বেসুরো সেতার

শুন্য শুন্যালয় ১৫ এপ্রিল ২০১৫, বুধবার, ০৪:৩৬:১৬অপরাহ্ন গল্প ৪২ মন্তব্য

১।
টুপটুপ করে কএক ফোঁটা বৃষ্টির পানি চোখে মুখে ছিটিয়ে পরলো সেতারের। ছাদ ফুঁড়ে কিভাবে বৃস্টির পানি এলো, এটা ভাবনায় এলোনা, মনে হচ্ছে এ রাজ্যে এটাই স্বাভাবিক কিংবা এতকিছু ভাবনা আসেনা কিছু সময়ে। চোখের কাছে আঙুলে ছোঁয়া পানি এনেই চমকে উঠলো সে, বৃষ্টির পানির রঙ এতো টকটকে লাল কেনো? দড়াম করে দরজা খুলেই কাজের মেয়ে মতির মা সেতারের হাতটা ধরে হেঁচকা টান দিয়ে টানতে টানতে পেছনের দিকের বাগানে নিয়ে এলো, ওটা এখন একটা জঙ্গলের মতোই। সেতারের মা প্রায়ই ওর বাবাকে বলতো, তুমি যেমন জংলী, বাগানটাকেও দিনে দিনে জঙ্গল বানাচ্ছো। সেতার কিছু বলতে যাবার আগেই মতির মা ওর মুখটা চেপে ধরে বললো, খালাম্মা কোন কথা বইলোনা, বাড়িতে মিলিটারি আসছে। মতির মায়ের ভয় পাওয়া লাল চোখ অনুসরন করে সেতার দেখলো দরজার বাইরে একটা জীপ গাড়ি দাঁড়ানো, আর তার পাশে অনেকগুলো মিলিটারি। আরেক দিকের জানালা থেকে সেতারের মা-বাবার চিৎকার ভেসে আসছে। মাত্র একবারের জন্য মায়ের মুখটা অস্পষ্ট দেখতে পেলো সে। দুই তিনটা গুলির আওয়াজের পর সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে যাবার কথা ছিলো, কিন্তু মতির মা'র চেহারাটা আচমকা পরিবর্তন হয়ে এক ভয়ংকর রূপ নিলো, যেন এক হায়েনা, সাথে তার তীব্র গর্জন। সেতার ছুটতে শুরু করলো। সেতারদের স্কুলঘর, তার বন্ধু তৃতীয় শ্রেনির জহিরুল, রোল নাম্বার ৩, আলতা দিদির আমবাগান, সবার বাড়ির পাশ দিয়ে ছুটলো সে। এক অচেনা জায়গায় চলে এলো ছুটতে ছুটতে। অদ্ভুত এক সুগন্ধ পেলো সে। তার মাকে দেয়া বাবার রজনীগন্ধা, রঙের কৌটো, আর বাবার সাথে যাওয়া সেই সে জনসুমদ্রের মানুষের ঘ্রাণ সব মিলেমিশে ঢেকে রেখেছে অচেনা পথটা। ধিরে ধিরে অচেনা পথগুলো সব চেনা হয়ে গেলো, সব পথগুলো দেখতে একইরকম। একই ঝোপঝাড় আর কাঁটায় ঘেরা। যুদ্ধ শিশুদের এতিমখানা, যেখানে সেতার বড় হয়েছে সেখানকার বন্ধুরাও কেউ কেউ ছুটে গেলো আশপাশ দিয়ে। তাদের সবার চোখেমুখে সেতারের মতোই অবাক আর নির্বিকার চাহনির মিশেল।
শান্তর কণ্ঠও শোনা গেলো। ছটফটে দূরন্ত, সবসময়ে সুরে ঝলমল থাকা শান্ত। নস্ট হয়ে যাওয়া টেপ রেকর্ডারের মতো শান্তর কন্ঠটা আস্তে আস্তে কেমন বীভৎস হয়ে গেলো, সেই সে হায়েনার মতো। দেয়ালগুলো হেঁটে হেঁটে চারপাশ থেকে কেমন ঘিরে ধরছে সেতারকে। একটা কফিনের ভেতর আঁটকে রয়েছে সে, চোখের উপর মৃদু একটা আলো...

 

২।
চোখ খুলে দেয়াল ঘড়িটায় নজর পরলো। ডিম লাইটের আলোয় তখন সেখানে রাত সাড়ে তিনটা। এপাশ ওপাশ করে কিছুতেই আর ঘুম এলোনা। বহুদিন পর ড্রয়ারটা টেনে ডায়েরীটা বের করলো, হালকা ফুঁ দিয়ে ধুলো ঝেড়ে উল্টেপাল্টে দেখলো ডায়েরীটা, কিন্তু পাতা উল্টালো না। স্মৃতি থেকে টেনে আনা কয়েকটা লেখা পাতা না খুলেই পড়ে ফেললো আর একবার......

