বালিশ ও কৃষি কথন

মনির হোসেন মমি ১৯ মে ২০১৯, রবিবার, ১০:০৮:২২অপরাহ্ন সমসাময়িক ২৩ মন্তব্য

কথা ছিলো স্বাধীন বাংলাদেশ হবে সবার। সব দিক দিয়ে সবার থাকবে সমান অধিকার। কিন্তু হচ্ছেটা কি! কৃষক স্ব-ইচ্ছায় নিজ কলিজা কৃষি জমির পাকা ধানে দিচ্ছে আগুন। কিন্তু কেন? যেখানে সরকারের লক্ষ্য  খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্ন বাংলাদেশ গড়ার, সেখানে কৃষক ও কৃষি খাতকে অবমূল্যায়ন করে আদৌ তা কি সম্ভব?। জাপান সহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে কৃষি কাজকে, কৃষকের ফসলাদির মূল্য দিয়ে থাকেন চড়াদামে যা আমদানী করে আনা খাদ্য দামের চেয়ে কয়েকগুণ বেশী। তারা কেন এমনটি করেন আর আমরা কেন ই বা কৃষককের পেটে লাথি মারি? তার অন্যতম কারণ হল জাপানীদের মতে-যদি কখনো দেশে যুদ্ধ লেগে যায় তখন জীবন ও জীবিকার জন্য খাদ্যের প্রয়োজন পড়বে তখন খাদ্য আমদানিতে হয়তো বাঁধার সম্মুখীন পড়তে পারেন সেই কারণে কৃষককে বাচিয়ে রাখতে, খাদ্যের মজুত রাখতে তাদের এমন কৌশল অবলম্বন করা।

বঙ্গবন্ধুর ভাষনে স্পষ্ট আছে,”এ দেশের কৃষক বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে।” তাঁর কথায় দেশ পরিচালনায় বিচক্ষণতার পরিচয় পাওয়া গেলেও তাঁর কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের মাঝে এমন কোন ধারণা আছে কিনা আমার জানা নেই। থাকলে আজ কৃষকরা ধান চাষের যথাযথ মূল্য পেতেন। ভাবা যায় কৃষকের ঘাম ঝরা দুইমন ধানের দামে একটি ইলিশঁও কেনা যায় না অথবা কিনতে হয়!

যতটুকু জানা যায় এ সব দাম উঠা নামার পিছনে সিন্ডিকেট বড় বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে যা প্রতিবারই এমনটি ঘটতে চলছে। আমার প্রশ্ন হল এই সিন্ডিকেট কারা?  কিছু অসাধু ব্যাবসায়ী সরকারের নির্ধারিত মূল্যের কম মূল্য দিয়ে কৃষকদের পেটে লাথি মেরে নিজেদের মোটা পেট আরো মোটা করতে ব্যাস্ত। এদের হাত হতে কৃষকদের রক্ষা করতে না পারলে দেশে অচিরেই কৃষক শূন্য হয়ে পড়বে এটা নিশ্চিত। কতটা কষ্ট পেলে নিজের পেটের আহারে আগুন দেয় তা অনুমেয়।

সরকারে মুখে কেবল উন্নয়ণের কথা। তিন বারের মেয়াদী সরকার এ দেশে নজিরবিহীন । তিন বারে ১৫ বছর যাবৎ সরকারের উন্নয়ন চোখে পড়ার মতন কেবলি রাস্তাঘাটে। প্রশাসনিক, বিচার ব্যাবস্থা,খাদ্য, বস্ত্রে উন্নয়ণের ধীর গতি। নেই নিশ্চয়তা নরপশুদের হাত হতে শিশু বৃদ্ধের সম্ভ্রমের। অথচ এইতো সে দিন এক নিউজে দেখলাম-রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বালিশের কত রঙ্ খেলা।

সংক্ষিপ্ত ভাবে কিছুটা তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

রূপপুরে তৈরী হচ্ছে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র যা ১৯৬১ নির্মাণের প্রথম উদ্দ্যোগ নেয়া হয় যেখানে ২০০ মেঘাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। এটি পরবর্তী ১৯৬৯/৭০ সালে পাকি সরকার বাতিল করে দেয়। এরপর ১৯৭২-৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু এটিকে পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণের উদ্দ্যোগ গ্রহন করেন পাবনা জেলার ঈশ্বরদী থানার পদ্মা নদী তীরবর্তী রূপপুর স্থান। এটি আবারো এ সরকার নির্মাণের টেন্ডার গ্রহণ করেন যা  ২৬০ একর জমি এবং আবাসিক এলাকার জন্য ৩২ একর জমিও নেয়া হয় এবং ভূমি উন্নয়ন, অফিস, রেষ্ট হাউজ, বৈদ্যুতিক সাব-ষ্টেশন ও কিছু আবাসিক ইউনিটের নির্মাণ কাজও এতে  অন্তর্ভুক্ত আছে। এই সব অফিস ও রেষ্ট হাউসের জন্য যে সব আসবাসপত্রে ক্রয়ে দরপত্র গ্রহন করা হয়, তাতে যে দাম উঠে তার টাকার পরিমান এতো বেশী যে তা যে কোন বিবেকবান মানুষদের ভাবাবে।

