বিশ্বাস ও পুনর্মিলন

জাকিয়া জেসমিন যূথী ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, শুক্রবার, ০১:০৫:০৯পূর্বাহ্ন গল্প ১২ মন্তব্য

 

জয় বাংলা বাংলার জয়, জয় বাংলা বাংলার জয়, হবে হবে হবে হবে নিশ্চয়

কোটি প্রাণ এক সাথে জেগেছে অন্ধ রাতে, নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়

টিভি রুম হতে শোনা যাচ্ছে গানটা। গান কে না ভালোবাসে। একটা সময় রেডিও ছিলো গান শোনার মাধ্যম, এরপর এলো ক্যাসেটপ্লেয়ার। তারও অনেক পরে কম্পিউটারে সিডিতে গানে সয়লাব। এখন কানে হেড ফোন, এমপিথ্রি প্লেয়ার, আইপড কত কি! সারা বছর গান শুনছে সব।

তরুণ-যুবা সবার কানেই প্রায়ই গানের তার ঝুলছে। পড়াশুনা করছে তখনো কানের ভেতরে তার। রান্না করছে সেখানেও কানের মধ্যে তার। হাঁটছে, ঘুরছে সব জায়গায় কানে তার ঝুলিয়ে রেখেছে। কিন্তু তারা শুনে হিন্দি গান! ইংলিশ গান! যে ভাষা অর্জনের জন্য নয় মাস যুদ্ধ করেছিলো সেই সময়ের তরুণ সমাজ; প্রিয়তমা নববধুকে রেখে ঘর ছেড়েছিলো প্রিয়তম স্বামী; বুড়ো বাবা-মা কে একাকী রেখে তার যুবক সন্তান; কত নারী হারিয়েছে সম্ভ্রম; এই দেশ, এই মাকে বাঁচানোর স্বপ্ন ছিলো ওদের চোখে-মুখে-প্রাণে! অন্তরে; এত ত্যাগের বিনিময়ে আনা স্বাধীনতা; বাংলা ভাষার জন্য! আর এখন, বর্তমান তরুণ প্রজন্ম বাংলা ভাষার গান শোনে না, শোনে ভিনদেশীয় গান!

মুক্তিযুদ্ধের সময় যে গানগুলো যুদ্ধে যাবার অনুপ্রেরণা দিয়েছিলো, রক্তে আগুন তুলেছিলো সেই গানগুলোকে বর্তমানে একটা দলভূক্ত করা হয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারি, ছাব্বিশে মার্চ, ষোলই ডিসেম্বরের জন্য আলাদা আলাদা গান। সারা বছরের ওই বিশেষ দিনটি না আসা পর্যন্ত ষোল কোটি জনতার মধ্যে হাতে গোণা দু-একজনকেও পাওয়া যায় না যারা এই গানগুলো একবার হলেও শুনে বা শোনার কথা মনে করে। এগুলো তোলা থাকে ওই বিশেষ বিশেষ দিবসের জন্য। তখন সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাসাবাড়িতেই শুধু নয়, সারা দেশের দোকানপাট, অফিস আদালত সব জায়গা হতে এই বিশেষ গানগুলো চালানো হয়। কেন? অসংখ্য গানের সাথে মাঝে মাঝে শোনা যায় না? গানগুলো শুধু গান তো নয়! এক একটি জীবন!।

বিশেষ দিবসের জন্য শুধু গানই নয়, আজকাল বিশেষ দিবসের জন্য বিশেষ পোশাকও পরিধান  করে সব। বিশেষ রঙের পোশাক পরে শ্রদ্ধা জানায় এরা লাখো শহীদের আত্মার প্রতি। একুশে  ফেব্রুয়ারিতে সাদা-কালো পোশাক। বিজয় দিবসে লাল সবুজ। এসব কি একদিনের শ্রদ্ধা প্রদর্শন নাকি একটা বিশেষ উপলক্ষ্যকে সামনে রেখে পোশাক ব্যবসায়ীদের রমরমা ব্যবসা? এদের আয়োজন দেখে শামসুন্নাহারের দ্বিতীয়টিকেই প্রধান বলে মনে হয়। খাবার ঘর হতে ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে প্রায় আশি বছর বয়েসী বৃদ্ধা শামসুন্নাহার শোবার ঘরে প্রবেশ করেন। এটা তাঁর বড় মেয়ের ঘর। এই ঘরেই টিভিতে গানটা বাজছিলো। সাথে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব ধারণকৃত দৃশ্য। তিনি বিছানার পাশের লাগোয়া সিংগেল সোফায় নিঃশব্দে বসেন। এখন আবার আরেকটি গান শুরু হয়েছে, …

এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা আমরা তোমাদের ভুলবোনা দুঃসহ   বেদনার কন্টক পথ বেয়ে শোষণের নাগপাশ ছিঁড়লে যারা আমরা তোমাদের ভুলবোনা তিনি  বসে বসে গান শুনতে শুনতে আমরা তোমাদের ভুলবো না এ লাইনটি কানের ভেতর দিয়ে ঢুকে  হৃদয়কে আন্দোলিত করতে থাকে। মনকে অস্থির করে তোলে। শুনতে শুনতে শামসুন্নাহারের চোখ  কুঞ্চিত হয়। হাত কাঁপতে থাকে। ঠোঁট ও চোখের কোণেও তিরতিরভাবে কাঁপতে থাকে। বয়সের ভারে কুঁচকানো ত্বকে সহজ মাত্রায় কান্না বের না হয়ে চাপা শক্ত হয়ে যায়। গলার কাছে এসে কান্না দলা পাকায়, আর এগোতে পারে না। তখন মৃদু হেঁচকির মতন শব্দ ভেসে আসতে থাকে।

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন নজির আর নেই যেখানে মানুষ নিজের জন্য কিংবা নিজের আপনজনের জন্যই শুধু নয় বরং পুরো একটি দেশকে মায়ের মর্যাদায় ভূষিত করে নিজের জীবনটাকে উতসর্গ করেছিলো। এই দেশ-মা কে শুত্রুকবল হতে রক্ষা করতে কতজনকে কত কিছু হারাতে হয়েছে। বাবা-মা! ভাই-বোন! প্রিয়তমা! আত্মীয়স্বজনের কথা তো বাদই। কত মায়ের বুক হয়েছে খালি। কত বউ হারিয়েছে তার প্রাণপ্রিয় স্বামীকে। কত প্রেমিকা তার প্রেমিককে। আর শামসুন্নাহার হারিয়েছেন তাঁর নিজে হাতে মায়ের মমতা দিয়ে বড় করে তোলা আদরের ছোট ভাইকে। সিরাজুল ইসলাম খোকন। সেই যে যুদ্ধের সময় ভাইটি নিখোঁজ হয়েছিলো এ জীবনে কি আর দেখা হয়ে উঠবে? যৌবন শেষ করে বৃদ্ধ এখন তিনি। সময় যে বড় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে ওপারে চলে যাওয়ার।

 

০২- নির্মাণের মহড়া

আরিবা আঞ্জুম এক মনে তার ঘরে ছবি আঁকছে। সারা ঘরময় ছড়িয়ে রয়েছে ডজনখানেক আট-দশ ফুট সাইজে আয়তাকার বর্গাকার চকচকে ছবির ক্যানভাস। কিছু পেইন্টিং ফুল ফিনিশিং দেয়া। কিছু পড়ে রয়েছে ফিনিশিং টাচ এর অপেক্ষায়। মাউন্ট বোর্ডও আছে। ছোট আকারের ক্যানভাসও বাদ যায়নি। দেয়ালে বাঁধাই করা কিছু জলরং পেইন্টিং ঝুলছে। ‘এগুলো নতুন করেছে বোধহয়, আগে তো চোখে পড়ে নাই!’

