বিবাহের স্মৃতিকথা-১

নিতাই বাবু ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার, ০৬:২১:৩৬অপরাহ্ন গল্প ১৭ মন্তব্য

জন্ম-মৃত্যু আর বিয়া, এই তিনটি শর্ত দিয়া। বানাইলো মানুষ আল্লায়, বানাইলো দুনিয়া। এটি আমাদের বাংলাদেশের একটা ছায়াছবির গানের দু’টি কলি। ছায়াছবিটির নাম হয়ত কম-বেশি সবাইর জানা। ছায়াছবির নাম ‘নান্টু ঘটক’, চলচ্চিত্রটির পরিচালক ছিলেন, গাজী মাজহারুল আনোয়ার। এই বঙ্গদেশে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পেয়েছিল, ১৯৮০ সালে। এতে অভিনয় করেছিলেন, আলমগির, সুচরিতা, ওয়াসিম ও অঞ্জনা। ‘নান্টু ঘটক’ ছায়াছবির গানটি এখনও আমার প্রায় সময়ই মনে পড়ে। ‘নান্টু ঘটক’ চলচ্চিত্রটির গানটি মনে পড়লেও, আমি কিন্তু চলচ্চিত্র নিয়ে কিছু লিখছি না। আমি লিখবো আমার জন্মের পর বিবাহ নিয়ে। মৃত্যু নিয়ে লেখা আমার দ্বারা হবে না। আমার মৃত্যু নিয়ে লিখবে হয়ত অন্য কেউ। জীবদ্দশায় আমি শুধু আমার ‘জন্ম ও বিবাহ’ নিয়ে কিছু লিখে গেলাম।

আমার জন্ম নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানাধীন একটা গ্রামে। আমি এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহ করেও ছিলাম, গরিব হয়ে। আমাদের বংশটাই ছিল পরাধীন (দাসত্ব)। আমার দাদা ও বাবা, খুরা, কাকারা ছিল সবাই চাকরিজীবী। আর তখনকার দিনে চাকরিজীবীদের যেই বেতন ছিল, তা দিয়ে সংসার চলতো না। আমার বাবা নারায়ণগঞ্জে একটা কাপড়ের মিলে চাকরি করতো। বেতন পেতো মাত্র ২০ টাকা, যা আমার মায়ের মুখ থেকে শোনা। আমারা ভাই-বোন ছিলাম ৬ জন, বাবা-মা ও আমার ঠাকুরমা-সহ ছিলাম ৯ জন। এই ৯ জন মানুষের ভরণপোষণের পর, আমাদের লেখা-পড়া তো ছিল, মরার ওপর খরা ঘাঁ।

আমার ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ার প্রতি অনেক আগ্রহ ছিল। কিন্তু সে সময়ের অভাবের কারণে আমার আগ্রহ ভেস্তে যায়। লেখাপড়া বেশি একটা করতে না পারলেও, কর্মটা শিখেছিলাম মনের মতন। কর্মটা হলো তাঁতশিল্প টেক্সটাইল মিলে। আমি ১২/১৩ বছর বয়স থেকেই ছিলাম কর্মঠ। আমার যখন ১৫/১৬ বছর বয়স, তখন আমি গিয়েছিলাম মহেশখালী। সেখানে এক লবণের মিলে দৈনিক ১২ টাকা হাজিরায় কাজ করতাম। আমি ১৮ বছর বয়স থেকেই টেক্সটাইল মিলের কাজ করি। মিলের শিক্ষাগুরু ছিল আমার বড়দাদা। প্রথমে শিখি তাঁতের কাজ, তারপরে শিখলাম একই ডিপার্টমেন্টের ভিন্ন কাজ। আমি যেই কাজটা শিখেছিলাম, তা তাঁতের কাজ থেকে একটু পরিশ্রম কম; সম্মান বেশি। তবে হেল্পার ছাড়া কাজটা করা যায় না। কাজ করতে হলে হেল্পার চাই।

