বারমুডায় বক্সী – ৪

নবকুমার দাস ১১ জুলাই ২০২১, রবিবার, ১১:২২:১১অপরাহ্ন উপন্যাস ৪ মন্তব্য
[ আঠারোই মে ,এভারগ্লেডস ,মিয়ামি,সকাল দশটা ]
ঝড় থেমেগেলেও মেঘের আনাগোনা চলছিল আকাশে। বাতাসে আর্দ্রতার পরিমান নেহাৎ কমছিল না। আমাদের গেস্টহাউসের বারান্দায় হ্যামকে শুয়ে শুয়ে মেঘ দেখছিল রিচার্ড। রিচার্ডের বাইনোকুলারটা বেশ শক্তিশালী। আমি ওর পাশে গার্ডেন চেয়ারে বসে মনমোহন গেজেটে জরুরী তথ্য ও ইমেল চেক করছিলাম।
হটাৎ রিচার্ড বলল ,”ডক্টর বক্সী ,হেক্সাগোনাল ক্লাউড মানে ছয়কোনা মেঘের কথা জানেন ?”
আমি বললাম। “হুম জানি। ইনফ্যাক্ট একটু আগেও আমি সেই নিয়ে পড়াশুনো করছিলাম। “
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই রিচার্ড ওর হ্যামক ছেড়ে উঠে পড়লো। তারপর আমাকে ইশারা করে নিজে বারান্দার সিঁড়ি বেয়ে নিচের লনে নেমে পড়ল ।
আমিও ওর পিছনে পিছনে আমার বাইনোকুলার নিয়ে সবুজঘাসের কেয়ারিকরা লনে নেমে পড়লাম।গত দুইদিনের বৃষ্টিতে লনের ঘাস যথেষ্ট ভেজা ছিল কিন্তু আমরা সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করলাম না।
আমাদের দৃষ্টিছিল আকাশের দিকে যেখানে অদ্ভুতদর্শন সাদা-কালো-নীল-কালচে নীল মেঘ ভেসে আছে এবং মৃদু মন্দ বাতাসে উত্তরদিকে এগিয়ে যাচ্ছে ।
এবার রিচার্ড উত্তরদিকের আকাশে একটা নির্দিষ্ট দিকে দৃষ্টিকে স্থির করে আমাকেও সেই দিকে দেখতে বলল। আমিও আমার বাইনোকুলার সেই দিকে তাক করে দেখতে শুরু করলাম।
সত্যি কি অদ্ভুত !
কেউ যেন মেঘের চাদরে তিন-চারটে ষড়ভুজ এঁকে দিয়েছে। ভালো করে দেখে বুঝলাম ষড়ভুজগুলি অতিকায় এবং বলাযায় ওগুলো মেঘ নয় বরং মেঘের ভরাট জমিতে ছয়কোনা শূন্যস্থান বা গ্যাপ।
এতদূর থেকেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সেই ছয়কোনা শূন্যস্থানের ছয়টি হাতের দৈর্ঘ্য সমান। ঠিক যেন বেনজিন বলয় কিংবা আকাশে মেঘের গায়ে মস্ত মৌমাছিচাকের মস্ত ষড়ভুজ কোটর !
প্রকৃতির পাঠশালায় কতকিছুই যে আছে কে জানে। কিছুদিন আগেই একদল বিজ্ঞানী জানিয়েছেন ওই ষড়ভুজ মেঘগুলি বায়বীয় বোমা বা বিস্ফোরকের মত শক্তিশালী। কি সাংঘাতিক এর শক্তি !