মেয়ের শোয়ার ঘর হতে কাঁদো কাঁদো  চেহারা নিয়ে বের হয়ে বাড়ির সবচেয়ে কোণার দিকের ত্রিকোণা সাইজের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ভেতরে বড় নাতনী কী করছে সেটাই দেখছিলেন শামসুন্নাহার। বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে সপ্তাহব্যাপী যৌথ চিত্র প্রদর্শনী চলছে চারুকলার জয়নাল গ্যালারীতে তিনি আর্টিস্ট রুহিয়া জাবীন তিনা, সাদিয়া শারমীন, কন্যা শ্যামলী মুন সহ আরিবার। ওদিকে শিল্পকলা একাডেমিতেও চলছে পক্ষকালব্যাপী নিজের একক চিত্র প্রদর্শনী। এবার নিয়ে অষ্টমবারের মতন প্রদর্শনী চলছে তাঁর নাতনীর।

কত যে ছবি আঁকা! বিশেষ দিবসগুলোতে আরিবার ব্যস্ততা বেড়ে যায় খুব। স্বাধীনতার দিবসগুলো ছাড়াও আজকাল ভালোবাসা দিবস, বাবা-মা দিবস, শিশু দিবস, নারী দিবস নামে ইত্যাদি আরও কত কত যে দিবস বের হয়েছে!

নিজের কাজে মগ্ন হয়ে থাকা নাতনীকে পেছন থেকে নিরবে দেখতে থাকেন শামসুন্নাহার। এক মনে ছবি আঁকতে আঁকতে পেছন ফিরে দরজার দিকে চোখ পড়তেই আরিবা বলে ওঠে, ‘ওহ নানী! আপনি আবারও আমার এই রঙের ঘরে ঢুকেছেন? বলেছি না, রঙের ঝাঁঝালো গন্ধে আপনার শরীর খারাপ করবে!’

‘আ…র সমশ…সা! বাঁচবোওওই আর কয়…দি…ন!; কান্নাভেঁজা কন্ঠ তার।

‘একি নানী আপনি কাঁদছেন? আমি তো আপনার শরীরের ভালো চাইলাম’ বলেই খেয়াল হলো নানী ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। ব্যাপার কী?

শামসুন্নাহার ততক্ষণে নাতনীর সাথে এগিয়ে এসে ঘরের ভেতরে একটা কাঠের চেয়ারে আস্তে আস্তে বসতে চেষ্টা করেন। ইদানিং তার শরীর অনেক ভারী হয়েছে। ইচ্ছে মতন আরামে আগের মতন আর শরীরটাকে নড়াচড়া করতে পারেন না। আরিবা কাছে এসে নানীকে ঠিকমত বসতে সাহায্য করে। তারপরে নিচু হয়ে হাঁটু গেঁড়ে বসে। কিছুক্ষণ নানীর হাঁটুতে নিজের দু হাত ভাঁজ করে তার উপরে মাথা রাখে। কিছুটা সময় দু’জনেই চুপ। কোন কথা নেই। দুজন ভিন্ন বয়েসী নারী অনুভূতিতে মিলেমিশে রইলো যেন।

“কি এত ভাবছে মেয়েটা!” নাতনীর মাথায় হাত রাখেন নানী। তারপরে জিজ্ঞেস করেন, কী হইছে আরিবা? শইল খারাপ?

আরিবা জবাব দেয়, ‘উঁহু!’

যে ছবিটা এতক্ষণ মনযোগ দিয়ে এঁকে চলছিলো, এবার সেটির দিকে সে মাথা তুলে তাকায়।

গভীরভাবে কিছু ভাবতে থাকে। নানীর বাঁধন হতে নিজেকে মুক্ত করে উঠে দাঁড়ায়। ইজেল হতে কালার প্লেটটা নেয় বাম হাতে। আর ডান হাতে তুলে নেয় অয়েল কালার ব্রাশটা। ঠোঁটের মধ্যে ব্রাশের গোড়াটা উলটো দিক করে বার কয়েক কামড়ে ধরে। তারপরে নানীর দিকে ফিরে চায়। ছবিটির দিকে ইশারা দিয়ে বলে ওঠে, ‘আচ্ছা নানী বলেন তো এই ছবিতে কী নাই? কী যেন নাই!’ বলে ঠোঁট বাঁকায়। নাক কুঁচকায়!