*** সকাল থেকে বাবা খুব উত্তেজিত আজ, কোথায় যেন আমাকে নিয়ে যাবে, এই বলে বেরিয়ে গেলো। কিন্তু বাবা এখনো কেনো আসছেনা? বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছি একটু পরপর। চুপ করে মাকে ফাঁকি দিয়ে দরজার ছিটকিনিটা খুলে দিয়ে আসলাম, যেন বাবা আসলে একটুও দেরি না হয়। কিন্তু কেন বাবা আসছেনা? কখন যে বাবার কথা ভুলে গিয়ে পুতুল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলাম, আচমকা বাবা আমাকে ছো মেরে ঘাড়ে তুলে নিয়েই ছুট। মা পেছন থেকে চিৎকার করছে, আরে কি করো, ওর জামাটা পাল্টে নিয়ে যাও। বাবা ছুটতে ছুটতে বলছে, আমার মেয়ে এখন থেকে নতুন লাল-সবুজের জামা গায়ে দেবে, আর জামা পাল্টাতে হবেনা। বিশাল এক সমুদ্রের মাঝে নিয়ে গেলো বাবা, মানুষের সমুদ্র। অবাক হয়ে ভাবছি, এতো মানুষ কোথা থেকে এলো? সেই সমুদ্রের গর্জনের মাঝে এক অলৌকিক কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে, এক দৈবস্বর। তার কণ্ঠে ফুঁসে উঠছে সমুদ্রের ঢেউ।

*** শান্ত আর আগেরমতো উচ্ছল নেই। সবসময় একটা গাম্ভীর্য ঢেকে রাখে ওকে। বাবা-মার অমতে বিয়ে করলেও হয়তো আবেগ টা বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনি। খুব কথা কাটাকাটি হয় আজকাল। একদিন পেপার পড়তে পড়তে বলে বসলো, এর চাইতে পাকিস্তান আমলই তো ভালো ছিলো, কি যে হয়ে গেলো আমার মধ্যে, চড় দিয়ে বসলাম শান্তকে। কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলোনা যেন। শান্ত আমার সবকিছুই জানে, আমার মায়ের উপর পাকিস্তানীদের নির্যাতন, বাবার হত্যা, যুদ্ধের অবহেলিত শিশুদের সাথে এতিমখানায় আমার বড় হয়ে ওঠা, হয়তো আমার সাময়িক মানসিক অবস্থা টা বুঝতে পেরে চুপ করে গিয়েছিল, কিন্তু প্রতিশোধের স্পৃহাটা ভেতরে বড় করতে লেগে গেলো। ধিরে ধিরে প্রকাশিত হলো তার ভেতরের সংশয়। শান্ত এই সমাজেরই একজন। সমাজ পাল্টে দেবার চাইতে তাতে মিশে যাওয়াই সহজ।

*** শান্ত চলে গেছে, যাবার আগে বিষের বীজ ছড়িয়ে গেছে। চিৎকার করে বলছিলো, লোকে তোমার সম্পর্কে যা বলে, ঠিকই বলে। তোমার জন্ম নিয়েই আমার সন্দেহ আছে। আমার কলেজ পড়ুয়া ছেলেটা সেদিন ফ্যালফ্যাল করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলো। কিছুক্ষন পর এসে আমার হাতটা ধরেছিলো, আমার উত্তপ্ত রক্তে গড়া সন্তানের শীতল হাত।

*** রাতে আমার ঘুম আসেনা প্রায়ই। বীভৎস সব স্বপ্ন দেখে জেগে উঠি। মৃদু আলো চোখে পড়তেই ভাবি, যে দুঃস্বপ্নের এক একটা রাত একাই পাড়ি দিয়ে যেতে পারে, তার জন্য কোন পথই আর কাঁটার থাকেনা। রাত একসময় শেষ হয়, ভোর হয় তার অনিন্দ্য আলোর আহ্বান নিয়ে।

.......................................... অনেকদিন পর ডায়েরীটা খুলে সেতার লিখলো... বাবা, দেখছো? লাল-সবুজের পতাকার নীচে সব রঙ কেমন ফিকে হয়ে আসছে। তোমরা ফিরে আসবে? আর একবার?

0 Shares

৪২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