একটু আগেই মনমোহন গেজেটে ওই রকম মেঘের কথা পড়ছিলাম। সায়েন্স চ্যানেলের একটি অনুষ্ঠানে আরিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং আবহবিশেষজ্ঞ ডক্টর ব্যান্ডি সের্ভানই এমন ষড়ভুজ মেঘের কথা জানিয়েছেন। উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট ক্যামেরায় এমন মেঘের অস্তিত্ব টের পাওয়া গিয়েছে। সেরকম কিছু ছবি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ব্যাপারটা তাঁর দলের সদস্য বা বিশেষকরে তার নজরে আসে। অদ্ভুত আকৃতির এই শূন্যস্থান দিয়ে ঘেরা মেঘের আচরণও বেশ অদ্ভুত। এরকম মেঘ মূলত উত্তর আটলান্টিকের উপকূল অঞ্চলে কখনো কখনো দেখা যায়। মাঝে মাঝে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের পরিসীমার মধ্যে সেগুলো একটু বেশি সংখ্যায় এসেপড়ে।ইওরোপের উত্তর উপকূলেও এমন মেঘের অস্তিত্ব টের পাওয়া গিয়েছে। ষড়ভুজ ওই মেঘের শূন্যস্থানের একেকটি বাহু বা হাতের দৈর্ঘ্য কমপক্ষে প্রায় পঞ্চান্ন মাইল বা অষ্টাশি কিলোমিটার। কি অদ্ভুত – দুই পদ্ধতির মাপকাঠিতেই এগারোর নামতা।
আবহবিজ্ঞানীদের মতে ছোটছোট মেঘের বিস্ফোরণে বড়বড় ওই শূন্যস্থান তৈরী হয় এবং ক্রমশ নিচের দিকে নেমে এসে সমুদ্রে সজোড়ে আঘাত করে ফলে উত্তাল ঢেউ তৈরী হয় – কখনো কখনো সেই ঢেউ অতিকায় হয়ে প্রায় সুনামির আকার ধারণ করে। সেই ঢেউয়ের সামনে নৌকা বা ইয়াট তো কোন ছাড় ,বড়বড় জাহাজও তলিয়ে যেতে পারে।
রিচার্ডকে আমি এই কথাগুলোই বললাম। আরো বললাম ,আপাত শান্ত নিরিবিলি এই সকালটা মোটেও শান্ত কিংবা নিরাপদ নয়। বিপদ আসতে পারে যে কোনো মুহূর্তে । ওকে আরো বললাম ,”এক্ষুনি স্থানীয় হাওয়া অফিসে ফোন করো। “
রিচার্ড পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে মিয়ামির হাওয়া অফিসে ফোন করলো। তবে সেখান থেকে জানালো বিষয়টি তাঁদের নজরেও এসেছে। সাবধানতা হিসাবে রেডিও,টেলিভিশন ও ইন্টারনেট মাধ্যমে বিশেষ সতর্কবার্তা জানানো হচ্ছে । মিয়ামি উপকূল থেকে সমস্ত জাহাজ ও প্লেন চলাচল আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।
আমি বুঝলাম প্রযুক্তিতে উন্নত এই দেশ কত সাবধানী। সাবধানের কোনো বিকল্প হয়না। ফ্লোরিডা উপকূল বাহামাসের নিকটে প্রায় দেড়শো মাইল দূরে থাকা মেঘ চিহ্নিত করে জনগণকে সাবধানে থাকতে বলা সত্যিই খুব প্রয়োজনীয় কারন প্রচন্ড গতিতে ধাবমান ও শক্তিশালী এই মেঘ যেখানে আছড়ে পড়বে সেখানে বিস্ফোরণের ফলে ঘন্টায় প্রায় একশো তিয়াত্তর মাইল বা দুশো আশি কিলোমিটার ঘূর্ণি তৈরী হতে পারে। স্বাভাবিকের তুলনায় অন্তত চল্লিশ -পঁয়তাল্লিশ ফুট বেশি ঢেউ উঠতে পারে যার ফলে পাঁচদশটা জাহাজডুবি ঘটতেই পারে।
তাছাড়া প্রবল গতিতে নেমে আসা এই এয়ার বম্ব বা বায়ু বিস্ফোরক যে কিছু কিছু দুর্ঘটনার পিছনে ছিল না সে কথা হলফ করে বলতে পারে !
