বাক্সবন্দি… (১ম পর্ব)

নৃ মাসুদ রানা ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২০, বুধবার, ১১:২৫:১৬পূর্বাহ্ন উপন্যাস ১৭ মন্তব্য

বাক্সবন্দী
– নৃ মাসুদ রানা

(আমার ড্রিম প্রজেক্ট/উপন্যাস)

এলার্ম বেজে উঠলো। সম্পর্কের এলার্ম। হৃৎপিণ্ডের এলার্ম। দেহের কলকব্জার এলার্ম। যে এলার্মে নাড়িরটান রয়েছে। গাঁথুনি রয়েছে মন মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে। দেহ ভিটা খন্ড দ্বিখণ্ডিত হলেও স্বাদের অভাববোধ হবে না।
আজানও হলো। মিষ্টি সুরের আজান। মিষ্টি কন্ঠের আজান। শ্রোতাপ্রিয় আজান। আত্মার আজান। কলিজার আজান। যে আজানের ধ্বনিতে আত্মতৃপ্তি বেঁচে আছে। বেঁচে থাকার স্বাদ আহ্লাদ আছে। যে স্বাদের অভাববোধ মিটবে না। আজীবন এ স্বাদের অভিজাত হোটেলে যাওয়ার নেশা থাকবে।
ঘুম ভাঙলো নহরের। ঘুমকাতুরে শরীরের ঘুম ভাঙলো। আলসেমিকে হত্যার ঘুম ভাঙলো। পুরো রাত পাহারার ঘুম ভাঙলো। যে রাতের অন্ধকারের অনুসন্ধানে অনেকেই কুকাজে বিভোর হয়ে আছে। পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য।
আজ খুব দ্রুতই চাবিটা খুঁজে পাওয়া গেলো। অবশ্য, এজন্য চোখেমুখে মিষ্টি হাসির ছাপ জ্বলে উঠলো। যেই মনভোলা মানুষ নহর। সে কথা বললে দিন ফুরিয়ে রাত হয়ে যাবে। তবে, একটা ঘটনা বলা যেতে পারে।
১৩ ফেব্রুয়ারীর রাত ছিলো সেদিন। সে রাত ছিলো ভালোবাসার রাত। প্রিয়তমার সাথে কথোপকথনের রাত। মনের গোপন কথাটি প্রকাশ করার রাত। যে রাতে প্রেমিকরা ভালোবাসা প্রকাশ করে। আর প্রেমিকারা আত্মতৃপ্তিতে গ্রহণ করে। সে রাতেও এরকম একটি ঘটনা ঘটে যাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু আদালতে স্বাক্ষী দিতে এসেও আসল কথাটি বলা হয়নি।
সে রাতে একটি শর্ত ছিলো। ফোন কেটে গেলে রাতে আর কথা হবে না। প্রকাশ না পাওয়া কথাটিও এবছর আর বলা যাবে না। ঘটনাটি সেরকমই হলো। সেদিন ১৩ তারিখ সারাদিনও সিমকার্ডে পর্যাপ্ত টাকা ফ্লেক্সিলড করার কথা মনে থাকলেও অফিস থেকে বাসায় ফেরার পর আর মনে নেই। অগত্যাই, ১৭ মিনিট পরে সংযোগটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। আর হুট করে মনে হলো বোকামি স্বভাবের অভাব বোধের কথা।
এই প্রথম রাত সাড়ে এগারোটার পর নহর ঢাকার রাস্তায়। অবশ্য সে জানতো ফ্লেক্সিলডের দোকান খোলা পাওয়া যাবে না। কিন্তু তবুও শর্ত ভাঙার অজুহাতে, প্রিয় মানুষটির সঙ্গে গোপন কথা পরিচয় করার জন্য আসতেই হয়েছিল। কিন্তু এ শপথের যাত্রাপথে সময়গুলো ছিলো বিভ্রান্তিকর, অন্ধকার, বাঁধ ভাঙার আওয়াজ।
ওপাশের ফিরতি কলের আশাও ছিলো না। সে সুযোগের সু্যোগ্য পুত্র হয়তো জন্ম নিয়েও রোগশোকে আক্রান্ত। কেননা, মোবাইল ব্যালেন্সের দুটাকা খরচ হলেও প্রিয় মানুষটিকে কৈফিয়ত দিতে হতো। নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হতো। গ্রামের মেয়েদের এই একটি মাত্রই জ্বালা। তাদের ইচ্ছে থাকলেও মোবাইলে ফ্লেক্সিলড করতে পারে না। ফ্লেক্সিলডের দোকানে ঢুকলেই কেউ একজন নিশ্চয়ই বাড়িতে বলে দেবে। এ জ্বালার জাতাঁকলে পিষ্ট হয়ে অনেক প্রেমিকারা দুমড়েমুচড়ে নিঃশেষ হয়ে যায়।
আজ সবকিছু যেন চমকিত। চমৎকার হাসিখুশী মাখা সকাল। এ সকালের অনুসন্ধান পেতেই সন্ধানের প্রহর গুনেছে নহর। অবশেষে ষাটোর্ধ চিন্তাভাবনার ফলাফল মিলেছে আজ।
