সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

বুমেরাং

তারিক ৫ ডিসেম্বর ২০১৯, বৃহস্পতিবার, ১০:২৬:৩২অপরাহ্ন গল্প ৬ মন্তব্য

কিছুদিন আগে মজনু মিয়ার দ্বিতীয় স্ত্রী মনোয়ারা নিজের গায়ে কেরোসিন ঢেলে, আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে।

যে স্ত্রী মজনুকে ভীষণ ভালোবাসতো, তার এই অপমৃত্যুতেও যেন মজনুর তেমন মাথাব্যথা নেই। সে বরং তার তৃতীয় বিয়ের পরিকল্পনায় মগ্ন।

মজনু মিয়ার বয়স ৬২ বছর। গ্রামের সবচেয়ে ধনী আর প্রভাবশালী লোক সে। তার কথায় গ্রামবাসী ওঠে আর বসে। তবে লোকটার বৌ ভাগ্য ভাল না। আগের দু টা বউ ই আত্মহত্যা করেছে।

প্রথমটার নাম ছিল তাহেরা। খুব সহজ সরল মহিলা ছিল। মজনুকে বাঘের মত ভয় পেত। দিনরাত মজনুর সেবায় মগ্ন থাকতো। কিন্তু মজনুর অত্যাচারে কীটনাশক পান করে কোনো এক পূর্ণিমার রাতে আত্মহত্যা করেছিল।

তাহেরা কিংবা মনোয়ারার ভালোবাসা মজনু মিয়াকে কখনোই আকৃষ্ট করতে পারেনি। এসব নিয়ে মজনু মিয়ার ভাবনারও সময় নেই। নিজের প্রভাব, প্রতিপত্তি আর পুরুষত্বে তার অগাধ বিশ্বাস।

মজনু মিয়া প্রায়ই তার বন্ধুদের বলে,
“আরে মিয়া, বউ হইলো গিয়া স্যান্ডেলের মত। সব সময় পায়ের নিচে রাখবা, আর মাঝেমধ্যে পাল্টাবা”

মজনু কারণে অকারণে বৌ গুলোকে ইচ্ছেমত পেটাতো। মার খেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলেও পেটাতো। তার এই অমানুষিক অত্যাচার সইতে না পেরেই বৌ গুলো যে আত্মহত্যা করেছে, সেটা সবাই জানে। কিন্তু ভয়ে কেউই কিছু বলেনা।

দ্বিতীয় স্ত্রী মারা যাওয়ার ৪৩ দিনের মাথায় মজনু মিয়া তৃতীয় বিয়ের জন্য কনে ঠিক করে ফেলে। কনের নাম নাহার। বয়স ১৮/১৯ হবে। বৈশাখের ১৭ তারিখ মজনু মিয়া বর বেশে বৌ আনতে রওনা দেয়। সাথে প্রায় ৫০/৬০ জন বরযাত্রী। তরুণী বৌয়ের স্বপ্নে বিভোর মজনু মিয়া, যাত্রাপথে বুকে বেশ ব্যথা অনুভব করে। অবস্থা খারাপ হতে থাকলে, সবাই তাকে গঞ্জের হাসপাতালে নিয়ে যায়। ডাক্তার জানায় মজনু মিয়া স্ট্রোক করেছে। তার শরীরের অর্ধেক প্যারালাইজড হয়ে গেছে। আর ডাক্তার এটাও জানায় যে, মজনু হয়তো আর কখনো ঠিক ভাবে কথাও বলতে পারবেনা।

মজনু মিয়ার আর তৃতীয় বিয়ে করা হয়ে ওঠেনি। ঠিক ১ বছর পর ১৭ই বৈশাখ, বিছানায় শুয়ে প্যারালাইজড মজনু উদাস ভঙ্গিতে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। বাগানের কাঠ বাদাম গাছটিতে বসে দুটি ঘুঘু অদ্ভুত ভঙ্গিতে ডাকছিল। বড্ড মায়ার সে ডাক!

আগের দু বউয়ের কথা মাঝেমধ্যে মজনুর খুব মনে পড়ে। কী যত্নটাই না করতো তারা মজনুর! মুখ খোলার সাথে সাথে মজনুর ইচ্ছে পূরণ করতে তারা সদা সচেষ্ট থাকতো।

আজ অথর্ব মজনুর দেখাশোনার জন্য দুজন বেতন ভোগী লোক রাখা আছে। কোনো প্রয়োজন হলে মজনু মুখ দিয়ে পশুর মত ঘোৎ ঘোৎ আওয়াজ করে, কিন্ত মজনুর চাওয়া বুঝতে ওদের অনেক সময় লাগে। যেন ওদের করুনায় আর অবহেলায় ই বেঁচে আছে মজনু। মজনুর চোখ দিয়ে দু ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে। প্রতাপশালী মজনুও আজ বুঝতে পারে, টাকা আর ক্ষমতা দিয়ে হয়তো সেবা কেনা যায়, কিন্তু ভালোবাসা ভিন্ন জিনিস। ভালোবাসা কেবল ভালোবাসায়ই বিনিময় যোগ্য।

#নোট_: মানুষের শক্তি, ক্ষমতা কিংবা প্রতিপত্তি কোনোটাই চিরস্থায়ী নয়। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই এগুলোকে চিরস্থায়ী ভেবে প্রায়ই হিংস্র জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্ট আচরণ করে। তবে ‘সময়ের প্রতিশোধ’ বলে একটা কথা আছে। সময় তার হিসেব একদিন ঠিকই মিলিয়ে নেয়। আপনার প্রতিটি অন্যায় আচরণের হিসেব, আপনি কড়ায়গণ্ডায় একদিন অবশ্যই ফেরত পাবেন। কারণ সময় এবং নিয়তি কখনোই পক্ষপাতিত্ব করেনা।

৩০৯জন ২৩৫জন
8 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য