“বাইক সার্ভিস”

রেজওয়ানা কবির ১৩ জানুয়ারী ২০২১, বুধবার, ০৮:০৮:১০অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ১৮ মন্তব্য

 

আমার জীবনের প্রথম বাইকে চড়া দাদু ভাইয়ের সাথে। অত ছোটবেলার কথা মনে নাই,আম্মুর কাছে শোনা যে দাদু ভাই একটা গামছা আমার সাথে তার পেটে বেঁধে সামনে বসিয়ে ঘুরে বেড়াত আর আমার মুখে নাকি ফোকলা হাসি লেগে থাকত। তারপর যখন একটু বড় হয়েছি তখন থেকে আব্বু, মেজ বাপ্পি, ছোট চাচার বাইকে চড়ে ঘুরে বেড়ানো।

পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু করে সব অকেশনে বাবার সাথে বাইকে ঘুরে বেড়ানো খুব মিস করি এখনো।

এরপর পড়াশুনা শেষে চাকুরিজগতে প্রবেশ করে বাইকের যে কি কদর তা ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম।

প্রথম জব শুরু করি প্রদীপনে। আমি থাকতাম বিডি আর ২ নং গেইট, আমার অফিস ছিল লালমাটিয়া। প্রতিদিন হন্তদন্ত করে দৌড় প্রতিযোগিতার মত ছুটে ছুটে লোকাল বাস বা লেগুনায় গিয়ে উঠতাম, চাকুরী তো করতে হবে তাই এভাবেই গিয়েছিল ১ বছর। অফিস যাওয়ার সময় রাস্তায় কোন বাইক দেখলেই মনে মনে ভাবতাম ইশ! যদি বাইকওয়ালাগুলো আমার পরিচিত হত, তবে খুব তাড়াতাড়ি গন্তব্যে পৌছে যেতাম।

এরপর বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্টে জয়েন করলাম। যদিও আমার রেগুলার অফিস ছিল ঢাকা উদ্যান  তবুও প্রতি মাসে মানথলি মিটিং ছিল কাকরাইল। যখন থেকে মিটিং এর তারিখ আসে মনে দুই ধরনের দোলা দেয়। এক, আনন্দ যে মুহিব ভাই, সামাদ ভাই, সাব্বির ভাই,তানজিলা আপুর সাথে দেখা হবে এই ভেবে,দুই হল,উফফফ! কিভাবে অত সকালে উঠে অতদুর বাসের পিছনে দৌড়ে ঠিক সময় মিটিং এটেন্ড করা। তখনও খুব মিস করতাম বাইক।।।

বলাবাহুল্য, আমি খুব আড্ডাবাজ একটা মেয়ে, ভার্সিটি থেকে শুরু করে প্রত্যেক জায়গায় আমার একটা করে সার্কেল আছে যাদের সাথে প্রচুর আড্ডা দেই। প্রত্যেক চাকুরীর জায়গায়ও আমার খুব কাছের মানুষ ছিল তবে কম সংখ্যক যাদের সাথে অফিস শেষে গল্প করে, চা খেয়ে প্রতিদিন বাসায় আসতাম। কত সুন্দর ছিল দিনগুলি!

এরপর জয়েন করলাম সাজেদা ফাউন্ডেশনে। তখন থাকতাম মোহাম্মাদপুর, অফিস ছিল ফার্মগেইট। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে আবারও দৌড় প্রতিযোগিতার খাতায় নাম লিখাতাম। সেখানে ও আমার দুই তিন জন প্রিয় বন্ধু তৈরি  হল,শাহারিয়ার ভাই, পিসি ভাই, তানিয়া, কামরুন,  পলি, রোমানাসহ আরও অনেকে । তবে বসের সাথে এত ভালো সম্পর্কও হয়,দুষ্টামি থেকে শুরু করে সব মজা আমি পিসি ভাইয়ের সাথে করতাম। ভাইয়া ও খুব ভালো মানুষ। এখনো মাঝে মাঝে ভিডিও কলে কথা হলে মনে হয় আমি তাদের সাথেই আছি। সম্পর্ক এমন ও হয়। অনেকদিন কথা না হলেও মনে হয় অনেক আপন। যাইহোক,  এক দিন হঠাৎ শাহারিয়ার ভাই পাঠাও আ্যপস  সম্পর্কে জানালেন।

পাঠাও অ্যাপসঃ পাঠাও রাইড নিয়ে ট্র্যাফিক জ্যাম এড়িয়ে ঢাকার যেকোন জায়গায় পৌছে যান দ্রুত এবং সাশ্রয়ী রেটে!

