ভারত ভ্রমণের গল্প-৪

নিতাই বাবু ২০ আগস্ট ২০১৭, রবিবার, ১০:৪৪:৩৭পূর্বাহ্ন গল্প ৯ মন্তব্য

 

কানাই ওর দুবোনকে নিয়ে স্টেশনের বাইরে গেল কিছু খেতে। রমেশ একা দাঁড়িয়ে আছে সাথে নেওয়া ব্যাগগুলো পাশে। রমেশের ভেতরটা কেমন যেন ভয়ে কাঁপছে আর এদিকওদিক তাকাচ্ছে। স্টেশনে থাকা ট্রেনের টিটিকে দেখলেও রমেশের শরীর ছমছম করছে। ‘বাংলাদেশ থেকে আসা, সাথে নেই পাসপোর্ট । আন্তর্জাতিক আইনে অপরাধী, একবার ধরা খেলে আর রক্ষা নাই। যদি ধরা পড়ে যাই, দেশে রেখে আসা দুটো সন্তানের দশা কী হবে? ওদের কে দেখবে, স্ত্রীর কী গতি হবে? বিনা পাসপোর্টে কেন-ই-বা আসলাম! না আসলেও তো হতো।’ রমেশের ভাবনার শেষ নাই, কানাইও আসছে না।

সিগারেটে অভ্যস্ত লোক রমেশ, সাথে একটা সিগারেটও নেই। রমেশ যেন এক সঙ্গীহীন মানুষ, তার ধারেকাছেও কেউ নেই। এমন অনেককিছু ভাবতে ভাবতে একসময় কানাই ওর দুবোনকে নিয়ে হাজির হলো। ওদের দেখে রমেশ যেন প্রাণ ফিরে পাওয়া এক ব্যক্তি। রমেশের এখন সাহস লাগছে, শরীরে রক্ত সঞ্চালন শুরু হয়েছে। এতক্ষণ যেন রমেশের শরীরের সমস্ত রক্ত বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল। রমেশকে একা রেখে বাইরে গিয়ে কানাইও ভাবছিল রমেশের কথা। ‘কেউ নাকি কিছু জিজ্ঞেস করছে রমেশকে, রমেশ উল্টাপাল্টা কিছু যদি বিলে ফেলে? ভারতের পুলিশের হলো রাজার হাল, সহজে দেখা যায় না। আবার কাউকে ধরলে আর ছুটানো যায় না। রমেশকে পুলিশে যদি কিছু জিজ্ঞেস করে? ভারতে বাটপারের অভাব নাই, সব জায়গায়, সবখানে বাটপারদের রাজত্ব। যদি কোনও বাটপারের কবলে পড়ে?’ এমন চিন্তা নিয়ে তাড়াতাড়ি করে কানাই এলো।

কানাই এসেই রমেশকে জিজ্ঞেস করল, “কি রে? ভয়ে ছিলি না কি? আমি তো তোর জন্য খুবই চিন্তায় ছিলাম। তুই এখানে এদেশে নতুন, তোর কথাও বাংলাদেশী। কথা বললেই ধরা খাওয়ার জোগাড়, আবার কোনও জায়গার নামও জানিস না। এসব চিন্তা করে আমি তাড়াতাড়ি চলে এলাম। এখন বল, তোকে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করেছে?”

রমেশ হাসি দিয়ে বলল, “আ-রে না, কেউ কিছু জিজ্ঞেস করেনি, আর জিজ্ঞেস করলে জবাব দিতাম। তবে তোদের আসতে দেরি দেখে একটু ভয় পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, যদি কোনও বিপদে পড়িস, তা-হলে তো মহাবিপদ হবে। এখন তোদের দেখে একটু ভালো লাগছে, এতক্ষণ শরীরটা অস্থির লাগছিল। এবার আমাকে কিছু খাওয়া? আমার যে বড্ড খিদা পেয়েছে রে।”

রমেশের কথা শুনে কানাই বলল, “এখন তো এখানে ওদের একা রেখে স্টেশনের বাইরে যাওয়া ঠিক হবে না। আমি তোকে দেখিয়ে দিচ্ছি, তুই বরং একা গিয়েই ঝটপট কিছু খেয়ে আয়। ওখানে আটার রুটি, চা’বিস্কুট সবই আছে, তুই তাড়াতাড়ি যা। ঝটপট না করলে সমস্যা হবে, কারণ, কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন আসবে। ট্রেন আসলে আর বেশি দেরি করে না, যাত্রী উঠতে নামতে যতক্ষণ। কারেন্টের ট্রেন, হুইসেল দিলেই ছুটলো, তুই যা তাড়াতাড়ি করে কিছু খেয়ে আয়।”
কানাইর কথা শুনে রমেশ প্রথমে ভয় পাচ্ছিল, পরে সাহস জুগিয়ে বলল, “স্টেশনের গেইটে থাকা গার্ড কিছু জিজ্ঞেস করবে?”
কানাই বলল, “না না, গার্ড কিছুই জিজ্ঞেস করবে না। তুই তাড়াতাড়ি গিয়ে খেয়ে আস, ট্রেন আসার সময় হয়ে গেল।”
রমেশ বলল, “আচ্ছা যাচ্ছি!”
রমেশ যাওয়ার আগে কানাই জিজ্ঞেস করল, “বর্ডার থেকে যেই টাকা বদল করে দিয়েছি, সেই টাকা থেকে কিছু টাকা আলাদা করে রাখ। সব টাকা বাইর করার দরকার নাই, ভারতের বাড়ি, টাকার খুব দাম!”

