১৬৬৩ খ্রিষ্টাব্দে ভূষণার বালক রাজপুত্রকে অপহরণ করে মগেরা ক্রীতদাস হিশেবে বিক্রি করতে আরাকান রাজ্যে নিয়ে যায়। আরাকানে পর্তুগীজ ফাদার মানুয়েল রোজারিও টাকার বিনিময়ে রাজপুত্রকে উদ্ধার করে নিজের বাসায় নিয়ে যান। সেখানে তিনি রাজপুত্রকে ধর্মশাস্ত্র শিক্ষাদান শুরু করেন, রাজপুত্র খ্রিষ্টধর্ম শিখছিলেন মনযোগ সহকারে, তবে হিন্দুধর্মে তাঁর অগাধ বিশ্বাসের কারণে ধর্ম ত্যাগে অসম্মতি জানান। বলেন, কেবলমাত্র স্বপ্নে ঈশ্বরের নির্দেশ পেলেই খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করবেন। এক রাতে সেইন্ট আন্তোনিও রাজপুত্রকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে ধর্ম ত্যাগ করতে বলেন এবং রাজপুত্রের গলায় একটি ক্রুশ এঁকে দেন। সকালে রাজপুত্র ফাদার মানুয়েলকে ক্রুশ দেখিয়ে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের নির্দেশের কথা জানান। খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের পর সেইন্ট আন্তোনিও’র নামানুসারে রাজপুত্রের নাম হয় আন্তোনিও দোম রোজারিও।

খ্রিষ্টধর্ম শাস্ত্রজ্ঞ আন্তোনিও দোম রোজারিও দেশে ফিরে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের সাথে হিন্দুধর্মের অসারতা ও রোমান ক্যাথলিক ধর্মের উৎকর্ষ বিষয়ে তর্ক-বিতর্কের সুবিধার্থে তিনি একটি বই লিখেন যার নাম ‘ব্রাহ্মণ-রোমান-ক্যাথলিক-সংবাদ’। একজন পাদ্রী দোম রোজারিও’র বইটির পর্তুগীজ হরফে অনুলিপি তৈরি ও পর্তুগীজ ভাষায় অনুবাদ করেন। ১৭৪৩ খ্রিষ্টাব্দে লিসবন শহরের ফ্রান্সিসকো দ্যা সিলভা ছাপাখানায় দোম আন্তোনিও’র বইটি রোমান হরফে ছাপা হয় – এটাই ছাপাখানায় ছাপা প্রথম বাঙলা বই। বইটি ছিল মূলত এ দেশীয় ব্রাহ্মণের সাথে রোমান ক্যাথলিক শাস্ত্রজ্ঞের ধর্ম বিষয়ক কথোপকথন।

প্রথমে বাঙলা থেকে পর্তুগীজ হরফে, তারপর পর্তুগীজ হরফ থেকে রোমান হরফে অনুলিখন, ব্যাপারটা সহজ ছিল না। আবার ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে পাদ্রীগণ বাঙলা ভাষা শিখলেও বাঙালিদের মতোন পারদর্শী ছিলেন না, তাই বইয়ে প্রচুর অসঙ্গতি দেখা যায়। বর্তমানে আমরা যেমন ফোনেটিকের সাহায্যে রোমান হরফে বাঙলা বর্ণমালা চিহ্নিত করতে পারি, তখন এই ধরনের কোন নিয়ম ছিল না। তাই হরফ চিহ্নিতকরণ ও বানানের ব্যতিক্রম ছিল অনেক। যেমন ‘ভজো’ ও ‘ভজি’ কে লেখা হয়েছে ‘bhoso’ ও ‘bhusi’। ‘চ্ছ’ কে কোথাও ‘cch’ কোথাও ‘chch’ লেখা হয়েছে। আবার ‘উচ্ছেদ’ কে লেখা হয়েছে ‘used’। ‘x’ দ্বারা একইসাথে ‘স’, ‘শ’, ‘ষ’, ‘চ’ ও ‘ছ’ লেখা হয়েছে। যেমন ‘ছোট’-কে ‘xotto’, ‘সেই’-কে ‘xei’, ‘শরীরে’-কে ‘xorire’। ‘ক’-কে সবসময়ই ‘c’ লেখা হয়েছে। অনুলিখনের কোথাও সাধু রীতি অনুসরণ করা হয়েছে, কোথাও চলিত রীতি। এই ধরনের অনেক অসঙ্গতি আছে। তবুও বইটি আমাদের কাছে ধনরত্নের চেয়েও দামী।

বইয়ের প্রথম পাতা রোমান ও বাঙলা হরফে তুলে দেয়া হলো।

Bramane : Tomi care bhoso?
ব্রাহ্মণ : তুমি কারে ভজো?

