বাবা তুমি এমন কেন? # ছোট গল্প

মামুন ১৬ মার্চ ২০১৫, সোমবার, ০৬:০৮:৩৮অপরাহ্ন গল্প ১ মন্তব্য

পড়ার টেবিলটা ছোট বাবুদের মত সাজানো।

দোতলা পড়ার টেবিল। উপরের অংশে মোট দু’টো ভাগ। বিভিন্ন ধরণের ছোট ছোট শো-পিস দিয়ে সাজানো। একপাশে সুন্দর একটি টেবিল ল্যাম্প। দুটো কলমদানিতে রঙ বেরঙের সাইন পেন, মার্কার ও বল পেন ভর্তি। একপাশে একটি মোবাইল। সুন্দর মলাট করা বইগুলোর দিকে তাকালে সহজে চোখ ফিরানো যায় না। কম্পিউটারে বানানো স্টিকারে নাম লিখা রয়েছে। সুন্দর ভাবে সাজানো একটি পড়ার টেবিল।

কিন্তু যার টেবিল সে অদূরেই বিছানায় শুয়ে আছে। এমন ভঙ্গীতে এবং বিছানাটা এতোটা এলোমেলো যে টেবিলটার মালিক যে সে, প্রথম দেখায় সেটা কেউ বিশ্বাস করতে চাবে না। এই সম্পুর্ণ বিপরীত স্বভাবের মেয়েটির নাম পিম্পি। এবারে জে এস সি পরীক্ষা দিবে। সকাল ১০টা থেকে স্কুল শুরু। এখন ৯টা বাজে। অথচ ঘুম থেকে উঠার কোনো নাম নেই।একেবারে বাবার মত আলসে ও ঘুমকাতুরে হয়েছে। ওর মা কয়েকবার এসে ডেকে গেছে। সেই সাতটা থেকে ডেকে যাচ্ছে। কিন্তু উঠার নামই নেই। একবার শুধু এপাশ থেকে ওপাশে ফিরল। আর প্রতিদিন রাতে ঘুমাতে যাবার আগে বলে যায়, ‘ আম্মু, আমাকে ভোর পাঁচটায় ডেকে দিও তো।’ এলার্ম ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে কণা ওর মাথার পাশে রেখে দেয়। কিন্তু প্রথম শব্দটা হবার সাথে সাথে পিম্পি কীভাবে যেন এলার্ম ক্লকটা বন্ধ করে দেয়। এরপর পড়ে পড়ে ঘুমায়। ঠিক সাড়ে ন’টার দিকে নিজেই উঠে পড়ে। এরপর এতো দ্রুত নিজেকে তৈরী করে যে, সেটা একটা দেখবার মত দৃশ্য। রোজকার এই রুটিন।

কণা একটা কেজি স্কুলে জব করে। ওকেও সকাল আটটার ভিতরে বের হতে হয়। ছেলে আরাফাত ও প্রায় একই স্বভাবের। এই এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে কণা ও রেজার ছোট্ট সংসার। রেজা একটা পোশাক কারখানায় চাকরি করে। নিজের হোন্ডা থাকলেও সেটাতে করে অফিসে যায় না। কণাই জোর করে যেতে দেয় না। বাসে করে অন্যদের মত প্রতিদিন অফিস করে। শত উদ্বেগের ভিতরে এইটুকুতেই কণা নিরুদ্বেগ থাকার চেষ্টা চালায়।
এভাবেই চলছে ওদের জীবনটা… টক-ঝাল-মিষ্টি’র মিশেলে… বেশ ভালোভাবেই। মায়ের সাথে পিম্পির সম্পর্কটা বাবার থেকে বেশী কাছের। মাকে ঘিরেই তার জগত। বয়ঃসন্ধিকাল এখন ওর। শিশু থেকে কীভাবে যেন হঠাৎ করে কিশোরীতে পরিণত হয়ে গেলো সে।

