প্রায় অর্ধযুগের স্ট্রাগলের পর অবশেষে মুক্তির আলো দেখলো মাহমুদ দিদারের ‘বিউটি সার্কাস’। সার্কাস, প্রেম এবং প্রতিশোধের গল্পের ‘বিউটি সার্কাস’ নিয়ে বলার পর একটু ভিন্ন ভাবনা জানাবো আজ।
 
সার্কাসের বিশাল তাবু গেড়ে সার্কাসের নানান কসরতের পাশাপাশি সার্কাস ঘিরে যে দোকানগুলো গড়ে উঠে অর্থাৎ মেলার আবহটা একদম সত্যিকারের লুকআপে ছিল। বিশাল তাবু, শতশত দর্শক এবং গেট আপনাকে নস্টালজিক করতে পারে। অর্থাৎ যারা সার্কাস দেখেছেন বা পরিবারের বড়দের কাছে সার্কাসের গল্প শুনেছেন। সিনেমাতে জমজমাট একটি সার্কাস দলের পাশাপাশি আছে তিন ধরণের প্রেমিক পুরুষের রূপ। একটি কামুক প্রেম, একটি সুবিধাবাদী প্রেম আরেকটা প্লেটোনিক প্রেম। আর আছে ছোট করে ধর্মীয় সন্ত্রাস, বোমা হামলা, ধর্মের নামে হত্যাকান্ড, ৭১ এর চিহ্নিত রাজাকারের জঙ্গী সংগঠন গড়ে তোলা। জঙ্গী সর্দার চরিত্রে গাজী রাকায়াত ডায়লগের পাশাপাশি চোখ দিয়ে খেলেছেন বেশ ভালভাবে। তার আস্তানায় প্রতিষ্ঠিত এক চোখের শয়তান বা ইলুমিনাতি’র চিহ্ন প্রতিকীভাবে ‘সাম্প্রদায়িক মৌলবাদ গোষ্ঠীর’ ধর্মের লেবাসে মূলত শয়তান উপসনার ব্যপারটা চমৎকার ভাবে তুলে ধরেছে।
 
নেগেটিভ চরিত্রের ফেরদৌস সব সময়ই দূর্দান্ত। তৌকির আহমেদকে নিয়ে নতুন করে বলার কিছু থাকে না। তবে হ্যা, কথ্য ভাষা এবং এংরিম্যান লুকে এবিএম সুমন আলাদাভাবে নজর কেড়েছে। সুমনকে দেখলে যে ইমেজটা যে কারো চোখে ভেসে আসে, তার শত সহস্র ভাগ ব্যাতিক্রমভাবে পর্দায় হাজির হয়েছে সুমন। পর্দার নিজের উপস্থিতিকে সফল করেছেন এত দূর্দান্ত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ভিড়েও। অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী চরিত্রে শতাব্দী ওয়াদুদের একটা ডায়লগ: “আমার কোন ধর্ম নাই। টাকাই আমার ধর্ম।” যা বর্তমান সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ধর্ম বাণিজ্যকে সামনে আনে। সিনেমাটিতে অভিনয় করেছে আমার বন্ধুবর হুমায়ুন সাধু। মৃত্যুর আগে এটাই বোধহয় তার শেষ কাজ ছিল। সাধু, সাধুর মতোই জমিয়ে রেখেছিল। সর্বশেষ জয়া আহসান। বহুবছর পর ধীর গতি এবং সামান্য মুখ খুলে বহু কষ্টে ডায়লগ দেয়ার বাইরে এবার পাওয়ার সেল জয়াকে দেখা গেল। জয়ার বাইরে আর কাউকেই ভাবা যায় না এই চরিত্রে।
 
সিনেমার ক্যামেরা কাজ, সম্পাদনা, মিউজিক, কস্টিউম, লোকেশন ইত্যাদি সবকিছুই মান ধরে রেখেছে। গল্পের তিন প্রেমিক পুরুষের তিন রকম সমাপনীটাও ভিন্নতা দেখিয়েছে। হত্যা, প্রেম, প্রতিশোধ তিনটি বিষয় কোনটাই কোনটার সাথে সম্পর্কিত ছিল না। এটাও গল্পের বৈচিত্রতা রেখেছে। যদিও প্রতিশোধের অংশটা চমৎকার নির্মাণ হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। এটাকে ফ্যান্টাসী হিসেবেই বিবেচনায় নিচ্ছি। তবে দৃশ্যায়ন চমৎকার। এই দেশের সাম্প্রদায়িক অপশক্তি এত সহজে দমানো যাবে না, যদি না মানুষ জাগ্রত না হয়। সিনেমার শেষ দৃশ্যে ধ্বংসপ্রাপ্ত খালি মাঠে শত মানুষের ভিড়ে রিং-এ দুলতে দুলতে সংলাপ দেয়া জয়া যেন আগুনে পুড়ে আবার জেগে উঠা ফিনিক্স পাখি। যে স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ।
 
