বাবা

খাদিজাতুল কুবরা ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, বৃহস্পতিবার, ০৮:৫৩:১৩অপরাহ্ন অণুগল্প ৩৮ মন্তব্য

নীরু খুব কষ্ট করে দীর্ঘ একমাইল পথ পায়ে হেঁটে স্কুলে পৌঁছলো। ক্লাস রুমে বসে সে যখন হাঁপাচ্ছে তখন সহপাঠী বন্ধু রোজি সেজে গুজে হেলে দুলে স্কুলের দিকে এগিয়ে আসছে। জানালার ফাঁক দিয়ে নীরু দেখছে আর ভাবছে তার বাড়িটা ও যদি স্কুলের কাছে পিঠে হতো! ততক্ষণে রোজি এসে তার পাশে বসেছে।

রোজির বাবা একই স্কুলের শিক্ষক। ওদের দুজনের মধ্যে খুব ভাব।ষষ্ঠ শ্রেনীতে এসে ভর্তি হয়েছে দুজনেই ।এখন নবম শ্রেনীতে পড়ে। পড়াশোনায় দুজনেই ভালো। তবে রোজির চেয়ে নীরু বেশি ভালো। ওরা পাল্লা দেয় কে কার চেয়ে ভালো রেজাল্ট করতে পারে। নীরুর গায়ের রঙ শ্যামলা, চেহারা ও ভালো বলা চলেনা। অন্যদিকে রোজি দেখতে খুব সুন্দর।বর্ণভেদ তাদের বন্ধুত্বে কোন ছাপ ফেলতে পারেনি। মেধাবী নীরুর মনটা আকাশের মতো বিশাল,সে সবসময় পড়াশোনার বিষয়ে সহপাঠীদের সাহায্য করে। সে কথা বলে খুব গুঁছিয়ে। যে কেউ তার কথা শুনে সম্মোহিত হতো। সহপাঠীরা নীরুর বন্ধু হওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকতো।

যথাসময়ে ক্লাস টিচার এলে সকলে দাঁড়িয়ে সালাম দিল। স্যার সবাইকে বসতে  বলে নিজেও বসে  রোলকল করলেন। নীরুর রোল বলতে বলতে তিনবার বললেন নীরু শুনতেই পেলোনা।
পাশে বসা রোজি বললো __
কিরে নীরু রোলকল শুনতে পাসনি?
নীরু হকচকিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে প্রেজেন্ট স্যার বললো।
সাথে সাথে ক্লাসের সব ছেলে মেয়েরা একসাথে হেসে উঠলো। নীরু ততক্ষণে লজ্জায় কাচুমাচু হয়ে গেলো কারণ সে অন্যের রোল নাম্বারে প্রেজেন্ট বলেছে।

স্যার সবাইকে চুপ করিয়ে বললেন __কি হয়েছে নীরু! অন্যমনস্ক ছিলে কেন? তুমি তো অমনোযোগী ছাত্রী না।
নীরু দাঁড়িয়ে কোনমতে বললো দুঃখিত স্যার। এমনটি আর হবে না।

নীরু ক্লাসে মনোযোগ বসাতে পারলোনা। তার বসে থাকতে ও কষ্ট হচ্ছে। ক্লাসের ফাঁকে রোজি জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে তোর! চোখমুখ শুকনো লাগছে কেন? নীরু অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে জবাব দিলো কই নাতো কিছু হয়নি, এমনি ভালো লাগছে না।

নীরুর চোখ ফেটে কান্না আসছে, সে রোজিকে বলতে পারলোনা গতরাত থেকে তার পেটে কিছু পড়েনি,আম্মার বকুনি হজম করতে না পেরে রাতে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। সকালে ও না খেয়ে এসেছে। তীব্র অভিমানে চাপা কষ্ট সাথে ক্ষিধের জ্বালা, তার শুধু মনে হচ্ছে সে কি এমন করেছে যে আম্মা এমন করে বকলো। বইয়ের ভাঁজে লুকিয়ে ‘মিসির আলী’ পড়ছিলো আম্মা হাতেনাতে ধরে ফেললো। এতো বকা দিলো যে বকা খেয়েই পেট ভরে গেছে। ভাবতে ভাবতে কখন মধ্য বিরতি হয়ে গেছে। রোজির কথায় সমন্বিত ফিরে পেলো।

রোজি বললো টিফিন খাবিনা! আমি বাড়ি গিয়ে খাবো। বলে সে বেরিয়ে গেলো। এদিকে নীরুর পেট জ্বলছে আর মোচড়াচ্ছে ক্ষুধায়। অলস পায়ে দুর্বল শরীর টেনে সে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো __

স্কুলের গেইটে চোখ পড়তেই নীরুর দুচোখ বিস্ফারিত! সে কি সত্যি দেখছে? টিফিন বক্স হাতে বাবা দাঁড়িয়ে! কাঠফাটা রোদ মাথায় করে একমাইল পথ পায়ে হেঁটে বাবা টিফিন নিয়ে এসেছেন!কদম কদম এগিয়ে আসছেন নীরুর দিকে। নীরুর চোখ দিয়ে টপ টপ করে গড়িয়ে পড়ছে আনন্দাশ্রু! বাবা খপ করে নীরুর হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন কমন রুমে। হাতে তুলে খাইয়ে দিলেন। প্রিন্সিপ্যাল স্যারকে বলে ছুটি করিয়ে বাড়ি নিয়ে গেলেন। রাগী বাবার অমন কোমল রুপ নীরু এর আগে দেখেনি। সে নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করলো আজ থেকে মন দিয়ে পড়াশোনা করবে ;কোন ভাবে বাবা মাকে কষ্ট দেবেনা।

৩৫৯জন ১৫জন
0 Shares

৩৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