ভারত ভ্রমণের গল্প-৬

নিতাই বাবু ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, রবিবার, ০৫:৩৭:০৪অপরাহ্ন ভ্রমণ ৬ মন্তব্য

চিঠি পাঠাল এই কারণে যে, রমেশের জন্য যেন কোনও প্রকার চিন্তা না করে, তাই। এভাবে কেটে গেল আরও দুইদিন, রমেশের চিন্তাও বাড়তে লাগল।

এখন আর রমেশের কিছুই ভালো লাগছে না, শুধুই চিন্তা। চার-পাঁচদিন পর একদিন সকালবেলা কানাই বলল, ‘চল দুইজনে টাউনে গিয়ে ঘুরে আসি।’
রমেশ জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাবি?
কানাই বলল, ‘আজ তোকে মেট্রো ট্রেনে চড়াব আর সময় পেলে হাওড়া, তারামণ্ডলও দেখাতে পারি।’
এ তো খুশির সংবাদ! কিন্তু_খুশির বদলে রমেশের কান্না আসতে লাগল। চিন্তা শুধু একটাই, তা হলো এখানে আসলাম বেশ কিছুদিন হয়ে গেল। অথচ কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না, হচ্ছে শুধু টাকা খরচ। এভাবে ঘুরে বেড়ালে কি হবে? আমার তো কিছু একটা করতে হবে। ভাবছে, কানাইর সাথে যাব-কী-যাব না! না গেলেও হয় না। শেষমেশ কানাইর সাথে জামাকাপড় পঢ়ে রমেশ বাইর হলো।

কানাইর বাসা থেকে একটা রিকশায় চড়ে গেল, ধর্মতলা। এই ধর্মতলায় কলিকাতা শহরের বড় একটি বাসস্ট্যান্ডও আছে। আছে কলিকাতার বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার ট্রাম ও বাস সার্ভিস। রিকশা থেকে নেমে একটা চা-দোকানে গিয়ে চা-বিস্কুট খেলো। দোকান থেকে বাইর হয়ে ফুটপাতের দোকান থেকে সিগারেট কিনল রমেশ। রপমেশ সিগারেট জ্বালিয়ে টানছে আর হাটছে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখছে রমেশ। একসময় একটা রাস্তার ফুটপাত দিয়ে হাটছে দুইজনে। দুইটা দোকানের মাঝখানে মাটির নিচে যাওয়ার জন্য অনেক চওড়া জায়গা। নিচে যাওয়ার সুন্দর সিঁড়িও আছে। রমেশ কানাইকে জিজ্ঞেস করল, নিচে কী?
কানাই রমেশের কথার জবাবে বলল, ‘এটি হচ্ছে কোলকাতা শহরের ভূগর্ভস্থ পাতাল রেলস্টেশন। অনেকে বলে, মেট্রো ট্রেন-স্টেশন।’
রমেশ বলল, তা হলে আমরা কী এখন এই স্টেশনেই যাচ্ছি?
কানাই বলল ‘হ্যাঁ, তোকে তো বাসা থেকে বাইর হবার আগেই বলেছি। চল এখন নিচে যাই, গেলেই বুঝতে পারবি, পাতাল রেল কাকে বলে!’

এই মেট্রো ট্রেন হলো, পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা পরিবহণ সেবার মধ্যে একটি। এটির পরিসেবা কোলকাতা শহরের পার্শ্ববর্তী উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা পর্যন্ত। দ্রুত পরিবহন সেবা প্রদানকারী পরিবহণ ব্যবস্থাও বলা যায়। জানা যায়, কোলকাতা মেট্রো ট্রেনের পথ ২৭.২২ কিলোমিটার। এই ২৭.২২ কিলোমিটার পথে ২৩টি মেট্রো স্টেশন রয়েছে। যার মধ্যে ১৫টি স্টেশন ভূগর্ভস্থ আর বাদবাকিগুলো ভূতলস্থ এবং উড়াল; এই তিন প্রকারেই স্টেশনই রয়েছে। এই পরিবহণ সেবা চালু হয়েছিল, ১৯৮৪ সালে এবং এটিই ভারতের প্রথম মেট্রো রেল পরিষেবা। এরকম পাতাল রেল সার্ভিস না-কি ভারতের রাজধানী দিল্লিতেও আছে।

