ভারত ভ্রমণের গল্প-৫

নিতাই বাবু ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭, শনিবার, ০৯:১২:০০অপরাহ্ন গল্প, ভ্রমণ ৯ মন্তব্য

রমেশ বলল, ‘এখন তো রাত ১১টার মতো বাজে, দমদম পৌঁছতে কয়টা বাজবে?’
কানাই জবাব দিল, ‘রাত ১২টার মতো বাজতে পারে।’

কানাইর কথাই ঠিক হলো, রাত ১২টা দশমিনিটের সময় ট্রেন দমদম পৌঁছাল। দু’বোনকে নিয়ে কানাই, রমেশ ট্রেন থেকে নামল। দমদম স্টেশনটা তখন নিস্তব্ধ, কোনও মানুষ নাই। ভারতের মানুষ এমনিতেই অনেক হিসাব করে চলে, বাইরে বেশি রাত করে না। সবাই চলে নিজের ধান্ধায়, কী করবে_কীভাবে চলবে এসব নিয়ে। বাংলাদেশের মতো অযথা রাস্তাঘাটে, হাট-বাজারে আড্ডা দেয় না। আর এখনতো রাত ১২ টারও বেশি, তাই জনশূন্য। ট্রেন থেকে যেই কয়জন যাত্রী নামল, সেই কয়জন মানুষেও ক্ষণিকের জন্য। যাত্রীরা যার-যার গন্তব্যে চলে গেলে স্টেশনে আর কোনও মানুষই থাকবে না।

সবাই স্টেশনের বাইরে এলো, রমেশ এদিক-ওদিক দেখছে, চা-দোকান আছে কি না। নাই, কোথাও কোনও চা-দোকান এতো রাতে খোলা নাই। নাই কোনও রিকশা বা ভ্যানগাড়িও। দমদম স্টেশন থেকে কানাইর বন্ধুর বাড়ি দুই কিলোমিটারের পথ। সাথে তিনচারটা বড়-বড় ব্যাগ। সেই সন্ধ্যার পর থেকেই টেনশন আর হাটা । রমেশের শরীর একরকম ক্লান্ত হয়ে পরছে। কিছু বলতেও পারছে না যে, আমি খুবই ক্লান্ত অনুভব করছি। কী আর করা! দুই কিলোমিটার পথ খুব কষ্ট করে হেটে, কানাইর বন্ধুর বাসায় পৌঁছাল। ভারতের বাড়ি, হিসেবি মানুষের দেশ। ভাই আর বন্ধু, অসময়ে কেউ কারোর জন্য মাথা ঘামায় না। নিজের আপন বোনও ভাইকে দুইদিন জায়গা দিতে চায় না। কোনও লোকের বাড়িতে একবেলা খাবার যেমন তেমন, পরের বেলাই হিসাব।

কানাইর বন্ধুর বাড়ির গেইটের সামনে গিয়ে সবাই দাঁড়াল। কানাইর বন্ধুটির নাম, প্রদীপ। কানাই বন্ধুর নাম ধরেই অনেক ডাকল, সাড়াশব্দ নাই। অনেকক্ষণ ডাকার পর, বন্ধুটি চোখ মুছতে-মুছতে গেইটে আসল।
জিজ্ঞেস করল, ‘কী রে, এতো রাতে?’
কানাই বলল, ‘বাংলাদেশ থেকে এলাম, যেতে হবে শিয়ালদা। কিন্তু শিয়ালদা পৌঁছতে অনেক রাত হয়ে যাবে, তাই তোদের বাড়ি এলাম।’
প্রদীপ জিজ্ঞেস করল, ‘সাথে ওরা কারা?’
কানাই রমেশকে দেখিয়ে দিয়ে বলল, ‘ও আমার বন্ধু আর আমার ছোট দুই বোন।’
কথা বলতে বলতেই প্রদীপ বাড়ির গেইট খুলছে। এমন সময় প্রদীপের বৃদ্ধ মা সামনে এসে প্রদীপকে জিজ্ঞেস করল, ‘প্রদীপ, কে আসলো রে? এতো রাতে কোত্থেকে?’
মায়ের কথায় প্রদীপ জবাব দিল, ‘মা, আমার বন্ধু কানাই, দু’বোন নিয়ে বাংলাদেশ থেকে এসেছে। আজকের রাতটা আমাদের এখানে থাকবে ওরা, কাল চলে যাবে।’
প্রদীপের মা বললেন, ‘আয় ওদের ভেতরে নিয়ে আয়। রাত অনেক হয়েছে। ওরা কী বাইরে থেকে খাওয়াদাওয়া সেরে এসেছে? না আমার কিছু করতে হবে? আমার শরীরটাও ক’দিন যাবত বেশি একটা ভালো যাচ্ছে না। আয় আয় ভেতরে, আয় শিগগির।’