সিনেমাটি দেখতে পারেন। স্ক্রীনে বড় ক্যানভাস, বড় আয়োজনের সিনেমা এই দেশে সচরাচর হয় না। সিনেমাটি খারাপ লাগবে না। তবে হ্যা, চটুল গল্প আর হৈ হৈ গান চাইলে সিনেমাটি আপনার জন্য নয়।
 

এবার ভিন্ন কথা।

একদমই আমার মতো করে গল্প সাজাচ্ছি শুরু থেকে শেষটুকু নিয়ে।
 
মাহমুদ দিদার তখন টিভি নাটকের খুব নামী পরিচালক। বেশ উচ্চমূল্যে তার নাটক বিক্রি হয়। স্পন্সররাও তার নাটকের অপেক্ষা করতো। তার গল্প এবং নির্মাণ সবাইকে মুগ্ধ করছিলো। সে সময় তিনি সরকারী অনুদানে সিনেমাটির কাজ শুরু করেন। এত বড় আয়োজনের সিনেমা স্বাভাবিকভাবেই ব্যয়বহুল। কিন্তু অত টাকা আসবে কোথা থেকে! অনুদান, নিজের সঞ্চয় আর এর বাইরে ভরসার জায়গা এতদিনের অর্জিত সুনাম। কিন্তু না! এবার তিনি দেখলেন কর্পোরেট নগ্নতা। সিনেমাটির স্পন্সরে কেউ এগিয়ে আসে নি। অনেক দরজা থেকে খালি হাতে ফিরে দীর্ঘ হতাশায় নিমজ্জিত দিদারকে সহযোগীতা করতে এগিয়ে আসে দারাজ। তাদের সহযোগীতায় সিনেমার কাজ আরেকটু এগিয়ে যায়। কিন্তু তাতেও সিনেমা শেষ হবে না। আরো টাকা দরকার। ঠিক সে সময় গ্রামীণ ব্যাংকের মতো ঘটি-বাটি-চটি সব গ্রাস করতে এগিয়ে আসে চ্যানেল আই। চ্যানেল আই হচ্ছে সেই প্রতিষ্ঠান যারা বসে থাকে কারো সিনেমা আটকে যাবার আশায়। হতাশাগ্রস্থ নির্মাতা সব সময়ই তাদের কাছে প্রিয়। তারপর চা-বিস্কুটের দামে সিনেমার নাড়ি-ভুড়ি সব কিনে নেয়। এখানেও তাই হলো। তারপর একদিন কোনমতে সিনেমাটি শেষ হয়।
 
সিনেমার পোষ্টারে বেশ কিছু লোগো আছে। যারা চ্যানেল আই কিনে নেয়ার পর যুক্ত হয়েছে। অথচ সিনেমাটির মার্কেটিং-প্রমোশন কোন কিছুতেই চ্যানেল আই যুক্ত হয় নি। অথচ এটা চরমভাবে সত্য যে, সিনেমাটি প্রথম দফায় কিংবা করোনা সংকট না এলে ২য় প্রচেষ্টায় মুক্তি পেলে শুধুমাত্র মাহমুদ দিদারকে দেখেই অন্তত নাটক পাড়ার সংশ্লিষ্টরা ঝাঁপিয়ে পড়তো। তবে এটাও সত্য যে, তখন আর এতগুলো লোগো পোষ্টারে থাকতো না। কারণ বাংলাদেশের কর্পোরেটওলারা গোপনে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সাথে অনেকাংশেই সহমতে জড়িত। তাদের দেশ, সংস্কৃতি, সভ্যতা, কৃষ্টি, ইতিহাস এসবের প্রতি নূন্যতম দায়বোধেও নাই। যতটুকু আছে, সেটাও শুধুমাত্র বিশেষ দিবসে বাণিজ্যিক প্রচারণা জন্য। অথচ এই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের একটা বিজ্ঞাপনের ছোট একটু অংশ দিলেও সিনেমাটা মাথা উঁচু করে জ্বলজ্বল করতো।
 
ফলে সম্ভাবনাময় একটা চলচ্চিত্রের মৃত্যু হলো সকলের সম্মিলিত অংশগ্রহণে। সকলে বলতে মাহমুদ দিদারের কর্মক্ষেত্রের লোকজন, কর্পোরেট দুনিয়া এবং দর্শককেই বোঝালাম। অর্থাৎ আমি আপনি সবাই মিলে একটি সিনেমাকে হত্যা করলাম।
 