১৯৮৫ সালের কথা। তখন আমি কাজ করি নারায়ণগঞ্জ কিল্লাপুল, ফাইন টেক্সটাইল মিলে। মাকে নিয়ে ভাড়া থাকি মিলের পাশে, একটা মহল্লায়। তখনকার সময় বাসা ভাড়া ছিল মাত্র ৩০০ টাকা। আমার চারবোনের বিবাহ হয়েছে বহু আগে, বড়দাদা থাকে আলাদাভাবে। মিলে কাজ করার জন্য হেল্পার ছিল একই মহল্লার এক ছেলে। নাম ছিল, কানাই লাল সাহা। কানাইকে আমি নিজ হাতে টাক্সটাইল মিলের কাজ শিখাই। কানাই আমার সাথে যখন কাজ করতো, তখন কা-না-ই ছিল আমার সঙ্গী ও বন্ধু। যেখানেই যেতাম, যাই করতাম ওকে ছাড়া আমার চলত না; এমন-কি আমার বিবাহ পর্যন্ত।

তাই এলাকার মানুষ বলত, ওরা দুজন জোরা কবুতর। অবিবাহিত জীবনে কানাই আর আমি, রাতে একসাথেই ঘুমাতাম। আমার মা ওকে নিয়ে কোনও সময় রাগ করতো না।
আমার মা বলত, ‘ও-তোর ছোটভাই, ওকে ভালমতো কাজটা শিখিয়ে দিবি।’ মা আরও বলত, “নিমাই, নিতাই আর কানাই, আমার তিন ছেলে।”
মায়ের কথা শুনে আমি হাসতাম আর ভাবতাম, মা আমার ঠিকই বলেছে। রক্তের সম্পর্ক ছাড়াও মানুষ একে অপরের আপনজন হতে পারে। কানাই ছিল আমার আপনের চেয়েও আপন। রক্তের সম্পর্কের চেয়েও ছিল অনেক বেশি। সেই স্মৃতিকথা আজও আমার মনে পড়ে জীবন চলার প্রতিটি মূহুর্তে। মনে পড়ে আমার শুভবিবাহের দিনের কথা।

কিল্লারপুল ‘ফাইন টেক্সটাইল’ মিলস্, তাঁত ছিল মাত্র ২০ টি। তখন এই বঙ্গদেশে পলেস্টার সূতার নতুন আগমন। রেডিও থেকে প্রতিদিন এই পলেস্টার সূতার এডভার্টাইজ করা হতো। সে সময় শহরের আনাচেকানাচে টেক্সটাইল মিলের ছড়াছড়ি। ওইসব মিলে দেশি বিদেশি পাওয়ার লোম (তাঁত) এর অভাব ছিল না। বাঙালিদের অনেকেই বলে, ‘হুজুগে বাঙালি।’
আসলেও তা-ই। কেননা, এই বাঙালি এক-এক সময় এক-এক রকম হুজুগে পড়ে যায়। তখনকার সময়ে এই পলেস্টার সূতার কাপড়ের ছিল অনেক চাহিদা। সূতা ছিল শক্ত ও মজবুত, নিম্ন আয়ের মানুষের কাজে ছিল খুবই প্রিয়। একগজ কাপড় তৈরি করতে খরচ হতো ১০/১২ টাকা। আর সেই কাপড় প্রসেস করে বাজারে বিক্রি হতো ২৫/৩০ টাকা। এ রকম মুনাফার লোভে পড়ে যায় কিছু বিত্তশালী মানুষ। তারা একজনের দেখাদেখি আরেকজন টেক্সটাইল মিল করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এ ভাবেই কোনও একসময় দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরেই ছিল, টেক্সটাইল মিলের ছড়াছড়ি।

এখন যেমন নীট গার্মেন্টস, তখন ছিল কাপড় তৈরির টেক্সটাইল মিল। চাহিদা ছিল তাঁতশিল্পের সাথে জড়িত শ্রমিকদের। আমি ছিলাম, নারায়ণগঞ্জ শহরের তাঁতশিল্পের একজন ড্রয়ারম্যান। তখন আমার এই কাজের খুবই চাহিদা ছিল, ছিল সম্মান। আর কানাই ছিল আমার সাগরেদ। কাজের সুবাদে আমার আদরযত্নেরও কমতি ছিল না। নতুন কোনও টেক্সটাইল মিল হলেই, আমার ডাক পড়তো আগে। আমাকে মিলের সবাই ওস্তাদ বলেই সম্মোধন করতো। কারণ, আমি হলাম নির্ভুলের একজন ড্রয়ারম্যান বা রিচিংম্যান। আমার কাজটা এমন একটা কাজ ছিল যে, ডিজাইনে একটা সূতা ভুল হলে আর চলতো না। সেটা আবার ফের করতে হতো। একটা কাপড়ে মোট সূতে থাকে ৬/৭ হাজার বা তারও কম বেশি। তার মধ্যে একটা সূতা ভুল হলেই, হতো মুশকিল। তাই মিলে-মিলে আমার ছিল খুবই সুনাম। আমি একাই ৪/৫টা মিলে কাজ করতাম। আমার অনপুস্থিতে কানাই সব মিলগুলো দেখাশুনা করতো। কানাইর মতো এমন অনেক সাগরেদ আমার এখনও আছে। তবে এখন আর কেউ টেক্সটাইল মিলে কাজ করে না। একেক জন একেক কাজে জরিয়ে পড়েছে বহু আগেই।

