিকিট কেটেই যাই। আমার ফ্লাইট ৪ঃ২০, প্লাটফর্মে বসে আছি,,  ডাক আসল ফ্লাইট বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কামিং প্লিজ,,,,,,,
লাগেজ হাতে নিয়ে বসে পরলাম প্লেনে,তারপর সিটবেল বেঁধে চোখটা বন্ধ করলাম,,,,,,,
কিছুক্ষন পরই বুঝলাম এইতো সবাই প্লেন থেকে নামছে,তার মানে  আমরা এসে গেছি। নতুন যায়গা,একা একা একটু ভয় ও লাগছে তবু এসেছি যখন ঘুরতে যেতে তো হবেই।
সাইনবোর্ডে দেখলাম “মনের অলিগলি”
এক রিকশাওয়ালা বলল,চিং চাং চেং,পেং।
ব্যাটা কোন ভাষায় কথা কয়???মহা মুশকিলে পরলাম। কি করি!  একজন ক্যাবওয়ালা হলুদ গেঞ্জি পরা, মুখে পান খেয়ে লালা পরছে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ম্যাম আপনি আমাকে চিনেন নাই??আমি অবাক নাতো,আমি আরবি স্যার।কি ! কিছুক্ষন নিশ্চুপ, আপনার এই অবস্থা কেন? করোনার কারনে দিনে কলেজে অনলাইন ক্লাস করাই আর রাতে এই মনের অলিগলি শহরে কার চালাই। যাক ভালোই হল পরিচিত মানুষ পাওয়া গেল। আমি ক্যাবে উঠে পরলাম। উনি বলল আমার একটু কাজ আছে আমি আপনাকে সুখের শহরে নামিয়ে চলে যাব। কি আর করার !
জায়গার নামঃ “সুখের শহর “
চলে এলাম’ সুখের শহরে’। নেমে দেখলাম বিড়াট বড় একখানা  লোহার দড়জা সেই জমিদার বাড়ির মত,কিছু কিশোরী ফুল ছিটিয়ে আমাকে তাদের হাত ধরে নিয়ে গেল।  আমি তাদের সাথে গেলাম। ওয়াও সেখানে অনেক হ্যাপি কাপল তাদের নিজের ইচ্ছামত সময় কাটাচ্ছে,কারো স্বামী বউয়ের নখ কেটে দিচ্ছে,কারো বউ স্বামীকে তুলে খাওয়াচ্ছে,কেউ আবার জুটি বেঁধে নাচছে, আবার কেউ বউয়ের মাথার চুল আঁচরিয়ে দিচ্ছে। কি যে ভাল লাগছে, আমি তাদের বললাম এই শহরে আর কি কি আছে???
এক তরুন বলল,এই শহরে সুখ পাখি জোড়া জোড়া আছে, প্রতিদিন সকালে এই পাখিগুলো দল বেঁধে আসে,আর সব কাপলদের সাথে সময় কাটায় আর আগলে রাখে কোন খারাপ কিছুর ছায়া পরতে দেয় না।
আবার একটা পুকুর ও আছে,সেই শান বাঁধানো ঘাটে পাথরে খোদাই করে লেখা ‘সুখ উপলব্ধি’।  সেই পুকুরে স্নান করার পর তারা নাকি সুখে আরও বেশি ঝলমল করে। বেশ ইন্টারস্টিং লাগল এই শহর। সেখান থেকে কিনলাম এক সুখের ঘরি যার এল্যার্মে শুধু সুখ সুখ লাগে।
এরপর গেলাম,,,, “দুঃখের শহর”
এখানে একটা ভাঙ্গা দড়জা। আশেপাশে কেউ নেই,ভয়ে গা ছমছম করছে।
দড়জার ওপাশে দেখলাম, এক দোড়োয়ান, চোখে জল,আমাকে দেখেই কাঁদতে কাঁদতে বলল ম্যাম এই শহরে খালি দুঃখ । আমি কিছু না বলে ভিতরে গেলাম। দেখলাম, দুজন ছেলে মেয়ে, বয়স প্রায় ২৫ /২৬ হবে হয়তো,মেয়েটি শুধু কেঁদেই যাচ্ছে,আর ছেলেটি বার বার বলছে তোমাকে আমার ভালো লাগে না,তোমার মাঝে কোন ভাল গুন নাই, এই সেই আরও কত কথা।অপরদিকে মেয়েটি বলছে, প্লিজ বোঝ একটু,
সেই ঘটনা দেখে আর ভালো লাগছিল না তাই আরেকটু সামনে গিয়ে দেখি, এক ছেলের বউ ছেলেকে বলছে তার মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসতে, মা করুন মুখ করে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে। দুর বাবা ! কোথায় আসলাম?
