মণি একজন ধর্ষিতার নাম

ফাহিমা কানিজ লাভা ২৭ আগস্ট ২০১৩, মঙ্গলবার, ০২:৪৪:১২পূর্বাহ্ন বিবিধ ২৪ মন্তব্য

মণি মেয়েটির বয়স ছিল ১১ বছর। গ্রামের একটা স্কুলে ৫ম শ্রেণীতে পড়তো সে। পড়তে ভাল লাগে না তার, শুধু ছুটে বেড়াতে মন চায় তার। একান্নবর্তী পরিবারে তার মা-বাবা, ভাই-বোনের পাশাপাশি থাকতো তার ২ চাচা ও তাদের ছেলেমেয়েরা। এদের মধ্যে তার ৩ জন চাচাতো ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে অনেক আগেই।

সেদিন আকাশ ছিল মেঘলা, থেকে থেকে বৃষ্টিতে প্রকৃতির ওপরের অংশ পরিষ্কার আর নিচের অংশে ধরণী কালো কাদাময়। বৃষ্টির কারণে হাফ স্কুল হলো। কাদার দরিয়া পেরিয়ে বাড়িতে আসে মণি। বই-খাতা রেখে দৌড় দেয় চাচাতো ভাই কলিমের বউয়ের কাছে যায়। সকালে কাঁচা আম পেড়ে রেখেছিল কলিম ভাই, এতোক্ষণে আচার বানিয়ে ফেলার কথা ভাবির।  কিন্তু বিধি ছিল সেদিন বাম, ভাবিকে পেলনা মণি ঘরে। বৃষ্টিতে ভাবি সেই যে বেড়িয়েছে, তখনো আসেনি।

বিছানায় শুয়ে ছিল কলিম ভাই, মণি তাকেই জিজ্ঞেস করে ভাবি কোথায়? কলিমের মনে দুষ্টুবুদ্ধি খেলে যায়। বৃষ্টিতে কেউ আওয়াজ শুনবে না, আশেপাশেও কেউ নেই, এইতো সুবর্ণ সুযোগ। শয়তান চাচাতো ভাই কলিম মণির প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আচমকা জাপটে ধরে মণিকে। মুখ চেপে, হাত-পা বেঁধে তাকে ধর্ষণ করে জানোয়ারটা। প্রচন্ড ব্যথায়-কষ্টে মণি চিৎকার করতে থাকে, কিন্তু মুখ বাঁধা থাকায় সেটা চাপা গোঙ্গানীর মতো শোনায় আর বৃষ্টির শব্দে সেই আহাজারি মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়তে থাকে। নিষ্ঠুর প্রকৃতি তবু তার উল্লাস থামায় না।

এতো নোংরামীর পরেও থামে না কলিম, মণির মুখ বন্ধ রাখার জন্য নানারকম ভয়-ভীতি দেখায়। ১১ বছরের বাচচা মেয়েটা এসব তোয়াক্কা না করে বাঁধন খোলার সাথে সাথেই ব্যথায় ও ভয়ে গগনবিদারী চিৎকারে সবাইকে বিপদের আলামত দেয়। ভাবিও তখন এসে পড়েছে, আর পরিবারের আরো কিছু সদস্য বিপদের গন্ধ পেয়ে ছুটে আসে এবং সব বুঝতে পারে। বাচচা মেয়েটা ধর্ষণ কি বোঝে না, যা ঘটেছে সবই কেঁদে কেঁদে বলে দেয়।

রাগে-দুঃখে মণির বাবা নালিশ দেয় এলাকার ইমাম সাহেবের কাছে। সালিশ বসে যথারীতি।। লম্পট কলিম নির্লজ্জের মতো বলে, মণি নাকি তাকে কু-ইশারা করতো প্রায়ই। সেদিন তাকে একা ঘরে পেয়ে মণিই নাকি তাকে এই বাজে কাজ করার জন্য প্রলুব্ধ করে । মণির মা সেই সময় ঘরে ঢুকে এই দৃশ্য দেখে কাহিনী রটিয়েছে যে মণিকে কলিম জোর করে ধর্ষণ করেছে। এমনকি কলিমের বউও সেটাকে সমর্থন দিয়ে স্বাক্ষী দেয়, না দিলে যে তার স্বামী তাকে তালাক দেবে। তালাক দিলে সে বাচচা নিয়ে কই যাবে, কি করবে? একবারও সে অসহায় মেয়েটার কথা ভাবে না অথবা ভাবলেও পাত্তা দেয়না হয়তো। তার মতো অসহায়-পরনির্ভরশীল নারীর জন্য স্বামীই সব, স্বামী যতো বড় লম্পটই হোক না কেন।