কিভাবে পাঠাও রাইড পাবেন?

– পাঠাও অ্যাপটি ইন্সটল করুন

– ফোন নাম্বার দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করুন

– অ্যাপ থেকে আপনার পিক আপ পয়েন্ট এবং ডেস্টিনেশন পয়েন্ট সিলেক্ট করুন।

– এস্টিমেটেড ভাড়া জেনে রাইড কনফার্ম করুন।

– আপনার লোকেশনের কাছের রাইডার আপনার রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট করে আপনার পিক আপ পয়েন্টে আসবে এবং আপনার ডেস্টিনেশনে পৌঁছে দিবে।

– রাইডারকে ভাড়া পরিশোধ করুন এবং আপনার রাইডের রেটিং দিন।

মনে হলো আমি আকাশ হাতে পেলাম, সাথে সাথে শরীরের সমস্ত ক্লান্তি যেন উধাও হয়ে গেল। শুরু হল আমার পাঠাও সার্ভিস উপভোগ। তার পর থেকে ঢাকা শহরের আলিতে গলিতে আমার বন্ধু হয় উঠল পাঠাও সার্ভিস। ছোটবেলায় বাইকে চড়ার আনন্দ ছিল এক রকম, এর এখন এই ভেবে আনন্দ হয় যে, যার বাইকই পাই না কেন গন্তব্যে পৌঁছাতে পারলেই হল।

শুরু হল চাকুরি ক্ষেত্রে  নতুন সুচনা।  ঘুম থেকে উঠে পাঠাও আ্যপসের মাধ্যমে বাইক ডেকে, সেই বাইকে চড়ে চলে যেতাম সময়মত আফিস।

” আহা,,!  কি! আনন্দ

আকাশে  বাতাসে”।

এরপর চাকুরিসূত্রে চলে এলাম আমার নিজ এলাকায়। জয়েন করলাম কলেজে। আমার বাসা থেকে কলেজের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিঃমি। শুরু হল আধো ঘুম চোখ নিয়ে বাসের পিছনে দৌড়ানো। যদি কোন করনে বাসা থেকে  পাঁচ  মিনিট  দেরি হত সে দিন  আর রক্ষা পেতাম না। এভাবে  পথ চলতে চলতে শিখলাম ভালো মন্দ সহ নতুন কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয়।

এক দিন ক্লাসের সময় ছিল দশটা দশ  মিনিট। সে দিন কুড়িগ্রামে কোন এক কারনে বাস বন্ধ ছিল, আটোতে যেতে প্রায় আড়ায় ঘন্টা। বাসা থেকে বের হয়ে দেখি এই অবস্থা!কি করব বুঝতে  পারছিলাম না। খুব মিস করসিলাম  পাঠাও কে। কিন্তু তবু যেতে হবে😭😭😭

হঠাৎ দেখি গরুসহ এক পিকাপ। পিকাপে ছিল প্রায়  ১০/১২ টা গরু ।  আমার সাথে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল ভুরুঙ্গামারী  রোডের কয়েকজন পরিচিত কন্টাকটার তাদের সাথে আমিও গরুর পিকাপে উঠলাম ।  সবাই ড্যাব  ড্যাব করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।  কিন্তু আমি অসহায়, বুঝতে পারছিলাম এটা মফসল এলাকা তাই তাদের কাছে বিষয়টা আরও অদ্ভুত লাগছিল।

কিন্তু উপায়তো নাই সময়মত যেতেই হবে। সেদিন পরেছিলাম লাল জামদানি, গরুর সাথে আমি দাঁড়িয়ে, খুব ভয় ও লাগছিল, কখন যে গরু ধাক্কা দেয় এই আতংকে ছিলাম।  আমার লাল শাড়ী দেখে গরুরা মনে হয় আমায় চুমু দিতে চাচ্ছে,ভাবেন গরুর চুমু কি অদ্ভুত! পাঠকবৃন্দ, আপনাদের কাছে হাসির মনে হচ্ছে কিন্তু খুব দুঃখজনক ব্যাপার  আমার জন্য। এরকম অনেক ঘটনা আছে যা পরে একসময় লিখব।

