ভালোবাসার দেশটা আমার

রিমি রুম্মান ৩ নভেম্বর ২০১৮, শনিবার, ০৮:৩৬:১৮অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ১০ মন্তব্য

বাড়ির পাশেই বিশাল শপিংমল। হাঁটাপথের দূরত্ব। নানান ব্র্যান্ডের পোশাকের দোকানে ভরপুর। মেসি, জেসিপেনি, গ্যাপ, এইচ এন্ড এম …। কোন এক বিচিত্র কারনে চমৎকার এবং আরামদায়ক কোন পোশাক পছন্দ করে যখন বাড়ি ফিরি, তখন নজরে আসে লেবেলে লেখা ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’। কাকতালীয়ভাবে দীর্ঘ দুইযুগের প্রবাস জীবনে এমনটি ঘটেছে একবার নয়, দু’বার নয়, বহু বহুবার। এই ভেবে ভাল লাগে যে, এতো বড় শপিং মলের এতএত পোশাকের মাঝ থেকে তন্নতন্ন করে খুঁজে বের করে কিনে আনা পছন্দের জিনিষটিই আমার দেশের। কখনো মনে হয়, বাহ্‌ পোশাকগুলোর সাথে আমার অনেক মিল! পোশাকগুলো আমার মতোই দেশান্তরী! আবার কখনো বা মনে হয়, কেউ বুঝি হাজার হাজার মাইল দূরের ছোট্ট অভাগী দেশ, বাংলাদেশটা নিয়ে এলো আমারই সামনে। ভেতরে মন কেমন করা অদ্ভুত এক অনুভূতি জাগে। হৃদয় ভিজে উঠে আবেগে।

একবার বাংলাদেশ থেকে এদেশে সপরিবারে এলেন আমার বন্ধুর বড়বোন।। সন্তান জন্মদানের উদ্দেশ্যে স্বল্প সময়ের জন্য বিশ্বের রাজধানীতে পরিবারটির আগমন। ‘আমেরিকার সীমানার ভেতরে জন্মগ্রহণকারী প্রতিটি শিশুই এদেশের নাগরিক’, আইনের এই সুবিধাটি অনেকেই নিয়ে থাকেন। যথাসময়ে সন্তান জন্মদানের পর পরিবারটির দেশে ফিরে যাবার পালা। যাবার আগে কিছু কেনাকাটার প্রয়োজন। উনাকে একটি চেইন স্টোরে নিয়ে গেলাম। অনেকটা সময় নিয়ে বেশ কিছু পোশাক পছন্দ করেন। বিল পরিশোধের জন্যে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর ক্যাশ কাউন্টারের কাছাকাছি আসার এক পর্যায়ে উনার নজরে এলো প্রায় সব কয়টি পোশাকের ট্যাগেই ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লেখা। জিনিষগুলো আর নেয়া হোল না। কেননা, আমেরিকা থেকে বন্ধুদের জন্যে উপহার হিসাবে উনি বাংলাদেশের তৈরি জিনিষ নিতে চাচ্ছেন না। অতঃপর ‘মেইড ইন ইউএসএ’ লেবেল দেখে দেখে কিছু পোশাক ক্রয় করলেন পছন্দ না হওয়া সত্ত্বেও! বিষয়টি আমাকে যারপরনাই বিস্মিত করেছিলো সেদিন। সেইসাথে মনটাও খারাপ হলো বেশ।

