‘বেগম রোকেয়া’ শুধু একটি নাম নয়। পুরো একটা মানব ধর্ম। বেগম রোকেয়া জন্মেছিলেন যে সব কর্মগুণে পৃথিবীর মানুষের মাঝে পৃথিবীর আয়ুষ্কাল পর্যন্ত পরম মমতায় বেঁচে থাকা যায় সেই সব মানবধর্ম গুণ নিয়ে।
বেগম রোকেয়া এক মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মেছিলেন। যে সময়টিতে বাড়ির মেয়েদের জোরে হাসাও নিষেধ ছিলো। বাড়ির বাইরে যাওয়া তো দূরের ব্যাপার। এমনকি বাড়িতে কোনো মেহমান এলেও তাদের সামনে যেতে হতো পূর্ণ পর্দা করে। তা ছিলো একরকম বন্দী জীবন।
বেগম রোকেয়ার পিতার নাম জহিরুদ্দিন মোহাম্মাদ আবু আলী হায়দার। মাতার নাম রাহাতুন্নেসা সাবেরা। তারা দুজনেই উচ্চবংশীয় ছিলেন। বেগম রোকেয়ার বাবা দিনাজপুর জেলার সব চাইতে প্রভাবশালী ব্যাক্তি ছিলেন। পায়রাবন্দে বিরাট জমিদারী ছিলো তাদের।
এমন একটি রক্ষণশীল পরিবারে বেগম রোকেয়া বেড়ে ওঠেন আবদ্ধ ভাবেই। বেগম রোকেয়ারা দুই বোন বাড়িতেই কোরআন ও হাদিস সম্পর্কে পড়াশুনা করতেন। কিন্তু তার বড় ভাই ইব্রাহিম সাবের ছিলেন আধুনিকমনা। আর তাই তিনি চাইতেন তার দুই বোন বেগম রোকেয়া এবং করিমুন্নেসা ইংরেজী ও বাংলা বিষয়ে পড়াশুনা করুক। বেগম রোকেয়ার আগ্রহের কারনে তিনি তাকে নিয়মিত ইংরেজি ও বাংলা বিষয়ে পাঠদান দিতেন।
বেগম রোকেয়ার স্বামীও রোকেয়ার জীবনে আসেন বিদ্যার জাহাজ নিয়ে। তিনি তাকে তখনকার সময়ের সকল বেড়াজাল থেকে বের করে শিক্ষার আলোর পথে হাঁটতে সহযোগিতা করেন। তিনি তার স্বামীর সহযোগিতায় একটি স্কুল তৈরি করেন। সেখানে প্রথমে তিনি মাত্র নয়জন মেয়ে শিশু নিয়ে স্কুলটি শুরু করেন। সমাজের সকল অন্ধকুসংস্কারের বেড়াজাল ভেঙ্গে তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে মেয়েদের শিক্ষিত করার জন্য উৎসাহ দিতেন। বোঝাতেন শিক্ষার সুফল। ধীরে ধীরে মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তার স্কুলে বাড়তে থাকে। নারীর জীবনকে মানুষরুপে বেঁচে থাকার জন্য তিনি বিভিন্ন বই লেখেন। এভাবে নারী জাগরনের এক অগ্রণী ভূমিকায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।
আজকের বাল্য বিয়ে বন্ধ কিন্তু তারই অবদান।
সমাজে এরকম একজন মানুষের এমন কর্মগুনে অনেক মানুষের ভালো হয়। এখানে অনেক মানুষ মানে অগনিত মানুষের কথা বলতে চেয়েছি। মানুষ মনে রাখে তাকে যুগ থেকে যুগে।
জনসেবা মানুষের জন্য একটি মহৎ গুণ। জনসেবার মধ্যেও অনেক পার্থক্য রয়েছে। কেউ তার অর্থসম্পদ একবারে বিলিয়ে দিয়ে জনমানুষের সেবা করে, কেউ বা কোনো প্রতিষ্ঠান করে সেখানে হাজার মানুসের কর্মসংস্থানের ব্যাবস্থা করে জনসেবামূলক কাজ করে।
কিন্তু এরকম যতোই সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হোক না কেনো, নারী যদি শিক্ষিত বা কুসংস্কার থেকে বের হতে না পারে তবে এমন জনকল্যানমূলক কাজের কোনো ফলপ্রসু সমাধান হবেই না।
একজন নারী শিক্ষিত হলে সে নারীর পাশাপাশি পুরো জাতির সামনে রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা। কারণ, অশিক্ষা মানেই সব সমস্যার জননী৷ বিপুল সংখ্যক নিরক্ষর লোকের বোঝা বহন করা জাতির পক্ষে অসম্ভব।
একজন নারী শুধুই কি নারী? একজন নারীর মধ্যে নিহিত আছে সীমাহীণ শক্তি। একজন নারী মানে, মা। আর মা মানেই জীবন শিক্ষার প্রথম পাঠশালা।
নারী মানে গুটিয়ে থাকা মোটেও নয়। নারী মানেই সামনে অগ্রসর। নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটি নারী-পুরুষ সবার অর্থাৎ সমগ্র সমাজের। এর সাথে মানব জাতীর কল্যাণের প্রশ্ন জড়িত। নারীর মর্যাদা আর অবস্থান থেকেই অনুধাবন করা যায় একটি দেশ কতখানি উন্নত বা সভ্য। তাই নারীকে পূর্ণাঙ্গ মর্যাদা দেয়ার জন্য জাতি-ধর্ম- বর্ণ, পেশা-শ্রেণী নির্বিশেষে সকলের গণতান্ত্রিক সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করার লক্ষে কাজ করে গেছেন বেগম রোকেয়া সাখায়াত হোসেন।
পড়াশুনার প্রতি প্রবাল আগ্রহ এবং সমাজের অবক্ষয়ের কথা মাথায় রেখে তিনি প্রতিনিয়ত কাজ করে গেছেন নারী শিক্ষায়।
আমরা পিছনের ইতিহাস পড়লে দেখতে পাই সতীদাহ এর মতো মর্মান্তিক সব ইতিহাস। যা নারীকে চিরতরে শেষ করে ফেলার এক অন্ধকার জগৎ। মেয়ে শিশুকে কম খেতে দেয়ার প্রবনতা থেকে বের হতেও সময় লেগেছে বহু যুগ। অথচ একজন নারীকে সন্তান জন্ম দেয়ার জন্য দরকার পর্যাপ্ত পুষ্টি। তখনকার প্রেক্ষাপটে একে তো শিশু অবস্থাতেই ধরতে গেলে একটি মেয়ে মা হতো। তার উপর তার কম পুষ্টি। এতে করে বহু প্রসূতি ও শিশু মৃত্যুর পরিসংখ্যান আমরা দেখতে পাই।
এমন সব জগৎ থেকে আমরা রাতারাতি বের হয়ে আসিনি।
নরীর প্রতি সমাজের এমন অনেক বৈষম্য থেকে বের হতে আমাদের যুগ থেকে যুগ কেটে গেছে।
বেগম রোকেয়া যখন বেড়ে ওঠেন এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে শতো বাঁধা বিপত্তির মধ্যে তখন তিনি উপলব্ধি করেন নারীকে সকল জড়তা কেটে বের হয়ে আসতে হবে পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য। নিজের জন্য।

