ব্লগ নিয়ে লিখতে হলে প্রথমেই জানতে হবে ব্লগ কি ? ব্লগ সম্পর্কে অনেক কিছু জানি তা নয়, তবে যতটুকু জানি/ বুঝি তা থেকেই বলার চেষ্টা করবো। ব্লগ হচ্ছে ডায়েরি লেখার মতো। নিজের প্রাত্যহিক জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা সমূহ নিজস্ব দৃষ্টি ভঙ্গিতে বিচার বিশ্লেষণ করে লেখার মাধ্যমে অন্যদের জানানোটাই হলো ব্লগ। যিনি ব্লগ লিখেন তাকে ব্লগার বলা হয়।

একজন ব্লগার যেকোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে লিখতে পারেন, অথবা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ নিয়েও লিখতে পারেন। ব্লগার যা ভাবেন সেটাই তিনি স্বাধীনভাবে প্রকাশ করার চেষ্টা করেন। নিজ মনোভাব প্রকাশে ব্লগের ভুমিকা অপরিসীম। এটা এমন একটি প্লাটফর্ম যেখানে খুব সহজেই নির্ধারিত বিষয়ের উপর নিজের বিবেচনা ও অন্যের মতামত আদান প্রদান করা যায়। বিশ্বের সব দেশেই নিজ নিজ ভাষার ব্লগ আছে। ব্লগে রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ হতে শুরু করে দলমত নির্বিশেষে সবাই অংশ নিতে পারেন। আমাদের দেশেও বড়ো ছোটো প্রচুর পরিমানে ব্লগ আছে। কোনোটি ব্যাক্তিগত আবার কোনোটি উন্মুক্ত। কিছু কিছু ব্লগ দলীয়ভাবেও আছে। রাজনীতি, খেলাধুলা, শিক্ষা, চিকিৎসা, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, আস্তিক, নাস্তিক, মুক্তমনা, এমন শতশত রকমের ব্লগ নেটে সার্চ দিলেই পাওয়া যাবে। চাহিদা ও রুচির অনুযায়ী নানা জনে নানারকম ব্লগ বেছে নেন। অনলাইনে যারা লেখা-পড়া করেন তারা ব্লগ সম্পর্কে বেশি আগ্রহী থাকেন। এমন কোনো তথ্য উপাত্ত নেই যা ব্লগ থেকে পাওয়া যায়না। সমসাময়িক ঘটনাবলি সহ শিল্প-সাহিত্য সব কিছুই ব্লগে বিদ্যমান।

বর্তমানে ব্লগ ছাড়াও অন্যান্য সোস্যাল মিডিয়াতেও মানুষ লেখালেখি করে থাকেন। ফেসবুক লেখার জগতে জনপ্রিয়তার সবচেয়ে শীর্ষে। ফেসবুকের কল্যাণে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ রাতারাতি লেখকে পরিনত হয়ে যেতে পারেন। ব্লগ ও ফেসবুক দুটোই লেখাপড়ার ক্ষেত্র হলেও এ দু’টোর মাঝে মিল খুব সামান্যই। একজন ফেসবুকার ইচ্ছে করলেই যে কারো লেখা কপি করে নিজের বলে চালিয়ে দিতে পারেন, বিতর্কিত লেখা লিখে মন্তব্য নিজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন, এমনকি তার লেখার পাঠক সংখ্যাও নির্ধারিত করে রাখতে পারেন। কিন্তু ব্লগ ফেসবুক থেকে একেবারেই বিপরীত। ব্লগে একজন লেখকের কাছে অন্যের লেখা কপি করা বা অন্যের লেখা নকল করাকে অসম্মানজনক মনে করা হয়। একজন ব্লগার কখনোই নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে রাজি নন। নিজের চিন্তা চেতনা, মেধা আর শ্রমের সমন্বয়ে তিনি লেখেন। তার রচিত রচনা কেবল তারই সৃষ্টি হিসেবে পরিচিতি পায়। উন্মুক্ত মনে স্বাধীনভাবে সে যা কিছু গড়ে তোলেন তাই পরবর্তীতে অন্যদের নিকট অনুস্মরণীয় হয়ে উঠে। ব্যাক্তিগত ব্লগে যারা লেখেন তারা খুব একটা সমস্যায় না ভুগলেও উন্মুক্ত ব্লগে ব্লগারদের নানাবিধ সমস্যায় পড়তে হয়। অনেক সময় অতি সাধারণ লেখার কারণে মতামতের ভিন্নতায় বড়ো ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে বাধ্য হয়। কারণ উন্মুক্ত ব্লগে লেখক-পাঠক কেউই দূর্বল নন। মন্তব্য-প্রতি মন্তব্য, কঠোর সমালোচনা কোনো কিছুই নিয়ন্ত্রিত থাকে না। অনেক ব্লগাররা এসব কারণে ব্লগিং ছেড়ে দিতেও বাধ্য হয়ে পড়েন। আমাদের দেশে ব্লগ ও ব্লগিংয়ে কতজন চিরতরে হারিয়ে গেছেন তা জানতে হলে খুব বেশি দূরের ইতিহাস ঘাটতে হবে না। একটি দেশ বা জাতির উপর ব্লগ এবং ব্লগারদের ভুমিকা অত্যন্ত বলিষ্ঠ রূপ নিতে সক্ষম। আমাদের দেশে অস্থিতিশীল ব্লগিংয়ের জন্যে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার ব্লগ ও ব্লগারদের জন্যে আইন আরোপ করতে বাধ্য হয়েছেন।

