বিমূর্ত নারী

শিপু ভাই ২২ ডিসেম্বর ২০১৯, রবিবার, ০৫:৩০:০০অপরাহ্ন গল্প ৮ মন্তব্য

মাওয়া ঘাটে বাসে উঠে আমি আর কামাল কাকা একদম শেষের সিটে বসেছি। আমি জানালার সাইডে। শাড়ি পড়া মেয়েটা এসেই আমার ঠিক সামনের সিটে বসা এক লোককে চোখ পাকিয়ে (মুখে দুষ্টামি মার্কা হাসি) বললো-“এই, তুমি এই সিটে আসো। আমি এখানে বসবো।”
লোকটা বললো-“টিকিট কাইট্টা উঠছি। তুমি অন্য সিটে বসো।”
মেয়েঃ”আমার জানালার পাশে বসতে হয়। তুমি উঠ। নইলে তোমার গায়েই বমি করে দিব।”
এই বলেই হাসতেছে মেয়েটা। তার সাথে আরেক মহিলা। লোকটা হাসিমুখেই খুব অষন্তোষ নিয়ে সিট ছেড়ে অন্যত্র গিয়ে বসে। এই মেয়েটার নাম প্রিয়া। মোটা না হলেও বেশ দীর্ঘাংগী। বিজয়ির হাসি নিয়ে আমার সামনের সিটটায় বসে পড়লো। বাস চলতে শুরু করলো ঢাকার দিকে। আমি মাথা গুজে ফেসবুক গুতাচ্ছি। প্রিয়া (নাম পরে জেনেছি) মাথা উচু করে ঘাড় ঘুড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে অমায়িক একটা হাসি দিল।
প্রিয়াঃ ফেসবুক চালাও?
আমিঃ হ্যা
প্রিয়াঃ ফেসবুক চালাতে কী লাগে?
আমিঃ নেট কানেকশন সহ একটা মোবাইল সেট লাগে।
প্রিয়াঃ সব সেটে হয় না?
আমিঃ যেসব সেটে নেট সাপোর্ট করে তেমন সেট হলেই হয়।
প্রিয়াঃ তোমার সেটটা দেখাও তো!
(আমার স্যামসাং ই৫ সেট উচু করে দেখালাম)
প্রিয়াঃ এই সেটই লাগবে।
আমিঃ আরে নাহ!
প্রিয়া তখন ওর ব্যাগ থেকে হাজার পঞ্চাশেক দামের একটি স্মার্ট ফোন আমাকে দেখিয়ে বললোঃ এই সেট দিয়ে ফেসবুক চালানো যাবে?
আমিঃ আরেহ! এটা তো দারুন সেট। অবশ্যই চালানো যাবে।
প্রিয়ার চোখেমুখে দুষ্টু হাসি। আমি অবশ্য শুরুতেই অনুমান করছিলাম যে ও আমাকে একটা চমক দেয়ার চেষ্টা করবে। হাহাহাহা
তারপর পুরো যাত্রা পথে ইন্টারনেট, স্কাইপ, উইচ্যাট, ভাইবার ইত্যাদি টপিকে আমরা অনেক আলাপ করলাম। এর মধ্যেই ও ওর আইডি থেকে আমার আইডিতে এড পাঠিয়ে টাইমলাইন ঘাটছে আর লাইক দিচ্ছে একেকটা পোস্টে। আমি এক্সেপ্ট করার পর ও ইনবক্স করেছে -“hi”
কিছুক্ষন চ্যাট করলাম ওর সাথে। যদিও ও আমার সামনেই বসা।
নিমতলি এসে ও নেমে যায় সংগি সহ। জানালা দিয়ে হাত নাড়লাম যখন ওরা রিক্সা নিচ্ছিল বাস থেকে নেমেই।
আবার বাস চলছে। ইনবক্সে মেসেজ এল-
“তোমার ব্যবহার খুব ভাল। থ্যাংকস”

তারপর ও মাঝে মাঝে নক দেয়, টুকটাক কথা হয়। ফোনেও কথা হয়েছে। আমি ওকে ভুলে গেছি এই অভিযোগ করে।
একদিন সন্ধ্যায় ফোন দিয়ে জানালো ও ঢাকায় মতিঝিলে আছে। ইন্ডিয়া যাবে রাতের বাসে। এতক্ষন কই বসে থাকবে! একা!
বললাম আমার অফিসে চলে আসতে। ঠিকানা বুঝিয়ে দিলাম। ঘন্টাখানেক পর ও আমার অফিসে এসে হাজির। আমি তখন আমার এক বান্ধবী, দুই বন্ধু আর দুইটা ছোট ভাইকে নিয়ে আড্ডা দিচ্ছি অফিসে বসে। প্রিয়ার সাথে সবাইকে পিরিচয় করিয়ে দিলাম। সবাই আগেই প্রিয়ার গল্প জানে। অল্প সময়েই আবার আড্ডা আগের মতই জমে উঠলো প্রিয়া সহ। সবাই প্রিয়াকে পছন্দ করেছে। বিদায় বেলায় প্রিয়াকে বাসি কাউন্টারে যাওয়ার রিক্সায় তুলে দিলাম। অন্যরা সবাই প্রিয়াকে আবার আসার জন্য বলে দিল।
“আল্লাহ হাফেজ! সাবধানে যেও।”
……
প্রিয়া! আমার বন্ধু। যে আমাকে জিজ্ঞেস করে “কেমন আছ?” ওর মত শুদ্ধ করে আমি কথা বলতে পারি না। ওর কন্ঠস্বর পুরুষদের মত। দাড়ি গোফ না থাকলেও বোঝা যায় ও তৃতীয় লিংগের একজন মানুষ। প্রকৃতির খেয়ালে ওর এই শারিরিক বৈশিষ্ট। ও নিজেকে একজন “নারী” ভাবতে ভালোবাসে। অন্য হিজরাদের সাথে থাকে সে, দোকানে দোকানে চাঁদা তুলে বেড়ায়, লোকজনের সাথে দুষ্টামি করে পথে। সবাই ওকে “হিজলা” বলেই চিনে। একটা মানুষ দেখলাম না যারা হিজরাদের সাথে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলে। হিজরারা যেন জ্যান্ত বিনোদন সবার কাছে। হিজরারাও তাই সবার সাথে সেই ইমেজটাই ফুটিয়ে তোলে তাদের আচরণে। এটা মুখোশ! ওই মেকাপ করা মুখবয়ব, ঔ রঙ ঢং করা শরিরের ভেতর বাস করা মানুষটাকে কেউ দেখে না, দেখতে চায়ও না। এই মানুষগুলো কতটা কষ্ট বয়ে বেড়ায় সারাটা জীবন কেউ বুঝতে পারে না। বেঁচে থাকার তাগিদে এরা এরকম চাদা তোলে। অনেকে বাড়াবাড়ির চুড়ান্তও করে। কেউ কেউ বিপথগামীও হয়। বস্তুত এরা অসহায়, বঞ্চিত মানুষ। পরিবারহীন, শিক্ষাহীন, নিরাপত্তাহীন অপমানের এক ভিক্ষাবৃত্তিক জীবন বেছে নিতে হয় জন্মের পর থেকেই।
প্রিয়া অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা। ও স্মার্ট একজন “নারী”! আমার বন্ধু। তার বাসায় আমার সবান্ধব দাওয়াত।
খুব শিঘ্রই যাবো ওর বাড়ি।

৪৫২জন ২৯৪জন
57 Shares

৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