ফাইন টেক্সটাইল মিলে কানাইর মতো একজন সাগরেদ ছিল। ওর বাড়ি ছিল বিক্রমপুরের কোনও এক গ্রামে। নাম কালাম, আমাকে ওস্তাদ ওস্তাদ বলে সম্মোধন করতো। কোনও ঈদ বা ধর্মীয় উৎসব আসলেই, ওদের বাড়িতে যাবার জন্য অনুরোধ করতো। কিন্তু আমার আর ওদের বাড়িতে যাওয়া হয়ে ওঠে না। ১৯৮৫ সালের শেষদিকের কথা, সামনে পবিত্র ঈদ। ঈদের ১৫ দিন বাকি থাকতেই কালাম বলে ওদের বাড়িতে যেতে। তা-মানে যে-তে-ই হবে! না গেলে নয়। আমি ঠিক করলাম, ঈদের বন্ধে কানাই-সহ ওদের বাড়িতে যাবো। কালামকে জানিয়ে দিলাম, ঈদের আগেরদিন কানাইকে নিয়ে ওদের বাড়িতে যাবো। কালাম, শুনে খুব খুশি হয়ে ওদের বাড়িতে চিঠি পাঠায়। কালামের মা-বাবা চিঠি পেয়ে, কী কী করবে তা আগেই ঠিক করে রাখে। কারণ, আমি হলাম কালামের ওস্তাদ, তাই। তখনকার সময়ে সন্তানাদির কাজ শেখানো ওস্তাদকে অনেক মূল্যায়ন করতো। এখন আর আগের মতো সেই মূল্যায়ন নেই, এখন ডিজিটাল যুগ। ছেলেপেলে কাজ শিখবে কাজ করবে, ওস্তাদকে মূল্যায়নের দরকার কী? বেশি তৈলমর্দনের দরকার নাই।

যাই হোক, আমি পবিত্র ঈদের বন্ধ পেলাম ৫ দিন। ঈদের আগেরদিন সকালবেলা মায়ের কাছে বলে রওনা হলাম দুইজনে। মাকে বললাম, ‘একজন সাগরেদের নিমন্ত্রণে বিক্রমপুর যাচ্ছি। সাথে যাচ্ছে কানাই, ফিরবো দুইদিন পরে।’
আমার মা প্রত্যুত্তরে কিছুই বলেননি।
মা শুধু বললেন, ‘যা, তবে দেখেশুনে যাবি।’

তখন আমি বিয়ে করিনি, আমার বয়স তখন আনুমানিক ২২/২৩ বছর হবে। বিয়ে করার খুবই দরকার থাকা স্বত্বেও বিয়ের ব্যাপারে ছিলাম, অমত। কারণ, বিয়ের বয়স হতে না হতেই খেয়েছিলাম ছ্যাঁক, তাই। একবার প্রতিজ্ঞা করেছিম যে, জীবনে আর বিয়েই করবো না। কিন্তু_সংসারে আমার বৃদ্ধ মা, ঠিকমত দুমুঠো ভাত রান্না করতেই তার জীবন শেষ। এর পরও সংসারে থাকে নানারকম কাজ। যা আমার মায়ের জন্য ছিল দুরূহ ব্যাপার। তাই আমার মা সব সময় লোকের কাছে বলতো, ‘আমার ছেলেটা বিয়ে করে না কেন? আমাকে এই সংসার থেকে মুক্তি দেয় না কেন? আমি যে, আর পারি না।’