আজও সাড়ে ন’টায় ঘুম থেকে উঠে একটা সাইক্লোনের মতো সব কাজ সেরে স্কুল ব্যাগটা এক সাইডে ঝুলিয়ে স্কুলের দিকে রওয়ানা হল। গত বছরও ব্যাগটা পিঠে ঝুলিয়ে নিয়েই চলেছে। একটা শরীরবৃত্তীয় পরিবর্তন পিম্পির পিঠের ব্যাগটাকে এখন সাইডে নিয়ে এসেছে। আরো কিছু পরিবর্তন হয়েছে যেটা পিম্পি নিজেও জানে না। কণার চোখে অবশ্য কিছু কিছু ধরা পড়ছে। আর পড়ছে রাস্তার দোকানগুলোতে বসে থাকা বখাটে ছেলেগুলোর চোখে যাদেরকে এই কিছুদিন আগেও সে ‘ভাইয়া’ ডেকে এসেছে। তখন তো তারা ওর দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকায়নি। শরীরের একটি যায়গায় সামান্য মাংস স্ফীত হওয়াটাই কি মুল কারণ? পিম্পি অনেক ভেবেছে ভাইয়াদের এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের কারণ সম্পর্কে। শুধু কি এই ভাইয়ারা? স্কুলের যে স্যারদের কাছে সে টিউশন নিতে যায়, সেখানেও এই বিপত্তি। আগে স্যারদের হাত ওর শরীরের এখানে ওখানে লাগত। কখনো পিঠে হাত দিয়ে স্যারেরা বাহবা জানাতেন। কই, তখন তো কোনো অনুভুতি জাগেনি… এখনকার মত!

এখন কেমন লাগে?

নিজেকে জিজ্ঞেস করে?

অন্যরকম… ভাল ও খারাপের মাঝামাঝি এক বোধ কাজ করে। আগে সব স্যারকে একই রকম লাগত। কিন্তু ইদানিং আর সেরকম লাগছে না। স্যারদের ভিতর এমন ক’জন আছেন যাদের দিকে তাকালেও এক অজানা ভাললাগার অনুভুতিতে আচ্ছন্ন হয় সে আজকাল। তবে যখনি এই অনুভুতি নিজের ভিতরে ফীল করে, তখনি কেন জানি নিজেকে বেশ অপরাধী মনে হয়… কি একটা গোপন কাজে সে যেন জড়িয়ে পড়েছে এমন মনে হয়। সে যে কারো সাথে এই কথাগুলো শেয়ার করবে তারও কোনো উপায় নেই। বন্ধুদের সাথে কোনো কিছু শেয়ার করতে ইচ্ছে করে না। বন্ধু বলতে তো সবাই… সেই নার্সারী থেকে ওরা সবাই এক সাথে আছে। ছেলে-মেয়েরা একই রুমে পাশাপাশি না বসলেও সবার সাথে সবার দেখাদেখি তো হয়। এর ভিতরে চোখাচুখি… একটু হাসি বিনিময়! কিন্তু কিসের জন্য যে এই হাসি, সেটা না জেনেই ওরা বড় হচ্ছে। তবে মেয়ে বন্ধুদের ভিতরে কয়েকটা বয়সের থেকে একটু বেশী পেকে গেছে। সেগুলোর সাথে এখন আর পিম্পি ইচ্ছে করেই বসে না। মিশতে ও মন চায় না। কিন্তু সেই বাবু বেলার বান্ধবী সবাই। মন না চাইলেও থাকতে হয়। শরীরে শিরশিরে অনুভুতি আনা কথা বার্তাও শুনতে হয়। এরা এতোটাই পাকনা যে স্যারদেরকে ও রেহাই দেয় না ওদের তীর্যক কমেন্টের আওতা থেকে।

