সারা অঙ্গে ব্যাথা, ওষুধ দেব কোথা। এমন অবস্থায় গ্রামের এক নানী বললেন, কলা আর কলা গাছের উপকরন থেকে তৈরি  খাবার খেতে। যুদ্ধ ও যুদ্ধবিদ্ধস্ত সময়টাতে তিনি নাকি তার পাঁচ সন্তানকে নিয়ে কলার এই বারোপদ খেয়েই বেঁচে ছিলেন।

কলা ভিটামিন-বি ও সি-তে ভরপুর। ভিটামিন-বি স্নায়ু দুর্বলতা, রক্তশূন্যতা, কোমরের ব্যথা কমায়। কাঁচকলা প্রচুর পরিমাণে হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে সহায়তা করে।

কলায় থাকা কপার, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ রক্তের জরুরি অংশ আরবিসির পরিমাণ বাড়ায়।

আমাদের সবার কলা নিয়মিতই খাওয়া দরকার। কারণ কলাতে আছে প্রচুর ভিটামিন বি, যা রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণ করে। কলা খেলে উচ্চ রক্তচাপ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যায়। কলায় যথেষ্ট ফাইবার থাকায় ‘হাগু’ সমস্যা দূর হয়। গ্যাস্ট্রিক, আলসার, বুক জ্বালাপোড়ায় পাকা কলা অ্যান্টাসিড ট্যাবলেট হিসেবে কাজ করে। কলায় পর্যাপ্ত শক্তিবর্ধনকারী সুগার থাকায় ক্ষুধা কম লাগে ফলে ওজন কমাতে সাহায্য করে। কলায় প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রয়েছে যার ফলে মানুষের বার্ধক্যকে পিছিয়ে দেয়। শারীরিক পরিশ্রম যারা বেশি করেন, তাদের জন্য কলা উপকারী। কারণ কলা দ্রুত এনার্জি ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে।

কলার ভিটামিন-সি ত্বক দুধে- আলতা এবং চুল উজ্জ্বল ও মসৃণ করে। এ ছাড়া বড় কোনো অপারেশন বা কোনো কারণে প্রচুর রক্তক্ষরণ হলে কাঁচকলার স্যুপ বা কাঁচকলার পাতলা ঝোল রোগীদের উপকারী পথ্য।

কলায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে জিঙ্ক, যা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

কলা অনেক প্রকার হয় যেমন-সবরি, অমৃতসাগর, অগ্নিশ্বর, দুধসর, দুধসাগর, চাম্পা, চিনিচাম্পা, কবরী, চন্দন কবরী, জাবকাঠালী ইত্যাদি । এছাড়া বীজযুক্ত কলা: এটেকলা, বতুর আইটা, গোমা, সাংগী আইটা ইত্যাদি ।

আপনারা হয়তো জানেন, পাকা কলা এমনিতে খাওয়া ছাড়া দুধভাতে খাওয়া যায়। ফলের সালাদেও কলা ব্যবহার করা যায়। কাস্টার্ড, চকোলেট, আইসক্রিমেও পাকা কলা ব্যবহার করা হয়।

এছাড়া তরকারী খাওয়া যায় এমন ধরনের কলাও আছে যার নাম কাঁচকলা। কাঁচকলা তরকারি হিসেবে রেঁধে কিংবা ভর্তা করে খাওয়া যায়।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো কলার অন্যান্য অংশ যা কলা সংগ্রহের আগে ও পরে আমরা নষ্ট করে ফেলি।সেসব থেকেও নানাপদ বানিয়ে খাওয়া যায়। চলুন দেখা যাক কি কি সেই অংশ ও কিভাবে রান্না করা৷ যায়ঃ

 

কলার থোড়ঃ

 

মূলত থোড় হলো ফলন্ত কলা গাছের কাণ্ডের মজ্জা। কলার মতোই এটি বেশ পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। থোড় তরকারি, শরবত সহ নানাভাবে খাওয়া যায়। কলার থোড়ের রয়েছে অনেক উপকারিতা।

১. কোলেস্টেরল ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ

২. অ্যাসিডিটি ও গ্যাসের সমস্যা তাড়াতে

৩. হজম সহায়ক ও বিষনাশক

৪. বৃক্কে পাথর ও মুত্রনালীর প্রদাহের চিকিৎসায়

৪. ওজন কমাতে সাহায্য করে।

” থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়”- বাংলা প্রবাদ। এর অর্থ বৈচিত্র্যহীন। রান্নার বৈচিত্র্যহীনতা, জীবনে বৈচিত্র্যের অভাব—এ রকম বোঝাতে এই প্রবাদ ব্যবহার করা হয়।

থোড় সরষে, থোড় ইলিশ, থোড় পোস্ত, মসুর ডালে থোড় ঘন্ট এরকম হরেকপদ খেতে পারেন। তবে আমি দিচ্ছি থোড় ঈলিশ। ঈলিশ মাছের মাথা দিয়ে এ পদ রান্না করতে হবে।