আসলে সম্ভাবনার কথা অসংখ্য ,প্রচুর তথ্য ও প্রমানের যথাযথ সন্নিবেশ না ঘটলে কোনো রহস্যেরই সমাধান হয়না। দুই একটি সূত্র খুঁজতে খুঁজতে মূল রহস্যে ঢুকতে হবে সেটা বুঝতে পারছি। প্রকৃতি নিজেই এক অপার রহস্য। রহস্য এর প্রত্যেক স্পন্দনে ,অস্তিত্বে। আমরা মানুষেরা সাধারণ দৃষ্টি ও লব্ধ জ্ঞান দিয়ে বিপুল পৃথিবী ও মহাবিশ্বের অপার রহস্যগুলিকে বোঝার চেষ্টা করি বা করতে থাকি এবং রহস্য সমাধানের এক চূড়া থেকে অন্যচূড়ায় লাফ দিতে থাকি কিংবা অনেকক্ষেত্রেই প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে থাকি।
বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের রহস্যের জট খোলা যেন সেই হামাগুড়ির নামান্তর। কোনো সুনির্দিষ্ট যুক্তি বা তত্ত্ব দিয়ে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলে ঘটে যাওয়া ঘটনা বা দুর্ঘটনার ব্যাখ্যা করা সম্ভব হচ্ছে কই ? তবে আমার মনে হয় কোন একটি মাত্র কারন বা যুক্তি এই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। একাধিক শক্তিশালী কারন অবশ্যই আছে।
রহস্য আছে বারমুডা ত্রিকোণের আকাশে বাতাসে ,সাগরে ,ডাঙায় এবং অবশ্যই এর ভূতলের গভীরে। কিন্তু কোনটির ভূমিকা কতখানি এখন সেটাই সুনির্দিষ্টভাবে খতিয়ে দেখতে হবে।
[ বিকেল চারটে ]
সারা দুপুর বিষয়টা নিয়ে ভাবলাম। নানান জার্নাল, এনসাইক্লোপিডিয়া এবং রিসার্চ পেপার তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম। ছয়কোনা বা ছয় হাতওয়ালা এই প্রবল শক্তিশালী মেঘ সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পৃথিবীবাসীর জানা নেই। তবে একেবারেই যে নেই তা কিন্তু নয়। এই সম্পর্কে লেখাওয়েদার নেটওয়ার্ক-এর সাংবাদিক লীনা ম্যাকলিনের একটা প্রবন্ধ আমার চোখে পড়ল। নিবন্ধটির শিরোনাম “হোয়াই হেক্সাগণাল ক্লাউডস ডোন্ট সলভ বারমুডা ট্রায়াঙ্গল মিস্ট্রি” অর্থাৎ ষড়ভুজ মেঘ কেন বারমুডা রহস্যের সমাধান করতে পারবে না?”
আমি তাঁর যুক্তিগুলো বোঝার চেষ্টা করলাম। লেখিকার মতে এই ষড়ভুজ মেঘের অস্তিত্ব টের পাওয়া গিয়েছে ফ্লোরিডা উপকূল থেকে প্রায় দুশো চল্লিশ কিলোমিটার দূরে বাহামাস দ্বীপের উপরে এবং তাদের আকৃতি কমপক্ষে বত্রিশ-তেত্রিশ কিলোমিটার থেকে অষ্টাশি কিলোমিটার। আবার অন্যদিকে সায়েন্সের চ্যানেলের মতে এইসব মেঘের বিস্ফোরণে ঘন্টায় দেড়শো থেকে একশো ষাট কিলোমিটার বেগে ঝড় হতে পারে এবং যার ফলে প্রায় বারো মিটার বা চল্লিশ ফুট পর্যন্ত ঢেউ তুলতে সক্ষম। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রাবল্য অস্বীকার করা যায় না।
[উনিশে মে,মিয়ামি ]
প্রথমে দুবার আওয়াজ করে মনমোহন মাল্টিপারপাস গেজেটে রবিশংকরের সেতার মূর্ছনা বেজে উঠলো বুঝলাম আন্তর্জাতিক ফোন কল এসেছে। যা ভেবেছি ঠিক তাই। পল দিমিত্রভ ফোন করেছে। সাধারনত সে ফোনকল করে না তার পছন্দই মেল কিন্তু অত্যন্ত জরুরী কিছু হলে ফোন করে জানায়। খরচটা ব্যাপার নয় বরং এটাই ওর স্বভাব নইলে রুশ রুবলে ওর রোজগার তো আর কম নয় তবে পলের বক্তব্য খুবই পরিষ্কার।
ও বলল,” তুমি একটা গুরুত্বহীন বিষয়ের পিছনে পড়ে আছো। মানে বারমুডা ট্রাঙ্গেল এর ব্যাপারটা বড় বেশি মিডিয়া হাইপ। এর মধ্যে সারবত্তা বলে কিছু নেই।”
আমি বললাম,” বলছো কি ? এতদিন ধরে এখানে এতগুলো দুর্ঘটনা ঘটেছে আর তুমি বলছ সেই সবের কোন গুরুত্বই নেই ?”
