বিষাদ

ইকু ১৫ মার্চ ২০১৪, শনিবার, ১২:২৭:৩২অপরাহ্ন গল্প ১৭ মন্তব্য

আজ আকাশের মেঘ গুলির মাঝে কেমন জানি একটা বিষাদ বিষাদ ভাব রয়েছে। বেশ কিছুক্ষন ধরে ত্রপা জানালা দিয়ে আকাশ দেখছে, ফাগুনের দিপ্তি চোখে ত্রপার। মেঘগুলি কিছুক্ষন পরপরই বদলে যাচ্ছে। সবকিছুই বদলে যায়, মানুষ বদলে যায়,সময় বদলে যায়। একটা সময় ছিল সৈকত ত্রপা কে বুঝত কিন্তু এইবার ত্রপা না হয় একটু বাড়াবাড়িই করে ফেলেছিল, কিন্তু তাই বলে সৈকত কিভাবে এতদিনের সম্পর্ক টি কে নিমিষেই ভেঙ্গে দিলো? তার কোন কথাই শুনতে চায়নি সৈকত।

সে না হয় একটা ছেলের সাথে একটু বেশিই মিশেছিল, বেপার টা বুঝে উঠতে পারেনি, একটা মোহে পড়ে গিয়েছিলো ত্রপা। ছেলেটার সাথে পরিচয় তার ফেসবুকে, নাম মুহিন। একটা মুহূর্তও ত্রপাকে বোর করেনি, কত রকম কথা যে সে জানে। খুব ভালো লেগেছিল মুহিন কে। কিন্তু বন্ধুর চেয়ে কখনোই বেশি কিছু ভাবেনি। কিন্তু ব্যাপার গুলো সৈকত কে জানাতে খুব ভয় হচ্ছিল, যদি সৈকত ভুল বুঝে ত্রপাকে।

ত্রপা এখন বুঝতে পারছে ঐ না জানানো টাই ছিল ত্রপার সবচেয়ে বড় ভুল। মুহিন ত্রপাকে পছন্দ করে, এই একটা কারনেই পুরো ব্যাপার টা সৈকত কে জানানো হয়নি।

খোলা জানালায় বিষণ্ণ চোখে ত্রপা ফিসফিস করে বলে, ফিরে এসো আমি সব শাস্তি মাথা পেতে নেবো। শুকনো নদীর পাড়ে দাড়ালে যেমন সব খালি খালি লাগে, ত্রপার ঠিক এমন টাই লাগছে। অভিমানি চোখ ভেঙ্গে পড়ছে প্রবল বর্ষায়। আঁধারে নিমজ্জিত, তাই আজ আলোর গন্ধ খুব অপরিচিত । স্বপ্নময় আকাশটি নীড় বিহীন পাখির মত হয়ে গিয়েছে যেন। বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নেমে আসে, ত্রপা জানালা ছেড়ে নড়ে না, এলোমেলো মেঘগুলি তে অস্ত প্রায় সূর্যের আভা এসে পড়ে। মেঘগুলো বদলাতেই থাকে, মেঘেদের মাঝে হঠাৎ করেই সৈকত এর অবয়ব ভেসে ওঠে।

 

তপ্ত পিচঢালা রাজপথে সারা দুপুর হেটে বেরিয়েছে সৈকত, একদম একা একা। বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামছে প্রায়, আকাশে অনেক মেঘ আর অস্তমিত সূর্যের ছটা। সেই মেঘে হঠাৎ করেই ত্রপার মুখ ভেসে উঠতেই চোখ বন্ধ করে নেয় সৈকত।

তার কেউ নেই, মেঘের মাঝে আর কোন মুখ দেখতে চায়না সৈকত। বন্ধুদের কথায় কান দেয়নি এতদিন সৈকত। অনেক বন্ধুই তাকে বলেছিল ইদানীং ভার্সিটি এলাকায় নাকি মুহিন নামে এক ছেলের সাথে প্রায়ই দেখা যায় ত্রপাকে। সৈকত ত্রপা কে জিজ্ঞেস ও করেছিল তার কি কোন নতুন বন্ধু হয়েছে নাকি। ত্রপা না করে দিতেই সৈকত নিশ্চিন্ত হয়ে গিয়েছিলো।