হেঁটে হেঁটে স্কুলের কম্পাউন্ডে চলে এলো। আসার পথে সিনিয়র ক’জন ভাইদের সাথে দেখা। হাসিমুখে ওকে ‘কেমন আছ’ … ‘ কোনো সমস্যা আছে কিনা’ জানতে চাইল তাঁরা। অনেক কষ্টে হাসি চেপে তাদেরকে উত্তর দিয়ে চলে এলো। এরা সবাই ইদানিং নিজেদেরকে বয়স্ক বানানোর জন্য কতই না চেষ্টা করে যাচ্ছে। ভালোভাবে এখনো দাড়িগোঁফ উঠে নাই অনেকেরই। অথচ ফ্যাশনদুরস্ত এবং বলিউডের নতুন চিংড়ি মার্কা নায়কদের মত অনুকরণ করে সেভাবেই নিজেদেরকে উপস্থাপনের চেস্টা করছে।

পিম্পিদের ক্লাশ টীচার হাবিব স্যার এখনই ঢুকলেন। ওকে দেখে কাছে ডাকলেন। আগে হলে ওর গাল টেনে দিতেন… মাথায় ও পিঠে হাত বুলিয়ে দিতেন। এই স্যারের কাছে এখনও প্রাইভেট পড়ে সে। কিন্তু ইদানিং আর আগের মত গাল টেনে দেন না। শুধু একটু হেসে বলেন, ‘ কেমন আছ মা?’

সে তাহলে বড়ই হয়ে গেছে!

বেশ বড় হয়েছে। সেদিন ওর বাবা ডেকে বললেন, ‘ এখন বড় হয়েছ তুমি। পথে ঘাটে কারো সাথে আর আগের মতো কথা বার্তা বলবে না। বুঝেছ?’ সে না বুঝেই বলল, ‘ হ্যা আব্বু।’ অথচ এই কিছুদিন আগে এই আব্বুই বাড়ীওয়ালার ছেলে যে ওর থেকে এক ক্লাস উপরে পড়ে, তার সাথে প্রতিদিন স্কুলে যেতে বলতেন। অথচ এখন মানে যেদিন থেকে ওড়না পরা শুরু করেছে সেদিন থেকেই ওর চেনা-জানা জগতটাই কেমন যেন অচেনা হয়ে গেলো। খুব দ্রুত সবকিছু বদলে যেতে থাকলো। ছোটবেলায় আম্মুকে কত বলেছে ওকেও ওড়না কিনে দিতে। অথচ এখন যখন বাধ্যতামুলক ভাবে সেটা পড়ার জন্য চাপ এলো, এখন আর পরতে ইচ্ছে করে না। কেন জানি হিন্দী সিরিয়ালের উঠতি মেয়েদের মত ওড়না গলায় ঝুলিয়ে রাখতে ইচ্ছে করে। তবে সেটা আয়নার সামনে কয়েকবার করেও দেখেছে। কিন্তু নিজেকে কেন জানি সেই মেয়েগুলোর মত লাগেনি। কেমন বিশ্রী ভাবে ওর বুকের নরম স্ফীত মাংসপিন্ড দু’টি দেখা দিচ্ছে! এটা দেখেও ওর মনটা কেন জানি খারাপ হয়ে গেলো।

ওর প্রিয় বান্ধবীদের একজন মিতা। ওর পাশেই গিয়ে বসল। আজ কেন জানি মন খারাপের দিকেই যাচ্ছে বারবার। এরকম হয় পিম্পির… প্রায়ই। তবে সেটা বেশীক্ষণ থাকে না। আজ কি জন্য জানি থেকে থেকে মন খারাপের দিকেই উড়ে যেতে চাচ্ছে। এমন সময় ‘কেউ’ যদি পাশে থাকত! একটু চমকে উঠল। কেউ মনে হল কেন? আবার ভাবতে বসে… এই কেউ কে হতে পারে? আব্বু ? আম্মু? আরাফাত তো হবেই না। তবে কে? ভাইয়াদের কেউ? নাকি ওকে দেখে শীষ দেয় সেই রাস্তার অচেনা ছেলেদের কেউ?