শেষমেষ ইমাম সাহেব রায় দেয় যেনো কলিম মণিকে বিয়ে করে। কিন্তু তাতে কলিমের বউ বেঁকে বসে। সে বেঁচে থাকতে এটা হতে দেবে না, কলিমের আপত্তি নেই যদিও। অবশেষে ৩০,০০০ টাকা ক্ষতিপূরণে মিটমাট হয় এই ঘটনা। কারণ কোর্টে মামলা চালাতে গেলে অনেক ঝামেলা আর টাকা খরচ হবে। আর তাতে এই ঘটনা আরো অনেক মানুষ জেনে যাবে। যা গেছে তা তো আর ফিরে পাবার নয়, শুধু শুধু জ্বালা বাড়িয়ে কি লাভ?

এবার আসে আরেক নির্যাতন মণির ওপর পরিবার ও সমাজের কাছ থেকে। একমাসে মণি বড় হয়ে যায়। তার পড়াশোনা,খেলাধুলা, স্বাভাবিক কাজ-কর্ম সব ওলট-পালট হয়ে যায়। তার সাথে সবাই এমন ব্যবহার করে যেনো সে অস্পৃশ্য একটি বস্তু, বিশাল পাপী। মণিকে স্বান্তনা দেয়ার মতো বা তার পক্ষে কথা বলার কেউ থাকে না। সে যে কতো বড় পাপ করেছে সেটা তার পরিবার ও সমাজের মানুষ তাকে বুঝিয়ে দেয় তাদের হাব-ভাবে,কথায়-বার্তায় প্রতিটা মুহুর্তে। মা-বাবা পর্যন্ত তাকে দেখতে পারেনা। মণি মরে গেলেই যে তাদের জ্বালা জুড়াতো সেটা মণি কেন বোঝে না? মণির জন্য তার মা-বাবা, ভাই-বোন সমাজের কাউকে মুখ দেখাতে পারে না।

কিন্তু ধর্ষক কলিম দিব্যি ঘুরে বেড়ায়, কেউ কিছু বলে না। বরং কলিমের বন্ধুরা কলিমের কাছে এই ঘটনার বিবরণ ব্যাপক মজা নিয়ে শোনে এবং তারা যে এই পাশবিক সুখ ভোগ করতে পারেনি সেজন্য খুব আফসোস করে। ওদিকে কলিমের বউ স্বামীর মন যেনো আর কোনো নারীর শরীরের প্রতি আকৃষ্ট না হয় সেজন্য আদর-যত্ন, সাজ-গোজ বাড়িয়ে দেয় স্বামী ভুলানোর জন্য, বাচচাদের শিখিয়ে দেয় অনেক মন ভোলানো কথা। মণিকে সে সতীনের মতো ঘৃণা করে।

মাত্র ১১ বছরের মেয়েটি কদিনেই সব বুঝে ফেলে। মাঝ দুপুরে শান্ত-শীতল পুকুরের অস্বচ্ছ পানিতে ঝাপ দিয়ে সে সবাইকে মুক্তি দেয়। সমাজ এখন বলে, “আহারে, মেয়েটা কি ফুটফুটে আছিল। কিন্তু পাপ যে বাপকেও ছাড়ে না।“
কলিমের কোনো অনুভূতিই নাই। সে যা চেয়েছিল তা আগেই পেয়েছে, এখন কার কি হল তাতে তার কিচ্ছু আসে যায় না।
কলিমের বউও ভাবে, সতীনটা মরে তাকে বাঁচিয়েছে।
মণির পরিবারকে এখন আর সমাজের মানুষদের কটু কথা সইতে হয় না। তবে মনের গভীরে তাদের একটা চিনচিনে ব্যথা দোলা দেয় মণির অনেক পুরোনো স্মৃতি ভেবে।

মণি একটি পাপের নাম হয়ে মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায় আর কলিম আজো সেই দিনের মতো সুযোগ খুঁজে বেড়ায়।

৩২৯জন ৩২৯জন
0 Shares

২৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