সকল কুসংস্কার থেকে তবু আমরা কতোটুকু বের হতে পেরেছি সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
বেগম রোকেয়ার মতো মহীয়সী নারীরা যখন হাজার ত্যাগ ও পরিশ্রমের মাধ্যমে সকল কুসংস্কারকে পায়ে দলে আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে উৎসাহ যুগিয়েছেন আমাদের চলার পথকে সুগম করেছেন, তবু এ একবিংশ শতাব্দীতেও কোথাও যেনো তাকে আবারো প্রয়োজন বলে আমার মনে হয়। কারণ, নারী আজও বন্দী তার নিজেরই ধ্যানধারণায়। এখনও সমাজে এমন সব নারীকে আমরা দেখতে পাই।
নারীর পথ সুগম হলেও এখনো হয়নি এর পথ মসৃণ। আমরা নারী নির্যাতন এখনো দেখতে পাই অহরহ। #মি টু আন্দোলনগুলো সামনে না আসলে আমরা হয়তো জানতেও পারতাম না শিক্ষিত সমাজেও নারী কতোটা নিগ্রহের শিকার হয়। তবে আজকে যে নারী এ অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার তাও কিন্তু নারী শিক্ষারই ফল।
নারী কি শুধু তার কর্মস্থলেই নিগ্রহের শিকার হয়? না, তা মোটেও না। নারী তার পরিবারেও প্রতিনিয়ত নিগ্রহের শিকার হয়, হচ্ছে।
সদ্য স্কুল পাশ করা মেয়েটিকে বাইরের নিগ্রহ থেকে বাঁচার জন্য চটজলদি বিয়ে দিয়ে দেয়া হচ্ছে পরিবার থেকেই। পরিবারের মানুষ হুঙ্কার করে বলতে পারছে না একটিবার যে, ‘খবরদার মেয়ে আমার চিৎকার করবে যতোদূর তার শব্দের প্রতিধ্বনিত বেজে ওঠে। সন্তান তার মেয়ে হলেও চাঁদে যাবার পুরো অধিকার তার আছে।’
সত্যি, এসব ক্ষেত্রে দরকার শুধু একটু হুঙ্কারের। সিংহ যেমন গর্জন করে জানান দেয়, এখানে আমার রাজত্ব। মেয়ে মানে নারী, নারীও শুধু একবার হুঙ্কার দিয়ে উঠুক। কুসংস্কারের বেড়াজালে আটকা মানুষ নামক প্রণীগুলো তার প্রজা হবেই হবে।