উফ!

একটু শব্দ করেই বলে ফেলল কথাটা। মিতা ফিরে তাকালো। বল, ‘ কি হল!’ একটু অবাক হল। বলল, ‘ নাহ! কিছু না।’

ইদানিং পিম্পির কাছে এরকম মনে হয়। ওর জীবনে আব্বু-আম্মুকে ছাড়িয়েও একটা অচেনা মানুষ একজন ‘কেউ’ হয়ে উঠছে… ধীরে ধীরে। পিম্পি নামের উচ্ছল একটি মেয়ে কীভাবে যেন তার উচ্ছলতা হারিয়ে শামুকের মত নিজে নিজের গতিকে স্লথ করে দিচ্ছে! ঝিনুকের মত নিজেকে গুটিয়ে রাখছে অনুভুতির খোলসে। আগে আব্বু-আম্মুর সাথে একই বিছানায় ঘুমাতো। সেই সিক্সে পড়া পর্যন্তও। একা একা অন্য রুমে ঘুমাতে ভয় লাগত। কিন্তু যেদিন এক রাতে ঘুম ভেঙ্গে চিরচেনা আব্বু-আম্মুকে অন্যরুপে দেখতে পেল, ওর চিন্তার জগতটাই ভেঙ্গে গেলো! কিন্তু কারো সাথে এই ব্যাপারে শেয়ার করতে না পারায় ভিতরে ভিতরে গুমরে মরতে লাগল। আর সিক্সের একজন মেয়ের সাথে কেই বা এই ব্যাপারে কথা বলতে আসবে। তবে এরপর থেকে সে নিজেই কেমন যেন এক নেশায় জড়িয়ে গেলো। একটা গোপন ও আদিম ক্রীড়ায় মত্ত এক দম্পতির নীরব সাক্ষী সে হয়ে রইল কিছুটা আলোআঁধারি পরিবেশের ভিতর। সরাসরি না দেখে শুধুমাত্র অনুভুতির সাহায্যে… কিছুটা গভীর নিঃশ্বাস প্রক্ষেপনের দ্বারা আর খাটের কম্পনের মাধ্যমে। আর মটকা মেরে পড়ে থেকে থেকে এই অন্যায় কাজটি করার জন্য পরের দিন একা একা বোবা কান্নায় ভেঙ্গে পড়া। একটা মানসিক রোগীতেই পরিণত হয়ে যেত সে। কিন্তু কীভাবে যেন কণা একদিন বুঝে ফেলল। এরপর থেকে ওকে আলাদা রুমে পাঠিয়ে দিল। তবে কণা নিজেও পিম্পি না ঘুমানো পর্যন্ত ওর সাথেই থাকত। তবে রাতে ওর পাশ থেকে ওর আম্মু যে উঠে চলে যায় সেটাও পিম্পি বুঝতে পারত। তবে ততদিনে নারী-পুরুষের মধ্যকার গোপন ব্যাপারটি অনেকটা ওর বুঝে এসে গেছে। কিন্তু এই ঘটনার পর থেকে বাবাকে কেমন যেন অন্যরকম লাগতে লাগল। ভালো লাগার সেই বাবাকে এখন কেমন এক ভীতিকর অচেনা মানুষের মত লাগতে শুরু করেছে। সব সময় না। রাতের সময়গুলোতে ওর প্রিয় বাবা- যে কাছে থাকায় তার শরীরের ‘বাবা বাবা’ ঘ্রাণে ছোট্ট এই বাসাটা বাবাময় অনুভূতিতে পিম্পিকে ভালো লাগার অপার্থিব আবেশে মুগ্ধ করে তুলতো! আজ কেন এক আলোআঁধারির অচেনা ঘোরময় কিছু অবোধ্য অনুভূতি পাওয়াতে সেই বাবা অন্য কেউ এ পরিণত হয়েছেন? সে কি বেশী বুঝতে শুরু করেছে?