আরেকটু সামনে এগিয়েই দেখি,৫ বছরের শিশু ধর্ষনের শিকার হয়েছে,শিশুটির বাবা মা তাকে কোলে নিয়ে বসে কাঁদছে আর গ্রামের মাতব্বর টাকা পয়সা দিয়ে মিটিয়ে নিচ্ছে। উফফ !  ভালো লাগছে না,,,,,
আমার বা পাশে দেখি,,,এক পরিবারের বাড়ি চুরি হয়েছে,গরীব মানুষ তাদের যা ছিল সব চোর নিয়ে গেছে,
আরেকটু এগিয়ে দেখি, ভাই ভাই সম্পত্তির জন্য মারামারি করে একজনের হাতে আরেকজন খুন। আর এই শহরে থাকা যাবে না যাই পালাই,এই শহরে নিঃশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। এত কষ্ট দেখে সেখান থেকে কিছু কিনলাম না।
এবার গেলাম “ভালোবাসার শহর”
বাহ! দারুন এখানে দেখি একজন প্রেমিক প্রেমিকার পায়ে নুপুর পরিয়ে দিচ্ছে,আরেকজন প্রেমিক তার প্রেমিকার মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পারাচ্ছে,তারপর এক বৃদ্ধ নিজেই ভালোভাবে চোখে দেখে না,তবুও তার বৃদ্ধা বউ কে শুপারি হাতুরি দিয়ে পিশে দিচ্ছে।  এক অন্ধ মহিলা তার সঙ্গীকে কাজে সহযোগীতা করছে। এক প্রেমিকা খুব ভালোবাসে তার প্রেমিককে তবু্ও শুধু প্রেমিকের ভালোবাসার জন্য কত কি যে করছে! এক স্বামী তার বউয়ের জন্য শখের কাঁচের চুরি পরিয়ে দিচ্ছে, এক গরীব লোক প্রচন্ড ঠান্ডায় কাঁপছে, এক বড়লোক তাকে গায়ে চাদর পরিয়ে দিচ্ছে, এক পুলিশ অসুস্থ লোকের সেবা করছে,এক বউ তার বৃদ্ধা শশুরকে যত্ন করে খাওয়াচ্ছে,এক লোক তার বৃদ্ধা শাশুড়ীকে নিয়ে বাইরের হাওয়া খাওয়ানোর জন্য রিকশায় ঘুরতে নিয়ে গেছে। দেখেই চোখ জুড়ায় গেল,,৷৷এখান থেকে রুকু আপুর জন্য ভালোবাসার পাথর কিনলাম, যেখানে ঘষা দিলে খালি ভালোবাসা উপচে উপচে পরে।
এবার গেলাম, “আবেগের শহর”
সেখানে গিয়েই রুকু আপুর কথা মনে পরে গেল, দীপ্তি যা ঘুরে আয় আবেগের শহরে, আমি তার উত্তরে বলেছিলাম আবেগ না থাকলে কি লোহা খুচিয়ে বের করব??মনে পরে হাসি পেল।যাই দেখি কি আছে এই শহরে???
ও আল্লাহ! এটা কি! এক মেয়ে প্রেমিককে না পেয়ে গলায় ফাঁসি দিয়েছে,এক প্রেমিক তার প্রেমিকার জন্য ঘুমের ঔষধ খেয়েছে, আবার এক মেয়ে শুধু অকারণেই কেঁদেই যাচ্ছে,এক পরিবারে মেয়ে শিশুর আগমনে বাবা আনন্দের আবেগে পুরো এলাকায় মিষ্টি খাওয়াচ্ছে। আবেগের ছড়াছড়ি।
না! দেরি হয়ে যাচ্ছে,এবার যাই,,এখান থেকে আমার এক আপনজনের জন্য কিনলাম এক আবেগের সন্দেশ যেটা খেলে রোবট মনেও আবেগের সঞ্চার হয়।
“অরাজকতার শহর”
দেখি এই শহরে কি আছে! ওরে বাবা ! এখানে শুধু হত্যা,মারামারি,ছিনতাই,রাহাজানি আরও ভয়ানক ঘটনা। আর থাকব না এই শহরে,,,,এই শহরে কেনার মত শুধু দা,কুরাল, বন্দুক,তাই কিনি নি কিছু।
“স্বপ্নের ও কল্পনার শহর”
দেখি, কি সুন্দর ফুলের বাহার, মনে হচ্ছে পরীর শহর। সবার একটা করে পাখা,আমাকেও একটা পাখা লাগিয়ে দেয়া হল,তাদের সাথে আমি সুর মিলিয়ে গান গাইছি আমার ভালোবাসার মানুষও আমার সামনে কি যে আনন্দ।আমার সব প্রিয় মানুষরাও আছে আমার সামনে,সবাই অনেক আনন্দ করছে। আমার পাশে কিছু প্রজাপতি উড়ছে, বেলী ফুলের মালা,কাঠাল চাঁপার গন্ধে যায়গাটা মৌ মৌ করছে। সবাই যে যার মত কল্পনা করছে,যে যার মত স্বপ্ন দেখছে, যে যাই চাচ্ছে,বা যাকেই চাচ্ছে তা অবলীলায় পেয়ে যাচ্ছে তাদের কল্পনায় বা তাদের স্বপ্নে।
