বিবাহের স্মৃতিকথা-২

নিতাই বাবু ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার, ০২:২১:০১পূর্বাহ্ন গল্প ৫ মন্তব্য

বর্ষার দিন, চারিদিকে পানি আর পানি, লোকে যাবে কোথায়? তাই গ্রামের অনেকেই ঠাকুরবাড়ির সিঁড়িঘাটকে বেছে নিয়েছে সময় কাটানোর জন্য। অনেক মানুষের মধ্যে ঠাকুরবাড়িতে থাকা মুরুব্বিও আছে। মুরুব্বির সাথে আছে ওনার অবিবাহিত তিন মেয়ে।

সাথে যারা সিঁড়ি ঘাটলায় আছে, তারা মনে হয় আগে থেকেই আমাদের কথাই বলছিল। আমরা ঘাটের সামনে যাওয়ার সাথেই একজন বলে ওঠল, ‘এই যে এসে গেছে।’
কালামকে ঠাকুরবাড়ির লোকটি জিজ্ঞেস করলো, ‘কিরে কালাম, তোর ওস্তাদ না-কি হিন্দু? বিয়ে সাদি করেছে না-কি রে? তোর ওস্তাদের জাত-গোত্র কী? খাওয়া-দাওয়া করেছে না-কি?’

আরও অনেক কথাই জিজ্ঞেস করেছিলেন হিন্দু লোকটি। লোকটির নাম: নারায়ণ সরকার, তাই গ্রামের সবাই তাকে সরকার বলেই সম্মোধন করে। লোকটির কথা শুনে কালাম আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘ওস্তাদ, আপনার জাত-গোত্র কী?’
আমি বললাম, আমারা তৈলপাল, গোত্র সান্ডল্য।
কালাম ঠাকুরবাড়ির মুরুব্বিকে বলল, ‘শুনেছেন সরকার কাকা, আমার ওস্তাদরা জাতে পাল আর গোত্র সান্ডল্য।’
এবার কালাম ঠাকুরবাড়িতে থাকা লোকটিকে বলল, ‘সরকার কাকা, আপনার জাত-গোত্র কী?’
লোকটি কালামকে বলল, ‘এতদিন একসাথে থাকি, অথচ আমার টাটেল জান না? আমি হলাম (কাপালিক) টাইটেল সরকার, গোত্র কাশ্ব্যাব।’
কালাম বলল, ‘দূর! এত কি আর আমি জানি? আপনি হিন্দু, আমি মুসলমান। আপনার জাত বেজাত সমন্ধে আমার কোনও ধারণা নাই। তবে এখন বুঝলাম, আমরা আপনাকে সরকার কেন বলি।’
এই বলেই কালাম হাতের হারিকেনটা মেয়ে তিনটার সামনে নিয়ে বলল, ‘ওস্তাদ এই যে, এই বাড়িতেই থাকে। ওনার মেয়ে চারজনের মধ্যে তিনজন।’
কানাই বলে ওঠল, ‘আরেকজন কোথায়?’
কালাম বলল, ‘কানাই ভাই, ওদের বড়বোনের বিয়ে হয়েছে। ও এখন স্বামীর বাড়িতে, এখানে মাঝেমধ্যে আসে। এই তিনজনের মধ্যে বড়টার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, বিয়ে হবে সামনের মাসে।’

কালামের হাতের হারিকেনটার বেশি আলো ছিল না, তাই আমার ভালো করে দেখা হয়নি। তবু অবিবাহিত দুইজনের মধ্যে ছোট মেয়েকে আমার পছন্দ হয়েছে। কিন্তু তা কী করে সম্ভব? আমার মা তো রাজি হবেই। কিন্তু বড়ভাই, বোন, ভগ্নিপতিকে ম্যানেজ করবে কে? আমি বসে-বসে ভাবছি। আবার মনে-মনে বলছি, দূর ছাই! এখনও ওর বড়বোনের বিয়ে হয়নি। বড়টাকে রেখে কী ছোট মেয়েকে বিয়ে দিবে? এখন আমার মনে কেবল ভাবনা আর ভাবনা।