তবে সবচেয়ে বড় বুঝটি এসেছে ওর নিজের মেয়েলি সমস্যাটির প্রথম দিনটিতে। ভাগ্য ভাল সেদিন স্কুল ছিল না… বাসায় ছিল। এমন সময়ে… কণাই ট্যাক্টফুলি পুরো ব্যাপারটা সামলায়। একজন মা ই পারে এসব ব্যাপারে মেয়েদেরকে সাহায্য করতে। তবে মেয়ে হওয়ার যে এতো ধকল ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারছে। আর সামনে যে আরো এরকম অপেক্ষা করছে সেটাও উপলব্ধিতে আসছে। আর এই ধকল কাটাতে ওর যে আব্বু-আম্মু ছাড়াও একজন ‘কেউ’কে প্রয়োজন সেটা ও কীভাবে যেন জেনে গেছে।

পিম্পিদের এটি স্কুল ও কলেজ। কলেজের অনেক ভাইয়াকে সে চিনে। স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে সে খুব সুন্দর নাচত। নাচে প্রতিবারই সে তার বিভাগে প্রথম হয়ে এসেছে। সেই ৭ম শ্রেণী পর্যন্ত। এখন আর আব্বু নাচতে দেন না। ভাইয়ারা ওর নাচ দেখে আসছে ওর ছেলেবেলা থেকেই। সেদিক দিয়ে অনেকেই ওকে চিনে। তবে ইদানিং ওর কাছে আসলে সবাই কেমন যেন হয়ে যায়। সেই ছোট্ট পিম্পি যে এখন আর সেই পিম্পি নেই। তবে তাদের ভিতর এবার ইন্টার পরীক্ষা দিবে একজন রয়েছে যাকে ‘ভাইয়া’ ডাকতে ইচ্ছে করেনা পিম্পির। সেও ওর কাছে আসলে অন্যদের মত ‘কেমন জানি’ হয়ে যায় না। পাওয়ার ওয়ালা চশমা পড়া এই ছেলেটির নাম আদনান। প্রতিদিন ছুটির সময় একবার হলেও পিম্পির সাথে অর কীভাবে যেন দেখা হয়ে যায়…

আর তখন…

এক ভিন্ন অনুভুতির দোলায় পিম্পি নামের সদ্য কিশোরি মেয়েটি দুলে ওঠে!

স্কুল কম্পাউন্ডের কৃষ্ণচুড়ার লাল ফুলগুলোকে তখন আরো লাল মনে হয়!…

নীলাকাশের সাদা মেঘ বালকদেরকে আরো শুভ্র মনে হতে থাকে!!…

বিশাল দীঘির কালো পানিকে কাকের চোখের মতো স্বচ্ছ ও শীতল মনে হয়… যেখানে ডুব দিলে শান্তি পাওয়া যাবে এরকম লাগে!!!

কেন এমন মনে হয় সেটা কখনো ভাবার চেষ্টা করেনা সে। তবে যেদিন আদনানের দেখা পায় না সেদিন মনটা যে ভীষণ খারাপ হয়ে যায় এটা টের পায়।

