ভালোবাসি তোমায় (৪’থ খন্ড)

ইঞ্জা ১৯ জুলাই ২০১৬, মঙ্গলবার, ০৫:০৬:৫৭অপরাহ্ন গল্প ১৯ মন্তব্য

 

কি ব্যাপার চুপ করে আছো যে, কিছু ভাবছো? প্রশ্ন করে অভির দিকে তাকালো অনামিকা।
অভি ওয়াইনে চুমুক দিয়ে তাকালো অনামিকার চোখে, তারপর সাথে সাথে নামিয়ে বলল, না তেমন কিছুনা। তুমিই বলো তোমার কেমন চলছে, তোমার কি বেবি আছে?
আরে না না বেবি হওয়ার সময় কই হলো, তার আগেই তো সব শেষ হয়ে গেল।
তার মানে তুমি একা থাকো এইখানে?
না, বাবা মাকে নিয়ে এসেছি এইখানে, আমরা তিনজনই থাকি এক সাথে।
ভালোই করেছো তোমার বাবা মাকে নিয়ে এসে, অভি জবাবে বলল।
তা অভি তোমার খবর কি বলো, তা বিয়ে করছোনা কেন, বেলা তো অনেক হলো, অনামিকা অভির চোখে তাকিয়ে যেন কিছু খুঁজলো।
দেখি কি করা যায়, অভি খেতে খেতে বলল।
অভি, আমি জানি আমাকে কোনদিন তুমি মাফ করতে পারবেনা তবুও বলি তুমি সব ভুলে গিয়ে কি আমাকে বন্ধু ভাবতে পারবেনা সেই আগের মতো?
অভি সেই ভুবন ভুলানি হাসি দিয়ে বলল, তুমি যদি বন্ধু না হতে তাহলে কি তোমার সাথে ডিনারে আসতাম?
অনামিকার চোখ ছলছল করে উঠলো, মুখে হাসি।
শুনে খুব বড় পাথর যেন সরিয়ে দিলে আমার বুক থেকে।
আরে খাওনা কেন তুমি, স্যামনটা বেশ হয়েছে, হেসে পরিবেশ হাল্কা করার জন্য বলল অভি।
দুজনেই এরপর হাল্কা পাতলা কথাবার্তা বলে বলে খেতে লাগলো। খাওয়া শেষে দুজনেই ড্রিংক্স নিলো, অভি যথারীতি ভদকা মার্টিনি আর অনামিকা নিলো স্কচ।
অভি কতদিন থাকবে?
তা সিউর নয়, কাজ শেষ হলেই চলে যাবো, যাওয়ার পথে কয়েকটি দেশ হয়ে যেতে হবে, কাজ আছে কিছু।

দুজনে যখন বেরুলো তখন রাত ৯.৩০, তুমি কি গাড়ী নিয়ে এসেছো, অভি জিজ্ঞেস করলো।
হাঁ নিয়ে এসেছি কিন্তু পার্কের অপর পাশের পার্কিংয়ে পার্ক করা।
হুম তাহলে চলো তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।
তুমি গাড়ী আনোনি?
এনেছিলাম, সোফার নামিয়ে দিয়ে গিয়েছে,আমি টেক্সি ক্যাব করে চলে যাবো।
কথা বলতে বলতে তারা পার্কিংলটে চলে আসলো।
অনামিকা বলল, চলো তোমাকে আমিই ড্রপ করে দিই।
না না লাগবে না, আমি ক্যাব নিয়ে নেবো।
অনামিকা ভেংচি কেটে বলল, না না আমি ক্যাব নিয়ে নেবো, ক্যাব যেন উনার জন্য এইখানে বসে আছে। উঠো বেশি কথা বলোনা, তুমি মনে করেছো আমি তোমার বাসা চিনে ফেলবো আর তোমাকে বিরক্ত করবো নাহ?
আরে না না তুমি আমার বাসা চিনলে অসুবিধা কি, আচ্ছা চলো বলেই অভি পাশের সিটে বসলো, অনামিকা ড্রাইভিং সিটে উঠে ওর বিএমডাব্লিউ স্টার্ট দিলো। পথে আর তাদের কোনো কথা হলোনা শুধু অভি তার ঠিকানাটা বলল। গাড়ী যখন বাসার সামনে এসে দাঁড়াল অভি নেমে এলো গাড়ী থেকে তারপর অনামিকাকে বললো, আসো এক কাপ কফি খেয়ে যাও। অনামিকা বললো, অনেক রাত হচ্ছে, আজ আর না আরেকদিন আসবে বলতে বলতে নেমে এলো গাড়ীর দরজা খুলে, তারপর অভিকে জড়িয়ে ধরে বললো, ভালো থেকো তুমি, পরে আশা করি দেখা হবে।
আশা করি, জবাব দিলো অভি।
তাহলে আজ আসি, বাই।
বাই।
অনামিকার চলে যাওয়া দেখলো দাঁড়িয়ে থেকে।