পল বলল,” আমি তা বলছি না তবে যেটা বলছি সেটা খুবই পরিষ্কার। আসলে ঘটনাগুলোর ইচ্ছাকৃত ভুলভাল উপস্থাপনের জন্য রহস্য বেশি ঘনীভূত হয়েছে। “
আমি বললাম,”তা হয়তো হতে পারে। সেই সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবো বলেই তো এখানে এসেছি।”
এবারে পল বলল,”সেটা নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই তবে শোনো আমি তোমাকে ইমেলে একটা ভিডিও পাঠিয়েছি। সেটা দেখে নিও…”
তারপর দুম করে ফোনের লাইন কেটে দিল. এই হচ্ছে পলের স্বভাব। বয়স হয়েছে যথেষ্ট কিন্তু এখনো বাচ্চাদের মত চঞ্চল। রিচার্ড আমাকে ফোনে কথা বলতে শুনে একটু দূরে চলে গিয়েছিল।
যাই হোক মনমোহন গেজেট থেকে পলের ইমেইল চেক করলাম। সে যা লিখেছে তার বাংলা করলে দাঁড়ায়,” চোখের দেখা নয় ,চেখে দেখো চমকে যাবে।”
চমকালাম কিনা জানিনা তবে অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিক কার্ল ক্রুশজেলনিকির ভিডিও বার্তাটি আমার জানা ছিল। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনি সাংবাদিক ক্রুশজেলনিকি পরিষ্কার দাবি করেন বারমুডা ওপর মধ্যবর্তী সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া বা নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে এলিয়েন কিংবা আটলান্টিসের লুকানো শহরের কোন সম্পর্ক নেই।
বরং তার মতে অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীরা এই রকম নিরুদ্দেশের কারন হিসাবে যা খুঁজে পেয়েছেন তার সঙ্গে আধিভৌতিক ,পরাবাস্তব অথবা অতিপ্রাকৃতিক বিষয়ের নামমাত্র মিল নেই। ব্যাপারটা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এবং যুক্তিযুক্ত – সেই পুরানো তত্ত্ব , হিউম্যান এরর এবং খারাপ আবহাওয়া। আসলে রংদার বা রং চড়ানো গল্প শুনতে বেশিরভাগ মানুষ হয়তো পছন্দ করেন তা নইলে বারমুডা ট্রাঙ্গেল,হোডু সাগর বা ডেভিলস ট্রায়াঙ্গেল এলাকায় বিমান ও জাহাজ চলাচলের সংখ্যা যে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সেটা কেন ভুলে যাই ? দ্বিতীয়তঃ বেশি যান চলাচল হলে সেখানে যে বেশি যান্ত্রিক গোলযোগ বা দুর্ঘটনা ঘটবে সেটা তো পাটি গণিতের মত স্বচ্ছ , পরিষ্কার।
কার্ল পরিষ্কার বলছেন,”এলাকাটা বিষুবরেখার নিকটবর্তী – কাছেই আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী দেশ এবং যানবাহনের সংখ্যা পৃথিবীর যে কোন অঞ্চলে বেশি তাই ‘লিম্বো অফ দি লস্ট’ বা বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলে বারবার বিমান দুর্ঘটনা বা জাহাজডুবির সংখ্যাও যে একটু বেশি হবে তাতে আর আশ্চর্যের কি !
লয়েড’স অফ লন্ডন এবং ইউএস কোস্ট গার্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বারমুডা ট্র্যাঙ্গেলে জাহাজ হারানোর শতাংশের হিসেবে সারা পৃথিবীর গড়ের থেকে আলাদা কিছু নয়।
তাহলে অবাক করার মত কি আছে !