আর প্রতিদিন মাঠের পাশে একা আদনান বসে থাকে।

ওর অপেক্ষায়… এটা বুঝতে পেরে পিম্পির জগতে আলোড়ন তুলে একটা উপলব্ধি ভেসে বেড়ায়…

আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে!
তবে ইদানিং পিম্পির মনোজগৎ ওর বাবাকে কেন্দ্র করে এক অবিমিশ্র চিন্তা-ভাবনায় নিজের ভিতরে থেকেও এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপানুভূতির উদ্রেক করছে। বাবা! সেই বাবা! আর এই বাবা!
আচ্ছা বাবাদেরও কি সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন ঘটে?
হেঁটে হেঁটে অন্যদের সাথে বাসায় ফিরছে। আজ কেন জানি খুব চুপচাপ সে। সাথের বান্ধবীদের দুজন ওর সাথে থেকেও ওর এই নীরবতাকে ঠিক খেয়াল করলো না। একই যায়গায় ওরা থাকে। পাশাপাশি বাসায়। বেশীরভাগ বান্ধবীরাই নিজেদের গাড়িতে করে স্কুলে আসে। সুন্দর গাড়িগুলো কেমন চকচক করতে থাকে। দরোজা খুলে বের হওয়া প্রিয় বান্ধবীদের চোখও চকচক করে। ওদের দেহমন কেমন এক উজ্জলতায় আচ্ছাদিত থাকে। সেগুলো দেখে নিজের ভেতরে পিম্পি বিবর্ণ হতে থাকে।
আচ্ছা, বাবা কি ওকে এই উজ্জ্বলতা এবং চোখের চকমকে আভা দিতে পারেননি বলেই কি এখন বাবাকে অন্যরকম লাগে?
ওর সাথে কি তবে বাবার দেয়া-নেয়ার সম্পর্ক?
ভালোবাসা তবে কোথায়? ভালো লাগারা কি ছয় বেহারার পাল্কিতে চড়ে ধিরে ধীরে নিঃশেষ হতে চলেছে?
দমবন্ধ এক অনুভূতিতে বিলীন হয়ে পিম্পি প্রচণ্ড রোদের ভিতরে লাল মাটির সংকীর্ণ পথ ধরে নিজের বাসায় ফিরে চলে। বাবা সম্পর্কে এমনটি অনুভব করাতে ঠিক এই মুহুর্তে নিজেকে ওর খুবই ছোট মনে হল।
তবে কি সে এতোটাই বড় হয়ে গেছে যে নিজেকে ছোট অনুভব করার মত তীব্র অনুভূতি বোধ সম্পন্ন একজনে পরিণত হয়েছে।
বড় হবার এত কষ্ট কেন?
ইদানিং অনুভূতিগুলো এতো কষ্টদায়ক কেন ?
এগুলোর উত্তর জানা খুবই জরুরী। কিন্তু সে জানে না এবং কাকে জিজ্ঞেস করলে জানা যাবে তাও বুঝে না। এজন্যই ওর কষ্টগুলো অতিরিক্ত অন্ধকারের বাসিন্দা যেন। কেবলি আলোর পথ খুঁজে বেড়ায়।
রাতে বাবা ফিরেন।
ক্লান্ত বিধ্বস্ত একজন মানুষ। পিম্পি নিজেই দরোজা খুলে দেয়। বাবা হাসেন। পিম্পি একটু হাসার চেষ্টা করে। কিন্তু আজ দুপুরে স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে এই মানুষটি সম্পর্কে ওর কিছু ভাবনা ওকে সেই হাসিতে প্রাণের সঞ্চারে বাঁধা দেয়। কেন জানি বাবার চোখে চোখ রাখতেও পারে না আজ। আবার নিজের কষ্ট হচ্ছে এটা বুঝেও সেগুলোকে বের করে দিতে পারছে না। চোখের জলে নিজেকে কিছুক্ষণ ভেজাতে পারলে হয়তো কষ্টগুলো কমত।