রমেশ-সহ দু’জন নিচের দিকে নামছে যত নিছে যাচ্ছে ততই সুন্দর। ঝকঝকা আলো আর লোকে-লোকারণ্য। স্টেশনের ভেতরে গার্ডের সাথে পুলিশও আছে। তাদের ডিউটি শুধু চেয়ে-চেয়ে দেখা। কে কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, এগুলো ফলো করা। মূল স্টেশনে প্রবেশ করতে হলে, চাই টিকিট। কম্পিউটারে টিকিট শো করলেই গেইট খুলবে, যাত্রী প্রবেশ করবে। এ-ছাড়া আর প্রবেশ করার মতো কারোর ক্ষমতা নাই।

কানাই কাউন্টার থেকে দু’টা টিকিট কিনে আনল। যাবে ধর্মতলা থেকে টালিগঞ্জ। টিকিটের দাম নিল, ৫ টাকা করে ১০ টাকা। দুটো টিকিটই একসাথে, মানে একটা টিকিট। টিকিটের গায়ে লেখা আছে টু-ম্যান। ট্রেন আসার সময় হয়েছে, হুইসেল শোনা যাচ্ছে।

কানাই বলল, ‘শিগগির আয়।’
দু’জনে কম্পিউটার সিস্টেম গেইটের সামনে গেল। কানাই গেইটের পাশে থাকা বক্সে টিকিট ডুকাল। টিকিটখানা শোঁ করে বক্সের পেছনে চলে গেল। কানাই আর রমেশ দু’জনে গেইট পার হয়ে টিকিটখানা হাতে নিলো। গেইটখানা ধরে রমেশ দেখছে, গেইট আর একটুও লড়ে-চড়ে না। টিকিটের গায়ে দুইজন লেখা, ঠিক দুইজন পার হওয়ার পরই গেইট বন্ধ। ট্রেন স্টেশনে এসে থামল, যাত্রিরা ট্রেন থেকে নামল। কানাই রমেশ ট্রেনে ওঠার জন্য রেডি হয়ে সামনেই দাঁড়িয়ে।

ট্রেন থেকে মাইকে বলছে, ‘টালিগঞ্জ যাওয়ার যাত্রিগণ ট্রেনে ওঠে আসন গ্রহন করুন।’

সব যাত্রী ট্রেনে ওঠে সিটে বসার পর, ট্রেন থেকে আবার মাইকিং। বলা হচ্ছে, ‘যাত্রিদের উদ্দেশে বলা হচ্ছে যে, আপনারা ট্রেনের দরজা ও জানালা থেকে দূরে থাকুন।’

এর পর-পরই ট্রেনের সকল দরজা ও জানালা একসাথে শোঁ করে লেগে গেল। রমেশ বুঝতে পারলো, দরজার সামনে যদি কেউ দাঁড়ানো থাকতো, তা হলে মৃত্যু অনিবার্য। তাই আগে থেকেই যাত্রিদের হুশিয়ার করে দেওয়া হয়, যাতে কোনও দুর্ঘটনা না ঘটে।

ট্রেন ছুটল দ্রুতগতিতে, জানালা দিয়ে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। যাচ্ছে মাটির নিচ দিয়ে, কিছু দেখা যাবে কী করে? শুধু একটু শব্দ শোনা যাচ্ছে, শোঁ শোঁ শব্দ। ১০ মিনিটের মতো বসে থাকার পর আবার মাইকিং।
বলা হচ্ছে, ‘আমরা টালিগঞ্জ পৌঁছে গেছি, ট্রেন থেকে নামার জন্য প্রস্তুত হোন।’

কানাই বসা থেকে ওঠে দাঁড়াল, সাথে রমেশও ওঠল। ট্রেন থামল, দু’জনে ট্রেন থেকে নেমে স্টেশনের বাইরে আসল। কিছুক্ষণ ঘুরেফিরে চা-বিস্কুট খেয়ে তৈরি হলো, আবার ধর্মতলা আসার জন্য। এবার ট্রামে চড়ে আসবে ধর্মতলা, দেখা হবে আর চড়াও হবে।

কলকাতা ট্রাম হলো শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন ব্যবস্থা। এটি এ-দেশের প্রথম ও একমাত্র পরিষেবা প্রদানকারি ট্রাম। জানা যায়, এটি এশিয়ার প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাম পরিবহন ব্যবস্থা। এই ট্রাম পরিসেবা প্রথম চালু হয়েছিল, ১৮৭৩ সালে। শোনা যায়, প্রথমে ঘোড়ার সাহায্যে না-কি ট্রাম চালানো হতো। ট্রাম, ঝুলন্ত ট্রাম নয়, এ-হলো রোড ট্রাম। যা বাস রোডের পাশ দিয়ে চলে। এই ট্রামের চলার রাস্তা হলো রেললাইন, ট্রাম দেখতে হুবহু রেলগাড়ির মতো। তবে ট্রেনের মতো এতো চওড়া নয়, সামান্য চিকন। বগি থাকে দুইটি, ড্রাইভার একজন; কন্ট্রাক্টর একজন। এক বগি থেকে অন্য বগিতে যাওয়া যায়। যাত্রী যেখানে খুশি, সেখানেই ওঠানামা করতে পারে। এই রোড ট্রামও চলে বিদ্যুতের সাহায্যে, তবে চলে আস্তে-আস্তে।

