বিবর্ণতা

আরজু মুক্তা ২৯ মার্চ ২০২১, সোমবার, ০৮:৫০:৪৫অপরাহ্ন অণুগল্প ২৪ মন্তব্য

লেখকরা নির্জন পরিবেশ চায়। গ্রামীণ পরিবেশ কিন্তু নাগরিক সব সুবিধা পাওয়া যাবে। আসিফ সাহেব খুঁজে এমন একটা বাড়িই পেলেন। অবিরাম গাড়ির হর্ণ, কালো ধোঁয়া মুক্ত। পানি নাই, গ্যাস নাই এমন এইসব হাহাকার থেকেও মুক্ত। কিছুদূরের স্টেশন থেকে ট্রেনের শব্দটা একটা ঘোর তৈরি করে। আর কাক ; মাঝে মাঝে চড়ুই এর কিচিরমিচির অথবা দূরের পানে যাওয়ার সময় বকের ডাক —– একটা নিবিড় সংযোগ।

অনেকদিন পর অবকাশ  পেলেন লেখক। ভরপেট খেয়ে একটা ভাত ঘুম দিলেন। তার চোখের পর্দায় কার যে মুখ ভাসছে ! কি সুন্দর হাসি ! ভাবনার আকাশের আড়ালে সে হাসছে।

ডোর বেলটা বাজলো। দিলো ঘুমের বারোটা বাজিয়ে। বিরক্তি নিয়ে আসিফ সাহেব গেলেন দরজা খুলতে।

: কে ?

: আমি।

: আমি কে ?

: লেখক,  আসিফ সাহেব আছেন ?

” আমাকেই তো খুঁজছে। কি মুশকিল !” দরজা না খুলে বললেন, ” আমি ওনার ভাই। উনি তো নাই। ”

কি বলেন ভাইয়া?  আমি যা শুনছি, তা কি ঠিক ?

কি শুনছেন?

লেখক আসিফ সাহেব তো মারা গেছেন।

এই মেয়ের কথা শুনে আসিফ সাহেবের চোখ কপালে উঠলো। দরজা খুলে গালে একটা ঠাস করে চড় বসায় দিতে ইচ্ছা করছে।

“এই মেয়ে কী বলো? ”

সত্যি বলছি। আপনি বের হন। বাইরে দেখেন কতো মানুষ ! সবাই কাঁদছে।

মেয়েটার কথা শুনে আসিফ সাহেব দৌড়ে জানালায় যায়। দূরে চোখ মেলে দেখেন। ” “আশ্চর্য,  আজ একা লাগছে কেনো? ঐগুলো কী হাঁটে ? ” ইস !  কী বিদঘুটে কালো রঙের বিড়াল। ”

জানালার খিল লাগিয়ে এসে দরজা খোলেন, লেখক। ওমা, ফাগুন রাঙা মেয়ে। চুল এক পাশে বেণী করা। চোখ চিকচিক করছে হাসির বারতায়।

: ” এখানে বসো। ”

: জি ধন্যবাদ। আচ্ছা,  আপনি কী জানেন না, আপনার ভাই মারা গেছেন?

: ” না, এইমাত্র শুনলাম। ”

মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বললো ; গতরাতে ” প্রাণে বাজিলো সুর ” বইটা পড়ে অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়েছিলাম। উনি গল্পের নায়িকাকে কখনোই ছোট করেন না। অনেক ছোট ছোট কথামালা দিয়ে ভাব প্রকাশ করেন। তার বই শেষ না করে ওঠা যায় না। আর আমার তো প্রতিদিন তার বই পড়া চাই — ই। মনস্তাত্ত্বিক অনেক কিছু শিখে ফেলি। বাস্ববেও প্রয়োগ করি। এক কথায় তিনি নারীদের অপরাজিতা করে রাখেন। এখন, কী করে সময় কাটবে বলেন ?

“কিন্তু মেয়ে, আমিই সেই লেখক।” আসিফ সাহেব বললেন।

মেয়েটা আকাশ থেকে পড়ে। কীভাবে সম্ভব ? সব পত্রিকার হেডলাইন, ” লেখক আসিফ গতকাল রাতে সড়ক দূর্ঘটনায় মারা গেছেন। আর আপনি,  ভাই হয়ে এতো মস্করা ক্যামনে করেন ?

বাড়ির সামনে জটলা বাড়ছে। ফিসফিসানিও চলছে। লাশ কই ?  এখনও লাশ আসেনি ? নানা কথা বার্তা।

আসিফ সাহেব, দরজা লাগিয়ে ভিতরের রুমে যান। দেখেন, কতোগুলো ছায়া শুধু যাওয়া আসা করছে। অশরীরি। আর গাছ থেকে হলুদ পাতাগুলো নিঃশব্দে ঝরছে। গরম বাতাস , ভারী বাতাস। বিবর্ণ সবকিছু।

 

৩৬৫জন ১জন
0 Shares

২৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য