ভয়

সাবিনা ইয়াসমিন ২৮ জুন ২০২০, রবিবার, ০১:৪৯:২০অপরাহ্ন গল্প ২২ মন্তব্য

বাবুল সাহেব এই এলাকায় এসেছেন প্রায় এক বছর হতে চলেছে। বেশ দাম দিয়ে মোটামুটি অভিজাত দেখতে একটা এপার্টমেন্টের দুটো ফ্লাট কিনে ফ্যামিলি সহ বসবাস করেন। পেশায় ব্যবসায়ী। তিনি শিক্ষিত লোক, তার আচার-ব্যবহার ভালো। দেখতে ভালো, দামী কাপড়চোপড় পড়েন। সুন্দর করে কথা বলেন। তার এক্সট্রা গুণ হলো তিনি গরীব মানুষদের টাকা ধার দেন, এবং বেশিরভাগ সময়েই ফেরত নেন না। এলাকার যেকোনো প্রয়োজনে দান করেন মুক্তহস্তে। উঠতি ছেলেপুলেদের নানা বায়নাও মিটিয়ে দেন বন্ধুর মতো। এমন সব বহুবিধ কারণে দেখতে-দেখতে  তিনি পাড়ার সবার কাছেই মোটামুটি পরিচিত একজন হয়ে উঠে ছিলেন।

সব্জী বিক্রেতা মামুনের বাপের কাছে বাবুল সাহেব দেবতাতুল্য মানুষ। তার কাছ থেকে সব্জী কেনার সময় বাবুল সাহেব কখনো দাম জিজ্ঞেস করেননা, উল্টো ভাঙতি টাকাও ফেরত নেয় না মাঝেমধ্যে। আবার মামুনের বাপের যখন মাঝে-সাজে কখনো চালানের অভাবে ব্যবসা বন্ধ হওয়ার দশা হয়, তখন তিনি নিজে এগিয়ে এসে টাকা ধার দেন। মামুনের বাপের কাছে বাবুল সাহেব দ্বিতীয় খোদার মতোই সম্মানিত হয়ে গেছেন। তিনি যখনই আওয়াজ দেন, মামুনের বাপ সাড়া দিতে ভুল করে না।

মামুন তেরো/চৌদ্দ বছরের ছেলে। এলাকার থেকে বেশকিছু দূরে একটা আধা সরকারি স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ে। বড়ো দুই ভাই বিয়ে করে আলাদা থাকে, তারা রিক্সা চালায়। বাপ-মায়ের খোঁজ খবর তারা রাখে না। মামুন দিনের অর্ধেক সময় স্কুলে, বাকি সময় বাপের কাজে সাহায্য করে। খুব ভোরে উঠে তাদের একমাত্র ভ্যানগাড়িটা নিয়ে বাপের সাথে আড়তে যায়। পাইকারী দরে অনেক রকম সব্জী নিয়ে ফিরে আসে। তারপর  ভ্যানে  সব্জী গুলো সাজিয়ে দিয়ে স্কুলে চলে যায়। মামুনের বাপ দুপুর পর্যন্ত পাড়ার অলিতে/গলিতে সেগুলো বিক্রি করে। বিকেলে সব্জীর ভ্যান নিয়ে এলাকার মোড়ে দাঁড়িয়ে বিক্রি করে। তখন মামুনও থাকে বাপের সাথে। যাদের অনেক সব্জী কিনে একা-একা বাড়ি ফিরতে কষ্ট হয়, বা যাদের  কাছে নগদ টাকা কম পড়ে যায়, তাদের সাথে বাড়ি গিয়ে জিনিস দিয়ে টাকা নিয়ে আসে সে। এই কাজটা সে খুব আগ্রহ নিয়েই করে। যাদের হেল্প করতে যায়, তারা টাকার সাথে অনেক সময় বখশিশও দেয়।

লকডাউনের সময়টাতে অসহায়-গরীব-ঘাওড়া মানুষেরা প্রয়োজনে/অপ্রয়োজনীয় কাজে ঘরের বাইরে গেলেও, অবস্থাসম্পন্নরা/স্বাস্থ্য সচেতন মানুষেরা একদমই  বাইরে বের হয় না। তাদের যা কিছু দরকার সব বাড়িতে বসেই সংগ্রহ করে নেন । এই লোকটিও ব্যতিক্রমী ছিলেন না। তার নিত্তনৈমিত্তিক কিছু প্রয়োজন হলেই সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আওয়াজ দিতেন, আর সবাই চাহিদা অনুযায়ী জিনিস তাকে পৌঁছে দিয়ে ধন্য হতো।

গতদিন দুপুরে মামুন বাবুল সাহেবের বাসায় সব্জী দিতে গিয়েছিলো। ফিরেছিলো খুব শুকনো মুখে। বাপের হাতে সব্জীর টাকা সহ আরও একমুঠো টাকা দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো। মামুনের বাপ ছেলের হাতে বাড়তি টাকা দেখে খুব খুশি হলো কিন্তু ছেলের শুকনো মুখ দেখে কিছুই বুঝলো না,। মিনিট খানেক পর সে তার বাপকে শরীর খারাপের কথা বলে বাড়িতে চলে গিয়েছিলো। রাতে জ্বর খুব এসেছিলো, একটু পর পর ঘুমের ঘোরে ভয়ার্ত চিৎকার দিয়ে জেগে উঠেছিলো। জড়িয়ে ধরছিলো তার মাকে।