পরের কয়েকদিন খুব ব্যস্থতায় কাঁটালো অভি আর অনামিকা প্রতিদিন ফোন দেয় খবর নেওয়ার জন্য। অভি ওর কোম্পানির জন্য তিনটি শীপের ডিল ফাইনাল কোড়লো এরপরে একদিন অনামিকা ফোন দিলো, হ্যালো অভি, কাল তো উইকেন্ড তুমি কি ফ্রি আছো?
কেনো, আমরা মানে আমি, স্টিভ, সিন্ডি, ইস্টেফেন সহ আরো কিছু আমাদের বন্ধুরা মিলে হাইকিংয়ে যাবো, সবাই পুরনো বন্ধু বান্ধবীরা আমাদের তুমি তো সবাইকে চিনো, চলোনা সবার সাথে তোমার দেখাও হবে আর মজাও করবো আমরা।
হুম তুমি বলছো, ঠিক আছে তাহলে আমি সকালে রেডি থাকবো।

পরের দিন খুব সকালে অভি ঘুম থেকে উঠে রেডি হয়ে নিলো, কিছুক্ষন পর অনামিকা রিং দিয়ে বললো তারা সবাই হাজির, নিচে দাঁড়িয়ে। অভি ওর নিজ হাইকিং ইকুইপমেন্ট নিয়ে চলে এলো নিচে, দুইটা ল্যান্ড রোভার নিয়ে এসেছে ওরা, গাড়ী থেকে সবাই নেমে এসে অভিকে জড়িয়ে ধরে বললো, hey man, after so many years, nice to see you again. সিন্ডি বললো Ovi you are looking so hot বলেই অনামিকাকে চোখ টিপলো, অনামিকা কপট রাগ দেখিয়ে বললো, don’t try Ovi, he is mine you know বলেই খিল খিল করে হেসে দিলো, সাথে সবাই হাসতে লাগলো, সে এমন হাসি যেন খুব মজা পেয়েছে। অভি হেসে বলল, how are you buddy’s? অনামিকা বলল, চল রওনা হই, অভি মাথা নেড়ে সায় দিয়ে ওর গিয়ার গুলো গড়ীর পিছনে দিয়ে উঠে বসলো।