রমেশ কানাইর কথামত কিছু টাকা সামনের পকেটে রাখল। আর বাদবাকি টাকা প্যান্টের ভেতরের পকটে রেখে গেল গেইটের বাইরে। বাইরে গিয়ে চা’বিস্কুট নিয়ে খাচ্ছে, এমন সময় ট্রেনের হুইসেল শোনা যাচ্ছে। ট্রেনের হুইসেল শুনে রমেশে বুকের ভেতরে কামড়াকামড়ি করছে; কখন রমেশ স্টেশনের ভেতরে যাবে সেই চিন্তায়। ঝটপট দোকানদারকে চা’বিস্কুটের দাম বিয়ে দৌড়ে আসলো, স্টেশনের ভেতরে। ভেতরে আসার পর কানাই বলল, “কী খেয়েছিস? এতো ঝটপট চলে এলি যে?”
কানাইর কথা শুনে রমেশ বলল, “আ-রে ভাই, আমি তো ট্রেনের হুইসেল শুনে চলে এলাম। তুই একবার বলেছিস, ইলেক্ট্রিক ট্রেন, হুইসেল দিতে দেরি_ছুটতে দেরি নেই। সেই কথায় আমি কোনোরকম খেয়ে দৌড়ে চলে এলাম।”
কানাই হেসে বলল, “ট্রেনের ইঞ্জিন ঘুরায়ে সামনে নিয়ে লাগাবে। তারপর ট্রেন ছাড়বে, আর ট্রেন ছাড়ার আগে মাইকে বলে দিবে। এখন চল ট্রেনে গিয়ে সবাই বসে পড়ি।”

কানাইর দুবোন সহ রমেশ, ট্রেনের ভেতরে গিয়ে গিয়ে বসলো। রমেশ নাম শুনেছে ইলেক্ট্রিক ট্রেন, কিন্তু কোনদিন চড়ে দেখেনি । রমেশের এই প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রেনে চড়া। ট্রেনের বগিগুলো অনেক চওড়া, দুইপাশে বসার টেবিল। মাঝখানে খালি জায়গা, খালি জায়গার উপরে আছে সারি সারি হাতা। বনগাঁ টু শিয়ালদা রাতের শেষ ট্রেন, তাই যাত্রী সীমিত। পুরো বগিতে রমেশ কানাই ও দুবোন সহ ৭/৮ জন। ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল, এবার হয়ত ট্রেন ছাড়ছে । বাংলাদেশর ডিজেল ট্রেনও স্টেশন থেকে ছাড়ার আগে হুইসেল দেয়। কিন্তু ট্রেনের হুইসেল শুনেও দৌড়ে আসে ট্রেনে ওঠা সম্ভব হয়। ভারতের বৈদ্যুতিক ট্রেনের বেলায় আর তা সম্ভব নয়। হুইসেল দেওয়ার সাথে সাথে শোঁ, মানে ট্রেন আর দেখা যাচ্ছে না। ট্রেন চলছে দ্রুতগতিতে, রমেশ বসে আছে কানাইর পাশে। দুবোন সিটের এককোণে বসা, ট্রেন একটা স্টেশনে থামল। ট্রেন ছাড়ার আগে রমেশদের বগিতে ওঠল, তিনজন ফেরিওয়ালা। একজন বাদাম, আরেকজন আপেল, অপরজন চানাচুর। কানাই ওর দুবোনকে জিজ্ঞেস করল, “এই তোরা কি বাদাম খাবি? না আপেল খাবি? রমেশ তুই কিছু খাবি?”
কানাইর দুবোন বাদাম খাবে, রমেশ কিছুই খাবে না। মনটা খারাপ করে একা একা কীযেন ভাবছে। চিন্তাভাবনার শেষ নাই রমেশের, কেন আসলাম কোথায় যাবো, কী করবো? এমন হাজার প্রশ্ন। ভাবনার এক ফাঁকে কানাইকে রমেশ জিজ্ঞেস করল, “কানাই, আমরা কখন গিয়ে পৌঁছবো?”
কানাই বলল, “আমরা প্রথমে এখন দমদম যাবো। ওখানে আমার এক বন্ধু থাকে, তার বাসায় আজকের রাতটা থাকবো। কাল সকালে আবার ট্রেনে করে যাবো শিয়ালদা। এই গাড়িতে করে যদি শিয়ালদা যাই, তবে রাত হয়ে যসবে প্রায় ৩ টা। এতো রাতে দুবোনকে সাথে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না, সমস্যা হতে পারে। তাই আজ রাতটা দমদম বন্ধুর বাসায়ই থাকবো।”
রমেশ বলল, “এখন তো রাত ১১টার মতো বাজে, দমদম পৌঁছতে কয়টা বাজবে?”
কানাই জবাব দিল, “রাত ১২টার মতো বাজতে পারে।”

চলবে…যতদূর সম্ভব

২৪৯জন ২৪৯জন
0 Shares

৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য