যাইহোক এভাবেই দৌড়ে দৌড়ে যাওয়া প্রতিদিন আমার গন্তব্যে। কিন্তু অসহায় এই আমি, রাস্তায় বিপদে পরলেই, দেরি হলেই চোখ দুটো দিয়ে শুধু ভুরুঙ্গামারী রোডে আমার বাইকওয়ালা কলিগদের খুঁজতাম, কেননা আমার এই জায়গায় কলিগরা ছাড়া পরিচিত মানুষ খুবই কম। আরেকটু বলে রাখি আমার সব কলিগরাই সেখানকার স্থানীয় শুধু আমি ছাড়া । যেদিন  যেতে দেরি হয় সেদিন মনে মনে শুধু দোয়া পড়ি ইশ!  আল্লাহ যেকোনো বাইক ওয়ালা কলিগদের  সাথে যেন দেখা হয়,তাদের সাথে গেলে আমার ক্লাস ধরাটা সহজ হয়। কিন্তু এতদুর থেকে যাই খুব কষ্ট হয়। ফেরার পথে সমস্যা নেই যত সমস্যা যাওয়ার সময়।  ইশ! যদি পাঠাও সার্ভিস এখানে থাকত তবে এই ঝামেলা হত না।   তবে অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে এইখানে এসে।

এবার আসি কালকের ঘটনায়। কিছুদিন থেকেই রংপুরে বাবার বাড়িতে আছি,হঠাৎ কাজে কলেজ যেতে হবে। রংপুর থেকে ভুরুঙ্গামারী প্রায় ১১০ কিঃ মি। ঘুম থেকে উঠলাম সকাল ৭ টায়,কুয়াশায় কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না, লাহিড়ীরহাটে দাঁড়িয়ে আছি অটোর জন্য, মেজ বাপ্পিকে বললেই রংপুরে এগিয়ে দিত, আব্বুও অসুস্থ,কিন্তু এত ঠান্ডায় তাদের আর বলতে ইচ্ছে হয় নি, তাই ডাকিনি। তবে যেকোনো বাইকের আশা করছিলাম, কারন আমার এলাকায় সবাই চেনে কেউ দেখলে তারা নিজেরাই দাঁড়াবে এই বিশ্বাসে দাঁড়িয়ে আছি।  তাই হল ও,হঠাৎ একটা বাইকওয়ালা চোখ মুখ বাঁধা সামনে দাঁড়ালো,যাক বাঁচা গেল রংপুর পর্যন্ত গেলেই  সুবিধা।

চাচাঃ কোথায় যাচ্ছ মা

আমিঃ রংপুর

চাচাঃ মুখ মাস্ক থেকে খুলল

আমিঃ আনন্দে চিৎকার করে উঠলাম, কেন জানেন???এই চাচা পল্লী বিদ্যুৎ কুড়িগ্রামে চাকুরী করে।

চাচার সাথে কুড়িগ্রাম পৌছালাম,বগুড়া হোটেলে খিচুড়ি খেয়ে  হাত ধুবো সেই সময় আজাদের পরিচত ছোট ভাই,

ছোট ভাইঃ ভাবী কই যান

আমিঃ ভুরুঙ্গামারী

ভাবিঃ আমার বাড়ি ওখানেই, চলেন

আমিঃ এত খুশি মনে হয় জীবনে হই নি কারন কাল কেই আমার আবার রংপুর ফিরতে হবে। মনে হল আজ কার মুখ দেখে যে বেড়িয়েছি, আনন্দে চোখেই পানি এল।  এভাবেই কাল ছিল আমার বাইক জার্নি।

আমরা অনেক সময়, সময় হাতে নিয়ে বেড়োলেও  সঠিক সময়ে পাৌছাতে পারি না,কিন্তু চাকরি ক্ষেত্রে বস কি সবসময় বুঝবে?? তাই অগত্যা পরিচিত যে কারোর  বাইক পেলেই উঠে পরি। বস হয়ত দেরি হলে বড়জোর বকা দেয়, কিন্তু ক্ষতি হয় আমার ছাত্রছাত্রীদের কারন ৪০ মিনিটের ক্লাস,দেরি হলেই পরের ক্লাস শুরু হয়।  আর এখানে পাঠাও সার্ভিস ও নাই। ইশ! যদি থাকত, তবে আর আমার যেকোনো পরিচিত বাইকওয়ালা খুঁজতে হত না। অপরিচিত হলেও আমার পাঠাওই ভালো, প্রয়োজনের সঙ্গী।

আমার কাছে মনে হয় যে কাজই করি না কেন?তা সময়মত করতে পারলেই হল।

 

এখন পর্যন্ত আমি যাদের বাইকেই প্রয়োজনে উঠেছি সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ, আপনারা নিজেরাও জানেন না আমার কত বড় উপকার করেছেন। আপনাদের কাছে আমি ঋনি।

আজ এ পর্যন্ত,,,,,,,,,,।

ছবিঃ আমার একমাত্র ভাই সাবিক আহনাফ।

 

৩৯৩জন ২০১জন
14 Shares

১৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