আরেকবার আমার আরেক সন্মানিত অতিথি দেশ থেকে বেড়াতে এলেন। কেনাকাটার জন্যে তাঁকে নিয়ে যাই ম্যানহাঁটনের থার্টি ফোর ষ্ট্রীটের জেসিপেনি নামক স্টোরে। পূর্ব অভিজ্ঞতার কারনে এবার আগেভাগেই অতিথিকে দেখাই পোশাকের পিছনে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লেখা লেবেল। উনার চোখে মুখে আনন্দের ঝিলিক। খুশি হলেন বেশ। বললেন, আমাদের দেশে এক্সপোর্ট কোয়ালিটি প্রোডাক্ট তৈরি হচ্ছে তবে দেশের বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। এক্সপোর্ট কোয়ালিটির পণ্য বিদেশের বাজারের জন্যে বানানো হয়। বিদেশের বাজার থেকে নিজ দেশের জিনিষ কেনার মাঝে অন্যরকম সুখ, অন্যরকম গর্ব আছে, কি বলো ? কথাটি এত ভাল লেগেছে যে, সেই অতিথির প্রতি শ্রদ্ধায় নত হয়েছি মনে মনে বহুবার। আবেগাপ্লুত হয়েছি অগোচরে।

নভেম্বর এসে গেছে। শহরময় ঝরাপাতার হলদে সাজ। এই শহরে এরই মাঝে শীত জেঁকে বসেছে। ছেলেকে নিয়ে গ্যাপ নামক স্টোরে গিয়েছি শীতের কাপড় কিনবো বলে। অনেক দেখে শুনে ছেলে নিজের জন্যে জ্যাকেট পছন্দ করেছে। সে-ই তো আমার দেশীয় পন্য! আমরা মা-ছেলে ক্যাশ কাউন্টারের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। পেছনে দাঁড়ানো শ্বেতাঙ্গ দীর্ঘদেহী এক ভদ্রলোকের সাথে টুকটাক সৌজন্যসূচক কথা হচ্ছিল। একপর্যায়ে জানতে চাইলেন, আমি কোন দেশ থেকে এসেছি। বললাম, বাংলাদেশ। তিনি ‘ওহ্‌ রিয়েলি’ বলে চম্‌কে উঠলেন। অতঃপর তাঁর গায়ের শার্টটি দেখিয়ে চোখে মুখে হাসি ছড়িয়ে বললেন, এটি ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’। এই ভিনদেশে জন্মগ্রহণকারী আমার ছেলেটির সামনে এমন উত্তরে গর্বে বুক ভরে গেলো সেদিন। হবেই বা না কেন ? এই বিদেশ বিভূঁইয়ের বড় বড় চেইন স্টোরগুলোতে আমার দেশের শ্রেষ্ঠ কারিগরের তৈরি পোশাক ছড়িয়ে আছে। অচেনা মানুষজন সেইসব কিনছে, ব্যবহার করছে, বিশ্বের বুকে আমার দেশ সুনামের সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। শুধুই কী তাই ? এই যে হ্যালোইন ডে গেলো, আট বছর বয়সী ছোট ছেলের স্কুল পার্টিতে বাংলাদেশি ‘ রুচি বারবিকিউ ফ্লেভার চানাচুর’ নিয়ে যেতে চাইলো তাঁর শিক্ষক এবং ক্লাসমেটদের জন্যে। আমি বিস্ময় নিয়ে বললাম, ওরা এটা খেতে পছন্দ করবে ? সে দ্বিগুণ উৎসাহে বলল, আমি সবাইকে ‘বাংলাদেশি চিপস্‌'(!) দেখাতে চাই, খাওয়াতে চাই। তাঁর চাওয়া মত আমিও অনেকটা পথ ড্রাইভ করে দূরের বাংলাদেশি দোকানে ছুটে যাই বাংলাদেশ থেকে বিদেশের বাজারে আসা খাবার কিনতে। সম্ভবত আমার মত সকল প্রবাসীর দেশের প্রতি ভালোবাসার গাঁথুনি এমন একই সুরে গাঁথা। অনেকটা সেই গানটির মত …

“ তোমার সঙ্গে দেখা না হলে 

ভালোবাসার দেশটা আমার দেখা হতো না

তুমি না হাত বাড়িয়ে দিলে 

অমন একটা পথে চলা হতো না … 

** আজ ৩রা নভেম্বর। জেল হত্যা দিবস। স্বাধীনতার স্থপতিদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি । 

রিমি রুম্মান

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

৪২২জন ৪২২জন
0 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