টিকিট কেটে হলে বসে সিনেমা দেখুন।
জয় হোক বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের।
২২৮জন ৯৭জন
0 Shares

২টি মন্তব্য

  • মোঃ মজিবর রহমান

    আপনি আমার মতে একমত হবেন না এটা নিশ্চিত, তবুও বলতে হই। তাই বলছি, আজ মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধা বলে চিৎকার করে লাভ নাই কারণ এখন পরিষ্কার আওয়ামিলিগই এই শব্দটা গলা টিপে হত্যা করেছে। আর্থিক সুবিধা দিয়ে ভাতা দিয়েই দায় শোধ হইনা। অনেক বিষয় আছে সেটা দেখা অনেক অপরিহার্য। অনেক মুক্তিযোদ্ধা হত্যা হলো এই সরকার ক্ষমতায় থাকতে বিচার করেনি। মুক্তিযুদ্ধের কোন আদর্শ বজায় আছে? দুর্নিতি,ঘুষ বাণিজ্য, বিদেশে অর্থপাচার কোনটা হইনি। এখন ডিজিটাল যুগে সবাই বুঝছে, দেখছে ও সর্বপরি শুনছে। সুতরাং ফাউ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লোক দেখানো ভালোবাসা কেউ মানতে চাচ্ছেনা। জামাত ইসলাম জামাত ইসলাম দোহায় দিয়ে লাভ নাই কারণ জামাত ইসলাম ও এখন আওয়ামিলিগের অন্দরমহলে। প্রকৃত অনেক আওয়ামিলিগ নেতা অসহায়, নিলজ্জের মত অথর্ব হয়ে চুপছে গেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ডায়ালগ ভাও সবার বায়োডাটা তার হাতেই সংরক্ষিত বাট কেউ শাস্তিও পাইনা বরঞ্চ পুরুশকার পাই। ওয়াশা এম ডির এতো জঘন্য কাজের পিরও আমেরিকায় বসে দেশের রাজধানীর জনগণের বিশাল দায়িত্ব নিয়ে ছেলেখেলা করছে। এই বায়ীডাটান? নিতি আদর্শ দিয়ে কাউকে পরাজিত করতে না পারলে বাহুবল দিয়ে ধ্বংশ করা যেতে পারে কিন্তু বাস্তবিকই পরাজিত করা যাই কি? আপনি যতই প্রচার করুন জামাত বিরোধী কাজ একাত্তরের কিন্তু আপনার বর্তমানের দেশ বিরোধী কাজ সেটাকে ওভারটেক করতে পারবে কি? একাত্তর আর একাত্তর বলে চিৎকার করে লাভ নাই যেমন বি এন পি অনেক প্রচার করেছে আওয়ামিলিগ ক্ষমতা গেলে মসজিদে উলুধ্বনি শুরু হবে কেউ বিশ্বাস করেনা। ঠিক আওয়ামিলিগ এখন হাজার হাজার গণসমাবেশ করে বললেও সাধারণ জনতা জামাতের বর্তমান কর্মকান্ড আর একাত্তর খাইনা।
    হ্যা পরিচালক অভিনেতা অভিনেত্রী পোক্ত ভালো অভিনয়ন হবেই।
    এটা আমার ব্যক্তিগত উপলদ্ধি।

    • তির্থক আহসান রুবেল

      আপনি যা বলেছেন, তা অপ্রিয় সত্য। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, সাংস্কৃতিক বলয় এবং কার্যক্রম দিয়ে সারা দেশে সুস্থ বিনোদনের প্রচার এবং প্রসার করা না গেলে অনিয়ম, দূর্নীতি, মৌলবাদ ইত্যাদি কোন অসভ্য কার্যক্রমের লাগাম-ই টেনে ধরা যাবে না। রাজনীতিকরা তাদের স্বার্থে নানা কথা বলবে, কিন্তু আমজনতা নির্ধারণ করবে সুস্থ্যতা। যার খুব বেশী অভাব বর্তমানে। জামাই ঘুষ না খেলে বউ রাগ করে। বাপের দুনম্বরী কামাই না থাকলে সন্তান বাবাকে অস্বীকার করে, বাবাকে নিয়ে ঘৃণা প্রকাশ করে।

      আমি সিনেমাটির প্রেক্ষাপট এবং ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো লিখেছি। যেখানে শুধুমাত্র কর্পোরেট এবং সামাজিক অপ-রাজনীতির অংশটুকু তুলে ধরেছি।

      ধন্যবাদ

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