আমার মতে আছে অসংখ্য গসিপ। মনগড়া গল্পের সিরিজ। শুরুটা হয়েছিল ইউএস নেভির টিবিএম আভেঞ্জার টর্পেডো বোম্বার্স এর কাহিনী দিয়ে। যা কিনা ফ্লাইট নাইনটিন নামে বেশি পরিচিত। উনিশ শ পঁয়তাল্লিশের পাঁচই ডিসেম্বর ফোর্ট লডারডেল থেকে দুই ঘন্টার প্রশিক্ষণের জন্য রওনা দিয়েছিল। পাঁচ-পাঁচটি আভেঞ্জার টর্পেডো আটলান্টিকের উপরের আকাশে উড়ছিল। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে তাদের রেডিও সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিমানবন্দর বা ঘাঁটির সঙ্গে সংযোগ কেটে যাওয়ায় পাঁচটি অ্যাভেঞ্জার টর্পেডোয় থাকা চৌদ্দজন ক্রু মেম্বার বিমানগুলোর সঙ্গেই ভ্যানিশ হয়ে যায়।
পরবর্তীকালে দাবি করা হয় সেই রাত্রেই পিবিএম মেরিনার সি-প্লেন তল্লাশি অভিযানের জন্য পাঠানো হয়েছিল কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই বিমানের তেরো জন ক্রু-মেম্বার সহ বিমানটি নাকি হারিয়ে যায়।
সঠিক তথ্য প্রমাণ ও জ্ঞানের অভাব বা তথ্য অনুসন্ধান এর ব্যাপক সুযোগ না থাকায় অনুমান নির্ভর গবেষণা গাল-গল্পে পরিণত হয় এবং ভিনসেন্ট গাড্ডিস এই গল্পগুলোকে আমল দিয়ে ‘দি বারমুডা ট্রাঙ্গেলের তত্ব’ প্রতিষ্ঠা করলেন।
ঘরের কাছে এমন বিপদের গন্ধওয়ালা বিয়োগান্ত ত্রিকোনের গল্প শুনে উর্বর কল্পনাপ্রবণ পাঠক-পাঠিকা উল্লসিত হয়ে উঠল। রহস্যের হাতছানি যেন তাদের কল্পনার রং মহলে টেনে নিতে চাইল।
পিবিএম মেরিনার প্লেনটি চমৎকার আবহাওয়ায় তল্লাশি শুরু করেছিল বলে গাড্ডিস সাহেব দাবি করেছিলেন। বাস্তবে কিন্তু তেমনটি ছিল না। প্রবল হাওয়া এবং উত্তাল সমুদ্র ছিল। সে কথা তিনি চেপে গিয়েছিলেন।
দ্বিতীয়তঃ পুরো অভিযানে একমাত্র লেফটেন্যান্ট চার্লস টেলর ছাড়া আর কোন অভিজ্ঞ বিমানচালক ছিলেন না এবং বিমান চালনায় তাঁর ভুল হতেই পারে। তাছাড়া মাথায় রাখা দরকার যে ইতিপূর্বে তাঁর বিরুদ্ধে বাজেভাবে বিমান চালানোর অভিযোগ ছিল। কার্ল এই সব খুঁটিনাটি বিষয়সম্পর্কে যথার্থ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তার পিছনে যথেষ্ট সারবত্তা বা যুক্তি আছে।
ফ্লাইট নাইন্টিনের ভ্যানিশ হওয়ার আগের মুহূর্তের রেডিও বার্তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে বিমান চালকেরা নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন। রেডিও বার্তা অনুযায়ী লেফটেন্যান্ট টেলর ভেবেছিলেন তাঁদের ফ্লাইটের কম্পাসটি খারাপ হয়ে গিয়েছে এবং তখন তাঁরা ছিলেন ‘ফ্লোরিডা কি’জ’-এর আকাশের উপর। ‘ফ্লোরিডা কি’জ’ হল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের একগুচ্ছ দ্বীপমালা যা কিনা মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ পশ্চিমে বাহামাস দ্বীপের দিকে প্রসারিত।