‘হু-উউউ!’ বলে সাড়া দিয়ে নানী তাকায় ছবিটার দিকে। তারপরে বলে উঠেন থেমে থেমে, ‘কী নাইইই? ভা-লো-ই তো লাগ-তা-ছে! শোন্দর হোইছে!’

“কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, কি যেন একটা নেই! কি দিলে যেন আরো বেশি পারফেক্ট হতো!” বিড়বিড় করে বলতে বলতে আবার এগিয়ে যায় আরিবা নিজের পেইন্টিং এর দিকে। আরিবা ব্যস্ত হয়ে যায়। ক্যানভাসে রঙ ঘষতে থাকে। শামসুন নাহার বসে থাকেন একা। আর চেয়ে দেখতে থাকেন সদ্য আঁকা ছবিটা। কিন্তু তিনি কি আদৌ দেখছেন ছবিটা! প্রকৃতপক্ষে তিনি ভাবছেন। ভাবতে থাকেন, ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে তো তরা সামনে থেকে দেখোছ নাই, অনুভব করতে পারোছ না তাই কি ছিলো সেটা! যা নিজ চোখে দেখোছ নাই, অনুভব করতে পারোছ নাই তা কি করে ছবিতে ফুটায়া তুলবি! যত ভালোই আঁকিস না ক্যান, না জানার ফাঁকটা তো রইয়া যাবোইই!’… বেশ জোরেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দেন।

 

আবারো মনে পরে যায় খোকনের কথা। চোখের কোণে জল চিক চিক করে উঠতে থাকে তাঁর।

 

০৩- দূরতম ব্যবধান

শামসুন্নাহার দিনের বেশির ভাগ সময় বড় মেয়ের সাথেই থাকেন। পাঁচ মেয়ে ও দুই ছেলের বেড়ে ওঠার সাথে সাথে অবসরপ্রাপ্তির টাকা দিয়ে তাঁর স্বামী আলহাজ্জ্ব হাফিজুল্লাহ এই বাড়িটা বানিয়েছিলেন। আজ তাই সব ছেলেমেয়ে নাতিনাতনী সাথে নিয়ে তাঁর চাঁদের হাট। সকাল সন্ধ্যা ছেলেমেয়ে নাতি নাতনীরা সবাইই খোঁজখবর রাখেন। হাফিজুল্লাহ সাহেব থাকেন নিজের ধর্মকর্ম নিয়ে। নামাজ পড়া, খাওয়া-দাওয়া, কোরআন শরিফ তেলাওয়াত করা আর ঘুমানো ছাড়া এখন আর অন্য কোন কাজ নেই। যথেষ্ট বয়স হয়ে গেছে। নব্বই পেরিয়েছেন কয়েক বছর হলো। কথাবার্তা খুব কমই মনে থাকে ওনার। নিজের ওই কিছু কাজের বাইরে বিশেষ কারো সাথে কথাটথাও বলেন না। কথা বললেও ঠিক ঠাওর করতে পারেন না যে কার সাথে কথা বলছেন। দেখা গেলো সেজ মেয়ের ঘরের নাতনী ফাইরুজ এসে সামনে বসেছে। উনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কেএএএ? লুতফুউউনে?’

‘নানু, আমি তো বড় খালা না। বড় খালাকে ডাকবো?’ বলেই ছুটে যায় পাশের ফ্লাটে, ‘খালামনি, নানু আপনাকে বোধহয় কিছু বলবে।‘

একমাত্র খাবার টেবিল ছাড়া শামসুন্নাহারের সাথে হাফিজুল্লাহ সাহেবের বিশেষ কথা হয়ে ওঠে না। পাশের ফ্লাটে বড় মেয়ের ঘরেই তাঁর বেশিরভাগ সময় কাটে।

বড় মেয়েটা ক’দিন ধরে খুব ব্যস্ত। খুব ছুঁটাছুটি করছে পাসপোর্ট বানানোর জন্য। বিদেশে যাবে। আমেরিকা। তাঁর বড় ছেলের কাছে। ছেলের পিএইচডি শেষ হবে সামনে। তারই রিসিপশনে প্রত্যেক ছেলে-মেয়ে তাঁদের বাবা-মাকে নেবার জন্য ইনভাইটেশন লেটার পাঠিয়ে দেবে। বাবু সেটা পাঠাবেনা। সাথে করেই নিয়ে আসবে। আসছে সপ্তাহেই সে ছুটিতে দেশে আসছে। থাকবে মাস দেড়েক।