মানে হলো, আমি বিয়ে করলেই, আমার মা হয়ে যাবেন আজাদি। সংসার ছেড়ে শুধু মন্দিরে-মন্দিরে গিয়ে হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ করবেন। এই হলো আমার মায়ের ইচ্ছা ও শখ। আমার মা বেশি ফুসলাতো আমার সাগরেদ কানাইকে। কানাই আমার কাছে মায়ের আবদারের কথাওগুলো বলতো। কানাই আর আমি দুইজন ছিলাম, সমবয়সী। তবে কানাই আমার থেকে ৩/৪ বছরের ছোট। একসমানে চললে কেউ বলতে পারবে না, কে বড় আর কে ছোট। বিক্রমপুর যাবো নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লা থেকে লঞ্চে চড়ে । কালামদের বাড়ি যেতে সময় লাগবে ৩ ঘন্টার মতো।

বাসা থেকে বেরিয়ে দুইজনে রওয়ানা দিলাম, ফতুল্লা লঞ্চঘাটের উদ্দেশে। চাষাঢ়া থেকে বাসে করে পৌঁছালাম লঞ্চঘাটে। লঞ্চ কখন ঘাটে আসবে তা আর জানা নেই। খবর নিয়ে জানলাম, লঞ্চ ফতুল্লা ঘাটে ভিড়তে একটু সময় লাগবে। লঞ্চ আসার খবরটা জেনে, দু’জনে গেলাম এক মিষ্টির দোকানে। আমি নতুন অতিথি, খালি হাতে যাওয়া কি ঠিক হবে? কিছুতেই না। তাই ফতুল্লা থেকেই দুই কেজি মিষ্টি কিনে নিলাম। লঞ্চ থেকে কোথায় নামবো? কী করবো? সেখানে আবার মিষ্টি পাবো কি না? তাই ঝটপট ফতুল্লা থেকেই মিষ্টি আর কিছু ফলফলারি নিয়ে নিলাম। এমনভাবে যাচ্ছি, কেউ দেখলে মনে-মনে ভাববে শশুরবাড়ি যাচ্ছি। লঞ্চ ঘাটে ভিড়ল, যাত্রী নামল, আমি আর কানাই লঞ্চে ওঠলাম। লঞ্চ চলছে তো চলছে, কাঠপট্রি, বেতকা, আব্দুল্লাহপুর, তালতলা। এরপর সুবচনী, সে ঘাটেই হবে আমাদের নামার পালা।

বর্ষা মৌসুম, চারিদিক পানি থৈথৈ করছে। নদীর জোয়ারের পানিতে কোনও-কোনও জায়গায় ঘরবাড়িও ডুবে গেছে। মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর এমনিতেই নিচু জায়গা। বর্ষা মৌসুমে ওই অঞ্চলের মানুষের নৌকা ছাড়া গতি নাই। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি যেতে হলে চাই নৌকা। চলাফেরা, হাটবাজার সবই নৌকার ওপরে নির্ভর। এদিকে আমাদের আগমনের অপেক্ষায় নৌকা নিয়ে পহর গুনছে কালাম। কখন আমরা ঘাটে পৌঁছাবে, সেই দিকেই ওর নজর। তালতলা ছেড়ে যখন যাচ্ছিলাম, লঞ্চ সুবচনীর ঘাটে ভিড়তেই দেখি কালামকে। কী কাণ্ড! কালাম মনে হয় সকাল থেকেই আমাদের অপেক্ষায় বসে আছে। আমরা লঞ্চ থেকে নামতেই, কালাম সামনে হাজির।

কালাম বলল, ‘এত দেরি কেন ওস্তাদ?’
আমি বললাম, ‘বাসা থেকে দেরি করে রওনা দিয়েছি, তাই দেরি হয়েছে। তা তুমি আমাদের জন্য এখানে কখন থেকে শুনি?’
প্রত্যুত্তরে কালাম বলল, ‘ওস্তাদ, আমি সেই সকাল থেকেই এখানে বসে আছি, আপনাদের অপেক্ষায়। সাথে আমার বড়ভাইও আছে।’
কানাই বলল, ‘এখানে আর কোনও কথা নয়, চল একটা চা-দোকানে যাই।’
আমি কালামকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমাদের বাজারে ভালো চা-দোকান আছে না কি?’
কালাম বলল, ‘ওস্তাদ, চা-তো এখম বাংলার কবিরাজি মহৌষধ। এটা কী আর না থাকে? আসেন আমার সাথে।’
যেতে-যেতে আমি কালামকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার মা-বাবা পান খায় না কি?’
কালাম বলল, ‘ওস্তাদ, গ্রামের মানুষ আমরা। পান হলো আমাদের সামাজিক প্রথা। পান আমাদের গোষ্ঠীর সবাই খায়, কেবল আমিই খাই না।’
আমি কানাইকে কানে-কানে বললাম, ‘একবিড়া পান নিয়ে নে, সাথে জর্দা সুপারিও।’
কানাই বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, আগে চা পান করে নেই, তারপর নিয়ে নিব।’