হাতের নাগালের কাছেই পাওয়া যাচ্ছে সব। টুপি, ঘড়ি, ভাঁজকরা পাঞ্জাবি। এমনকি প্রিয় মানুষটির ফোনকল। সম্পর্কের এতো হয়ে গেলেও মিসডকল কল ছাড়া কোনকিছু মেলেনি। কিন্তু আজ! আজ তার সাথে কথাও হলো। সত্যি! আজকের দিনটা হাজার দিনের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণও মিলেছে।
মেইন গেটের তালাটিও আজকে প্রথমবারেই খুলে গেলো। কোন ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হয়নি। অন্যদিন তালা খুলতেই বাড়িওয়ালার উপর রাগে শরীরটা কিলবিল করে উঠতো। বারবার বলা সত্বেও তিনি তালা বদলায়নি। তবে আজকে অবশ্য মনের মধ্যে গালি উচ্চারিত হয়নি।
বুয়া খালাও আজ দ্রুত এসেছে। সকাল ০৭ঃ৩০ মিনিটে। এর আগে কোনদিন এতো সকালে আসেনি। অবশ্য তিনি মাঝেমধ্যে দেরি করলেও তার রান্নাঘর খুবই পরিছন্ন ও পরিপাটি করে রাখে। আর তার হাতের রান্না দুর্দান্ত। ঠোঁটে মুখে জিহবায় স্বাদ লেগে থাকে।
‘খালা, আপনি! এতো সকালে।’
‘হ বাজান। আইজকা সকাল সকালেই আইলাম।’
‘না মানে। আপনিতো কোনদিন এতো সকালে আসেননি। সেজন্য বললাম আরকি।’
‘বাসায় দেশ থেইক্কা কুটুম আইছে। বড় মেয়র শ্বশুর। ডাক্তার দেখাইতে। হাঁপানি হইছে। আর শ্বাস কষ্ট। এজন্যই…।
‘এসেছেন, ভালো করেছেন। আপনার বোনাসসহ বেতন আর ঐ প্যাকেটটা নিয়ে যাইয়েন যাওয়ার সময়।’
এই প্রথম বাসা থেকে সকালের নাস্তা করে অফিসে যাচ্ছে নহর। অবশ্য, সকালের নাস্তা প্রায়শই সে বাইরে করে। এই প্রথম এতোদিনের নিয়মতান্ত্রিক রুটিন ভেঙে সকালের নাস্তা করা। অবশ্য নহরের কাছে সকালের নাস্তা বেশ ভালোই লেগেছে।
‘মামা, বাড়িত যাইবেন কবে?
‘এইতো মামা, আজকে যাবো ইনশাআল্লাহ। দোয়া করবেন।’
‘হ, মামা। ইনশাআল্লাহ ভালোভাবে যাইয়েন।’
‘ঠিক আছে। ভালো থাকেন মামা। বিকেলে নাও দেখা হতে পারে।’
শফিক সাহেব খুবই ভদ্র একটা মানুষ। মুদির দোকানের মালিক। নহরের সাথে সম্পর্কটা বেশ ঘনিষ্ঠ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। মসজিদেই শফিক সাহেবের সাথে আলাপ হয় নহরের।
মোবাইলটা বেজে ওঠে নহরের। অফিসের কলিগ। মিন্টু মিয়া। টাক মাথাওয়ালা। তবে বেশ রসিক। শুধু বিয়ে আর তার বউয়ের কথা বলে। একদম বউ পাগল। নহরের সাথে তুইতোকারি সম্পর্ক। নহরের সবচেয়ে কাছের বন্ধু সে। ওপাশ থেকে বলে উঠলো –
‘কি রে! কোথায় তুই?’
‘এইতো অফিস যাচ্ছি। তুই কোথায়?’
‘আমিতো বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দিয়েছি।’
‘ও, আচ্ছা। তাহলে তো তোর সাথে আর দেখা হবে না।’
‘হুমম, সেটাই। ভালো থাকিস। বাড়িতে গিয়ে কথা হবে।’
‘ঠিক আছে। চাচা চাচিরে আমার সালাম দিস।’
নহর বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ কোত্থেকে যেন ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি পরে, নুরানির মতো চেহারার একজন অপরিচিত মানুষ এসে পাশে দাঁড়ালো। নহরের কাছে লোকটাকে বেশ পরিচিত হচ্ছে। মনে হচ্ছিল কোথায় যেন তাদের সাক্ষাৎ হয়েছে। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছে না।
একই বাসের পাশাপাশি সিটে বসলো দুইজন। মিষ্টি হাসির মোলাকাতও হলো। কিন্তু কোন কথাবার্তা হলো। শুধু শুধু একে অপরের দিকে চেয়ে থাকা। কোন সাড়াশব্দ নেই। নেই কোন কোলাহল। সময় যেন কিছুটা থমকে দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ একটা প্রচন্ড বিকট শব্দ এসে এলোমেলো করে দিলো সব।
দূর্ঘটনাটা। বাসে ট্রাকে মুখোমুখি।

১৮১জন ৪৭জন
19 Shares

১৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য