শামসুন্নাহার শুনছেন, নাতির নাকি এবার বিয়ে করে বউ সাথে নিয়ে যাবার ইচ্ছা। সে আসার আগেই চলছে পাত্রী নির্বাচন।

অল্প সময়ের মধ্যে ভালো পাত্রী খুঁজে পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়! তাঁর উপর নাতির মন মতন হতে হবে যে! নিজের মতন পড়ুয়া জীবনসংগী খুঁজছে সে। বুয়েট অথবা ঢাকা ভার্সিটির মেয়ে চাই! নাতির মতন যেন দেখতে মিষ্টি হয় আর গায়ের রঙটা যেন হয় উজ্জ্বল! নাতির কোন মেয়েই মনে ধরছে না।

অনেক মেয়ের খবরই তাকে দেয়া হয়েছে। এখনো হচ্ছে। শুধু দেখতে শুনতে সুন্দর হলেই তো হবে না। ‘মেয়ে তাঁর সব ছেড়ে দেশের বাইরে গিয়ে থাকতে রাজী আছে তো?’ এই শর্তে বাদ পড়েছে আরও বেশ কয়েকজন।

 

নাতি পিএইচডি ডিগ্রি সম্পন্ন করার আগেই চাকরি পেয়েছে। বিদেশের চাকরি মানে শুধু চাকরি তো নয়, সেখানে অফিসের ভেতরেই অফিসের সব ধরনের স্টাফদের জন্য নানা রকম বিনোদন ও আরামের ব্যবস্থা করা আছে। কারো যদি সারাদিনের অফিসের কাজের মধ্যে মনে হয় এই মুহুর্তে গোসলের প্রয়োজন, তবে সে তাও করতে পারবে। সব রকম সুযোগ সুবিধা দিয়ে ও দেশের বড় স্যারেরা তাদের অফিসারদের আরামের মাধ্যমে নিজেদের কাজ আদায় করে নেয়। সুতরাং অত ভালো চাকরি ছেড়ে সে এই দেশে কোনদিনও স্থায়ীভাবে ফিরে আসবেনা। কত ভালো বেতন! কত কত সুবিধা!

 

‘সবাই বিদেশ চইলা যাইতে চায়!’ দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন শামসুন নাহার।

‘এই দেশটাকে নিজের কইরা পাওয়ার জন্য এক সময় কত মানুষ স্বজন হারা হইছে। কত ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই দ্যাশ! লোকজন এখন সব বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে!’

নিজের মেয়েই তার ছেলের সাথে নিউ ইয়র্কে স্থায়ী হতে চাইছে। তার ভাষায়, ‘এই হরতাল, যানজট, দূর্নীতির দেশে এখন আর টিকে থাকার উপায় নেই! তার চেয়ে দূর্নীতিমূক্ত বিদেশে চলে যাওয়া অনেক ভালো। অন্তত জানে বেঁচে থাকা যাবে!’

‘কথাডা একাবারে মিথ্যাও না! এহানে যহন তহন ক্রসফায়ারে মরার চাইতে পরাধীনতায় বাঁইচ্চা থাকনও ভালা। এত্ত কষ্টে পাওয়া দ্যাশটা এরম পালটায় যাইবো কেউ ভাবতে পারছে জীবনে?’ শামসুন্নাহারের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে নিদারুন কষ্টে।

 

০৪- অন্ধ অনুকরণ

আরিবার ছোট বোন নাদিবা আঞ্জুম খুব ব্যস্ত! মেপল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষক। বাসায় ফিরেই সামান্য কিছু মুখে দিয়েই আবার বসে যায় টিউশনীতে। আজ এখনো ফেরেনি। সন্ধ্যার আযান হয়ে গেছে।

 

নাদিবা ফেরেনি। কিন্তু ওর কাছে যে পিচ্চি মেয়েটা পড়তে আসে সে এসে পরেছে। সাথে কাজের মেয়েটা।

শামসুন্নাহার মাঝে মাঝে এদের দেখেন। কখনো কথা বলা হয়নি। আজ যখন নাতনী ফেরেনি কথা বলা যাক। সময় কাটবে।

‘কি নাম তোমার?’