কালাম আমাদের নিয়ে গেল, একটা চা-দোকানে। তিনজনে বসলাম, তিন কাপ চায়ের অর্ডার দিলাম। বিক্রমপুরের খাঁটি গরুর দুধের চা, বেশ মজা করেই তিনজনে পান করছি। চা-দোকানটাও বেশ সুন্দর, পরিপাটি পয়পরিষ্কার। সামনে নদীর মতো সুবচনী খাল, লঞ্চ ও মালবাহী ট্রলার আর নৌকা চলছে। লঞ্চ ও ট্রলারের শব্দ শোনা যাচ্ছে দোকানে বসেই। চা-দোকানে বসা থাকতে থাকতেই কালামের বড়ভাই দোকানে এসে উপস্থিত। কালাম, তার বড় ভাইয়ের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, ‘এই হলো আমার ওস্তাদ, সাথে ওস্তাদের সাগরেদ কানাইদা। আর এই হলো আমার বড়ভাই, সালাম মিয়া।’

আমি সালাম ভাইয়ের সাথে করমর্দন করলাম, জানলাম তাদের পারিবারিক অবস্থা।
সালাম ভাইকে বললাম, ‘এক কাপ চা-বিস্কুট কিছু খেতে।’
সালাম ভাই বলল, ‘আমি এখন কিছু খাবো না দাদা, চলেন তাড়াতাড়ি করে বাড়ি যাই।’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ দাদা যাবো। আমাদের সামান্য একটা কাজ বাকি আছে, তারপর।’

আমি কানাই কে পাঠিয়ে দিলাম পান-সুপারির জন্য বাজারের ভেতরে। তখন দুপুর পেরিয়ে বিকাল হতে চলছে। বাজারের কেনাকাটা শেষ করে গিয়ে ওঠলাম, ওদের নিজেদের কোষা নৌকায়। নৌকার মাঝি সেজেছে কালাম, সামনে ওর বড়ভাই সালাম। নৌকা চালাচ্ছে কালাম, নৌকার সামনে বৈঠা টানছে সালাম ভাই। নৌকা চলছে হেলেদুলে।

নদীর মতো সুবচনীর খালটা যখন পাড়ি দিচ্ছিল, আমার তখন ভয়ে প্রাণ যায়। আমার ভয়টা টের পেয়েছে আমার বন্ধু কানাই। কানাই আমাকে শক্ত করে ধরে বসল, তবু আমার ভয় যাচ্ছিল না। খাল পাড় হয়ে ফসলি জমির ওপর দিয়ে ছুটলো নৌকা। ভয়টা তখনই সরেছে আমার ভেতর থেকে। বর্ষার স্বচ্ছ পানির ওপর থেকে জমির নিচ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। পানির নিচে কতরকমের উদ্ভিদ ঢেউয়ের সাথে হেলেদুলে নাচছে। নৌকা চলছে, কথাও হচ্ছে, কালামের বড় ভাইয়ের সাথে কানাইর সাথে। আমি নৌকার কার্নিশে বসে পানির সাথে জলকেলি খেলা খেলছি। কখনও আবার ভেসে থাকা জাতীয় ফুল শাপলা টেনে তুলছি। এভাবে নৌকা চলতে-চলতে একসময় কালামদের বাড়ির ঘাটে নৌকা ভিড়ল।

কালাম বলছে, ‘এসে গেছি ওস্তাদ! এটা আমাদের বাড়ি, নামেন নামেন।’
কালামের কথা শুনে ঘাড় উঁচু করে তাকিয়ে দেখি, এ কী কাণ্ড! এখানে এত মানুষ কেন?

