বিপ্লব আনবাড়ি যায়

নাজমুস সাকিব রহমান ২৬ এপ্রিল ২০২০, রবিবার, ০৯:০০:৩৮অপরাহ্ন বুক রিভিউ ৭ মন্তব্য

বিপ্লব আনবাড়ি যায়—একটা গল্প বইয়ের নাম। বইটা লিখেছেন সৈকত দে। তাকে আমি চিনি। তার এই বইয়ে এক ডজন ডিম আছে। আমি ইতিমধ্যে বেশিরভাগ ডিম ভেজে খেয়ে ফেলেছি; কিন্তু আলস্যের কারণে কিছু লেখা হয়নি। এই বইটা নিয়ে প্রাথমিকভাবে যে কথাটা বলা যায়, তা হল—এটা কন্টেন্টে ভর্তি। গল্পগুলো খুবই আন্তরিক। পুকুর মনে করে টানা সাঁতার কাটা যায় এবং এক পর্যায়ে গিয়ে মনে হয়, পানির ভেতর পরনের লুঙ্গি খুলে গেছে।

হিপোক্রেসি ছেঁকে তুলে আনা বই বিপ্লব আনবাড়ি যায়। এটা একটু উড়ে যাওয়া, একটু ভেসে যাওয়া, একটু খোলামেলা, কিন্তু প্রচণ্ড পরিমাণে ইন্ট্রোভার্ট। যদিও বৈঠকি ঢঙের কারণে তা অনেকের চোখে পড়বে না। … এবার একটা নিম্ন মাধ্যমিক কথা বলব। কথাটা হল, এই বইয়ের লেখককে অনেকে চেনেন। এই চেনাটা বইটার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এর কারণ, পরিচিতদের বইটা পড়তে গিয়ে কিছুটা ব্যক্তিগত লাগতে পারে। চরিত্রদের চেনা মনে হতে পারে। দু একটা গল্পে সৈয়দ শামসুল হকের ‘গল্পপ্রবন্ধ’ এর কথাও বলতে পারেন কেউ কেউ।

যাই হোক, ‘চেনা চেনা লাগে, তবু অচেনা’—এটা আলমগীর কবিরের সূর্যকন্যা সিনেমার গান। আমি এই রোমান্টিক গান বইটার জন্য ক্ষতিকর মনে করছি । একই সঙ্গে এটাও সত্য একজন লেখক তার আশপাশ থেকে নেবেন। জীবন থেকে নেবেন। ডেসটিনি থেকে নেবেন। পরিবেশ বন্ধু গাছ থেকে নেবেন। এটাই লেখালেখির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু কেউ যদি গল্প পড়তে গিয়ে চেহারা খুঁজতে যান, তাহলে গল্প পাঠের আনন্দ নষ্ট হতে পারে। একজন মা যখন তার সন্তানকে ঘুমপাড়ানি গান শোনান—‘খোকা ঘুমাল, পাড়া জুড়াল, বর্গী এল দেশে’; এটা তার সন্তানের জন্য ঘুমপাড়ানি গানই থাকে। বিপথগামী মারাঠা সৈন্যদের লুটতরাজের থিসিস হয়ে উঠে না।

এই বইয়ে আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছে ‘কবি আবদুল্লাহ সোলাইমান সম্পর্কে যা জানি’। বিবিধ কারণে এটা খুবই মজার একটা গল্প। সমসাময়িক এবং প্রাসঙ্গিক। আমি গল্পের শুরুটা উল্লেখ করছি —‘কবি আবদুল্লাহ সোলাইমান সম্পর্কে একটা কিছু লেখার কথা অনেকদিন ধরে ভাবছি। না, এখনো তিনি বহাল তবিয়তেই আছেন। আপনারা হয়তো ভাবছেন, তিনি পটল তোলার পর আমি কবি সোলাইমানের কবিতার প্রভাব শীর্ষক কোনো নিবন্ধ ফেঁদে আঞ্চলিক দৈনিক প্রদত্ত কুল্লে পঁচাত্তর টাকা হাতাবার চেষ্টা করব এবং তার খসড়া হিসেবেই এই রচনা। না, আপনারা নিশ্চিত থাকুন আমি, আপনি ফৌত হয়ে যাবো কিন্তু তিনি থেকে যাবেন অবিনশ্বর, অনন্য, জগতের সকল বেদনার ভার নিজের দুই কাঁধে নিয়ে’।

‘বিপ্লব আনবাড়ি যায়’—এই টাইটেল গল্পের শুরুটা খুবই অস্বস্তিকর। দমবন্ধ অবস্থার সৃষ্টি করে। আমি কয়েকজনকে এই গল্পের প্রশংসা করতে দেখেছি। কিন্তু গল্পটা এক পর্যায়ে ফ্ল্যাশব্যাকে চলে যায়। এতে পাঠক হিসেবে আমি আরামদায়ক জোনে চলে যাই। আমি এই যাওয়াটার প্রতিবাদ জানাই। এছাড়াও বইয়ের ‘বিস্মরণবিরোধী গল্প’ নিয়ে আমার আপত্তি আছে। এটা পড়ে যে প্রশ্নটা মাথায় এসেছে, তা হল, এটা এখানে কি করছে? ছোট গল্পের বই ছেড়ে সে তো নভেলায় ঢুকে যেতে পারতো। কিন্তু এসব নিছক আপত্তিই। শেষ পর্যন্ত কোনো লেখককেই বলা যায় না—এভাবে কেন লিখলেন? তার লেখা, সে তো নিজের ইচ্ছেমতই লিখবে।

আমার ভাল লেগেছে ‘চতুষ্কোণ : ২০১৮’। শুরুর প্যারাটা একটুখানি পড়া যাক—‘এখন হয় যা তার নাম অবসাদ আর বয়স। মাঝ রাতে কাশতে কাশতে বুক ও ঘুম একসাথে ভাঙে। মনে হয়, কেন আমি এবং কোথায়। তার চেয়ে বড়ো কথা, কিসের জন্য। ঘুম ভেঙে গেলে এক গ্লাস জল খাওয়া হয়। সিগারেটের কাছে আযাপন ক্রীতদাসত্ব, এ সেই শেকল ছিঁড়তে হবেই, অথচ মার্ক্সকথিত সর্বহারা, হারাবার কিছুই নেই’।

এতটুকু পড়ে কেউ বুঝতে পারবে না—একটু পর ঈদসংখ্যা নিয়ে চমৎকার একটা হিউমার আসবে। যেখানে কুড়ি বছর পর স্কলাসটিকা স্কুলের এক মেয়ের সঙ্গে নিউ মার্কেটে গল্পের চরিত্রের দেখা হবে। এরপর তার অনুভূতি হবে এরকম—এই ঢাউস ঈদসংখ্যার মত ভদ্রমহিলাকে দেখে কে বলবে আমরা একদিন প্লাসিডের কবরস্থানের পেছনে গিয়েছিলাম …। অনেস্টলি স্পিকিং— বাংলাদেশের ঈদসংখ্যা নিয়ে এরকম প্র্যাকটিকাল জোকস আমি এখন পর্যন্ত পাইনি। সৈকত দে’কে অভিনন্দন।

১২৪জন ৪৩জন
29 Shares

৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য