এখন এ সব আসবাবপত্রের মধ্যে বাশিলের দাম নিয়ে অনলাইন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বেশ আলোচনার ঝড় উঠেছে, আর উঠবেই না কেন! একটি বালিশের দাম যদি ৫৯৫৭ টাকা হয় তাহলে ভাবনার কথা আবার তা রাস্তা থেকে ভবনের মধ্যে নেয়ার খরচ দেখানো হয়েছে প্রতিটি ৭৬০ টাক। এরকম অস্বাভাবিক দর কেবল বালিশের ক্ষেত্রেই নয় প্রজেক্টটির আরো আসবাবপত্রের ক্ষেত্রেও একই সামঞ্জস্যহীনতা দেখা যায়।

শুধু তাই নয় প্রকল্পের কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ভাতাও অস্বাভাবিক লক্ষ্য করা যায়। প্রকল্প-পরিচালকের বেতন ও ভাতা সহ ৬,৯৬,০০০ টাকা, একজন সচিবের বেতনের নয়গুণ। প্রকল্পের গাড়ি চালকের বেতন ৭৩ হাজার ৭০৮ টাকা, যা একজন সচিবের বেতনের কাছা কাছি। রাঁধুনি আর মালির বেতন ৬৩ হাজার ৭০৮ টাকা। প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক ৫ লাখ ৪৩ হাজার এবং প্রকল্পের কর্মকর্তা পর্যায়ে সবচেয়ে নীচে বেতন ধরা হয়েছে এক লাখ তিন হাজার টাকা। কর্ম কর্তাদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তারা প্রতি মাসে এ অনুপাতিক হারে বেতন পাবেন। এর বাইরে তিনি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব থেকে অতিরিক্ত ৪৫ হাজার টাকা বেতন পাবেন। অর্থাৎ তার মোট বেতনের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ১ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। এতে তার বেতন রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী এমন কি রাষ্ট্রপতির চেয়েও অনেক বেশি পড়বে।

আরেকটি বিষয়ে লক্ষণীয় হল এ প্রকল্পের  ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৪ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ওঠার কথা রয়েছে। যদি তা অনুমোদিত হয়ে যায় তবে  ব্যয়ের দিক দিয়ে এটিই হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রকল্প, যা কিনা পদ্মাসেতু প্রকল্পের প্রায় চার গুণ।

এর বিনিময়ে আমাদের বিদ্যুৎ এর পরিমান বাড়লেও কতটুকু উন্নয়ণের সফলতা আসবে তা সময়ের ব্যাপার। কারণ দেশে বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরনে যে চুরি তা আমাদের নিঃসন্দেহে ভাবিয়ে তুলে। এর পর এমন সব বড় বড় প্রকল্পগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়ণে কতটুকু সাফল্য আসবে তা সময় সাপেক্ষ।

অভিজ্ঞদের ভাষ্যমতে এ প্রকল্পের এ অস্বাভাবিক দামের পার্থক্য দেখেন টেন্ডারের কৌশলতা। দেশ উন্নয়ণে এ সব প্রয়োজনীতা আছে যেমন তেমনি থাকা চাই এ সব প্রকল্প ব্যায় নির্ধারনের বিচক্ষণতা।

অন্য দিকে দেশে বিদ্যুতের যেমন ঘাটতি পূরণের সরকরের লক্ষ্য সুনিদিষ্ট তেমনি খাদ্যেও চাই জিরো পারসেন্ট  টলারেন্সের নিশ্চয়তা। বিদ্যুৎ যে জীবনকে আলো দিবে সেই জীবন যদি না বাঁচে, তাহলে শুধু আলো দিয়ে দেশ আলোকিত হবে না। দেশে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৭৫ ভাগ মানুষ এখনো গ্রামে বসবাস করে৷ গ্রামে যাঁরা বসবাস করেন, তাঁদের মধ্যে প্রায় ৬০ ভাগ মানুষ এখনো কৃষি খামার বা চাষাবাদে যুক্ত রয়েছেন৷ আবার শহরেও শতকার প্রায় ১১ ভাগ মানুষ সরাসরি কৃষি  কাজের সাথে পরোক্ষভাবে যুক্ত আছেন৷অথাৎ দেশের জিডিপিতে এখন কৃষিখাতের অবদান শতকরা প্রায় ১৫.৩৩ ভাগ৷ এছাড়া এই কৃষিখাতে কর্ম সংস্থান হয় ৪৮.১০ ভাগ কর্মজীবী মানুষ৷

কৃষিখাতে এই যে অবদান তার সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করতে না পারলে দেশ কখনো এগুতে পারবে না। রূপপুরের মতন আরো অসংখ্য প্রকল্পের দূর্নীতি আর লুটপাটে ব্যাস্ত সরকারী লোকজন সেখানে কৃষি নির্ভর আমাদের এ দেশে কৃষকদের প্রতি এমন অবহেলা দেশ উন্নয়ণে কখনো সফলতা বয়ে আনবে না। আমরা আশা করব সরকারী উন্নয়ণের সকল প্রকল্পের দুর্নীতি বন্ধ করে কৃষিখাতের দিকে নজর দিয়ে কৃষিবান্ধব সরকার হবেন।
—————————————–

তথ্যও ছবি ও লিংক কৃতজ্ঞতায়:
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প
বাংলাদেশ টু-ডে
ডয়েচভেলে
অন্যান্য অনলাইন মিডিয়া

১০১৯জন ৮৫৭জন
20 Shares

২৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