পরদিন সকালে মামুন আরও অসুস্থ হয়ে পড়লো। জ্বর নেই, কিন্তু কি এক অজানা আতঙ্ক তাকে পেয়ে বসেছে। সারাদিন সে ঘরের এককোনে চুপচাপ শুয়ে থাকলো। মামুনের বাপ-মায়ের এতকিছু খেয়াল রাখার সময় ছিলো না। কিছু শ্রেনীর মানুষেরা ছেলেমেয়েদের সামান্য অসুখ-বিসুখ বা মন খারাপ নিয়ে কেউ এত ভাবে না। মামুনের পরিবারও তেমন।

বিকেলের দিকে মামুন কিছুটা সুস্থির হলো। সে হাটতে হাটতে রাস্তার মোড়ে তার বাপের ভাসমান দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। অন্যান্য সময়ে তার বয়সি কিছু বন্ধুরাও সেখানের এক চায়ের দোকানে আড্ডা দেয়। গিয়ে দেখলো তার বাপ চিন্তিত মুখে নিজের ভ্যান রেখে, চায়ের দোকানে বসে আছে, চায়ের দোকানের কাদির চাচা নেই, তার ছেলে করিমও নেই।

মামুন জিজ্ঞেস করলো- কি হইছে বাবা? আপনে কাদির চাচার দোকানে বইস্যা আছেন ক্যান?

মামুনের বাপ চিন্তায় অস্থির হয়ে জবাব দিলো- কাদির ভাই ভাত খাইতে বাড়িত গেছে, এখনো আসে নাই। করিমরে তরকারি দিয়া বাবুল সাবের বাড়িত পাঠাইছি, এখনো পোলাডা আইলো না। ওর বাপে আইয়া দোকানে না পাইলে আমারে কটু কথা শুনাইবো। কিযে করি!

– বাবা, আপনি তাড়াতাড়ি আমার লগে চলেন, আর যারা যারা এইখানে আছে তাগোও লইয়া লন। এক্ষণেই সবার বাবুলের বাসায় যাওন লাগবো।

— ক্যান?

মামুনের  মুখ দিয়ে কোন আওয়াজ আসতে চাচ্ছে না, গলা বুজে আসছে ভয়ে-কান্নায়। তবুও সে চেষ্টা করলো…
— বাবা, বাবুল একটা জানোয়ার। অয় কাইল আমার সাথে অনেক খারাপ কাজ করছে। আমি নিজেরে বাচাইতে পারি নাই। অনেক ব্যাথা, তবুও শরমে কাউরে কইতে পারিনাই। তাড়াতাড়ি চলেন, আমরা দেরি করলে করিমের লগেও হ্যায় ঐ কাজ করবো। আমার আর ভয় নাই, করিমের লগে যদি কিছু করে তাইলে আজকে ঐ জানোয়ারের একদিন কি আমার একদিন।

মামুন, মামুনের বাপ এলাকার কিছু লোকজন সাথে নিয়ে গিয়ে করিমকে উদ্ধার করে নিয়ে এলো। বাবুল সাহেব কুকর্ম করার সময় হাতেনাতে ধরা পড়েছেন। তাকে ধরে এলাকার  সমাজকল্যাণ অফিসে নিয়ে যাওয়া হলো।

অফিসের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করা।

বাইরে উৎসুক মানুষের ভীর জমেছে। তারা অনেকেই সম্পূর্ণ ঘটনা জানতে পারেনি। এর-ওর মুখে-মনে ঘুরছে-ফিরছে কিছু জিজ্ঞাসা..

– এই ব্যাটার  বউ বাচ্চা নাই!
– ঐ সময়ে তার ফ্যামিলি কই ছিলো!
– নিজের ঘরের ভিত্রে কেউ এসব করে!
– এরপর সে মানুষের সামনে মুখ দেখাবে ক্যাম্নে!
– তার ঘরের মানুষেরাও আটকালো না!
– ওও আল্লাহ ব্যাটায় কি পাগল!
– কলেজে পড়া ছেলেমেয়ে / তার ওয়াইফের সম্মানের কথাও ভাবলো না! সেতো শিক্ষিত লোক!
– লোকটার মনে হয় মানসিক সমস্যা আছে।

ঘন্টা খানেক পর মামুন, করিম, তাদের বাপ গম্ভীরমুখে সমাজ কল্যাণের অফিস ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। বিচার শোনার অপেক্ষায় যারা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো, তারা নানা ধরনের প্রশ্ন করতে আরম্ভ করলো। যারা বাবুল সাহেবের নাম শুনেছে/ শোনেনি তারাও এসেছিলো।

কিন্তু সমাজ চলে নিজের রথে। ঠুনকো সমাজের ধারকরা বাবুল সাহেবকে নিরাপদে তার ফ্লাটে পৌঁছে দিয়ে এলেন। সমাজ -সভাপতির বক্তব্য ছিলো,

— মানুষ মাত্রই ভূল করে। ভালো মানুষেরা আসলে ভূল করতে চায় না। এই ভূল গুলো শয়তান করায়। বাবুল সাহেব যেটা করেছেন, তাও শয়তানের প্ররোচনায়। তিনি তার কৃতকর্মের জন্য  লজ্জিত। তাই তার সম্মানের কথা ভেবে, তার ছেলে-মেয়েদের মান-সম্মানের কথা ভেবে এই ব্যাপারটা এখানেই ফুলস্টপ করে দেয়া হলো।

 

* ছবি- নেট থেকে নেয়া।

২৯১জন ৫জন
87 Shares

২২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য