ভালো থাকি রোজ

রিমি রুম্মান ১২ এপ্রিল ২০২০, রবিবার, ০২:২৪:৩০অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি, সমসাময়িক ১৪ মন্তব্য

নিউইয়র্ক শহরে এখন বসন্তের হিমেল হাওয়া। ম্যাগনোলিয়ার পাপড়ি ঝরে পড়ছে প্রতিদিনই শব্দহীন। চেরি এখনো ফোটেনি। প্রস্তুতি নিচ্ছে। টিউলিপ এপ্রিলের শেষদিকে রং ছড়াবে শুনেছি। জ্যাকসন হাইটস, ডাইভারসিটি প্লাজায় শ্মশানের নিস্তব্দতা। সেভেন্টি ফোর স্ট্রিটে ভূতুরে নির্জনতা। জ্যাক্সন ডায়নারে মধ্যাহ্নভোজের দীর্ঘ লাইন নেই। ফুলের মিষ্টি সুবাস আর সৌন্দর্যের হাতছানি উপেক্ষা করে চারদেয়ালের মাঝে স্বেচ্ছা কারাবাস আমাদের। অচেনা আগন্তুকের মতোই মৃত্যুদূতের আনাগোনা চারপাশে।আমরা জানালায় উঁকি দিয়ে অচেনা বাতাসে ভেসে বেড়ানো আগন্তুক দেখি। আমরা বেঁচে থাকার আশায় ভালো থাকি রোজ !

বেঁচে থাকার আশায় আমাদের খাবার খেতে হয় রোজ। সঞ্চিত খাবার ফুরিয়ে এসেছে প্রায়। বাচ্চাদের দুধ, ডিম, কলা, পাউরুটি ফুরিয়েছে অনেক আগেই। এসব এখন আমাদের কাছে বিলাসী খাবার। কোনমতে খেয়েপরে বেঁচে থাকাটাই মুখ্য। আর্থিক সংকটের বিষয় নয়, বরং বাইরে বেরুনোটাই বিরাট চ্যালেঞ্জ। কেননা নগরীতে হুহু করে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। আমেরিকার নিউইয়র্কের কুইন্স, অর্থাৎ যে এলাকায় সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর হার, সেখানেই সপরিবারে আমাদের বসবাস। কখন, কেন, কীভাবে করোনাভাইরাস ছড়াচ্ছে এ বিষয়ে নানান রকম মতামত বিশেষজ্ঞদের। যদিও এতদিন জেনেছি এটি মানুষের সংস্পর্শে, হাঁচি, কাশির সাথে সংক্রমিত হয়। এখন বলা হচ্ছে এটি বাতাসেও ছড়াচ্ছে। সঠিক তথ্য বিষয়ে সকলেই দ্বিধান্বিত। বলা হচ্ছে এবং বারবার করে সতর্ক করে দেয়া হচ্ছে সকলকে বাড়িতে অবস্থান করতে। তবুও প্রয়োজনীয় ওষুধ ফুরিয়ে গেলে নিরুপায় হয়ে বের হতে হচ্ছে। ফার্মেসীগুলো সামাজিক দূরত্ব কঠোরভাবে মেনে চলছে। তারা ক্রেতাদের ক্যাশ কাউন্টারের সামনে লাইনে দাঁড়ানোর জন্যে ছয় ফিট দূরত্বে মার্ক করে দিয়েছে। গিয়েছিলাম ইন্ডিয়ান গ্রোসারিতে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে। বিশাল বড় স্টোর, অথচ ভেতরে খুব কম সংখ্যক ক্রেতা। বাইরে ক্রেতাদের বিশাল লাইন। কিছু ক্রেতা বেরিয়ে এলেই তবে কিছু সংখ্যক ক্রেতাকে ভেতরে যাবার অনুমতি দেয়া হচ্ছে। কাজ সেরে গিয়েছিলাম অন্য আরেকটি সুপার শপে। একজন মাত্র ক্যাশিয়ার কাজ করছে ক্যাশ কাউন্টারে। ক্রেতা এবং ক্যাশ রেজিস্টারের মাঝ বরাবর লম্বা কাঁচের পাটিশন দেয়া হয়েছে সতর্কতা স্বরূপ। কিন্তু তা সত্ত্বেও ক্যাশিয়ার সংকট। আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে কেউ কাজে যেতে চাচ্ছে না। কিছু জিনিষ ট্রলিতে নিয়ে লাইনে দাঁড়ানোর জন্যে হাঁটছি বিশালাকৃতির স্টোরের প্রশস্ত আইলের ভেতর দিয়ে। লাইনটি দীর্ঘ হতে হতে এক আইল থেকে অন্য আইলে সাপের মত এঁকেবেঁকে কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে, সেই শেষপ্রান্তের দেখা পাইনি। অগত্যা জিনিষ রেখেই বেরিয়ে এসেছি।
দীর্ঘ শীত শেষে বছরের এই সময়টায় শিশুরা পার্কে ছুটোছুটি খেলার কথা। বন্ধ ঘরে দিনের পর দিন সময় কাটানো তাদের জন্যে কঠিন এক পরীক্ষা! বসন্তের এই সময়ে বাইরে ঝলমলে রৌদ্রজ্জ্বল আবহাওয়া। সাথে মাতাল হাওয়া। বসন্ত কি খুব একাকি নৈঃশব্দ্যের মাঝে বিষণ্ণ মনে ফিরে যাবে এবার ? শহর জুড়ে হবে না কোন বসন্ত উৎসব কিংবা বৈশাখ বরণের আয়োজন ? হবে না শেকড় ছেড়ে স্থানান্তরিত হওয়া মানুষের সমাগম ? না হয় থাকুক এবার সব আয়োজন। তবুও থামুক মৃত্যুর মিছিল। থামুক ঘরে ঘরে স্বজন, প্রিয়জন হারানোর শোক। থামুক একফোঁটা অক্সিজেন পাবার বিরামহীন যুদ্ধ। কোলাহলমুখর এই শহরটা সত্যিই আজ নৈঃশব্দ্যের শহর হয়ে উঠেছে। শুধু থেমে থেমে এ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বেজে উঠে করুণভাবে। আমরা বেঁচে থাকা মানুষেরা আচমকা সেইসব শব্দে কেঁপে পেঁপে উঠি অজানা শংকায়।
আমাদের এবারের বসন্তকালীন সন্ধ্যাগুলো বড় বেশি বিবর্ণ, ম্লান। আমাদের চোখ মেলে দেখা হয় না ফুলের ভারে নিচু হয়ে আসা ম্যাগনোলিয়ার ডাল আর সবুজ ঘাসের মাঝে গড়ে উঠা নিবিড় সম্পর্ক। আমরা ভুলে যাই এখন ভোর না সন্ধ্যা। ভুলে যাই বুধবার না বিষ্যুদবার। প্রতিটি মধ্যাহ্ন কিংবা অপরাহ্ণকে মনে হয় অভিশপ্ত। জীবন এতদিন ছিল আদিগন্ত খোলা মাঠের ন্যায়। এখন তুমুল বৃষ্টিতে চুপচুপে ভেজা আশ্রয়হীন দাঁড়কাকের মতো। তবুও জীবনের নিষ্ঠুর সময়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আমরা জীবন খুঁজি।
রিমি রুম্মান
কুইন্স, নিউইয়র্ক
১০৫জন ৪৬জন
0 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য