আমার ভাবনার মধ্যেই একসময় কানাইকে কাছে ডাকে নারায়ণ সরকার। হয়ত আমার ব্যাপারেই কিছু জিজ্ঞাসা করার জন্য। কানাইও একেবারে মঘা নারায়ণ নয়, কানাই খুবই চালাকচতুর টাইপের মানুষ। আর যদিও আমার কথা কানাইকে কিছু জিজ্ঞেস করে, উত্তর পাবে সঠিক। আর আমার মা ও কানাই চাইছে, আমি বিয়ে করে সাংসারিক হই। আমার মা বৃদ্ধ, ঘরের সব কাজ করতে পারে না। তাই আমাকে বিয়ে করানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। বিক্রমপুর আসার সময়ও আমার মা কানাইকে বলেছে, একটা মেয়ে দেখে আসবি। আমার মায়ের ইচ্ছার কথাটা কানাই বলেছে, বিক্রমপুর যাবার সময়। তখন দুইজনে লঞ্চে বসে বাদাম খাচ্ছিলাম।

নারায়ণ সরকারের সাথে কথা বলে কানাই আমার সামনে এসে বসলো। আমি কানাইকে জিজ্ঞেস করলাম, হ্যাঁ রে, কোথায় গিয়েছিলি?
কানাই বলল, ’ঠাকুরবাড়ির ভেতরে ।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন? কী দরকার ছিল?
কানাই বলল, ‘আ-রে ভাই, কালাম ভাই আমাকে ডেকে নিয়েছে, তাই গেলাম।’
আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, তা কী জিজ্ঞেস করলো?
কানাই আমাকে সরাসরি বলল, ‘তোর কথা জিজ্ঞেস করেছে। তোরা জাতে কী? তোর কত টাকা বেতন? নিজেদের বাড়ি আছে কিনা? ক’ভাই, ক’বোন? বাবা আছে কিনা? বাসা ভাড়া কত? আরও অনেক কথা।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, তো হ্যাঁ, তুই কি বললি?
কানাই বলল, ‘তোর যাযা আছে, তাই ঠিক-ঠিক বলে দিয়েছি।’
আমি বললাম, আচ্ছা আমি বুঝতে পারছি না, আমার ব্যাপারে এত গবেষণা কেন? আমি কী এই বাড়িতে মেয়ে দেখতে আসেছি?
আমার কথা শুনে কানাই বলল, ‘মেয়ে দুটেই বেশ সুন্দর, মাসিমার পছন্দ হবে। এখন তোর সিদ্ধান্তের উপরেই সবকিছু নির্ভর করছে।’
আমি কানাইর কথা শুনে বললাম, আরে রাখ তোর সুন্দর! এই সেন্টমার্টিনের দ্বীপে বিয়ে করবে কে? তুই কানাই একটা মেয়েকে বিয়ে করে ফেল। মাসিমাকে আমি ম্যানেজ করবো।
আমার কথা শুনে কানাই বলে ওঠল, ‘দেখতো পাগলের কথা! আরে ভাই মাসিমার শরীরের অবস্থা বেশি ভালো নেই। কখন যে-কী-হয়ে যায়, কে জানে! মাসিমার খুব শখ তোর বউ দেখার জন্য।’

কানাইর কথা শুনে আমি কেবল ভাবছি সেই মেয়েটির কথা। গেল ছয়মাস আগে একটা মেয়ে আমার জন্য পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। মেয়েটাকে আমার ভালো লেগেহিল, কিন্তু বিয়ে করেনি। করেনি শুধু আর্থিক দুরাবস্থার জন্য। তখন মিলে বেতন ছিল কম, বাজারে দ্রব্যমূল্য ছিল অনেক বেশি। তাই আর বিয়ে করতে সাহস পায়নি। মেয়েটা ছিল আমি যেই বাড়িতে মাকে নিয়ে ভাড়া থাকতাম, সেই বাড়ির মেয়ে। আসলে সেই বাড়ির মেয়েও না, ও হলো ওই ছিল বাড়িওয়ালার গৃহকর্মী। ছিল গরিব ও অসহায়। ওর বাবাও ছিল না। ছিল ছোট এক ভাই আর বিধবা মা। বাড়ি ছিল মুন্সিগঞ্জের কোনও এক গ্রামে। মেয়েটি গরিব হলেও, ছিল ওর রূপের বাহার। মেয়েটার সেই সোনালী রূপ আজও আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