প্রদীপ আগে, রমাশ-সহ চারজন পিছনে-পিছনে যাচ্ছে বাড়ির ভেতরে। বিশাল ঘর, পুরানো বিল্ডিং, দেয়ালের চারদিক নক্সা করা কারুকার্য। ঘরের ভেতরে সুবিশাল আয়তাকার অতিথিশালা আর চারদিক দামী চেয়ার বসানো। দেয়ালে নানা রঙের ছবি টানানো রয়েছে। রমাশদের সাথে নেওয়া ব্যাগগুলো মেজেতে রেখে সবাই বসল। প্রদীপের মা একটা প্লেটে করে কিছু বিস্কুট নিয়ে আসলেন, অতিথিশালায়।
বিস্কুটগুলো সামনে দিয়ে বললেন, ‘খাও বাবা সকল, এতো রাতে আর কোনও ঝামেলা করবো না। এগুলো খেয়ে শুয়ে পড়ো, সকালের খাবার খেয়ে তোমরা যাবে।’
কানাই বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে মাসিমা, আমরা হাত মুখ ধুয়ে তারপর খাব। আর সকালবেলাও আমাদের জন্য আপনার কিছু করতে হবে না। আমাদের খুব ভোরবেলা রওনা দিতে হবে।’

প্রদীপের মা শোবার ঘরে চলে গেলেন, প্রদীপ তখনও অতিথিশালায়। কানাইর সাথে শোফার একপাশে বসে ঘুমাচ্ছে।
কানাই প্রদীপকে জাগিয়ে বলল, ‘কী হলো রে প্রদীপ? ঘুমিয়ে পড়লি? আমরা কে কোথায় ঘুমাবো একটু বলে দে?’
প্রদীপ চোখ ঢলতে-ঢলতে শোফা থেকে ওঠে বলল, ‘ভেতরে আর জায়গা নেই যে। তোদের সবাইকে এখানেই ডলা-ডলি করে থাকতে হবে।’

এই কথা বলেই প্রদীপ আরেক ঘরে চলে গেল। অতিথিশালায় এখন শুধু রমেশ-সহ চারজন ছাড়া কেউ নেই। সবাই পেটের খুদায় আর ঠিক থাকতে পারছে না। খুদা নিবারণের জন্য মাসিমার দেয়া বিস্কুটগুলো সবাই মিলেমিশে হজম করল। এখন ঘুমও পাচ্ছে, অতিথিশালায় তিনটে শোফা ছাড়া আর কোনও বিছানা-পত্র ছিল না। কানাই একটায়, রমেশ একটায় আর দু’বোন একটা শোফায় ঘুমিয়ে পড়ল। সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও রমেশের চোখে ঘুম নেই, শুধুই চিন্তা। ভারতের এমন কিচ্ছা-কাহিনী রমেশ বহু আগেই শুনেছে। এবার নিজ চোখে দেখার ভাগ্য হলো, যেমনটা কিছুক্ষণ আগেই দেখল।

বাংলাদেশে একজনের বাড়িতে কোনও অতিথি আসলে, কতনা সমাদর করে। অতিথির জন্য রাত আর দিন কোনও বিষয় নয়, অতিথিকে সমাদর করাটাই বড় বিষয় । আর এখানে রাত হয়েছে বলে যত যন্ত্রণা। কিছু খাও আর ননা খাও, সকালবেলা চলে যাও। রমেশ ভাবছে, যার কাছে যাব, সে যদি এমন করে, তা হলে কোথায় যাব? কানাইর কাছেও ক’দিন থাকব। বড় দিদির বাড়ি গেলে, বড় দিদি যদি আমাকে দেখে বিরক্ত হয়? তা হলে যাবো কোথায়? চাকরি যদি মনোমত না হয়, তা হলে? এমন আরও অনেক অনেক প্রশ্ন নিয়ে একসময় রমেশ ঘুমিয়ে পড়ল।

সকাল হল, সময় তখন ভোর ৫টা, সূর্য মামা তখনও উঁকি দেয়নি। অনেক রাতে ঘুমানো, সবাই তখনও ঘুমে বিভোর।
সেসময় প্রদীপের মা এসে সবাইকে ডেকে বলছে, ‘ওঠো ওঠো-গো বাবা সকল, সকাল ৫টা বাজে। তোমরা যখন শিয়ালদা যাবে, সকাল পৌনে ছয়টার সময় একটা ট্রেন আছে। তাড়াতাড়ি ওঠো, ট্রেনটা ধরতে পারলে নিরিবিলি যেতে পারবে।’

প্রদীপের মায়ের কথা শুনে ররমেশ ওঠে কানাইকে বলছে, ‘এই কানাই, তাড়াতাড়ি করে রেডি হয়ে নে। ছয়টা বাজতে আরো ৪৫ মিনিট বাকি আছে, ট্রেনটা হয়ত ধরতে পারব।’