মাঝে মাঝে বাবা-মায়ের ভিতরে মনোমালিন্য হয়। সেই দিনটি অধিকাংশ ই কেন জানি বৃহস্পতিবার হয়। বাবাকে তখন কেন জানি আরো পর পর মনে হয়। মা অভিমান করে দূরে থাকেন। সেই রাতে মা এসে পিম্পির সাথে ঘুমান। পিম্পি কিছু বলে না। তবে বাবার প্রতি তীব্র রাগ হয়। কেন বাবা এসে মায়ের মান ভাঙ্গিয়ে যাচ্ছেন না। এভাবে চিন্তা-ভাবনার এক পর্যায়ে এসে সে ঘুমের জগতে হারিয়ে যায়। তবে সকাল বেলা ঘুম ভেঙ্গে উঠে সে নিজের পাশে মাকে পায় না। ধীরে ধীরে মায়ের রুমে গিয়ে বাবা-মাকে পাশাপাশি ঘুমন্ত দেখতে পায়। দুজনের চেহারায় কেমন এক সর্গীয় আভা বিরাজ করে। এই সময়েও বাবার প্রতি ওর কেন জানি রাগ হয়। বাবা কখন মায়ের মান ভাঙ্গিয়ে ফেললেন! সে একটুও জানতে পারলো না!
তবে কি পিম্পি চেয়েছিল বাবা-মায়ের পুনর্মিলননের সময়টিতে সেও উপস্থিত থাকুক?

বাবার কাছে একটা এন্ড্রয়েড মোবাইল সেট চেয়েছিল। ওর বান্ধবীদের সবার হাতেই সুদৃশ্য সেটগুলো শোভা পায়। পিম্পির হাতে অতি সাধারণ একটি সেট। সেটি নিয়ে বের করতেও কেন জানি নিজের কাছে লজ্জা লাগে। একটা দামী সেট কিনে দিতে পারেন নাই বাবা। কিন্তু দিবেন না বা পারবেন না, তাও বলেন নাই। সেই চিরাচরিত একই উত্তর, ‘ দেখি মা। সামনের মাসে…’। সেই মাসটি কবে আসবে? পিম্পির অনেক জানতে ইচ্ছে করে।

আজ কেন জানি ওর ঘুম আসছে না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে এদিক সেদিক করছে। ওর ছোট্ট হৃদয়ে আজ অনেক ঝড় উঠেছে। চিন্তা-ভাবনার গাছপালাগুলোর অনেক ডালপালা সেই ঝড়ে নড়বড়ে হয়ে গেছে। বাবা নামের এক বিশাল মহিরুহকে ঘিরে এই ঝড়টি এখনো থামছে না। এভাবে অনেকক্ষণ কেটে গেল।
ঘুম আসবে আসবে এমন তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় সে দেখতে পেল ওর রুমে বাবা! একবার মনে হল সে স্বপ্ন দেখছে। আবার ভাবল কথা বলে বাবা কি চায় জানবে কিনা। কিন্তু বাবা দরোজায় হাতে কিছু একটা নিয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছেন। ডিম লাইটের মায়াবী সেই আলোতে বাবাকে কেমন অপার্থিব মনে হয়! একজন মানুষ যে ওর অনেক চাওয়া-পাওয়াকে পুর্ণ করতে পারেন না, এমন একজন বাবা আজ এতো রাতে এখানে এভাবে কেন দাঁড়িয়ে রয়েছেন? নিমিষে আধোজাগরণ থেকে পিম্পি নামের এক নব-কিশোরি নিজের ভেতর থেকে জেগে ওঠে। কিন্তু সে চুপচাপ ঘুমের ভান করে পড়ে থাকে।
বাবা ওর কাছে আসেন।
ওর শরীরের উপর থেকে সরে যাওয়া পাতলা চাদরটিকে পরম মমতায় গলা পর্যন্ত টেনে দেন। এরপর ওর মাথার পাশে কিছু একটা রাখেন। পিম্পি সব কিছু অনুভব করে। কেমন অদ্ভুদ এবং উত্তেজিত বোধ করে। বাবার শরীরের সেই ছেলেবেলায় পাওয়া সুঘ্রাণে নিজের ভালোলাগার কোষগুলো উদ্দীপ্ত হতে থাকে। সে নিজেও জানে না আসলে ভালবাসার ঘ্রানে এই কোষগুলো উদ্দীপ্ত হয়। ওর ভিতরে সাময়িক সেই কোষগুলো নিজেদেরকে যে কোনো কারণেই হোক কিছুদিন সুপ্ত রেখেছিল। আজ সেগুলো জাগ্রত হচ্ছে।