Roman : Poromexorere Purno Bromere.
রোমান : পরমেশ্বরে পূর্ণ ব্রমেরে (ব্রহ্মেরে) ।

Bramane : Tobe tomara boro utom bhosona bhoso, amora tahara bhusi.
ব্রাহ্মণ : তবে তোমরা বড় উত্তম ভজনা ভজো। আমরা তাহারে ভজি।

Roman : zodi tomora xei Purno Bromere bhoso tobe queno eto cubit. Cudhoram nana odhormo bhosona deqhi?
রোমান : যদি তোমরা সেই পূর্ণ ব্রমেরে (ব্রহ্মরে) ভজো তবে কেন এত কুবিত (কুরীত)। কুধরাণ নানা অধর্ম ভজোনা দেখি?

Bramane : Tomi emot guiamonto hoia amardiguer Poromexorere ninda coroho? Ehate tomardiguer xastre oparniman nahi?
ব্রাহ্মণ : তুমি এমত গিয়ানমন্তো হইয়া আমারদিগের পরমেশ্বরেরে নিন্দা করো? ইহাতে তোমারদিগের শাস্ত্রে অপারনিমান (অপরিণাম, মন্দ পরিণাম) নাহি?

Roman : Amarghore xastre liqhiasen ze zon dhormo ninda core, xe boro naroqui; ebons ze zon odhormere dhormo bole xe moha naroqui.
রোমান : আমারগোর শাস্ত্রে লিখিয়াছেন যে জন ধর্ম নিন্দা করে, সে বড়ো নরকী; এবং যে জন অধর্মরে ধর্ম বলে সে মহা নরকী।

Brahman : Tobe to tomardiguer xastre ze ninda corile moha naroqui hoe; tobe queno ninda corila?
ব্রাহ্মন : তবে তো তোমারদিগের শাস্ত্রে যে নিন্দা করিলে মহা নরকী হয়; তবে কেন নিন্দা করিলে?

Roman : Amito dhormo ninda corina, dhormere dhormo cohi; odhormere odhormo cohi; puniore punio cohi; zononire zononi cohi; strire stri cohi; Bromere Bromon cohi; Chondalere chondal cohi;
রোমান : আমিতো ধর্ম নিন্দা করিনা, ধর্মেরে ধর্ম কহি; অধর্মেরে অধর্ম কহি; পূণ্যরে পূণ্য কহি; জননীরে জননী কহি; স্ত্রীরে স্ত্রী কহি; ব্রমেরে (ব্রাহ্মনেরে) ব্রমন (ব্রাহ্মন) কহি; চন্ডালেরে চন্ডাল কহি;
dhugdere dhugdo cohi; Gochonere gochona cohi; Omertere omerto cohi; bixere bix cohi; emot cothae punio bade pap nahi; ehate protoquie na zanile dhormadhormo zanite na pare; poriname mucti na hoe eha na zanile, e carone ninda na cohi.
দুগ্ধরে দুগ্ধ কহি; গোচনারে গোচনা কহি; অমেরতেরে (অমৃতরে) অমেরতে (অমৃত) কহি; বিষেরে বিষ কহি; এমত কথায় পূণ্য বাদে পাপ নাহি; ইহাতে প্রত্যক্ষ না জানিলে ধর্মাধর্ম জানিতে না পারে; পরিণামে মুক্তি না হয় না জানিলে; এ কারণে ইহারে নিন্দা না কহি।

একই সময়ে বাঙলা ভাষার আরও দুইটি বই লিসবন থেকে রোমান হরফে ছাপা হয়েছিল। একটি ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ’, অন্যটি ‘ভোকাবুলিরও এম ইদিওমা বেনগল্লা, ই পোরতুগীজ’- এটা ব্যকরণ বিষয়ক বই। ‘ব্রাহ্মন-রোমান-ক্যাথলিক-সংবাদ’ বইটি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আরও একটি কারণে- সতের’শ সালের শুরুতে আমাদের দেশে প্রকাশ্যে ধর্মের সমালোচনা করা যেত, বই লেখা যেত। বর্তমানে প্রকাশ্যে সমালোচনা করা না গেলেও বই লেখা যায় বটে, তবে সেটা যদি হয় তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে অন্য ধর্মের দোষ-ত্রুটি বের করা, তবে বইয়ের লেখক পান্ডুলিপি জমা দেয়ার পর বাসায় ফিরতে পারবেন না।

(পূর্বে  অন্য একটি সাইটে  প্রকাশিত)

সহায়ক : 
দোম আন্তোনিও প্রণীত ‘ব্রাহ্মণ-রোমান-ক্যাথলিক-সংবাদ’
‘কতো নদী সরোবর বা বাঙলা ভাষার জীবনী’ – হুমায়ূন আজাদ
উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া

১৭২জন ১৭২জন
0 Shares

৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য