ওরা যখন কেটসহিলের কাছাকাছি পোঁছাল তখন ১০টা বাজে প্রায়, ওরা গাড়ী রেখে হেঁটেই এগুলো কারণ পর্বত ৪১৮০ ফুট সমুদ্র লেভেল থেকে, ওরা হেঁটে উপরে উঠতে লাগলো, ক্রমশ খাড়া হচ্ছে পথ, সবার পড়নে শর্টস আর হাইকিং ড্রেস, কিছু পথ খুবই খাড়া হওয়াতে ওরা দড়ির সাহায্য নিলো, পথে একটু রেস্ট নিতে নিতে খাবার খেলো এরপর আবার শুরু করলো তাদের যাত্রা, একেবারে উপরে উঠে যখন সবাই উঠে এলো তখন ৪টা বাজে। সবাই একটু রেস্ট নিলো, অনামিকা বারবার অভির দিকে তাকিয়ে হাসি দিচ্ছে, অভি ইচ্ছে করেই অন্য দিকে তাকিয়ে বন্ধুদের সাথে গল্প করছে আর একটু পর সবাই এইখান থেকে প্যারাসুট জাম্প দেবে আর নামবে গাড়ী রাখার কাছাকাছি এক খোলা জায়গাই। একে একে সবাই জাম্পস্যুট পড়ে নিলো সাথে প্যারাসুট তারপর একে একে লাফ দিতে লাগলো নিচের দিকে। অভির আগে অনামিকা লাফ দেওয়ার জন্য রেডি হয়ে বললো, নিচে দেখা হবে, বাই বলেই লাফ দিলো তারপর অভি কিনারার কাছে গিয়ে লাফ দিলো, আগেও অভিরা এই প্যারাসুট জাম্প করেছে তাই কোনো চিন্তা করলো না। উপর থেকে সবাইকে লাল, নীল, হলুদ পাখির মত লাগছে, হঠাৎ অভি খেয়াল করলো অনামিকা তার প্যারাসুট খোলার জন্য বেল্ট ধরে টান দিচ্ছে বারবার এরপর ভয়ার্ত চিৎকার দিয়ে উঠলো, অভি ছাড়া বাকিরা সবাই প্যারাসুট খুলে ফেলেছে তাই অনামিকা ভয়ার্ত চোখে উপরে থাকা অভির দিকে তাকিয়ে থাকলো। অভি দ্রুত চিন্তা করতে লাগলো কি করবে তারপর অভি দুই হাত পিছনে নিয়ে গিয়ে ডাইভ দিলো অনামিকাকে লক্ষ্য করে, কাছাকাছি এসেই অনামিকাকে জাপটে ধরলো আর অনামিকাও ওকে জড়িয়ে ধরলো, অভি বলল, আমাকে চেপে ধরে রাখো আর যখন অনামিকা চেপে ধরলো অভি প্যারাসুটের বেল্ট ঠান দিলো আর সাথে সাথে দুজনকে নিয়ে প্যারাসুট উপরের দিকে লাফ দিলো।

অনামিকাকে নিয়ে অভি নিচে নেমে এলে বন্ধুরা সবাই দৌড়ে কাছে চলে এলো, সবাই জিজ্ঞেস করছে ওরা কেমন আছে, কি হয়েছে, ওরা নিজেরাই অভিদের প্যারাসুট খুলে নিলো। অনামিকা থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে মাঠিতে বসে পড়লো। একজন পানি এগিয়ে দিলে অনামিকা ঢক ঢক করে সব পানি খেয়ে নিলো। একটু ধাতস্থ হয়ে সে অভির কাছে এসে অভিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো আর বলতে লাগলো, আজ তুমি না বাঁচালে আমি মরেই যেতাম। কিছু সময় ওকে সহজ হতে দিয়ে সবাই গাড়ীর উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করলো। গাড়ীর স্টিয়ারিং অভি নিয়ে নিলো, শহরের কাছাকাছি এসে অভি সিন্ডিকে বলল অপর গাড়ীর সবাইকে ফোন দিয়ে বলো আজ আমি সবাইকে ডিনার করাবো, সবাই যেন রয়াল অর্কিড প্লাজাতে চলে আসে।
২৫ মিনিট পর সবাই এক হলো হোটেল লবিতে, অনামিকা অভির হাত ধরে আছে, সে এখনো তেমন সহজ হতে পারেনি। সবাই মিলে রেস্টুরেন্টে চলে এলো আর সবাই মিলে একটা টেবিল দখল করে বসলো। অভি সবাইর মতামত নিয়ে খাবার আর রেড ওয়াইনের অর্ডার করলো, এরপরে অনামিকাকে জিজ্ঞেস করলো, তুমি ঠিক আছো তো? অনামিকা আসতে করে নড করলো যে সে ঠিক আছে।