গতকাল হঠাৎ করেই চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসে সৈকত, ত্রপাকে সারপ্রাইজ দিবে ভেবে তার ক্যাম্পাসের দিকে গেলে দূর থেকে ত্রপাকে এক ছেলের সাথে রিক্সায় যেতে দেখে। ডেকেছিল সৈকত, ভেবেছিল কোন বন্ধুর সাথে কোথাও যাচ্ছে। ত্রপা সৈকত এর ডাক শুনতে না পাওয়ায় সৈকত ফোন দেয়।

ত্রপা কিভাবে মিথ্যে বলতে পারল? সৈকত অবাক হয়ে ভাবে। ত্রপা নাকি একা একা বাসায় যাচ্ছে ভার্সিটির ক্লাস শেষে। সন্দেহ টা ঠিক তখনই সৈকতের মাথায় ঢুকে যায়। সৈকত চুয়েটের সি,এস,সি ডিপার্টমেন্টের ফাইনাল ইয়ার এর স্টুডেন্ট। ফেসবুক হ্যাক করা তার কাছে কিছুইনা। ত্রপার ফেসবুকে ঢুকেই ইনবক্সে দেখে রিক্সার ঐ ছেলেটার সাথে গত তিন মাসে অনেক কথা। তার কিছুটা পড়েই সৈকত বুঝতে পারে ছেলেটি ত্রপাকে পছন্দ করে, ত্রপাও সৈকত এর সাথে রিলেশন এর কথা কিছুই বলেনি তাকে। মেসেজ গুলি কিছুদুর পড়েই তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। পরগাছার মত ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা বিশ্বাস-ভালোবাসা টুকু এক নিমিষেই অঙ্গার। জলের অভাবে শুকিয়ে পড়া বৃক্ষের মত নুইয়ে পড়েছিল সৈকত।

তার অনেক্ষন পর একটু সম্বিত ফিরে পেলে ফোন দেয় তানভীর কে। তানভীর এয়ারটেল এর কাস্টোমার কেয়ারে জব করে। তার কাছে ত্রপার নাম্বার দিতেই তানভীর চেক করে জানায় একটা নাম্বারে অনেক রাত পর্যন্ত কথা হয় ত্রপার। নাম্বার টি মুহিন নামে রেজিস্ট্রেশন করা।

আবার মুহিন? সৈকত এর হাত থেকে ফোন টি পড়ে যায়, ব্যর্থ পরাজিত সৈনিক এখন সে, ক্ষত বিক্ষত চোখে নামে বর্ষার প্লাবন। এরপর কিভাবে সে ত্রপার সাথে ব্রেক-আপ করলো সে কথা ভাবতে চায়না সৈকত।

চোখ খুলে মেঘের দিকে তাকায়, আলো-ছায়া আর মেঘের খেলার মাঝে আবার সে ত্রপার অবয়ব দেখতে পায়। এভাবে আর পারবেনা সৈকত, উঠে দাড়ায় স্থিরচিত্তে চোয়াল শক্ত হয়ে আসে তার। পৃথিবী টাকে মনে হচ্ছে আগুনের কুণ্ড, ক্রোধ তাকে জড়িয়ে ধরে অষ্টপৃষ্ঠে। ঘুরে ঘুরে অনেকগুলো ওষুধের দোকান থেকে বিশটা ঘুমের ওষুধ কিনে নেয় সে। অনুভূতি হীন চোখে শেষ বারের মত তাকায়_ কোথাও কেউ নেই, স্পর্শ হীন কাতরতায় সিক্ত পৃথিবী, মাঠ ঘাট প্রান্তর সব কিছুকে বিদায় জানায় সৈকত।

 

আর ঠিক তার একটু পরেই আকাশের মেঘগুলির হঠাৎ সরে যাওয়া দেখে ত্রপা খুব অবাক হয়।

থমথমে নিস্তব্ধতায় নগরী ও অবাক হয়ে তাকায়, বিষণ্ণ নগরী কাউকে বাধা দেয়না। দেয়ালের শ্যাওলা বেয়ে ওঠা শামুকটিও নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে খোলসে ঢুকে যায়।

৩৮৮জন ৩৮৮জন
0 Shares

১৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