রমেশ ও কানাই ট্রামে চড়ে আসলো ধর্মতলা, এবার যাবে রানী ভিক্টোরিয়া পার্কে। এই ভিক্টোরিয়া পার্কটি ছিল যুক্তরাজ্য ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাণীর নামে। রানী ভিক্টোরিয়া ১ মে ১৮৭৬ সালে ভারত সম্রাজ্ঞী উপাধি ধারন করেন। তার স্মৃতিকে ধরে রাখতেই, তার নামে ‘রানী ভিক্টোরিয়া’ পার্ক নির্মাণ করেন ভারত সরকার। পার্কটি খুবই সুন্দর, পার্কের মাঝখানে আছে রানী ভিক্টোরিয়া ভাস্কর্য। প্রতিদিন বিকালবেলা এই পার্কটিতে থাকে লোকে লোকারণ্য। পার্কের গেটের সামনে বসে হরেকরকমের দোকান, যেন এক বৈশাখী মেলা। দেখা হলো ভিক্টোরিয়া পার্ক। রানী ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে বাইর হলো সন্ধ্যা লগ্নে। এ দিন রমেশের তারামণ্ডল দেখার আর সুযোগ হল না, চলে এলো কানাই’র বাসায়।

কানাই বলল, ‘আজ যখন তারামণ্ডল দেখা হল না, তা হলে আগামীকাল দেখব।’

রাতের খাবার খেয়ে দুইজনে শুয়ে পড়লো।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠলাম, তখন মনে হয় বেলা ১০ টার মতো বাজে। ঝটপট দুইজনে স্নান করে খাওয়া-দাওয়া করলাম। দিনটি ছিল রবিবার, রবিবার ভারতের সাপ্তাহিক ছুটির দিন। তাড়াতাড়ি না গেলে, তারামণ্ডল আজও দেখা হবে না। কারণ, ছুটির দিনে তারামণ্ডলে লোক অনেক বেশি হয়। কানাই রমেশকে নিয়ে গেল তারামণ্ডল দেখানোর জন্য। এটি হলো দক্ষিণ কলকাতার জওহরলাল নেহেরু রোডে। এর পাশে আছে, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল। এটি হলো মহাকাশচর্চা কেন্দ্র ও প্ল্যানেটরিয়াম জাদুঘর। নাম রাখা হয়েছে, এম. পি. বিড়লা তারামণ্ডল। এই তারামণ্ডলটি সাঁচীর বৌদ্ধ স্তুপের আদলে নির্মিত, একটি একতলা ভবনে অবস্থিত। শোনা যায়, এই
প্ল্যানেটরিয়ামটি এশিয়ার বৃহত্তম প্ল্যানেটরিয়াম। এটি ছাড়াও না-কি ভারতে আরও দুটি তারামণ্ডল আছে। একটি চেন্নাইতে, অপরটি হায়দ্রাবাদে অবস্থিত।

তখন তারামণ্ডলের ভেতরে যাওয়া বাবদ প্রবেশ মূলা ছিল ২টাকা। তারামণ্ডলের ভেতরে গেলো রমেশ, দেখলো তারামণ্ডল। ভেতরে যাবার পর রমেশের মনে হচ্ছিল যে, রমেশ যেন সৌরজগতে আছে। ইউটিউবে বা টিভিতে যেভাবে মহাকাশের দৃশ্য দেখে, ঠিক সেই ভাবেই দেখছে তারামণ্ডল।

তারামণ্ডল থেকে বাইর হলো দুপুরবেলা। দুপুরের খাবারের সময় হয়েছে, গেল এক হোটেলে। দু’জনে ভাত-মাছ আর মুগের ডাউল দিয়ে পেট ভরে ভাত খেলো। দুইজনের খাবারের বিল হলো, ৩০ টাকা।

হোটেল থেকে বাইর হয়ে রমেশ কানাইকে জিজ্ঞেস করলো, এবার কোথায় যাবি?
কানাই বলল, ‘জীবনে তো হাওড়া ব্রিজ নাম শুনেছিস, এবার দেখে যা বাস্তবে।’
সেখান থেকে ট্রামে চড়ে গেলো হাওড়া।

 

চলবে…

৩৩৬জন ৩৩৮জন
0 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য