সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

বৃষ্টি হয়ে আমি,তোমার উঠোনে নামি

মহানন্দ ২ মার্চ ২০২০, সোমবার, ০৭:৩০:৩৬পূর্বাহ্ন ছোটগল্প ৮ মন্তব্য

হ্যালো -মিস্টার শাওন বলছেন  ?

বলছি,আপনি কে?

আমি বৃষ্টি ,আমাকে ঠিক চিনবেন না আপনি ।আমি আপনার চাচাতো বোন শিউলি আপুর খুব পরিচিত।

বুঝতে পেরেছি ,আমাকে কি দরকার বলুনতো।

আপু বলেছে ভাইটা ঢাকায় থাকে পরিচিত হতে পারো!

কোথায় থাকেন আপনি?

আমরা মিরপুর পল্লবীতে  থাকি।

ঠিক আছে বৃষ্টি  আপনার নাম্বারটা সেভ করে রাখলাম পরে কথা হবে -আল্লাহ হাফেজ।

শিউলি আপা আমার অসম্ভব প্রিয় একজন কাজিন। আমি বিয়ে করছিলামনা জন্য অন্যদের মত উনিও চিন্তিত ছিলেন। বৃষ্টি মেয়েটা আপুদের শহরের একজন নামকরা স্কুল শিক্ষকের মেয়ে।আপুর কথায় বৃষ্টি আমাকে ফোন দেয়। 

তখন আমি বাড্ডাতে চাচার অফিসে কাজ শুরু করেছি।থাকতাম ওখানেই । ঢাকা শহরে ভালভাবে বসবাস করতে কেমন খরচ লাগতে পারে একটা ধারনা হয়ে গিয়েছে তখন। হিসেব করে দেখি যা পাই তা দিয়ে বউ নিয়ে সংসার করা সম্ভব না।

বৃষ্টির সাথে প্রায়ই কথা হতো । ওর কথা বলার স্টাইল সুন্দর ছিল। কিছুদিনের মধ্যে আমরা দুজন আপনি থেকে তুমিতে নেমে অসেছি। মোয়েটা অনেক লেখাপড়া করতো,খুব সুন্দর করে গল্প বলতে পারতো । এভাবে কখন ৬  মাস  কেটে গেছে বুঝতেও পারিনি।

প্লান করলাম একদিন দেখা করার। ওকে অনুরোধ করলাম যেন শাড়ী পড়ে আসে। সংসদ ভবনের সামনে যেখানে রাস্তার দুধারে কৃষ্ণচূড়া গাছের সারি আর সংসদের লেক ওখান আসতে বললাম বিকাল বেলা ।

আমি একটু আগেই চলে এসেছি ,ফোনে জানালো ওর আরও ৩০ মিনিট লাগবে। লেকের ধারে বসে আছি  ,অনেকে এসেছে এখানে বেড়াতে ,বদ্ধ ঢাকা শহরের মুক্ত জায়গাটাতে প্রান খুলে নি:শ্বাস নিতে। হকারদের উৎপাত প্রচুর।কত কি যে এখানে হকাররা বিক্রি করে তার ইয়ত্তা নেই।

ফোনে লোকেশন বলে দিয়েছি । কিছুক্ষন পর খেয়াল করলাম টাংগাইল তাঁতের শাড়ী পরে হালকা পাতলা ফরসা  মিষ্টি চেহারার একটি মেয়ে এগিয়ে আসছে । হাতে ফোন নিয়ে কল করতেই বুঝলাম বৃষ্টি  এসেছি । ফরমাল কুশল বিনিময়ের পর লক্ষ্য করলাম ও খুব লজ্জা পাচ্ছে । বাদাম কিনে রেখেছিলাম ,দুজন টুকটাক কথা চলছে ,বাদাম আবার কিনতে হয়েছে। আলাপ মিরচা এলিয়াদের  লা নুই বেংগলী থেকে মৈত্রেয়ী দেবীর  ন হন্যতে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর নাঝি , শরৎচন্দ্রের দেবদাস সবই অন্তভুকত ছিল। বাদ যায়নি মার্কস , লেনিন , মাও সেতুং,চেগুয়েভরা।বৃষ্টি তখন ইডেনে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টারসে পড়তো।

হাতে কাচের চুড়ি পড়েছে, একটু পরপর সুন্দর  একটা আওয়াজ পাওয়া যায় । কাজলে বেশ মানিয়েছে বৃষ্টিকে। 

