বালিকা বধু

রোকসানা খন্দকার রুকু ২৮ জুন ২০২১, সোমবার, ১০:৫৪:২৮পূর্বাহ্ন গল্প ২০ মন্তব্য

বিয়ে হলো দিল্লিকা লাড্ডু জো ভি খায়েগা ও পস্তায়েগা অর জো ভি না খায়েগা ও ভি পস্তায়েগা। পেত্নীর সাথে ব্রেকআপ হবার পর ভেবেছিলাম আর বিয়েই করবো না। বাধ্য হলাম সবার চাপাচাপিতে। কাউকে নতুন করে ভালোলাগানোটা একটু কষ্টসাধ্য তাই মেয়ে দেখতে গেলাম না। যা থাকে কপালে!

বিয়ের কোন আমেজ নেই, তাই বেশ রাতে রুমে ঢুকলাম। ও মাই গড! সমবয়সী পেত্নী হলে তো এতক্ষনে গলা টিপে ধরতো। তার বদলে কান্নারত এক বালিকাকে পেলাম যে কিনা আমি দেরী করায় বসে কাঁদছে। নিজেকে আবারও খুব খারাপ ও অবিবেচক বলে মনে হলো। কি করি, চোখ মুছিয়ে দিতেই বালিকা আদুরে গলায় বললো, ‘আমার ভীষন ক্ষিদে ও ঘুম পেয়েছে।’

এতরাতে কি পাই! সামান্য বিস্কিট আর আমার খাবার জন্য যে দুধটা ছিলো তাই দিলাম।ঢকঢক করে খেয়ে খুশি হয়ে বালিকা ঘুমিয়ে পড়লো। বুঝলাম, এতোক্ষণ তাহলে ক্ষিদের জ্বালায় কাঁদছিলো।

পরিপূর্ণ এক পুরুষের জন্য নিদেন এক বালিকা, কি করে সম্ভব! প্রথম পূর্ণ চোখে তাকালাম তার দিকে। বয়সের চেয়ে একটু বেশিই লম্বা আর অতি সুন্দরী। অবোধ বালিকার আলোতে পুরো ঘর যেন জোসনামাখা।জোসনামাখা অতি সুন্দরীদের জীবন আলো ছড়ানোর আগে অঙ্কুরেই শেষ হয়, যা দুখখজনক।

ছেলের বয়স নয়, ক্যারিয়ার আসল। সরকারী কর্মকর্তা মানে জামাই হিসেবেও প্রথম শ্রেণী। সেখানে আমার মতো কালো, খটাস, বদরাগী একটা লোকও কোন ব্যাপার না। এই মেয়ের কপালে কি আছে কে জানে?

সংসার শুরুর কদিন শাশুরী সাথে ছিলেন। বেশ যত্ন করে মেয়ের ঘরদোর গুছিয়ে দিলেন। সরকারী বাসা, মানুষ আমরা দুজন। বয়স্ক কাজের দাদী মাঝে মাঝেই আসেন না, অসুস্থ থাকেন। শাশুড়ী যাবার সময় মেয়েকে জড়িয়ে খুব কাঁদলেন। আমাকে বললেন, বাবা মেয়েটা বাচ্চা, দেখে রেখ। আহা! কি দরদ!

অধিকাংশ সময়ই আমার অফিসের কাজের চাপে ফিরতে দেরী হয়। জানিনা কি হবে? বালিকা সারাসময় একা একা কি করবে? একটা উটকো যন্ত্রনা মাথায় নিয়ে চলতে হবে।

আমার একা একা সব কাজই করার অভ্যাস। বালিকা ঘুমে থাকতেই আমি ড্রাইভার দিয়ে নাস্তা আনিয়ে তার জন্য টেবিলে রেখে যাই। সে উঠে ফোন দেয়, বাবু আমার নাস্তা কোথায় রেখেছেন? আমি কোন এ্যাঙ্গেলে তার বাবু লাগি এটা তো বুঝলাম না। আবার আপনিও বলে। খেতে বসে নানা অভিযোগও থাকে। পরোটা ঠান্ডা হয়ে গেছে, অতি শক্ত, কি দিয়ে খাবে, প্রতিদিন একই জিনিস খেতে ভালো লাগে না এসব।

তথ্য অফিসের যে কোন জরুরী অবস্থাতেও আমাকে তার ফোন ধরতে হয়। প্রথম দিকে উঠে যেতাম এখন আর উঠি না। মিটিং চলুক, যাই চলুক তাকে ঠিকঠাক ডিরেকশান দেই। ওভেনে কিভাবে পরোটা, তরকারী গরম করে নেবে এসব। অফিসের সবাই মুখ টিপে হাসে।

-আমাদের বহু জ্বালিয়েছ বাছা এবার বোঝ বালিকা বধুর ঠেলা। এসময় পেত্নীটাকে ভীষন মিস করতে থাকি। কতো জ্বালিয়েছি তাকে।