বাবা আঁধারের ভিতর দিয়ে আরো কিছুক্ষণ ওকে দেখলেন। চোখ বুজে থেকেও পিম্পি নিজের ওপর সেই ভালবাসার প্রখর দৃষ্টি কিভাবে যেন অনুভব করছে। এক প্রশান্ত অনুভূতিতে ছেয়ে যাচ্ছে ওর দেহমন! এভাবে কতক্ষণ ছিল সে বলতে পারবে না। একসময় নিজের চোখ খোলে।
সামনে বাবা নেই।
চলে গেছেন।
কিন্তু ভালবাসার অনুভূতি রেখে গেছেন যা এখনো ঘরময় ছড়িয়ে আছে।
উঠে বসে সে। মাথার পাশে রাখা প্যাকেটটি হাতে নেয়। কম্পিত হাতে র‍্যাপিং পেপারটি খোলে।
একটি মোবাইল সেট! ওর আরাধ্য সেই এন্ড্রয়েড সেট!!

এই সময়ে পিম্পি নামের এক নব-কিশোরি ভাবের জগতে এক মিশ্র অনুভূতিতে প্রগলভ হয়ে উঠে। আনন্দ-বেদনা এবং এগুলোকে ছাড়িয়ে অবোধ্য আরো কিছু অনুভূতি- এসব কিছু মিলিয়ে সে কেমন যেন বোধহীন হয়ে পড়ে।
নিজের বাবা যাকে বিগত কয়েকদিন ওর নিজের কাছে অন্য মানুষ লেগেছে… ভেবেছে ওকে নিয়ে তার কোনো অনুভূতি নেই… অন্য বাবাদের থেকে ‘আমার বাবা’ আলাদা… আজ সেই মানুষটি আবারো সেই চিরচেনা রূপে ফিরে এসেছেন!
আনন্দ সেজন্য।
আর বেদনা?
সেই বাবাকে ফিরে পেতে একটি বস্তু ওকে সাহায্য করেছে… একটি চাহিদার পুরণ হওয়াতেই হারানো বাবা ফিরে এসেছেন বলে মনে হবার অনুভূতিটুকু ওর ভিতরে নিজে নিজের কাছে ছোট হবার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। কিছু দিতে পারলেই বাবাকে ‘বাবা’ মনে হবে কেন? না দিতে পারলে কি বাবারা ‘বাবা’ থেকে অন্য মানুষে পরিণত হয়ে যান?

প্রচন্ড একটা কান্না হৃদয়কে সাথে নিয়ে পিম্পির জগৎটিকে নাড়িয়ে দিয়ে চলেছে… নিঃশব্দে… নিরবে… প্রবল অনুভূতিতে এক সদ্য কিশোরি থেকে অনুভূতিতে পুর্ণতা প্রাপ্ত এক নারী তার বাবাকে চিনতে পারে! বাবা বাবা ই। বাবা সব সময়েই বাবা ই থাকেন।
তবে ওর বাবা এরকম চুপিসারে রাতের পর রাত ওকে দেখে যান… ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ এই মানুষটির হয়তো এভাবেই। তার ভালবাসার প্রকাশ করতে তিনি হয়তো লজ্জা পান।

প্রচণ্ড ভালোলাগায় উদ্দীপ্ত হয়ে পিম্পি ভালোবাসাগুলোকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে অস্ফুটে বলে, ‘বাবা! তুমি এমন কেন?’

( চার পর্বের লেখাটি এরই সাথে শেষ হয়ে গেল। )

২৯৬৪৯জন ১৮৪৯২জন
3 Shares

একটি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য