আইলা এবং ফণী’র পরে এবার বাংলাদেশে আসছে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। ইতিমধ্যেই অনলাইন এবং প্রিন্ট মিডিয়ার বদৌলতে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল সম্পর্কে আমরা সকলেই অবগত হয়েছি। বুলবুল এর প্রভাবে উত্তাল হয়ে উঠছে সমুদ্র। উপকুলীয় অঞ্চলে ১০ নম্বর মহা বিপদ সংকেত জারি করা হয়েছে। এই ঘূর্ণিঝড়ের কারণে গত রাত থেকেই উপকূলীয় এলাকায় ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের শক্তি ক্রমশই বাড়ছে।

বাংলাদেশের বুলবুলের তীব্রতা-

বলা হচ্ছে, গত ৪০ বছর ধরে যতগুলো ঘূর্ণিঝড় হয়েছে তাদের মধ্যে সবথেকে শক্তিশালী ঝড় হচ্ছে এই বুলবুল। আবহাওয়া দপ্তর ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, বর্তমানে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের গতিবেগ ঘণ্টায় ১২৫ থেকে ১৪৫ কিলোমিটার। যার প্রভাবে প্রচন্ড উত্তাল হয়ে উঠেছে সাগর। আমি যখন এই লেখাটি লিখছি তখন ঘূর্ণিঝড়টি উপকূল থেকে ৫০০ কিলোমিটার এর একটু দূরে অবস্থান করছে। আজ শনিবার থেকে এই ঝড়ের প্রভাবে বৃষ্টিপাত ও দমকা বাতাস আরও বাড়তে থাকবে। এটি ঘন্টায় ১২০ কিলোমিটার বাতাসের গতিবেগ নিয়ে শনিবার মধ্যরাত থেকে খুলনা উপকূল অতিক্রম করতে পারে। তবে বুলবুলের অগ্রভাগ চলে আসবে সন্ধ্যার দিকেই।

উপগ্রহ থেকে তোলা ছবিতে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তীব্রতা

এটি খুলনা থেকে বরিশালের উত্তর দিক দিয়ে মধ্যাঞ্চল হয়ে বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করবে। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের ব্যাস ৪০০ কিলোমিটার এর উপরে। ঘুর্ণিঝড় বাংলাদেশ অতিক্রম করতে সময় লাগবে ২৪ ঘন্টা। তারমানে এটি পুরো একদিন রাত বাংলাদেশে তাণ্ডব বইয়ে নিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বুলবুল যখন বাংলাদেশ অতিক্রম করবে তখন সাগরে জোয়ার থাকবে। তাই ঐ সময় উপকূলীয় এলাকায় পাঁচ থেকে সাত ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। চলতি বছরের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় ফণী’র চেয়েও বুলবুল আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে বাংলাদেশে আঘাত করতে পারে বলে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে।

ঘুর্ণিঝড় বুলবুলের নামকরণ-

মনে প্রশ্ন আসতে পারে বুলবুল নাম কোথা থেকে? এলো কারা দিয়েছে এই নাম? তাহলে শুনুন-

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা সর্বপ্রথম ঘূর্ণিঝড়ের নাম দেয়ার রীতি প্রচলন করে। ২০০৪ সালে ভারতে ঝড়ের নাম দেওয়ার রীতি চালু হয়, সাথে সাথে প্রতিবেশী দেশ (বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মায়ানমার, মালদ্বীপ,থাইল্যান্ড ) এই দেশগুলিতেও ঘূর্ণিঝড়ের নামকরনের প্রচলন ঘটে। WORLD METEOROLOGICAL ORGANIZATION (WMO) ঝড়ের পরিস্থিতি অনুযায়ী ঝড়ের নাম রাখে। এর আগে ঘূর্ণিঝড় ফণী’র নামকরণ করেছিল বাংলাদেশ। এবারে বুলবুল ঘূর্ণিঝড়টির নাম দেয়া হয়েছে পাকিস্তানের তরফ থেকে এবং বুলবুল কিন্তু একটি পাখির নাম।

ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের জন্য ৮টি দেশের প্রস্তাবিত ৬৪টি নাম

WMO এর কাছ থেকে নামকরণের বিষয়ে যে ব্যাখ্যা এসেছে তা হলো- যেহেতু এক একটি অঞ্চলের ঝড়ের নাম দেবার দায়িত্ব থাকে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে, যেমন- উত্তর মহাসাগরে সৃষ্ট ঝড়ের নামকরণ করে ভারত আবহাওয়া অধিদপ্তর। এশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগর সংলগ্ন আটটি দেশের আবহাওয়া সংস্থা ঘূর্ণিঝড়ের নাম চূড়ান্ত করে WMO এর কাছে পাঠায় এসব দেশ। সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে নাম চূড়ান্তকরণ করা হয়। এবারের ঘূর্ণিঝড়টির জন্য এই আটটি দেশের প্রস্তাবিত ৬৪ টি নামের মধ্যে একটি হলো বুলবুল, যা পাকিস্তান কর্তৃক প্রস্তাবিত নাম।

ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি-

আজ শনিবারের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং জেএসসি, জেডিসির সকল পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। উপকূলীয় সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ সরকার উপকূলবর্তী অঞ্চলে বাগেরহাট, খুলনা, ভোলা, বরগুনা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, সাতক্ষীরা সহ অন্যান্য এলাকায় বুলবুলের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিয়েছেন। বাগেরহাট জেলায় ২৩৪ টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। জেলার সব উপজেলায় একটি করে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। দুবলার চরের রাস উৎসব বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ভোলা জেলায় ৬৬৮ টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সিপিপি, রেডক্রিসেন্ট ও স্কাউট সহ ১৩ হাজার স্বেচ্ছাসেবী প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ৯২ টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। পটুয়াখালীতে ৪০৩ টি সাইক্লোন সেন্টার প্রস্তুত করা হয়েছে। ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, ১৬৬ বান্ডিল টিন এবং ৩৫০০ কম্বল মজুদ রাখা হয়েছে। এসব সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি আমরা যারা শক্তসমর্থ ও স্বাবলম্বী আপদকালীন মূহুর্তে তাদেরও কিন্তু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।

ঘূর্ণিঝড় হলে করণীয়-

১. এমন পরিস্থিতিতে যেসব অঞ্চলে এই ঝড় তীব্র আঘাত করবে সেসব অঞ্চলের মানুষজন পারতপক্ষে নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করুন। সেটি বাসাবাড়ি, সাইক্লোন সেন্টার, উচ্চস্থান যেকোন স্থানেই হতে পারে।

২. বাসায় বৈদ্যুতিক লাইনের মেইন সুইচ বন্ধ করে দিন, বিদ্যুৎ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করুন।

৩. গৃহস্থালির পশু-পাখীকে নিরাপদে রাখুন। অন্য জীবজন্তু যা ক্ষতিকারক নয় তাদের বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দেবেন না।

৪. গভীর নলকূপ এবং টিউবওয়েলের মুখ মোটা পলিথিন পেপার দিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখুন যাতে জলোচ্ছ্বাসে নোনা পানি প্রবেশ করতে না পারে।

৫. শুকনো খাবার (মুড়ি, চালভাজা, চিড়া,গুর প্রভৃতি) পরিমান মতন একটি বড় টিনের কৌটা কিংবা বড় মোটা পলিথিন ব্যাগে শক্ত করে বেঁধে রাখুন যাতে পানি প্রবেশ করতে না পারে।

৬. প্রয়োজনীয় টাকা পয়সা, অলংকার নিরাপদে সাথে রাখুন।

৭. বিপদকালীন জরুরী ওষুধপত্র( আমাশয়, পাতলা পায়খানা, জ্বর, ডায়রিয়ার জন্য ওরস্যালাইন) প্রভৃতির জন্য এসব ওষুধ নিজেদের সংগ্রহে রাখুন।

৮. আবহাওয়া অধিদপ্তর কর্তৃক প্রদত্ত বিপদ সংকেত মেনে চলুন। নৌকা ট্রলার সহ সব যানবাহন সমুদ্র থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনুন। সব সময় আবহাওয়ার খবর জানার চেষ্টা করুন।

৯. একে অপরকে সাহায্য করুন, অযথা ভুল খবর প্রকাশ করে জনগণকে বিভ্রান্ত করবেন না।

১০. যে কোন পরিস্থিতিতে সদা সতর্কতা অবলম্বন করুন।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো বারংবারই ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়, হচ্ছে। আমরা বীরের জাতি, ঘূর্ণিঝড় এর আগেও মোকাবেলা করেছি। কষ্ট হয়েছে তবুও ভয় পাইনি, পিছিয়ে আসিনি। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলকেও আমরা মোকাবেলা করব তাই সবাই মানসিকভাবে প্রস্তুতও আছি। তবে প্রার্থনা করুন বুলবুল যেন আঘাত হানার আগেই ক্রমেই দূর্বল হয়ে পড়ে।

সোনেলা পরিবার উপকূলবর্তী সকল মানুষের সাথে থাকবে সবসময়। এসব অঞ্চলে বসবাসকারী আমাদের সকল সদস্যদের এই ঘূর্ণিঝড়ে আপনাদের নিজস্ব সর্বোচ্চ সর্তকতা অবলম্বন করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি। সবাই ভাল থাকবেন, নিরাপদে থাকবেন।

তথ্যসূত্র ও ছবি- নেট থেকে নেয়া।

৪০২জন ১০জন
76 Shares

২৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