সেদিনের এক বাস্তব ঘটনা দিয়ে লেখাটার স্পষ্টতা আনতে চাই যে, নারীর পথ এখনো কতোটা অমসৃন। যদিও এমন ঘটনা আমাদের সমাজে অহরহ ঘটে চলেছে।
সেদিন এক কিশোরী মা বসেছিলো বাসে আমার সামনে ইঞ্জিন কভারের উপরে। কোলে তার সদ্যোজাত বাচ্চা। বাচ্চাটা অসুস্থ বলেই হয়তো রংপুর মেডিকেল নিয়ে গেছিলো। চোখে তার রাজ্যের ঘুম। দেখে বোঝাই যাচ্ছে অনেকটা ঘুম দরকার তার। কতো কতো রাত হয়তো কেটে গেছে নির্ঘুম। মুখে ক্লান্তির ছাপ। হাত দেখে বোঝা যাচ্ছে সংসারের কাজ করতে করতে সে নরম হাত একেবারে জরাজীর্ণ হয়ে গেছে। স্বামী পুরুষটি তার পাশে বসে আছে দিব্যি নির্দিধায়। চোখ বন্ধ করে ঘুমাচ্ছে। নির্দয় এক স্পষ্ট মুখচ্ছবি সেখানে ফুটে উঠেছে। লুঙ্গির গাঁটে গোজা বিড়ি ও ম্যাচ বক্স। সে কি কখনো এ কিশোরী মেয়েটিকে সংসারের কোনো কাজে সাহায্য করে? কারণ, আমাদের সমাজে স্বামী তার স্ত্রীর কোনো কাজে সাহায্য করবে এটা সমাজের জন্য দৃষ্টিকটু হিসেবে ধরে বসে থাকি আমরাই নারীরা। এমন সব ধ্যান ধরনা থেকে যেনো আমরা বের হয়ে  আসতে পারি এটাই হোক আজকের অঙ্গীকার।
আমাদের সমাজে একটি শিশু, কিশোরী হতেই কখন যে মা হয়ে যায় সেটা এ কিশোরীটিও বুঝে উঠতে পারে না। সংসারের চাপে এ কিশোরী কখন যে পৌঢ়া নারীতে পরিণত হয়ে গেছে টেরই পায় না। জীবনের সুখের উপলব্দিগুলো বুঝে ওঠার আগেই পুরো সুন্দর এক জীবন তার শেষ হয়ে যায়।
অথচ এ পৃথিবী থেকে তার পাবার আরো কিছু ছিলো। ছিলো নিজের জন্য একটুকরো সময়।

সুন্দর এ পৃথিবীতে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার যে স্বপ্ন বেগম রোকেয়া প্রতিটি নারীকে দেখিয়ে গেছেন সে পথ ধরে নারী এগিয়ে চলুক সম্মুখপানে নির্দিধায়। বাঁকা চোখের চাহনিগুলোকে সিংহের মতো হুঙ্কার দিয়ে বলুক, এ রাজ্যের আমিই রাজা, হুম আমিই রাজা। প্রকন্ড এক বীর যোদ্ধার মতো বুক ফুলিয়ে সামনে এগিয়ে চলুক।
বেগম রোকেয়া দিবসে মহীয়সী এ নারীর প্রতি রইলো আমার বিনম্র শ্রদ্ধা।

,,,রিতু,,
৯/১২.১৮.কুড়িগ্রাম।

১৫০জন ১৫০জন
0 Shares

১৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য