আমার ব্লগ জীবনের শুরুটা বেশ সাদামাটা ভাবেই হয়েছিলো। ফেসবুকের এক নামকরা গ্রুপের সাথে এ্যাড থাকার সুবাদে বিভিন্ন ব্লগে ঘোরাঘুরি করতাম। গ্রুপটা ব্লগারদের মিলনস্থল ছিলো। নানামতের নানা স্বভাবের ব্লগারদের দেখতাম। কখনো হয়তো লিখতাম, কমেন্ট-রিপ্লাইয়ের তোড়ে ভুলেই যেতাম কী লিখেছি। এক সময় সব বাদ দিয়ে থিতু হয়ে গেলাম। কী হবে ব্লগার হয়ে যদি ঘাড়ে মাথাই না থাকে !! ব্লগার মানেই নাস্তিক কথাটা শুনে শুনে সেই যে কান একটা বাঁকা হলো তা এখনো মাঝে মাঝে সোজা হয় না।

একদিন খুব প্রিয় শ্রদ্ধেয় একজন আমায় দেখালেন তার অতিপ্রিয় সোনেলার উঠোন। প্রথম দেখাতেই মন জয় করে নিয়েছিল সোনেলার সৌন্দর্য। তার আমন্ত্রণের উত্তরে বলেছিলাম, এখন না। পরে হয়তো কোনোদিন দেখা হবে আপনার সোনেলায়। তারপর কেটে গেছে দিন-মাস-বছর। উঠোনে প্রবেশ না করেই ধীরে ধীরে চিনে নিয়েছি সোনেলার সোনালী মানুষদের। তাদের লেখা পড়ে হেসেছি , তাদের হাসি-আনন্দ দূর থেকে দেখেছি। ভালো লাগার তালিকায় যোগ করেছি সোনেলার সোনালী উঠোন। তারপর একদিন সোনেলার বাসিন্দারা আমায় ডেকে নিলেন তাদের মাঝে। মায়া, মমতা, ভালোবাসা, সম্মান, স্নেহ , সহযোগীতা সব কিছু উজার করে দিলেন আমার দুহাত ভরে। আমার ঠিকানা হয়ে গেলো সোনেলা ব্লগ। আমার পরিবারের নাম সোনেলা পরিবার।

সোনেলা নামকরণই বলে দেয় সোনেলা ব্লগের স্বকীয়তা। সোনেলার আভিধানিক কোনো অর্থ নেই। সম্পূর্ণটাই উপলব্ধির। এক কবি এক ঝকঝকে দুপুরে আনমনে বসে ছিলেন। হঠাৎ করেই সোনালি রোদের সৌন্দর্যে বিমোহিত হলেন। নির্মল আকাশ চারিদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এর মাঝে ঝক্‌ঝকে রোদ। তিনি এই উজ্জল রোদকে তার প্রেমিকা হিসেবেই কল্পনা করলেন, যে তার সমস্ত অস্তিত্বকে এক অপার আলোতে উজ্জল করে দিয়েছে। এই প্রেমিকার নাম দিলেন সোনেলা। সম্ভবত সেই কবি ছিলেন জীবনানন্দ। সোনেলা হচ্ছে এক উজ্জল প্রেমময় রোদের নাম। সোনেলা ব্লগের নাম সোনেলা হয়েছে ব্লগ পরিবারের অবিচ্ছেদ্য একজনের কারণে। সোনেলার নামকরণ করেছেন, ব্লগের খ্যাতিমান কবি সম্রাট ছাইরাছ হেলাল। সোনেলাকে ভালোবেসেই তিনি এই নাম দিয়েছেন। সোনেলা যদি আমাদের উঠোন হয় তবে ছাইরাছ হেলাল সাহেব এই উঠোনের সবচেয়ে শক্তিশালী ইমারত। জিসান সাহেব এবং ছাইরাচ্ছ হেলাল সাহেবের অতন্দ্র প্রহরায় ব্লগবাসিগন এখানে তাদের যাবতীয় অনুভূতি, উপলব্ধি লেখার আকারে জমা রাখেন।

২০১২ইং এর ২৩শে সেপ্টেম্বর থেকে সোনেলার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। সোনেলার প্রতিষ্ঠাতা জিসান শা ইকরাম  এই ব্লগটিকে পরম যত্নে গড়েছেন। উন্মুক্ত করে দিয়েছেন সবার মাঝে। এই ব্লগে কোনো সংঘাত বৈষম্য নেই। এখানে লেখকই পাঠক , পাঠকই লেখক। সবাই এখানে সসম্মানে নিজেদের লেখা প্রকাশ করেন, এবং সাবলীল ভাবে বিচরণ করেন। প্রায় সমস্ত ব্লগার অত্যন্ত আন্তরিক ও বন্ধু মনোভাব সম্পন্ন। অন্যান্য ব্লগে লিখতে হলে আগে ভালো লেখক হয়ে ঢুকতে হয় , কিন্তু সোনেলায় অবিরত/অবারিত উৎসাহ দিয়ে লেখক তৈরি করে। এর জন্য সোনেলা অন্যান্য সকল ব্লগ থেকে ভিন্ন এবং ব্যাতিক্রম। সোনেলা কর্তৃপক্ষের কঠোর নীতিমালা ও দক্ষ পরিচালনা সোনেলাকে একটি পরিচ্ছন্ন ব্লগ হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। বাংলা ব্লগ জগতে সোনেলা এক আলোকিত সূর্য।

সোনেলা ব্লগ আমাদের গৌরব। সোনেলা আমাদের প্রাণের উঠোন। সোনেলার নিরন্তর সাফল্য ও সমৃদ্ধি কামনা করি।

৪৯৯জন ১০৭জন
46 Shares

৫১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য