কানাই কুরমুড়ি দিয়ে ওঠে ওর দু’বোনকে ঘুম থেকে ওঠাল। প্রদীপদের বাড়িতে আর কিছু খাওয়া হল না, চলে আসলো দমদম রেলস্টেশনে। স্টেশনে এসে একটা চা-দোকানে সবাই চা-বিস্কুট খেয়ে সকালের নাস্তা সারল। এরপর কানাই তাড়াতাড়ি করে স্টেশনের ভেতরে গিয়ে চারটে টিকেট কিনল। ট্রেন আসার পর সবাই ট্রেনে গিয়ে বসল। ট্রেন শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছালো সকাল ৮টায়। শিয়ালদা স্টেশনের বাইরে এসে একটা অটো রিজার্ভ নিয়ে নিলো। অটো দিয়ে যাচ্ছে আর রমেশ দেখছি সেখানকার ১৪০০ বঙ্গাব্দ, বর্ষবরণ উৎসব। প্রতিটি রাস্তার মোড়ে-মোড়ে, মহল্লায়-মহল্লায় এখানে-সেখানে চলছে বর্ষবরণের আয়োজন। কোথাও-কোথাও বৈশাখী লোকজ মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চ। অটো চলল প্রায় ৩০ মিনিটের মতো, নামল বাঘ যতীন রেলস্টেশনের বিপরীতে এক মহল্লায়। সেখান থেকে একটু পায়ে হেটে গেল কানাইর ভাড়া করা বাসায়।

এই জায়গাটার নাম বাঘা যতীন কেন হলো রমেশ তা কানাইর কাছে জানতে চাইল।
জবাবে কানাই বলল, ‘এই বাঘা যতীনের বাড়ি ছিল আমাদের বাংলাদেসের কুষ্টিয়া জেলার কয়া গ্রামে। তাঁর পিতার নাম উমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় এবং মাতার নাম শরৎশশী। বাঘা যতীন শৈশব থেকেই শারীরিক শক্তির জন্য বিখ্যাত ছিলেন। শুধুমাত্র একটি ছোরা নিয়ে তিনি একাই একটি বাঘকে হত্যা করতে সক্ষম হন বলে তাঁর নাম রটে যায়, বাঘা যতীন। এখানে থেকেই না কি বাঘা যতীন কোনও একসময় লেখাপড়া করতেন। তিনি ছিলেন একজন বাঙালি ব্রিটিশ-বিরোধী বিপ্লবী নেতা। ব্রিটিশ-বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের সম্মুখ যুদ্ধে উড়িষ্যার বালেশ্বরে তিনি গুরুতর আহত হন। কিছুদিন বালাসোর হাসপাতালে থাকার পর অবশেষে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর একসময় ভারত ব্রিটিশ থেকে স্বাধীনতা লাভ করেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাঘা যতীন স্মরণে জায়গার নাম রাখা হয় বাঘা যতীন।’

এই বাঘা যতীন এলাকার কানাই এখন স্থায়ী বাসিন্দা, থাকে ব্যাচেলর। যেই বাড়িতে থাকে, সেই বাড়িওয়ালার ঘরেই কানাই খাওয়া-দাওয়া করে। কানাই থাকত একা, এখন সাথে আরও তিনজন দেখে বাড়িওয়ালার মাথায় হাত। এখন কানাইকে কিছু বলতেও পারছে না, আবার সইতেও পারছে না। রমেশ সেটা ভালো করে ফলো করছে, যখন খাবার খেতে যাই তখন।

সেখানে দুইদিন থাকার পর রমেশ কানাইকে বলল, ‘আমাকে রতন চক্রবর্তীর বাড়ি নিয়ে যা, এখানে তোর সমস্যা হচ্ছে।’
কানাই বলল, ‘যাব আরো দুইদিন পরে। আগে তোকে কোলকাতা শহরটা একটু ঘুরিয়ে দেখাই। ওখানে গেলে তো আর সহা-শিগগির আসতে পারবি না। তাই কিছু সুন্দর-সুন্দর জায়গা দেখে যা, আর চিনেও যা।’
রমেশ বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, তা-ই হবে।’

কানাইর কথায় আর রমেশ অমত করেনি, দুইদিন কানাইর সাথে শুধু ঘোরাফেরা করল। এদিকে রতন চক্রবর্তীর স্ত্রী ভারত আসার কথা, রমেশকে সুন্দর একটা ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু কই! তিনিও আসছে না, কানাইও তার জন্যই অপেক্ষা করছে। এই অপেক্ষার মধ্যে কেটে গেল আরও দুইদিন। এর এক ফাঁকে রমেশ নিকটস্থ পোস্ট অফিস থেকে একটা চিঠির খাম কিনল। নিরিবিলি সময়ে চিঠি লিখে পাঠাল, রমেশের স্ত্রীর কাছে। চিঠিতে জানিয়ে দিল, ‘আমি মঙ্গল মতো কলিকাতা পৌঁছেছি।’
চিঠি পাঠাল এই কারণে যে, রমেশের জন্য যেন কোনও প্রকার চিন্তা না করে, তাই। এভাবে কেটে গেল আরও দুইদিন, রমেশের চিন্তাও বাড়তে লাগল।

 

  • চলবে…
৪৩৫জন ৪৩৪জন
0 Shares

৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য