‘ওর নাম এশা।‘ উত্তর দিলো কাজের মেয়েটা।

‘তুমি নাম বলতে পারো না?’

‘আপু, তোমার নাম বলো!’ এবারো উত্তর দিলো কাজের মেয়েটাই।

‘মা’ নেম ইস এশা!’ এতক্ষণে কথা বলে উঠলো বাচ্চাটা।

‘কি কইলো? নামই কইলো নাকি! ইংরেজীতে কইছে? কি যে শিখাইতেছে আজকালকার মা-গুলো বাচ্চাগো! বাংলা ইস্কুলে দিলে কি সমশ-সা!’ শামসুন্নাহারের চোখে-মুখে স্পষ্ট বিরক্তি।

বাইরের গেটে শব্দ শোনা যায়। মিনিট কয়েক পরেই ঘরের দরজায় নাদিবার কন্ঠস্বর, ‘ওহ এশা, ইয়ু হ্যাভ খাম?’

‘ইয়েশ মিশ!’ বাতাসে খলখলে হাসির শব্দ ছড়িয়ে চঞ্চল হয়ে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো বাচ্চা মেয়েটা।

 

০৫- ম্যাজিক শো!

শামসুন নাহার উঠে চলে এলেন আবার মেয়ের ঘরে। মেয়ে জামাই নেই। এ ঘরে টিভি আছে। নামাজ কালাম শেষে মাঝেমাঝে মেয়ের সাথে বসে বাংলা নাটকগুলো উপভোগ করেন। আজ একুশে ফেব্রুয়ারী উপলক্ষ্যে নাটক দেখাচ্ছে সব বাংলা চ্যানেলগুলো।

 

খুব মনযোগে নাটক দেখতে বসেন শামসুন নাহার। দেশ টিভিতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্মৃতিতে আবার ভেসে আসে খোকনের কথা। সেই দিনগুলো। দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র দিন কয়েক আগের এক রাতের ঘটনা। ঢাকা মেডিকেল হল থেকে খোকন এসেছিলো লালবাগে বাবার বাসায়। শামসুন্নাহার ছোট ভাইকে রাতের খাবারের জন্য সাধলেন, ‘খোকন, ভাত টা খাইয়া যা’! জবাবটা এখনো কানে বাজে স্পষ্ট, ‘রাত দুইটার আগে খাইনা, বুবু। অভ্যাস হইয়া গ্যাছে!’ যেন বা এখনই সে ওই কথা বলেছে এতটাই জীবন্ত সুর এখনো কানে বাজে।

চোখের ডাক্তার হওয়ার জন্য মেডিকেল পাস করে ইন্টার্নি করছিলো ভাইটা। সেই রাতে হলে ফিরে গিয়েছিলো খোকন। পরদিন সারা দেশে কারফিউ ছিলো। তাঁর মধ্যেই দিনের বেলায় একটা এম্বুলেন্স এসেছিলো বাড়ির গেটে। বাড়ির মেইন গেট খুলতে এগিয়ে যান আব্বা। কিছু কথা বাতাসে ভেসে এসে কান দিয়ে গরম সিসার মতন ঢুকে হৃদয়কে গলিয়ে দিয়েছিলো, ‘গভীর রাতে ঢাকা মেডিকেল হলে তল্লাশি চালিয়ে যাদের পাওয়া গেছে, তাদের প্রত্যেককে ধরে নিয়ে গেছে মিলিটারিরা। কোথায় নিয়ে গেছে কেউ জানে না! রাত থেকেই খোকনও নিখোঁজ!’