মেয়েটি আমাকে অন্তর দিয়েই ভালোবাসতো। ওর সেই অন্তরের কথা কয়েকবার কানাইর কাছেও প্রকাশ করেছিল। কানাইও মেয়েটির প্রকাশ করা মনোভাব আমার কাছে বলতো, আমি পাত্তা দিতাম না_শুধু এড়িয়ে যেতাম। বাড়িওয়ালার ঘরে ভালমন্দ কিছু রান্না করলে, সেই খাবার মেয়েটি একা খেতে পারতো না। আগেই বাটি ভরে গোপনে আমার মায়ের কাছে দিয়ে যেত। এ নিয়ে আমার মা সময়-সময় মেয়েটির সাথে রাগারাগিও করতো। আমার মায়ের রাগারাগিতে মেয়ের কিছু যায়-আসতো না, ও ওর কাজ করেই যেত। সর্বক্ষণই আমার আগমের অপেক্ষায় প্রহর গুনতো। কখন মিল থেকে বাসায় আসবো, সেদিকে থাকতো মেয়েটির নজর। মেয়েটি দাঁড়িয়ে থাকতো বাড়ির সামনে পুকুরপাড়ে, না হয় বাড়ির উঠানে। মেয়েটির এমন উদাসীভাব একসময় আমি টের পেয়ে যাই। এরপর মানুষের কানাঘুষার ভয়ে আমি বাসায় যেতাম চুপিচুপি, ও যেন না দেখে এমন করে। তারপরও ধরা খেয়ে যেতাম ওর কাছে, পড়ে যেতাম মেয়েটির চোখের নজরে।

একদিন মেয়েটি আমাকে বলেছিল, আজ যেমন করে আমি আপনাকে খুঁজি, হয়ত কোনও একদিন আমাকে আপনি খুঁজবেন। তারপরও ওর কথায় তেমন কোনও গুরুত্ব দেইনি। শেষতক আমি মেয়েটাকে উঠিয়ে দিলাম পরের হাতে। আমার মা’ও একশ পার্সেন্ট নিশ্চিত ছিল যে, আমি মেয়েটা বিয়ে করবো। কিন্তু না, তা আর হলো না, হয়েছে উল্টো। বরঞ্চ আমি মেয়েটিকে নিজের ঘরে না নিয়ে, পাঠিয়েছি অন্যের ঘরে। আজ হঠাৎ এই বিক্রমপুর এসে ওকে ভীষণভাবে আমার মনে পড়ছে। মনে পড়ছে ওর বলা কথা, ‘কোনও একদিন আপনি আমায় খুঁজবেন। সত্যি! আজ মেয়েটিকে মনে-মনে খুঁজি। আমার চোখের সামনে যেন দেখছি, সেই মেয়েটিকে। যেই মেয়েটি এখও কাঁদে, চোখের জলে বুখ ভাসায়। কয়েক বছর আগে একদিন হঠাৎ করে দেখা হয়েছিল। মেয়েটির ছোট ছেলের জন্য একটা মানসী দিতে আসা নারায়ণগঞ্জ কালী বাড়িতে। মেয়েটি ছোট ছেলেকে নিয়ে কালী বাড়ি আসলো আর অমনি আমার সাথে দেখা। আমাকে দেখেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। ওর কান্না দেখে আমিও কেঁদেছিলাম। সেই দেখাই ছিল ওর সাথে আমার শেষ দেখা। কিন্তু সেইদিন মেয়েটি বলেছিল, এই দেখাই শেষ দেখা নয়। আবার দেখা হবে কোনও একসময় হঠাৎ করে। কই? আর তো দেখা হয়নি!