(রুই মাছে থোরের ডালনা)

থোড় ঈলিশঃ

উপকরণ: কলার থোড় ধুয়ে কিউব করে কেটে নিতে হবে, ঈলিশ মাছের মাথা নেবেন যেরকম খেতে চান, হলুদ গুঁড়া, কাঁচা মরিচ, পেয়াজ কুচি, পেয়াজ বাটা, আদা বাটা, জিরা বাটা, লবণ- স্বাদ মতো, সরিষার তেল। ফোঁড়নের জন্য: গোটা জিরা, এলাচ, দারচিনি, তেজপাতা।

সরিষার তেলে কিউবগুলো হালকা ভাজতে হবে। ভাজা হয়ে গেলে নামিয়ে রেখে ঈলিশ মাছের মাথাগুলোও সামান্য ভেজে নিতে হবে।

এরপর তেলে গোটা জিরা, এলাচ, দারচিনি পরিমান মতো দিয়ে কিছুটা ভেজে নিতে হবে। দুটো/ তিনটে তেজপাতা দিয়ে দেয়া যেতে পারে। এবার পেয়াজ কুচি দিয়ে কিছুক্ষণ ভাজতে হবে। এরপর পেয়াজ বাটা, আদা বাটা,জিরা বাটা,লবন দিয়ে ভালোভাবে কষিয়ে নিতে হবে। মসলা কষানো হয়ে গেলে কলার ভেজে রাখা থোড়গুলো দিয়ে ভালোভাবে নাড়াচাড়া করে কষিয়ে নিতে হবে। এবার ঈলিশের মাথাগুলো উপরে দিয়ে সামান্য কষিয়ে নিতে হবে। কষানো হয়ে গেলে সামান্য পানি ও কাঁচামরিচ দিয়ে ঢেকে রান্না করতে হবে। লাল রঙ করতে চাইলে সামান্য লালগুড়া মরিচ দিয়ে দিতে পারেন। বাসায় ধনেপাতা থাকলে তাও ব্যবহার করা যেতে পারে। দশমিনিট পর ঢাকনা খুলে দেখা যাবে রান্না হয়ে গিয়ে মাখা মাখা একটা অবস্থা। এখন নামিয়ে এনে গরম ভাতের সাথে পরিবেশন করুন!!!

 

কলার মোচাঃ

উপকরণ: ধোয়া কলার মোচা, কুচো চিংড়ি যেরকম খেতে চান, হলুদ গুঁড়া, কাঁচা মরিচ, পেয়াজ কুচি, পেয়াজ বাটা, আদা বাটা, রসুন বাটা, জিরা বাটা, লবণ- স্বাদ মতো, সরিষার তেল। ফোঁড়নের জন্য: জিরা, এলাচ, দারচিনি, তেজপাতা।

 

সরিষার তেলে চিংড়ি মাছগুলোকে হালকা ভেজে লাল করে নিতে হবে। এরপর ওই তেলে ফোঁড়নের জন্য রাখা মসলা দিয়ে সামান্য নেড়ে নিতে হবে। গন্ধ এলে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে ভাজতে হবে এরপর একে একে হলুদ, জিরা, রসুন, আদা, লবন দিয়ে কষিয়ে নিতে হবে। মোটামুটি লাল হয়ে এলে কলার চিকন মোচাগুলো দিয়ে নাড়াচাড়া করতে হবে।( আপনারা কলার মোচার কস ফেলতে চাইলে সেদ্ধ করে পানি ঝড়িয়ে নিতে পারেন। তবে এটা না করাই ভালো। পুষ্টিগুন নষ্ট হয়)। এরপর সামান্য পানি ও চিংড়ি মাছ দিয়ে নাড়াচাড়া করে ঢেকে ১০/১৫ মিনিট সেদ্ধ করতে হবে। মাখামাখা হয়ে এলে নামিয়ে ফেলতে হবে।

 

কলা পিঠাঃ

আমরা যেটাকে বিচিকলা বলি। এর পিঠা সবচেয়ে সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর। পিঠা বানাতে চাইলে একটু কষ্ট করে চালতে হবে। বাঁশের চালুনি থাকলে আমরা তা ব্যবহার করতে পারি। না হলে স্টিলের চালনী দিয়ে কলার নরম অংশ ছেঁচে নিতে হবে।

পিঠা মানেই তেল দিয়ে বানানো ভাজা/ পোঁড়া। আজকাল আমরা নানা রোগে ভুগি তাই এসব তেলচর্বি এড়িয়ে চলা দরকার। কিন্তু পিঠা খেতেও মন চায়। সহজলভ্য তেলহীন এ পিঠা খাওয়া যেতে পারে। কলা পিঠা তেল ছাড়া দুভাবে খাওয়া যায়। প্রসেস একই শুধু একটা মাটির ছড়ানো পাত্রে সেকতে হবে আর একটা ভাপে সেদ্ধ করতে হবে।