সেই যে নিখোঁজ হলো ভাইটাকে আর ফিরে পাওয়া গেলো না। আদৌ কি সে বাঁচতে পেরেছিলো? বেঁচে থাকলে চোখের ডাক্তার হতো! ঘটনাগুলো যেন এখনো জীবন্ত! যেন এই কয়েকদিন আগের ঘটনা!

মাঝেমাঝেই ওনার কেন যেন মনে হয় ভাইটা আছে। কোথাও আছে। এত বড় পৃথিবীর আনাচে-কানাচে!

‘কিন্তু যদি বাঁইচা থাকে খোকন, তাঁর কি স্মৃতি নষ্ট হইছে? তিনি না হয় সংসারী হইছেন, ঠিকানা বদলাইছেন। বাপজানের ভিটা তো সেই একই জায়গাতেই রইছে! তাইলে সেইখানে ক্যান খোকন ফিরা আসতে পারে না? মরার আগে কি তারে একবার দেইখা যাওনের সুযোগ আইবো না?’

কারফিউ এর পরদিন শামসুন্নাহারের বড় ও মেজ দুই ভাই বাচ্চু আর আনু এসে খবর দেয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে অনেক লাশ স্তুপ করে ফেলে রেখে গেছে মিলিটারিরা। অনেকেই নিজেদের স্বজন খুঁজতে সেখানে যাচ্ছে। ওরাও খোকনের লাশ খুঁজতে যাবে। এই শুনে, শামসুন্নাহারও আপাদমস্তক বোরখায় ঢেকে ছুটে গিয়েছিলেন সেখানে। কিন্তু এত এত লাশের ভিড়ে দাঁড়িয়ে তাঁর মনে হয়, স্নেহশীল ছোট ভাইটাকে লাশ হিসেবে কল্পনা করতে তিনি পারছেন না। সেই স্নায়ুজোর তাঁর ছিলো না। ছুটে চলে এলেন তিনি। মন বলতে থাকে, তাঁর ভাই মরতে পারে না।

 

নাটকে বেশ উঁচু শব্দে গানের সুর অতীত স্মৃতির গহ্বর থেকে শামসুন্নাহারকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনে। অতীত ভুলে তিনি বর্তমানের নাটকে মনযোগী দর্শক হয়ে ওঠেন।

 

মাঝের কিছুটা সময় খেয়াল করেন নাই। নাটকে কি কি দেখিয়েছে তাও ভালো করে খেয়াল হচ্ছেনা। হাফিজুল্লাহ সাহেবের মতন ওনারও মাঝে মাঝে স্মৃতিবিভ্রম ঘটে। পর পর দু’বার স্ট্রোক করেছেন তিনি! কিডনি, ডায়াবেটিস, হাই প্রেশার সহ নতুন এক রোগ মাথায় স্থান দিয়েছেন। পারকিনসন্স! যত বেশি বয়স বাড়তে থাকবে ব্রেনের বুদ্ধিকোষগুলো কিছু কিছু করে মরে যেতে থাকবে। মাঝেমাঝে যা একটু আধটু পুরনো কথা যেন মুড়ির টিনের মত বাসের ঝাঁকুনিতে মগজের ভেতরে সজাগ হয়ে ওঠে!

নাটকের যতটুকু দেখেন নাই ততটুকুর কথা মনে নেই। বাকিটুকু ভালো করে দেখা যাক! দেখতে দেখতে চমকে যেতে লাগলেন! যা তিনি শুধু ভেবেছেন, আশা করেছেন কিন্তু সত্যি হবেই এমনটা কি সত্যি ভাবতে পেরেছিলেন? এটা কি সত্যিই নাটক? এ কী দেখছেন তিনি? চুলে পাক ধরা এক বৃদ্ধা! দেখতে যেন অনেকটাই শামসুন্নাহারের নিজের মতন! আর ওই ছেলেটা? এক বৃদ্ধ খোকনের মতই কি মনে হচ্ছে না? স্বপ্ন দেখছেন? কেউ কিছু বলছে না কেন? একা তিনিই কি ধরতে পেরেছেন বিষয়টা? উত্তেজনার আতিশর্যে তিনি দাঁড়িয়ে গেছেন। তাঁর মেয়ে লুতফা কিন্তু সেই ঠায় বসেই আছে। তিনি অস্ফুটে বলে উঠলেন, ‘লুতফুউউন! দ্যাখ, এইটা তোর ছোট মামা না? আমার খোকনে?’ বলে মেয়ের সমর্থনের আশায় কান পাতলেন।