আমি কালামকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কালাম, বাড়ির ঘাটে এত মানুষ কেন?’
কালাম বলল, ‘ওস্তাদ, আপনারা নারায়ণগঞ্জের মানুষ, আবার হলেন আমার ওস্তাদ তাই!’
নিজের কাছে একটু শরম-শরম লাগছিল আমার। তবু নির্লজ্জের মতোই নৌকা থেকে নেমে পাড়ে ওঠলাম আমি, সাথে কানাইও। আমার আর কানাই, দুইজনের পড়নে ছিল একই পোশাক। জিন্সের প্যান্ট আর সাধা জামা, কোমরে কালো বেল্ট। আমি আর কানাই সবসময় একসাথেই জামাপ্যান্ট বানাতাম। আমার পছন্দই কানাইর পছন্দ, তা যেই রঙেরই হোক। নৌকা থেকে ওঠার সময় মিষ্টি, ফলফলারিগুলো কালাম নিয়ে নিল। যাচ্ছি সবাই কালামদের বাড়ি। কালামদের ঘরখানা আগে থেকেই পরিপাটি করে রাখা হয়েছিল। ঘরে গিয়ে বসার সাথে সাথে সামনে দিল দুই গ্লাস লেবুযুক্ত চিনির সরবত। সাথে কিছু মিষ্টি ও আলাদাভাবে পানসুপারি। আমি আর কানাই সবই খেলাম, খায়নি শুধু পানসুপারি। তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হবার সময়। কালামদের ঘর থেকে বাইরে আসলাম। সামনেই দেখলাম একটা বিশাল পুকুর।

কালামরা যেই গ্রামে বসবাস করে, সেই গ্রামটির নাম নয়াবাড়ি। গ্রামটি দেখতে সেন্টমার্টিনের একটা দ্বীপের মতো। আয়তনে বেশি একটা বড় না হলেও জনসংখ্যার দিক দিয়ে কম নয়। পুরো গ্রামটির মাঝখানে একটা পুকুর, যা কালামদের বাড়ি ঘেঁসা। পুকুরটি দেখতে একটা দিঘির মতো। পুকুরটি ছিল এক হিন্দু গোসাইর, তার নাম ছিল সত্যগুরু। সত্যগুরুর পরিবারবর্গ তখন এই গ্রামে নেই। তারা সংঘটিত হিন্দু মুসলিম রায়টের সময়ই ভারতে চলে যায়। ফেলে রেখে যায়, তাদের বিশাল বাড়ি ও স্ব-সম্পত্তি। পড়ে থাকা সত্যগুরুর বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে থাকে, এক হিন্দু পরিবার। বিরাটকার পুকুরটিতে একটিমাত্র পাকা ঘাটলা। ঘাটলাটিও অনেক বড়, দেখতেও খুব সুন্দর। দুপাশে মানুষ বসার জন্য চেয়ারের মতো করে বানানো আছে।

প্রতিদিন এই ঘাটলাটিতে বসে নয়াবাড়ি গ্রামের ছোটবড়দের আড্ডা। কালামদের বাড়ি থেকে বাইর হয়ে, গেলাম পুকুর ঘাটে। আমাদের সাথে আছে সালাম ভাই। সালাম ভাই আগে, আমরা তার পেছনে। তখন ঘাটলায় চলছিল গ্রামের মানুষের আড্ডা, তাস খেলা। বর্ষার দিন, কাজকর্ম বেশি একটা নাই, তাই এই আড্ডা। আমাদের দেখেই সবাই তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। সবার মনে হয়ত একটা জিজ্ঞাসা, কে এই দুইজন লোক? দুই-একজন লোক আবার হাতের তাশ রেখে দিয়ে ওঠে দাঁড়াল। সিঁড়ী ঘাটে যাদের দেখতে মুরুব্বির মতো, তাদের নমস্কার জানালাম।

উপস্থিত সবাই তখন খুব খুশি হয়ে কালামের বড় ভাইকে জিজ্ঞেস করল, ‘ওরা কারা? বাড়ি কোথায়? কী করে?’
আরও অনেক কিছুই জানতে চাইল, কালামের বড় ভাইয়ের কাছ থেকে।
কালামের বড়ভাই, মুরুব্বিদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, ‘এরা একজন আমার ছোট ভাইয়ের ওস্তাদ, আরেকজন বন্ধু। কালাম যেই মিলে কাজ করে, সেই মিলের ওস্তাদ। তাদের বাড়ি নারায়ণগঞ্জে, আমাদের বাড়ি এসেছে বেড়াতে।’
কালামের বড় ভাইয়ের কথা শুনে সবাই করমর্দন করলেন। সিঁড়ি ঘাটলায় বসতে দিলেন, আমরা বসলাম।