মেয়েটির বিবাহের পর ওয়াদা করতে চেয়েছিলাম, এই দারিদ্র্য জীবনে বিয়েই করবো না। ‘দেবদাস’ হয়ে জীবন পার করবে। কিন্তু আমার মায়ের কথা ভেবে আর সেই কঠিন ওয়াদাটি করতে পারেনি। আমি ছাড়া মায়ের আর তেমন কেহ নাই যে, মাকে দেখবে। আমার বউ দেখবে এটা যেন মায়ের অন্তরে জমানো আশা। মায়ের সেই আশা, সেই শখ থেকে মাকে কীভাবে বঞ্চিত করি? তা কি সম্ভব? এখন আমার কাছে এই মেয়েটিও পছন্দের। কপালে যদি লেখা থাকে, তবে এবার বিয়ে হবেই হবে। প্রথম ভালো লাগা মেয়েটাকে নিয়ে আমি একা-একাই ভাবছিলাম। এমন ভাবতে-ভাবতে একসময় সিঁড়ি ঘাটলায় বেজে গেল রাত ১০ টা।

কানাই একপাশে আর কালাম আরেক পাশে বসা।
কালাম বলছে, ‘ওস্তাদ, এবার ওঠেন, রাত অনেক হয়েছে! ভাত খাবেন চলুন।’
কানাইও বলে ওঠল, ‘হে রে! এবার চল, বড্ড ঘুম পাচ্ছে।’
সিঁড়িঘাট থেকে ওঠার সময়ও এদিকওদিক থাকাচ্ছিলাম, মেয়েটাকে দেখা যায় কি না। না দেখা আর হলো না, আক্ষেপ নিয়েই চলে গেলাম কালামদের বাড়ি। খাবারের খাবার রেডি করে বসে আছে কালামের মা। সবাই তখন ঘুমে বেভার, যেন রাতদুপুর হয়ে গেছে। গ্রামাঞ্চলের মানুষের সন্ধ্যে হতেই তাদের চোখে ঘুম নেমে আসে। সেখানে রাত ১০ টা তো অনেক রাত। গ্রামের মানুষ, সারাদিন মাঠেঘাটে কৃষি কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। সারাদিনের পরিশ্রম মাটি করে রাতের ঘুমে। আবার সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠেও তাড়াতাড়ি। তাই কালামও একটু তাড়াহুড়া করতে লাগলো বাড়ি আসার জন্য।

সিঁড়ি ঘাটলা থেকে আমরা বাড়ি যাবার পর,
কালামের মা বলছে, ‘কি রে, আজ কি তোরা ঘুমাবি না? রাত তো অনেক হয়েছে! নে_তাড়াতাড়ি করে খেয়ে নে, আর মেহমানদের নিয়ে এই খাটেই ঘুমিয়ে থাকিস। আমার ঘুম পাচ্ছে, আমি গেলাম।’
কালামের মা চলে গেলেন, কালাম-সহ তিনজনে মিলেমিশে ভাত খাচ্ছি। খাওয়ার মাঝেই শুরু হলো আমাকে নিয়ে কথা।

কানাই কালামকে বলল, ‘কালাম ভাই, আমি ওকে বললাম, ঠাকুরবাড়ির ছোট মেয়েটাকে বিয়ে করতে। মেয়েটা খুব সুন্দর! টানাটানা চোখ, গায়ের রঙও ফর্সা আর বয়সও কম । ওর সাথে মানাবে বেশ! আপনি কী বলেন, কালাম ভাই?’
কালাম কানাইর কথা শুনে হাসি দিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, আমিও মনে মনে তা-ই ভাবছি কানাই ভাই! এখন ওস্তাদের ওপর সিদ্ধান্ত, ওস্তাদ যা ভালো মনে করে তা-ই হবে। তবে মেয়ে শতগুণে ভালো, আমাদের গ্রামের মেয়ে। সবেমাত্র ক্লাস ফাইভে পড়ছে, গরিব মানুষ ওরা, এর বেশি লেখাপড়ার দরকার কী? আপনারা আসার আগে ওর বাবাও আমাকে একবার বলেছিল, একটা ছেলে দেখতে। তবে ওর জন্য নয়, ওর বড়টার জন্যে। কিন্তু ছেলে কী গাছের গোটা? যে, চাইলেই পাওয়া যায়? এখন আপনারা এসেছেন আমাদের বাড়িতে, ওদেরও দেখেছেন, যদি ভালো লাগে…।’
কালামের কথা শুনে আমি বললাম, মেয়ে পক্ষের গার্ডিয়ান কী রাজি হবে? যদি রাজি হয় তো পরে দেখা যাবে। তুমি কালাম এই রেজাল্টটা নিয়ে আমাকে জানাবে।
কালাম খুশি হয়ে বলল, ‘আচ্ছা ওস্তাদ, আমি অবশ্যই আপনাকে জানাবো। এখন ঘুমান, রাত অনেক হয়েছে।’
আমি আবার কালামকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললাম, আর শোন, কাল সকালে ঘুম থেকে ওঠেই আমরা চলে যাবো। আমাদের জন্য খালাম্মা যেন কিছু না করে, বুঝলে?
কালাম হেসে বলল, ‘তা কি হয়! আমাদের বাড়ি থেকে চলে যাবেন, অথচ কিছু খেয়ে যাবেন না, তা হয় না। আর আগামীকাল তো যেতেই পারবেন না।’
আমি প্রত্যুত্তরে বললাম, আচ্ছা তা দেখা যাবে সকালে। এখন আর কোনও কথা নয় ঘুমাবো।