সেদিনও মিটিং এ ফোন। বাবু, আলুভর্তায় হলুদ দিতে হয়? সবার সামনে কি বলি, দাঁত চিবিয়ে বললাম হ্যাঁ দিতে হয় তবে পরিমানে কম।

আজ বালিকা রান্না করেছে তাই বিকেল থেকে ফোন দিয়ে বাসায় ডাকছে। মনে হলো সে ভীষন এক্সাইটেড। আমাকে একদম উঠতেও দিচ্ছে না। রাজ্যজয়ের মতো খেতে দিলো হলুদ আলুভর্তা আর ডিমভাজি দিয়ে। ভর্তায় এতো ঝাল জীবন যায় যায়, মরিচ বোধহয় আর ছিলো না।

খাবারের ব্যাপারে কম্প্রোমাইজ করার মানুষ অন্তত: আমি না তাই প্রচন্ড রেগে গেলাম। মনের সব ক্ষোভ ঝেডে তাকে বকাঝকা করলাম। শুরু করে দিলো কান্না। তার কান্না শুরু হলে আর থামেনা। তখন তার সাথে আমার আহ্লাদী করতেও ইচ্ছে হয় না। কি করি! তাকে থামাতে বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে খেতে ডাকছি কিন্তু সে চোখ- মুখ ফুলিয়ে একাকার করে বসে আছে। কিছুতেই খেতে আসবে না, একনাগারে কেঁদেই চলেছে। আল্লাহ কি বিপদ দিলে?

অফিসে যাবার আগে শার্ট খুঁজ পাচ্ছিলাম না। গেল কৈ? একটা শার্টও নাই, অগত্য কালকেরটাই পরতে হবে। বালিকা হাসিমুখে আমার শার্ট নিয়ে হাজির। সব জমা হয়ে ছিলো তাই বের করে ধুয়ে রেখেছে। ভাবলাম ম্যাচিউরিটি এসেছে এবার বোধহয় বৌ ডাকা যাবে।খুশিমনে শার্ট খুলে আমি প্রায় অজ্ঞান হবার অবস্থা।

এককালার সব শার্টেই বিভিন্ন রঙ। ওয়াশিং মেশিনে লাল, নীল, হলুদ, সবুজসহ রঙ ওঠে এমন সব কাপড় একসাথেই দিয়েছিলো তার ফলেই এই হাল। রাগে মুখে ফেনা উঠে গেলো। বালিকা এক দৌড়ে পাশের রুমের দরজা লাগিয়ে দিলো।

রাতে বাসায় ফিরে সাড়া শব্দ নেই, বুকের ভেতর ছ্যাত করে উঠলো। চিরকুট পরে আছে- আপনার সব শার্ট নষ্ট করার জন্য আমি দুখ্খিত। মাকে বলেছি আমার মাটির ব্যাংকটা পাঠিয়ে দিতে। আমি ওটাতে যে টাকা জমিয়েছি তা দিয়ে আপনার শার্ট কিনে দিবো। না হেসে পারলাম না, সংসার করার কি আপ্রাণ প্রয়াস!

বালিকার ব্যাংক ভেঙ্গে ৯৭৫ টাকা পাওয়া গেছে। তার ভীষন মন খারাপ, সাথে গুরুতর সন্দেহ নিশ্চয়ই ব্যাংকের মুখ ঘসে ছোট ভাই টাকা বের করে নিয়েছে। ওকে ছাড়বে না, হাঁটছে; পায়চারী করছে। বালিকার রাগ থামাতে বললাম চলো বাইরে বেডিয়ে আসি। আর তোমাকে সংসার করতে হবে না। বয়স হলে এমনিই সব শিখে যাবে। তুমি পড়াশুনা করবে তারপর আমার মতো অবস্খান যেদিন তৈরি করবে। সেদিন তোমার বেতনের সব টাকায় আমি শার্ট কিনবো, ওকে।

লাইব্রেরি থেকে বালিকার জন্য প্রয়োজনীয় সকল বই- খাতাপত্র কিনে নিলাম। তার টুকটাক কেনাকাটা সেরে রিকশায় ফিরছি। রিক্সায় বসে বালিকা হাত নেডে নেডে, কলকলিয়ে গল্প বলেই চলেছে। আমার প্রতি তার ভয় কাটতে শুরু করেছে বোধহয়!

আকাশে ভরা পূর্নিমা।চাঁদের সমস্ত আলো যেন বালিকার শরীরে চিকচিক করে ধরা দিয়েছে। আমার মাথা পুরুষালী চেতনায় ঝিমঝিমিয়ে উঠলো। আলতো কাছে টেনে আমি তার ঠোঁটে হারিয়ে গেলাম। আর সেও প্রথম আমাকে জড়িয়ে ধরলো।

(আমার এক প্রিয় মানুষ বালিকা ঝামেলায় বিপদে, তাঁর অনুরোধেই লিখতে চেষ্টা করলাম। করোনায় যতো বালিকা বউ হয়েছে সবার জন্য শুভকামনা)

ছবি- নেট থেকে

৩২১জন ১৮৫জন
0 Shares

২০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য