মেয়ে তখনো নির্বাক। সম্মোহিতের মত চেয়ে আছেন টেলিভিশনের দিকেই। টেলিভিশনের ভেতর থেকে স্পিকারে শোনা যাচ্ছে, ‘সুধী দর্শকমন্ডলী, এটি ছিলো আমাদের একটি প্রামান্য চিত্র! দেশে স্বাধীন হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে, ঢাকা মেডিকেলের ছাত্রাবাস থেকে বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য সব ছাত্রকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।

তাদের মধ্যে চোখের ডাক্তার হিসেবে ইন্টার্নি হিসেবে থাকা সিরাজুল হক খোকন হলের পাশের রাস্তার ম্যানহোলের গন্ধের মধ্যে সারা রাত ডুবে থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান! হানাদার বাহিনী ওনার কথা জানতে পারে নি। এক্ষেত্রে তাকে ভাগ্যবান বলাই যায়। পরদিন কারফিউ এর মধ্যে মুক্তিবাহিনীর একটি ছোট দলের সাথে ভিড়ে যান। বাড়ির ত্রিসীমানায় ঘেঁষেন নি কদিন। এরপরে ষোলই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়ে যায়। তিনি বাড়ি ফিরে আসেন নিঃসংকোচিত্তে। কিন্তু ফিরে এসে নিজের পৈত্রিক ভিটায় কাউকে খুঁজে পাননি। তারপর থেকে অনেক খঁজেছেন। জীবন সায়াহ্নে এসে তিনি তাঁর পরিবার পরিজনদের সাথে একটিবার দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ-এর কারণেই আজকের এই প্রতিবেদন প্রচার!’

 

ঘোষকের বক্ত শেষ হতে না হতেই শামসুন্নাহারের প্রেশার বেড়ে যায়। হাঁত কাঁপতে থাকে। ওনার অবস্থা দেখে মেয়ে বিছানা থেকে নেমে মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে যান। এদিকে শামসুন্নাহার উঠে দাঁড়াতে গিয়ে ‘খোওওকন’ বলে এক চিৎকার দিয়ে ওঠে মেয়ের কাঁধে ভর দিয়ে অবলম্বন পেতে চেষ্টা করেও না পেরে ধপাস করে মেঝেতে পড়ে যান।

প্রায় পঞ্চাশওর্ধ বয়স্কা ভাগ্নী লুতফুন নাহার হারিয়ে যাওয়া মামাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে বিহ্বল হবে কি, মায়ের পড়ে যাওয়া দেখে ভড়কে যায় পুরোপুরি। মুহুর্তের মধ্যে সারা বাড়ির সবাইকে খবর দেয়া হলো। সবাই এসে হাজির হয়ে গেলো।

ছোট ছেলে ইমতিয়াজ এসে প্রেশার মেপে দেখে বললো, ‘নাহ! আসলেই ভড়কে যাবার তেমন কিছুই হয়নি! প্রেশার বেড়ে গিয়েছিলো শুধু।‘

 

পাঠক, এর পরের ঘটনা শুধুই আনন্দের। স্বাধীনতার একচল্লিশ বছর পরে বোন ফিরে পেলো তাঁর হারিয়ে যাওয়া এবং পরিবারের সকলের কাছে মৃত বলে মনে করা ভাইটিকে। আর ভাই ফিরে পেলো তাঁর পুরো পরিবার সহ এক ঝাঁক নতুন প্রজন্মকে।

(সমাপ্ত)

নোটঃ

[জাগৃতি প্রকাশনীর মাধ্যমে একুশে বইমেলা ২০১২ তে ণৈঃশব্দের উচ্চারণ গল্প সংকলনে প্রকাশিত]

*ছবিটি গুগল থেকে সংগৃহীত

২৬৮জন ১৪৯জন
61 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য