বেশি রাত করে ঘুমানোর কারণে সকাল-সকাল ঘুম থেকে ওঠা হলো না । বেজে গেল সকাল ৮টা, খাবারও রেডি করতে লেগেছে খালাম্মায় । খালাম্মার সামনে বসা আছে মেয়েটি, যেই মেয়েটির কথা বলছে কানাই। কিন্তু এতো সকালে এখানে কেন? কেন-ই-বা এসেছে? এখানে ওকে কে পাঠালো? মেয়েটিকে দেখামাত্র আমি চমকিত, বিষ্মিত। কানাই আমাকে চিমটি দিয়ে মেয়েটিকে দেখাচ্ছে, কিন্তু আমিতো আগেই ওক দেখেছি! শোবার ঘরের সাথেই রান্নাঘর, খালাম্মা আমাকে উদ্দেশ্য করে কি যেন বলছে মেয়েটাকে। একটু দূর হওয়ার কারণে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না কিন্তু_আমাকে যে, দেখাচ্ছে সেটা বোঝা যাচ্ছে। আমি উৎসাহিত হয়ে খালাম্মাকে বললাম, খালাম্মা, কী করছেন? আমরা এক্ষুণি রওনা দিবো।
খালাম্মা বলল, ‘সে কী! আজই চলে যাবে? না না বাবা সকল, তা হয় না । অন্তত আজকের দিনটা তোমাদের থাকতেই হবে, তা যে করেই হোক।’
আমি কিছু বলার আগেই কানাই বলে ওঠল, ‘না-খালাম্মা না, আজ আমরা থাকতে পারছি না। আবার সামনের ঈদে আপনাদের বাড়ি বেড়াতে আসবো। আজ আমাদের যেতেই হবে।’

কানাইর কথা শুনে আমি কানাইকে পেছন থেকে চিমটি মারছি। তার মানে হলো, আজকের দিনটাও এখানে থাকবো। আমার চিমটি খেয়ে কানাই পরে বুঝতে পেরেছে, আমি ওকে কী বলতে চেয়েছি।

আমি খালাম্মাকে জিজ্ঞেস করলাম, খালাম্মা কালাম কোথায়? ওকে দেখছি না যে?
খালাম্ম বললেন, ‘ও তো বাবা সকালে ঘুম থেকে উঠে কোথায় যেন গেছে। হয়ত এখনই চলে আসবে। তোমরা বাবা হাত মুখ ধুয়ে আস, খাবার তৈরি হয়ে গেছে। নাস্তা খেয়ে কালামকে নিয়ে আমাদের গ্রামটা ঘুরে দেখ। আজকে আর তোমাদের যাওয়া হবে না, কাল যাবে।’

