বেলা অবেলা

আরজু মুক্তা ২ নভেম্বর ২০২০, সোমবার, ০৮:৪২:৩১অপরাহ্ন ছোটগল্প ৩২ মন্তব্য

” আজ তোমার চুলটা বাঁধা হয়নি ঠিক মতো!  ”

ওর কথা শুনে আয়নায় ফিরে তাকালাম। ক্ল্যাপস ব্যান্ডটা দিতে গিয়ে অকারণে চুলগুচ্ছ ফুলে গেছে। ঝটপট ঠিক করে বের হলাম। ৮:৩০ বাজে।

” তুৃমি কিন্তু বড্ড দেরি করে ফেললে?  তেলও পুরাও নি !  ”

ওহ – হো!  তাই তো!

স্নিকারস পরে ভেসপা স্টার্ট দিলাম। মনোযোগ ধরে রাখতে পারছি না। কতো কথা মনে পরছে ! নিধি যখন তিন মাস। তখন ও সাত আসমানে পাড়ি জমায়। স্বল্প সময়ের ভালোবাসা এমনি বন্ধনহীন গ্রন্থি দিয়ে বেঁধে রেখেছে যে, মনের অজান্তে ওর সাথে কথোপকথন শুরু হয়।

বিয়েটা ঢাক ঢোল পিটিয়ে তিনদিনের মাথায় হয়েছিলো। অপরিচিত থেকে পরিচিতির বেশে আসতে বেশি সময় নেইনি। রোমান্টিকতার বাহার ছিলো।

বাবা মায়ের বড় মেয়ে বলে ছাড় দিতে দিতে নিজেকে পাখির ডানায় ভর করে আকাশ দেখিনি কখনো !  ময়ূরের নীল রং পছন্দের তালিকায় থাকলেও ; শো রুমে গিয়ে একটা বড় নিঃশ্বাস গোপনে বাইরের কার্বন ডাই অক্সাইডের সাথে মিশে, নিজের বেদনার বিষক্রিয়াটা কমিয়েছে। উদাসী বিকেলে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফিতে চুমুকে চুমুকে আড্ডা জমেনি। বরং কফির চামচে জীবন মেপেছি।

পড়া শেষ করে চাকরি !  বাবার সংসারে সাথী হলাম। ভাইবোনদের আবদার পূরণ করলেই মনে হয়, নিজেরটা হয়ে গেলো।

রাফসান, কেমনে জানি বুঝে গেলো, হৃদয়ের গোপন কুঠুরির কথাগুলো। নীল,  সাদা, কালো রং এর ড্রেস গুলো শোভা পেতে লাগলো আলমীরাতে। পছন্দের লিপস্টিক!  বাহারি নেইলপালিশ। ওর মনে হয় সিক্সথ সেন্স বেশি ছিলো। না হলে ——–!

যাক ! সুখ পাখি বন্দি থাকেনা। আর আমার দুখের সাথে সন্ধি দলিলে পাকাপোক্ত হলো। নিধিকে নিয়ে আমার সংগ্রামী পথ চলা শুরু ঢাকা শহরে।

ঘ্যাঁস করে বাইক থেমে গেলো মাঝ পথে। আসলেই তেল পুরতে ভুলে গেছি। জীবন ঠেলার মতো বাইক ঠেলা শুরু করলাম। আচ্ছা,  রাফসান কেমনে জানে, আমি যে তেল পুরিনি!

ঢাকার অলিগলিও সাত সকালে ব্যস্ত হয়ে পরে। করোনার কারণে লেবুওয়ালার হাঁকডাক বাড়ছে। নিধির স্কুল পেরোতেই মনে হলো ; কতোদিন মুখরিত হয়না ঐ সবুজ মাঠটি!  ফুসকা, চটপটি, চানাচুরওয়ালারা কি করছে?  রিংটোনের শব্দে, চমকে দেখি ; ৪ টা মিসকল।

মেয়ের ফোন। মা, তুমি পৌঁছিয়েছো?

না, বাবা!  ৫ মিনিট লাগবে।

পৌঁছে ফোন দিও।

আবার ফোন!  তিতাসের!!!!

কি রে, তোর কোন খবর নাই!

জানিস তো একলাই সব করতে হয়!  তুই ও ফোন দিস না!

তুইও বেমালুম ভুলে গেছিস। গত পরশু আমার জন্মদিন গেলো।  এই প্রথম তুই উইস করলি না।

নিজের উপর রাগ হলো। আজকাল সব ভুলে বসে আছি। শোন, আমি পথে। অফিসে পৌঁছে ফোন দিবো। কিছু না বলে, ও লাইনটা কেটে দিলো।

অফিসে পৌঁছে কফির অর্ডার দিয়ে কাজ গুছাতে লাগলাম। বৃষ্টির ঝাপটা দেখে মনে হলো, কফিতে চুমুক দেই। জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে, নির্মল সবুজ প্রকৃতিতে ডুব দিলাম। আরে আমি এতোক্ষণ,  কার কথা ভাবছিলাম। রাফসান, তিতাস! এরা তো কবেই না ফেরার দেশে চলে গেছে।

ঢাকার এসি রুম। অন্ধকার বাসা। স্মৃতিরাও অন্ধকারে থাকতে চায়। দিন রাতের হিসাব আকাশ দেখে হয় না ! ঘড়ি কথা বলে। ভর দুপুরে আলো জ্বালাতে হয়। আমরাও হুমড়ি খাই। নিকষ কালো, গভীর অন্ধকার ধোঁয়ার মতো কুন্ডলি পাকিয়ে গ্রাস করে।

” কি এতো ভাবছো ? কফিটা তো শেষ করো!  “

৪২৪জন ২৮জন
0 Shares

৩২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য