কলা পিঠার উপকরণঃ

বাড়িতে চালের গুড়া তো থাকেই। বিশেষ করে এ সময়টাতে। কারন আমরা মহররম উপলক্ষে চালের রুটি তো খেয়ে থাকি। বিন্নি চালের গুড়া বা আতপ চালের গুড়া যেমন পিঠা বানাবেন সে অনুযায়ী নিতে হবে। কচি কলা পাতা লাগবে। স্বাদ বাড়াতে নারিকেল কুড়ানো ব্যবহার করতে পারেন। আর ফেলে দেবার আগের একদম নরম তুলতুলে পাকা কলা, লবন পরিমানমতো।

 

কলা পিঠা তৈরির পদ্ধতিঃ

প্রথমে চাউলের গুঁড়ার সাথে সামান্য পরিমাণ লবণ দিয়ে নারিকেল কুড়ানো মিশিয়ে নিতে হবে। হাত দিয়ে ভালোভাবে মেশানো হয়ে গেলে পাকা কলা চাউলের গুঁড়ায় পানি দিয়ে আবার কষিয়ে মিহি মিশ্রন করে ফেলতে হবে। অতিরিক্ত পানি দেয়া যাবে না কারন চাউলের গুঁড়ার মন্ডটি খুব বেশি নরম হলে সমস্যা হবে।

এবার কলাপাতা গুলো আপনার পছন্দের সাইজ অনুযায়ী ছিঁড়ে নিতে হবে। সেঁকে খেতে চাইলে কলা পাতার উপর সামান্য তেল ব্যবহার করতে হবে। এরপর পরিমানমত চাউলের মন্ড দিয়ে কলা পাতা মুড়িয়ে পাতা বাঁশের শলাকা দিয়ে গেঁথে দিতে হবে। যাতে খুলে না যায় সেজন্য  সুতা দিয়ে বেঁধে দেয়া যেতে পারে। এভাবে সব চাউলের গুঁড়া পিস পিস করে কলা পাতায় মুড়িয়ে নিতে হবে।

এবার একটি মাটির পাত্রে দুটো তিনটে করে পিঠা দিয়ে উল্টে পাল্টে সেঁকে নিতে হবে। সামান্য পোঁড়া পোঁড়া হলে নামিয়ে গরম গরম খাওয়া যেতে পারে। ঠান্ডা হলে আরও ভালো লাগে। ফ্রিজে রেখে বেশ কদিন খাওয়া যায়।

 

আর সেদ্ধ খেতে চাইলে পাত্রে পানি দিয়ে চুলায় গরম করে নিতে হবে। এরপর গরম পানির পাত্রের উপর আরেকটি ছিদ্রযুক্ত পাত্র বসিয়ে দিতে হবে। তাতে কলার পিঠা আস্তে আস্তে বসিয়ে দিতে হবে যাতে ছিদ্রগুলো বন্ধ না হয়। ছিদ্রগুলো বন্ধ হয়ে গেলে কিন্তু গরম বাষ্প বের হতে পারবেনা এবং পিঠা সিদ্ধ হবে না। এবার উপরের পাত্রটি একটা ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। হাত দিয়ে সেদ্ধ হয়েছে কিনা দেখে নামাতে হবে।

এছাড়াও তেলে বানানো অসংখ্য পদ রয়েছে। আমি যেহেতু তেল বিরোধী তাই বওনা তেলেরটাই দিলাম। বাড়ির কলা পচেঁ যাবার আগে অন্ততঃ ট্রাই করুন প্রিয় মানুষদের জন্য।

” কলা রুয়ে না কেটো পাত, তাতেই কাপড়, তাতেই ভাত” এটি বহুল প্রচলিত খনার বচন। যার অর্থ কলা লাগিয়ে তার পাতা ছেঁটে না ফেললে, এই এক কলা রুয়েই ভাত, কাপড় দুটোই হয়।

আসলেই কলা এমন এক জিনিস যার সর্বঅঙ্গই খাদ্য হিসেবে উপাদেয়। আর কলা চাষ পদ্ধতিতে তেমন কোন টেকনিক প্রয়োজন নেই। কলা রোদ, ছায়া সব জায়গাতেই হয়। বাড়ির আশেপাশে পরিত্যক্ত জায়গায় কচি কলা গাছের চারা থেকে আমরা অনায়াসেই কলা চাষ করতে পারি। তাই আজই কলা গাছ লাগান, পুষ্টিতে সমৃদ্ধ করুন আপনার পরিবারকে! শুভ রাত্রি 🌹🌹

ছবি- নেট ও আমার।

 

১৭৫জন ৪৮জন
0 Shares

৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