মেয়েটি তখনো খালাম্মার সাথে বসা। আমি কথা বলছিলাম, আর মেয়েটি ঘাড় ফিরিয়ে এদিকওদিক চাচ্ছিল। আমার তখন ইচ্ছা হচ্ছিল, মেয়েটির সাথে একটু কথা বলতে।
কথা বলতে না পেরে খালাম্মাকেই জিজ্ঞেস করলাম, খালাম্মা, আপনার সাথে বসা মেয়েটি কে? কালামের কী হয়?
জবাবে খালাম্মা বললেন, ‘ও তো বাবা তোমাদের স্বজাতি। ঠাকুরবাড়ির সারকারের মেয়ে।’
কানাই বলল, ‘ও আচ্ছা, গতরাতে সিঁড়ি ঘাটলায় দেখেছি, সাথে ওর বোনও ছিল।
খালাম্মা বললেন, ‘হ্যাঁ বাবা, ওরা খুব ভালো মানুষ। ওরা আমাদের আত্মীয়স্বজনের মতো।’ এই কথা বলেই মেয়েটাকে বলল,”যা ওদের সাথে কথা বল। ওরাও খুব ভালো ছেলে, নারায়ণগঞ্জের মানুষ। আবার কাপড়ের মিলে কাজ করে।” কানাইকে বলল, “‘দেখো তো বাবা একটা ছেলে পাও কি না, ওদের নারায়ণগঞ্জেই বিয়ে দিব।”‘ তারপর বললেন, ‘আমাদের এই নয়াবাড়ি গ্রামে তিনটা হিন্দু বাড়ি আছে, তার মধ্যে ওরাই খুব ভালো।’

খালাম্মার কথায় মেয়েটি ধীরগতিতে আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল। গতরাতে হারিকেনের আলোতে ভালো করে দেখা হয়নি। তাই দেখার ইচ্ছাটা আজ পূরণ হয়েছে মনে হয়। যতই দেখছি তৃষ্ণা মিঠছে না। যত কাছে আসছে ততই যেন আপন হয়ে যাচ্ছে। চুম্বক যেমন একটুকরা লোহাকে কাছে টানে, তেমনি আমাকে যেন কাছে টানছে। মেয়েটি সামনে আসার পর আমি যেন বোবা হয়ে গেছি, কিছুই আর বলতে পারছি না।

সুযোগ পেয়ে কানাই বলল, ‘আপনি এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন যে? এখানে এসে বসুন।’

মেয়েটি বলল, ‘না থাক, বসবো না । আমার এখনই যেতে হবে, মা রাগ করবে।’
কানাই আমাকে দেখিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমার ওস্তাদ, কালাম ভাইয়েরও ওস্তাদ। আমরা থাকি নারায়ণগঞ্জ, বাসাও নারায়ণগঞ্জে। খালাম্মাকে সাথে নিয়ে একদিন আমাদের ওখানে যাবেন, খুশি হবো।’

এমন সময় খালাম্মা সামনে এসে বললেন, ‘একদিনের জন্য কেন? চিরদিনের জন্যই নিয়ে যাও। দেখেশুনে বিয়ে দিয়ে দাও, ওর বাবা খুবই গরিব মানুষ। ওরা অবিবাহিত দু’বোনও খুব ভালো। পাত্র থাকলে একটু দেখো।’

খালাম্মার কথা শুনে মেয়াটি মুচকি মুচকি হাসছে। এই ফাঁকে কানাই চট করে বলে ফেলল, ‘খালাম্মা, আমার ওস্তাদই তো এখনো বিয়ে করেনি। দেখি মাসিমাকে বলে ওস্তাদের ঘরে নেওয়া যায় কি না।’
কানাইর কথা শুনে মেয়েটি আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না, সোজা দৌঁড়। কথায় আছে, ‘লজা নারীর ভূষণ।’ হয়ত লজ্জা পেয়েই মেয়েটি দৌড়ে বাড়ি চলে গেছে। মেয়েটি চলে যাবার পর খালাম্মা বলল, ‘খুব ভালো মেয়ে বাবা, যার ঘরে যাবে, তার ঘর উজ্জ্বল করে তুলবে।’
খালাম্মার কথা শুনে কানাই বলল, ‘খালাম্মা, সরকার বাবু বড় মেয়ে রেখে কি ছোট মেয়ে বিয়ে দিবে?’
খালাম্মা বলল, ‘গরিবের মেয়ে, দিতে পারলেই বাঁচে! না দিয়ে যাবে কই?’

চলবে…

২৯৯জন ২৯৯জন
0 Shares

৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য