বিসর্জন

পথহারা পাখি ৩ নভেম্বর ২০১৮, শনিবার, ০১:৩৪:৫০পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ১৮ মন্তব্য


এভাবে হঠাৎ মা অসুস্থ হয়ে পড়বে, কল্পনাও করেনি ইরিন। কিভাবে যেন সব উলটপালট হয়ে গেল! সামান্য একটা সিস্টোস্কোপি করাতে গিয়ে এমন ইনফেকশন হয়ে পড়বে, সেটা ভাবনার অতীত ছিল। হাসপাতাল থেকে মাকে আনার পর সবটা সময় বাসার সবাই মাকে নিয়েই আছে।

কেইবা থাকে বাসায় তেমন! মা, বাবা, ছোট ভাই আর ইরিন। মা অসুস্থ বলে বাসার সব কাজই তাকে করতে হচ্ছে…নাস্তা বানানো, দুপুরের রান্না করা, থালাবাসন ধোয়া, ঘর গুছানো, মাকে গোসল করানো, ইঞ্জেকশন দেয়া! কাজ করতে করতে সে খুব অবাক হয়, এতো কাজ মা এক হাতে সামলায় কিভাবে?

রাতেও ঘুমাতে পারেনা ইরিন মায়ের চিন্তায়; মা ঘুমাতে পারছে তো, মায়ের জ্বরটা বাড়েনি তো…কবে যে মা পুরোপুরি সুস্থ হবে, খুব হাঁপিয়ে উঠেছে সে!

ইরিন সদ্যপাসকৃত এমবিবিএস ডাক্তার।

খুব সিরিয়াসলি সে প্রস্তুতি নিচ্ছিলো ইংল্যান্ডের হাসপাতালে চাকরি পাওয়ার পরীক্ষার জন্য।
দেশের ডাক্তারদের যেই অবস্থা, না আছে সম্মান, না আছে নিরাপত্তা! এর চেয়ে বিদেশ পাড়ি দেয়াই ভালো। তার অনেক পরিচিত সিনিয়রই আছেন ওখানে, দিব্যি চাকরি করছেন সেখানের হাসপাতালগুলোতে। বেতনও ঢের বেশি, ছুটিছাটাও নেহাত কম নয়।

বাবা কিছুটা নাখোশ হলেও মায়ের মানা নেই। মায়ের কথা, “মন যেটা চায়, সেটাই করো। দেশে চাকরি করে এভাবে মার খাওয়ার মানে নেই!” বাবা বলে, “এভাবে মা-বাবাকে শেষ বয়সে ছেড়ে চলে যাবে? আর যেখানেই যাও, নিজের দেশে সরকারী ডাক্তার হওয়ার মত সম্মান কী আর পাবে?”
ইরিন কিছুই কানে নিচ্ছে না, ও এই দেশে থাকবে না!

কিন্তু হঠাৎ মায়ের এই অসুস্থতা তাকে থমকে দিলো।

অসুস্থ হওয়ার পর মা পুরোপুরি তার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বাবাও কেবল তাকিয়ে থাকে তার আশায়। ছোট ভাইটা অসহায় হয়ে মায়ের মাথার পাশে বসে থাকে।

ইরিন সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা।

আচ্ছা, দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর মা কিংবা বাবা এমন অসুস্থ হয়ে পড়লে সে কি পারবে দূরদেশে পড়ে থাকতে? কে দেখাশোনা করবে তাদের? সব কাজ শেষে নিজের রুমে বসে চুপ করে ভাবে সে।

ছেলেমেয়েদের মঙ্গলের কথা ভেবে সন্তানজন্মের পর কতোকিছুই না করেছেন মা-বাবা! বাবা তো তার সবটুকু সঞ্চয় রেখেই দিয়েছেন ইরিন আর তার ভাইয়ের জন্য, আর মা তার এতো ভাল একটা চাকরি বাদ দিয়ে বাসায় থেকেছেন শুধুমাত্র তাদের দুজনকে ভাল মানুষ করে তোলার জন্য। তাদের অবদান ছাড়া ইরিন কী কখনোই এতদূর আসতে পারতো!

সিদ্ধান্তহীনতায় কুঁকড়ে পড়ে সে।

মা-বাবার কোনো প্রয়োজনে সে যদি পাশে না-ই থাকতে পারে, তবে কি মূল্য তার এতো পড়াশোনার? কি লাভ পরবাসে গিয়ে চড়া বেতন আয় করে? কোনো উত্তর পেলো না নিজের অস্থির মনের কাছে।

টেবিলে পড়ে থাকা বইগুলো সরিয়ে বিসিএস গাইডটা নিয়ে বসলো সে…মা-বাবার শত বিসর্জনের  ঋণ সামান্য হলেও শোধ করতে পারার আশায়। ।

৩৮০জন ৩৮০জন
0 Shares

১৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