আজকের সূর্যটা যেন আর মেঘে ঢাকা পড়ছে না।বত্রিশ ডিগ্রীর সূর্য্যের তাপমাত্রা যেন গা পুড়ে যাবার অবস্হা।প্রচন্ড এই গরমেই মা বের হন বাসা বাড়ী কাজের জন্য,প্রায় আধা মাইল ত্রিশোর্ধ মা তার ছোট দুই ছেলেকে মানুষের মতন মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।এক সময় যখন এই মা তার প্রথম শশুড় বাড়ীতে আসেন তখন কি না ছিল তার স্বামীর,গোয়াল ভরা গরু,মহিষ, গোলা ভরা ধান,অগণনিত ফসলের জমি,বিশাল রাজকীয় প্রাসাদের মতন বাড়ী আর হবেই না বা কেনো কথিত আছে যে তার স্বামীর ঘরের সামনের রাস্তা দিয়ে কেউ হেটে গেলে পায়ের জুতো হাতে নিয়ে যেতে হতো।বৃষ্টিতে কেউ ছাতা ব্যাবহার করতে পারত না এটাই ছিল এলাকার সবার জন্য আইন কারন সে যে জমিদার।সে সময়কার জমিদাররা যা বলতেন তাই হত আইন।জমি বেচা কেনা হতো মুখের কথার উপর বিশ্বাসের উপর লিখিত দলিলের তেমন একটা প্রয়োজন ছিল না।সেই জমিদার স্বামীর ব্যাবহার ছিল ভয়ংকর।সর্ব ক্ষন মদের নেশায় ভূত হয়ে বাইজীর নৃত্যের তালে টাকার বদলে দলিল ছুড়ে দিত।মিনিটেই জুয়ায় বিলিয়ে দিতেন বিঘায় বিঘায় জমিন,ছিলেন বদ রাগীও কত মানুষ কে যে সে চাবুকের আঘাতে রক্ত জড়িয়েছেন তা বলা মুসকিল।মানুষকে গরু ছাগলের মতন ভাবতেন।সেখানে মা ছিল ভিন্ন তার আরো সতিন থাকলেও সে স্বামীর হারামের রাজত্ত্বে থাকেননি,প্রতিবাদে লাভ হয়নি বরং অত্যাচারিত হতেন সে অবশেষে ছয় সাত বছরের ছেলে দুটোকে নিয়ে বিলাসময় রাজ্য থেকে বেরিয়ে যান দূরে এক অচিন গ্রামে যেখানে কেউ তাকে চিনবে না।মোগলী কিচ্ছা হলেও এটাই বাস্তব আমাদের গ্রামের পূর্ব পূরুষদের রাজকিয় ইতিহাসে।এক সময় এই জগন্য ইতিহাসের ইতি ঘটে,ধ্বংস হয় অহংকারের প্রাচুর্য্য অবশেষে রাজার সন্তানদের ভাড়া বাড়ীতে থেকে জীবনকে ছেড়ে দিতে হয়েছিল মৃত্যুর কাছে।

মা সংগ্রাম করে যাচ্ছেন ছেলে দুটোকে নিয়ে।এ বাসায় ঐ বাসায় ঝিয়ের কাজ করে পেট চালায় এবং ছেলে দুটোকে শিক্ষিত করে মানুষ করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।ছেলে দুটোও ছিল মাশাল্লা দেখার মতন রাজপুত।দিন যায় রাত যায় খেয়ে না খেয়ে মা পরিশ্রম করে ছেলে দুটোকে মের্ট্রিক পাশ করান।দেখতে দেখতে চলে যায় আরো বেশ কয়েকটি বছর।কোন ক দিন মায়ের দেহ যেন আর সয় না ক্লান্ত দেহে মা শুয়ে ছিল সে দিন আর কাজে যেতে পারেননি।ছেলে দুটো কলেজ থেকে ফিরে মায়ের তেমন একটা খোজঁ নেন না চলে যায় বন্ধুদের সাথে আড্ডায় অথবা কোন ক্লাবে।ঘরে ফিরে দেখে মা জ্বরে কাতর হয়ে কাদাঁমুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে আছেন।ঔষধ কি, লাগবে কি না, মা তুমি কেমন আছো শুয়ে আছো কেনো?কোন প্রশ্নই নেই যেন ছেলেদের।দুনিয়ায় যার কেউ নেই তার আল্লাহ আছেন।মা ঘরে শুয়ে শুয়ে কেবল আল্লাহর নাম যপছেন।আল্লাহ তার কথা শুনে পরদিন সকালেই জ্বর সেরে যায় কিন্তু পেলো না ছেলেদের কাছ থেকে কোন সেবা।মা আবার ভাবেন,থাক ওদের জানিয়ে শুধু শুধু কি লাভ পোলাপান মানুষ ঘাবড়ে যাবে চিন্তা করবে,এখানেই মায়ের ভিন্নতা অন্য সব মায়েদের চেয়ে সে একটু ব্যাতিক্রম।ছেলেরা আই এ পড়ছেন তবুও যেন তার কাছে ওরা পোলাপান।কিছু দিন পর ছোট ছেলেটিকে স্বামীর পরিত্যাক্ত কিছু জমি ছিল তার নামে সেই জমি বিক্রয় করে পাঠিয়ে দেন ফ্রান্সে।বড় ছেলেটি দেশেই থেকে যায় সে লেখা পড়া ছেড়ে গাড়ীর কাজে লেগে যায়।ছোট যে ছেলেটি সে ইন্টার পড়া অবস্হায় ফ্রান্সে চলে যায়।ফ্রান্সে সে এক সময় স্যাটেলড হওয়ার জন্য সেখানে এক অর্ধ বয়সী রমণীকে নিকাহ করেন কন্টাক ম্যারিজ বাংলাদেশে যে তার শিকড় রয়ে গেছে সে দিকে তেমন কোন খেয়াল নেই,পশ্চিমা অনুকরণে মাঝে মাঝে দেশে এসে নিজের জম্মভূমির দায় সারা মাত্র।বড় ছেলেকে বিয়ে করান ঢাকাতে তাদের ঘরে ফুটফুটে দুটো সন্তান।কয়েক বছরের মধ্যেই পাচঁ তলা বিশিষ্ট একটি প্রসাদময় বিল্ডিং তৈরী করেন।কিছু দিনের মধ্যে ছোট ছেলেও ফ্রানস থেকে এসে দেশে আরো একটি বিয়ে করেন।মায়ের ঘোর আপত্তি সত্ত্বেও বাধা মানেনি ছেলে বিয়ে করে ঘরে তুলেন।