ভালোই তো, আমিও এই সুযোগে যা যা চাওয়ার সব পেয়ে গেলাম এই শহরে।বেশ লাগল এই শহরটা, কিন্তু আমায়তো ফিরতে হবে, ইশ! আরও থাকলে ভালো হত। এখান থেকে আজাদের জন্য কিনলাম একটা স্বপ্নের ক্যামেরা যেটাতে ক্লিক করলে শুধু স্ব্প্নে আমাকে দেখতে পাবে।
” হতাশার শহর”
এই শহরে গিয়েই একজনকে বললাম কেমন আছেন?সে অনেকক্ষন চুপ থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিল,,,”আছি ভাল, যাছে দিন,
চিন্তায় চিন্তায় ধরে না নিন  ( মানে ভালো আছি,যাচ্ছে দিন,চিন্তায় চিন্তায় ঘুম হচ্ছে না)
যাকেই দেখি তার চেহারায়ই হতাশার ছাঁপ।এক।ছাত্র এ প্লাস পায় নি বলে হতাশায় ভুগছে,এক বেকার চাকরি পায় নি বলে হতাশায় ভুগছে,স্বামী বিদেশে আছে বলে বউ হতাশায়।এই শহরে অনেক গাছপাল, সেগুলো সব হতাশায় নড়বড় করছে।
যাই এই মনের অলিগলিতে আরও অনেক শহর দেখার বাকি, আজাদ ও বার বার ফোন দিচ্ছে, ফিরতে হবে তবে আরেকটা শহর দেখেই ফিরি,
শেষ গেলাম।
 ” শান্তির শহর”
শহরটিতে পুরো এলাকা জুরে শান্তির প্রতীক দেশী,বিদেশী অনেক কবুতর শুধু আশেপাশে উড়ে বেড়াচ্ছে,আমার কাঁধে কবুতরের সমাহার,খুব শান্তি শান্তি লাগছে, এছাড়া কিছু লাভ বার্ডও আছে। এখানে একটা পুকুর আছে যেটাতে স্নান করলেও শান্তি শান্তি লাগে। এখানে প্রান ছুঁয়ে যায়,মনভরে নিঃশ্বাস নেয়া যায়,এখানে ভালোবাসতে জানা যায়,ভালোবাসাও পাওয়া যায়,এখানে অকপটে সব বলা যায়, এখানে এক জন আরেকজনের পাশে সর্বদা থাকে,এখানে নেই কোন ভয়,তাই একসাথে সবকিছুকেই সবাই ভালোবাসা দিয়েই করে জয়।যেখানে নেই কোন খুন,নেই কোন ধর্ষন,নেই অন্যায়, শুধু শান্তি বিরাজমান। এখান থেকে কিনলাম এক জোঁড়া শান্তির কবুতর, যারা শত বিপদেও একে অন্যকে আগলে রাখে। অনেক কেনাকাটা করলাম,টাকা পয়সা শেষের পথে।
 মনের অলিগলি ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত আমি, সারাটাদিন শহরটা ঘুরে কেমন লাগল তা বোঝার আগেই প্রচন্ডরকমের ক্ষুদা লাগল, ঘোরার আনন্দে খাবার খাওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম, এখন খাবারের খোঁজ করতেই অদ্ভুত এই মনের অলিগলিতে এত চিকন চিকন গলি যেখানে কোন খাবারই পাওয়া যায় না। আজবতো এরা খাবার ছাড়া বাঁচে কিভাবে????
যেখানে সীমান্ত তোমার গানটি ফোনের রিংটোন বেঁজে উঠল,  রুকু আপুর ফোন,,,,
দীপ্তি লিখলি” মনের অলিগলি “
ওর সাথে কথা বলতে বলতে খাবার কথাও ভুলে গেলাম, শুরু হল আমাদের হাসির কত কথা।তাই আমার আর রুকু আপুর শহরের নাম হল,” হাসিখুশির শহর” যেখানে শুধু আমরা হাসি,শত কষ্ট থাকলেও এক নিমিষেই আমাদের হাসির অত্যাচারে পালিয়ে যায়। সবাইকে আমন্ত্রন আমাদের এই হাসিখুশির শহরে।
আজ এই পর্যন্ত, সবাই ভালো থাকবে, সুস্থ থাকবেন, আল্লাহ হাফেজ।
ছবিঃ নেট থেকে সংগ্রহ।
২১২জন ১০জন
0 Shares

২২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য