বৃষ্টি বলা শুরু করলো-তুমিতো জানো শিউলি আপু কেন তোমার সাথে যোগাযোগ করতে বলেছিল। আমার বাবা মারা গেছেন ৪ বছর আগে ,কিছুদিন আগে আমাদের একমাত্র ছোটভাইকে  সন্ত্রাসীরা গুলি করে মেরে ফেলেছে। মা-ছোট বোনকে নিয়ে আমরা ঢাকায় থাকি।এই মূহুর্তে আমার একটা বিয়ে হলে পরিবারে সবার জন্য ভালো হতো ।

সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে,বললাম বৃষ্টি আজকে উঠি ,যদি আপত্তি না থাকে তাহলে তোমাকে  পল্লবী পর্যন্ত এগিয়ে দিতে পারি । একটু দুরে হলেও রিক্সা নিয়েছি। বৃষ্টিকে বললাম সংসার করতে তোমার কমপক্ষে ২বেড রুমের একটা বাসা লাগবে, গেসট সহ মাসে খাবার খরচ, যাতায়াত ,বিভিন্ন বিল , সার্ভিস চার্জ , চিকিৎসা সব মিলিয়ে কেমন খরচ পরবে তোমার  নিশ্চয় ধারনা আছে । ইমোশনালি সব কিছু চিন্তা করলে হবেনা ,বাস্তবতা বুঝতে হবে । আরও টুকটাক সংসার করতে গেলে কিকি লাগে এসব আলাপ করতে করতে পল্লবীর কাছে চলে এসেছি । বিদায় নেবার সময় বললাম -বৃষ্টি ,রাতে জানিও মাসে বাজেট কত লাগতে পারে।

রাতে ফোন দিয়ে বলল বাসায় ফেরার পর আজকে অনেকদিন পর বৃষ্টিতে ভিজেছি ছাদে যেয়ে । বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটার শীতলতা অনুভব করতে পারছিলাম আলাদা ভাবে।মনে হয়েছে তোমার সাথে দেখা হওয়ার সময় 

বৃষ্টি এলে একসাথে ভিজতে পারতাম। এবং অনুযোগের সংগে বলল -তুমি তো আমার দিকে ভালকরে তাকিয়ে দেখলে না । বলা শুরু করলাম ওর চুড়ি , কাজল ,গালে তিলের অবস্হান । বলল -কখন দেখলে ,সারাক্ষনতো আমরা  জ্ঞানী গুনীদের নিয়ে বকর-বকর করলাম। যাক এসব কথা ,বৃষ্টি বলল-এখন সংসার শুরু করতে গেলে মাসে অন্তত ……হাজার টাকা লাগবে।।

আমি বৃষ্টিকে সুন্দর করে বললাম -আমি এই মূহুর্তে এত টাকা ইনকাম করি না।অতএব আমরা যে চিন্তা ভাবনা নিয়ে কথা শুরু করেছিলাম সেটার এখানেই সমাপ্তি,কি বল। কিছুক্ষন চুপকরে থেকে বলল ,খোদা হাফেজ ,ভাল থেকো। যে রুমে থাকতাম সেটার ছাদের টিনে বৃষ্টির শব্দ পেলাম ,অঝোরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে ..অনেকক্ষন রুমের বাাহিরে দাঁড়িয়ে ভিজলাম।

এক সপ্তাহ পর বৃষ্টির ফোন-আচছা আমরা একরুমের একটা বাসা নিয়ে  শুরু  করতে পারি অনেক খরচ কম পরবে ,এক সময় তোমার ইনকাম বাড়বে অথবা দুজনের ইনকাম হবে তখন অন্য চিন্তা করা যাবে। হেমন্তের গানটির কথা মনে পড়ছে ..”নীড় ছোট ক্ষতি নেই আকাশতো  বড়..” ।বললাম-অল্পদিনের পরিচয় আমাদের ,এত জটিলতা নিয়ে সংসার শুরু করা যায়না ,তিক্ততা বাড়তেই থাকবে। তাছাড়া তোমার  সাথেতো আমার ভালোবাসার সম্পর্ক না,যে তোমাকে নিয়ে গাছতলায় বাস করবো।কিছুক্ষন চুপ থেকে ফোন কেটে দিল বৃষ্টি ।

কাজের ঝামেলাতে বৃষ্টির কথা ভুলেই গিয়েছিলাম ।মাস দুয়েক পর বৃষ্টির ফোন,কান্নাভেজা কন্ঠে বলল আমাকে প্লিজ একটা কথার উত্তর দাও ..একজন মানুষকে ভালোবাসতে কত দিন,মাস,বছর সময় লাগে??

৩৮৭জন ২৮৫জন
9 Shares

৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য