সবাই গল্পে মেতে উঠলো, বিষয় একটাই অভি না থাকলে আজ কি হতো, অভি ওদের ইশারায় না করলো এই বিষয়ে আর কথা না বলতে। চুপচাপ থাকা মেয়ে মায়রা হটাৎ অভিকে বলল, অভি তুমি আমাকে বিয়ে করো কারণ আমি এইদিক ওইদিক পড়ে যায় কিনা, তখন তুমি আমাকে বাঁচাবে। সবাই হা করে মায়রার দিকে তাকিয়ে থাকলো তারপর মায়রা অনামিকার দিকে তাকিয়ে দম ফাটা এক হাসি দিলো আর সাথে সবাই কারণ অনামিকা মায়রার দিকে কটমট করে তাকিয়ে আছে, এরি মধ্যে ড্রিংক সার্ভ হয়েছে আর খাবারো এসে গেছে আর সাথে সাথে সবাই মিলে জাপিয়ে পড়লো খাওয়ার জন্য, সবাইর খিদে এতক্ষণ পেট চোঁ চোঁ করছিল। খাওয়া শেষে সবাই ড্রিংক নিলো, ড্রিংক করতে করতে অভি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললো, বন্ধুগণ তোমাদের সাথে আমার আজকের এই সময় উদযাপন খুবই আনন্দের ছিল যা আজীবন আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে আর আরেকটি খবর তোমাদের দিতে চাই, আমি আগামীকাল আমেরিকা ছেড়ে যাচ্ছি। সবাইর একি প্রশ্ন, মাত্র তো এলে, এতো তাড়াহুড়ো কেন? অভি সবাইকে বুঝিয়ে বলল তার আরো কয়েকটি দেশে বিজনেস ভিজিট আছে, অনামিকা চুপ করে রইলো, চোখে পানি নিয়ে। বিল পে করে সবাই যার যার গাড়ীতে করে অভির এপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের সামনে এলো আর সবাই অভির কাছ থেকে বিদায় নিতে লাগলো, শেষে অনামিকা কাছে এসে অভিকে জড়িয়ে ধরে ওর বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো আর বলতে লাগলো, তোমার সাথে আমার আবার দেখা হবে আমি ভাবতেই পারিনি, আমি জানি আমার উপর তোমার অনেক রাগ, আমাকে মাফ করে দিয়ো তুমি, আজ তুমি না থাকলে আমার যে কি হতো ভাবতেই পারছিনা, তোমাকে কি বলে ধন্যবাদ দেবো বলো?
ওসব কিছুনা, আমার জায়গায় অন্য কেউ হলেও একি কাজ করতো, তুমি ওসব ভুলে যাও, অভি বলল।
তুমি কি আবার আসবেনা?
আসবো তো অবশ্যই কিন্তু কখন তা জানিনা।
আমাকে ভুলে যেওনা অভি বলেই অভির গলা জড়িয়ে ধরে অনামিকা কাছে টানলো আর এরপর অভির ঠোঁটে চুমু খেলো, অভি এই অবস্থায় একটু অপ্রস্তুতি ছিলো।
কাল কোন সময় যাচ্ছো অভি?
ভোরে, অভি জবাবে বললো।
আমি আসবো তোমাকে এয়ারপোর্টে নিয়ে যেতে।
না আমার সোফার দিয়ে আসবে, তোমরা যাও এখন আমি একটু রেস্ট নেবো।
ভালো থেকো বন্ধু, আমাকে ভুলে যেওনা, আসি অভি, বাই।

……….. চলবে।

বিঃ দ্রঃ
আজকের এই লেখাটি প্রিয় সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদকে উৎসর্গ করলাম, প্রিয় স্যার যেখানেই আছেন ভালো থাকুন।

১১৯জন ১১৯জন
0 Shares

১৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য