ওই রেডিও বার্তা থেকে স্পষ্ট যে লেফটেন্যান্ট টেলর একজন জুনিয়র পাইলটকে নস্যাৎ করে বলেন পশ্চিম দিকে নয় বরং তারা আরও পূর্ব দিকে যাবেন। ফলত তাঁরা আরও গভীর অতলান্তিক মহাসাগরে পৌঁছান। সম্ভবত ঝড়ঝঞ্ঝার প্রকোপে পরে অতল সমুদ্রে তলিয়ে যান এবং সেখানে তল্লাশি চালানো সহজ নয়।
উপরন্তু গাড্ডিস সাহেব তল্লাশি চালানো বিমান সম্পর্কে যা লিখেছেন তা সর্বৈব মিথ্যা। হ্যাঁ, মিস্টার কার্ল ক্রুশজেলনিকির মতে গাড্ডিস সাহেব লিখেছিলেন,”সন্ধানী মেরিনার সি-প্লেনটি ভ্যানিস হয়ে যায় বাস্তবে সেটা কিন্তু আগুন লেগে আকাশেই পুড়ে যায়। তবে এটাও সত্যি যে মেরিনার সি-প্লেন গুলোর ভীষণরকম বদনাম ছিল এবং লোকেরা এই প্লেনগুলোকে ‘ফ্লাইং গ্যাস ট্যাংকস’ বলত কারণ এগুলো ঘন ঘন দুর্ঘটনা লেগে থাকত।
আমার হঠাৎ কেন জানিনা মিগ -২১ এর কথা মনেপড়ল। হয়তো ভারতীয় বায়ুসেনার দুর্ঘটনাপ্রবণ এই বিমানগুলির রেকর্ড সংখ্যক দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল। কোথায় যেন পড়েছিলাম মিগ ২১ বিমান ভারতে মোট ১১৩টি দুর্ঘটনায় ১৭০জন বিমানচালক এবং চল্লিশ জন সাধারণ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন।
অতএব অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিক বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের রহস্য মানতে নারাজ। অবশ্য তিনি এক নন লন্ডনের “লয়েড এন্ড লয়েড” সমানে বলে চলেছেন,”সারা পৃথিবীতে হারিয়ে যাওয়া বিমান বা হারিয়ে যাওয়ার যা পরিসংখ্যান তারবারমুডা ত্রিকোণের থেকে হারিয়ে যাওয়া প্লেন কিংবা জাহাজের ঘটনা আলাদারকম কিছু নয়। পরিসংখ্যান মতে সত্যিই তো এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। কিন্তু কিছু লোকের বক্তব্য ঠিক এর বিপরীত। সাক্ষ্য প্রমাণ বা যুক্তি থাকুক বা না থাকুক তারা ভাবে আটলান্টিক মহাসাগরের নিচে অসংখ্য রহস্যময় জীবজন্তুরা সেখানে বাস করে এবং মাঝে মাঝে ‘ফায়ার ক্রিস্টাল’ বা ‘অগ্নিস্ফটিক’ জ্বলে ওঠে যা কিনা মহাশূন্যে তথা মহাবিশ্বে বার্তা কিংবা শক্তি রশ্মি প্রেরণ ব্যবস্থা।
তারা আরো দাবি করেন এই শক্তিরশ্মির কবলে কোন জাহাজ বা বিমান পড়লে তা নাকি সুদূর মহাশূন্যে প্রক্ষিপ্ত করা হয়।
ভাবো কান্ড ! মানুষ কতইনা উদ্ভট ভাবনা ভাবতে পারে।
আবার একদল মানুষ ভাবেন সমুদ্রের তলায় থাকা মিথেন গ্যাস বিক্রিয়া করে হাইড্রেট গ্যাস উৎপন্ন হয় এবং সমুদ্রের জলে দৈত্যাকার বুদবুদ সৃষ্টি করে যার বিস্ফোরণে বড় বড় জাহাজ ডুবে যায়। এমনকি প্লেনেও আগুন লেগে যেতে পারে। একজন মার্কিন ভূতাত্বিক ও গবেষক এই হাইড্রেট গ্যাসের বিস্ফোরণের সম্ভাবনাকে স্বীকার করেছেন- তবে তাঁর মতে এই রকম ঘটনা শেষবার ঘটেছে প্রায় পনের হাজার বছর আগে। হিসেব কষে বলা যায় সেই সময়ে সবচেয়ে উন্নত মানুষ সবে মাত্র কাঠের গুড়ি গড়াতে শিখছে। সত্যিই ভাবা যায় না।
(ক্ৰমশঃ )
৯৭জন ১৭জন
0 Shares

৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য