আমি ঘাটে বসেই সত্যগুরুর বাড়িটির দিকেই বেশি ফলো করছি। কারণ, বাড়িটি দেখতে খুবই সুন্দর তাই। আগের দিনের তৈরি বাড়ি, সাথে তিন চারটা ঘর। আর পাকা সিঁড়ি ঘাটলা-সহ ঠাকুরঘর। আমরা ঘাটে বসা থাকতেই ওই বাড়ি থেকে দুটি মেয়ে আসলো। ওদের দেখে আমার ধারণা হয়েছিল, ওরা দুই বোন।
ধারণা সঠিক কি না, তা যাচাইয়ের জন্য কানাইকে বললাম, ‘কানাই, মেয়ে দুইটি কে? তুই সালাম ভাইয়ের কাছ থেকে একটু জেনে নে।’

কালাম তখন সিঁড়ি ঘাটলায় নেই, কালাম গেছে বাজারে। আমাদের সাথে বসা আছে কালামের বড়ভাই সালামা মিয়া ।

কানাই, সালাম ভাইকে ডেকে নিয়ে গেল একটু আড়ালে। জিজ্ঞেস করল, ‘দাদা, একটু আগে যেই মেয়ে দুইটি ঘাটে আসলো, ওরা কারা?’
এটুকু বলার সাথেই সালাম ভাই বলল, ‘ওহ! ওরা? ওরা এই বাড়িতেই থাকে। ওরা চার বোন, দুই ভাই। এক বোনের বিয়ে হয়েছে, বাকি আছে আরও তিন বোন। কেন জিজ্ঞেস করলেন দাদা? পাত্র আছে না কি? পাত্র থাকলে বলবেন, ওরা খুব ভালো মেয়ে। তবে দাদা গরিব, বিয়ে সাদির ব্যাপারে কিছুই দিতে পারবে না। কেউ যদি দয়া করে আসে, আমরা পাড়াপড়শি ওদের সাহায্য করব। আর কালামের ওস্তাদ কি বিয়ে করেছে? যদি না করে থাকে, তবে আমরাই ওস্তাদকে বিয়ে করাবো।’

কানাই সালাম ভাইয়ের কোনো কথার উত্তর না দিয়ে আমার কাছে এলো।
আমি কানাইকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি-রে কানাই, সালাম ভাই কী বলল?’
আমার কথার উত্তরে কানাই বলল, ‘সালাম দাদা বলল, “তোকে এই গ্রামেই বিয়ে করাবে” বুজলি ।’
আমি বললাম, ‘বলে কী? তো মেয়ে কোথায়? মেয়ে দেখাতে বল, যদি আমার পছন্দ হয় তবে বিয়ে করতেও পারি! আমার মায়ের খুবই কষ্ট হচ্ছে রে কানাই, বিয়েটা তাড়াতাড়িই করতে হবে।’
কানাই আমার কথার জবাবে বলল, ‘কেন রে, মেয়ে তো কয়েকবার দেখেছিস। এবার বল, পছন্দ হয়েছে কিনা?’

আমি কানাইর কথায় অবাক হয়নি, কেন হয় নি? সত্যিই তো, মেয়েতো কয়েকবারই দেখেছি। কিন্তু ভালো করে তো দেখতে পারলাম না, লোকে যদি মন্দ বলে, তাই। আমি ভাবছিলাম একা একা। আর আশায় থাকলাম আবার দেখার জন্য। এরমধ্যেই কালাম বাজার থেকে এসে হাজির হল। কালামকে খুবই ব্যস্ত দেখাচ্ছিল, ব্যস্ত শুধু আমাদের খাবারের জন্য।
‘সে কখন ওস্তাদ এসেছে, বিকাল শেষ হয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল । অথচ এখনও ওস্তাদকে খাবার দিতে পারছি না।’ এটা ছিল কালামের মনের কথা ।

কালাম বাজার থেকে এসেই মায়ের সাথে এ ব্যাপারে রাগারাগিও করেছে। বোনদের সাথে রাগারাগি করে শেষতক এসেছে সিঁড়ি ঘাটলায়।