পাচঁ তলা প্রাসাদে দুই ইউনিটের দুই ভাইয়ের দুইটি ইউনিট রেখে বাকী ইউনিটগুলো ভাড়া দিয়ে দেয় মা কোথায় থাকবে প্রশ্ন ফুফাত বোনের,চাচাত বোনের এবং পাড়া প্রতিবেশীদের কিন্তু যাদের মা তাদের যেন কোন মাথা ব্যাথা নেই মাকে নিয়ে।দেন দরবার বসার অবস্হা।মা যেন একটু অনিহা দেখালেন তাকে নিয়ে দেন দরবার বসাতে তার ভাবনায় ছেলেরা সমাজের চোখেঁ ছোট হয়ে যাবে ।ছেলেদের মান সম্মানের দিকে চিন্তা করে মা বোনদের দেন দরবার করতে দেননি এখানেই মায়ের চিন্তাধারা বোনদের চেয়ে ব্যাতিক্রম।অবশেষে মা পাচঁ তলার সাথে একটি ছোট টিনের ঘরে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন।আর খাবার দাবারের ব্যাপারে দুই ছেলেই খাওয়াবে তবে পালাক্রমে সময় মতন খাবার পাঠিয়ে দিবেন মায়ের ঘরে।

দেখতে দেখতে মায়ের জীবন থেকে চলে গেলো আরো বেশ কয়েকটি বছর মা এখন আর আগের মতন উঠে চলা ফেরা করতে পারেন না।ছোট্র টিনের ঘরটিতে একাই দিন রাত নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছেন।ছেলে আছে আছে ছেলের বউরা আছে নাতিনও।নাতিনরা আগে তার ঘরে এলেও বেশ কিছু দিন যাবৎ নাতিনরাও আসে না আর ছেলে ছেলের বউদেরতো প্রশ্নই আসে না।এই একটি বয়সে সব মায়েরই ইচ্ছে থাকে শেষ বয়সে অন্তত ছেলে মেয়েদের সেবা পাওয়ার কিন্তু তার ভাগ্যে বিধাতাই যেন রাখেনি।একদিন বাহিরের কোন এক ব্যাক্তি খবর দেন পাচ তলায় ছেলেদের তাদের মা আর নেই ডেকেও সাড়া না পেয়ে ব্যাক্তিটি হয়তো ভাবছেন বুড়ি মরে গেছেন।খবর পেয়ে বড় ছেলে,ছেলের বউয়েরা ছোট ছেলে তখন ফ্রান্সে ছিল।নীচে মায়ের ছোট টিনের ঘরে ঢুকতেই বড় ছেলে দরজার চৌকাঠের আঘাত পান কপালে,কপাল ফাটেনি তবে ফুলে টুভলা হয়ে গেছে।ছেলের বড় বউ প্রথমে ঢুকে মায়ের হাত,কান,গলার দিকে তাকিয়ে অবাক হন স্বর্ণের জিনিসগুলো নেই!ছোট বউ আসেন সাথে সাথে বড় ছেলেও ভিতরে ঢুকেন।

-কি রে ছোট আম্মার গলা হাত কানের জিনিসগুলো কই?

-আমিতো জানি না দিদি।

-বললেই হলো আমাদের ছাড়া আর কে নিবে বল?

-পরশু ফুফাত বোনেরা এসেছিল,আম্মা ওদের দিয়ে দেইনিতো?ছোট বউয়ের কথা।

-হতেও পারে,

চলবে….

ব্যাতিক্রম “মা”১ম

৩৫৪জন ৩৫৪জন
0 Shares

১৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