ঘাটলায় এসেই কালাম আমার হাত ধরে বলল, ‘ওস্তাদ, এখানে আর দেরি না করে বাড়ি চলেন, খাবেন।’
আমি কালামকে বললাম, ‘হ্যাঁ যাবো। তবে তোমাকে এত ব্যস্ত দেখাচ্ছে কেন? তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে?’
কালাম বলল, ‘ওস্তাদ, আজ সুবচনী সাপ্তাহিক বাজার, গিয়েছি বাজারে। বাড়ি এসে মাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমার ওস্তাদ খেয়েছে কি না।?’ মা বললেন, “তোর ওস্তাদ ঠাকুরবাড়ির সিঁড়িঘাটে গিয়ে বসে আছে, সেই কখন থেকে। না আসলে কি খাবার দিতে পারি?” ‘মায়ের কথায় আমার ভীষণ রাগ হয়েছে ওস্তাদ। বাড়িতে কী একটা মানুষও ছিল না, ওস্তাদকে ডেকে আনার জন্য? এখন চলেন বাড়িতে।’

কালামের সাথে আমি আর কানাই চলে এলাম খাবার খেতে। খাবার খেতে বসলাম, অনেক রকম খাবার। কানাই কালামকেও টেনে বসাল, কালামও বসলো। গ্রামের বাহারি রকমের খাবার, সাথে গরুর খাঁটি দুধও আছে। আমি একটু তাড়াতাড়ি করেই খেলাম, উদ্দেশ্য সিঁড়িঘাটে আসার জন্য।

কালামের মা আমাদের খেতে দিয়ে শোনালেন ঠাকুরবাড়ির গল্প, ‘সত্যগুরু জীবিত থাকতে ওই বাড়িতে কোনো চোর চুরি করতে পারে নাই। চুরি করতে গেলেই সারারাত আটকা পড়ে থাকতে হতো। সকালবেলা সত্যগুরু ঘুম থেকে ওঠে চোরকে শাসিয়ে ছাড়ত। আর পুকুরে ছিল এক অলৌকিক কাণ্ড! কারোর বিয়ে সাদি হলে পুকুরপাড়ে এসে থালাবাসনের কথা বললেই হতো। পরদিন ভোরবেলায় সিঁড়িঘাটে থালাবাসন ওঠে থাকত। বিয়ে বা অন্যকোন ধর্মীয় কাজ ছিল মুখ্য বিষয়, এ ছাড়া অন্য কাজের জন্য নয়। কাজ শেষে থালাবাসনগুলো ভালো করে ধুইয়ে আবার পানিতে ছড়ে দিতো। একদিন ঘটলো এক অন্যরকম ঘটনা। বিয়ের কাজ শেষে পুকুরের থালাবাসন থেকে একটা থালা রেখে দেয়। একটি বাদে বাদবাকি থালাবাসন যখন পুকুরে দিচ্ছিল, তখন থালাবাসনগুলো পানিতে ডুবছিলো না। তিনদিন যাবত থালাবাসনগুলো ওইভাবেই পুকুরে ভাসমান অবস্থায় ছিল। তিনদিন পর থালাবাসনগুলো পানিতে ডুবেছে ঠিক, কিন্তু আর কখনো কেউ চেয়ে পায়নি।’ বলছিলেন কালামের মা।

গল্প শুনতে শুনতে বেজে গেল রাত আটটা। তখনো আমার মনটা ছটফট করছে, ঠাকুরবাড়ির সিঁড়িঘাটে আসার জন্য। কালামকে বললাম, ‘চলো একটু ঘুরে আসি সিঁড়ি ঘাটলা থেকে।’
কালাম বলল, ‘হ্যাঁ ওস্তাদ, চলেন।’

এই বলে কালাম হাতে একটা হারিকেন নিয়ে নিল,অন্ধকারে পথ দেখার জন্য। কালামদের বাড়ি থেকে সিঁড়ি ঘাটলা অল্প একটু দূরে। রাত্রিতে ওদের চলতে আলোর প্রয়োজন হয় না, সমস্যা শুধু আমাদের। হারিকেন নিয়ে কালাম আগে, আমরা দুইজন কালামের পিছনে। আসলাম ঠাকুরবাড়ির সিঁড়িঘাটে, বসলাম তিনজনে। তখনো সেখানে অনেক মানুষের আনাগোনা। বর্ষার দিন, চারিদিকে পানি আর পানি, লোকে যাবে কোথায়? তাই গ্রামের অনেকেই ঠাকুরবাড়ির সিঁড়িঘাটকে বেছে নিয়েছে সময় কাটানোর জন্য। অনেক মানুষের মধ্যে ঠাকুরবাড়িতে থাকা মুরুব্বিও আছে। মুরুব্বির সাথে আছে ওনার অবিবাহিত তিন মেয়ে।

 

চলবে…

২৭৪জন ২৭৪জন
0 Shares

১৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য