বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া কালজয়ী মহাপুরুষ অতীশ দীপঙ্কর

 

অতীশ দীপঙ্কর (৯৮০- ১০৫৩)  একজন বিখ্যাত চিন্তাবিদ, দার্শনিক, ধর্মগুরু, বহু ভাষাবিদ এবং বিজ্ঞানী। তিব্বত এবং এশিয়ার দেশগুলোতে তিনি অত্যন্ত সন্মানীত এবং মহান জ্ঞানী ব্যক্তি বলে পরিচিত।

কিন্তু এই বিখ্যাত দার্শনিক এবং চিন্তাবিদ তাঁর নিজ জন্মস্থান বাংলাদেশ এবং ভারতবর্ষে শতাব্দীকাল ধরে স্মৃতির আড়ালে চলে যেতে বসেছিলেন এবং  তা ছিল  19th শতাব্দী পর্যন্ত ।

যুগে যুগে দেশে দেশে অনেক চিন্তাবিদ জন্ম নিয়েছেন, যেমন :  এরিসটেটল, সক্রেটিস, প্লেটো, ফেরদৌস (৯৪০-১০২০), আল খাওয়া রিজমি ( ৭৮০- ৮৫০ ), আল বেরুনি ( ৯৭৩- ১০৪৮) আর আমাদেরও  বাংলার এই অতীস দীপঙ্কর। তিনিও  সেই বিখ্যাত মহা পুরুষদেরেই  সমকক্ষ এবং সমান মর্যাদার অধিকারী একজন । পাল আমলে আমাদের এই জনপদের মানুষ বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিল, ইসলাম ধর্ম তখনো এখানে ছিল না। দীপঙ্কর সে সময়ে জন্মগ্রহণ করেন।

অতীস দীপঙ্করের মাধ্যমেই বিখ্যাত বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষা সমস্ত পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করেছে। বৌদ্ধ ধর্ম আজ তিব্বত, চীন, জাপান, থাইল্যান্ড , মায়ানমার, কম্বোডিয়া, মঙ্গোলিয়া এবং সাইবেরিয়াতে ছড়িয়ে গেছে। তাঁর বাণী এবং  দর্শন এই সব দেশে অনেক সন্মানের সাথে উচ্চারিত হয় এবং মেনে চলা হয় ।

আমাদের বাংলাদেশের সর্বযুগের সর্ব শ্রেষ্ঠ হারিয়ে যাওয়া  সন্তান এই অতীস দীপঙ্করকে  সেই সুদূর তিব্বত থেকে তুলে এনেছেন একজন স্কলার ডিপলোম্যাট, যার  নাম শরৎ চন্দ্রদাস ( ১৮৪৪- ১৯১৭ ) । তাঁর বাড়ি চট্টগ্রাম, বাংলাদেশে।

উনিশ শতকে তিনি ব্রিটিশ রাজের অধীনে  স্কলার ডিপ্লোম্যাট  হিসাবে প্রতিনিধিত্ব করার চাকরি নিয়ে তিব্বতে যান। । তিনি ছিলেন  একজন সাহসী এবং ভয়হীন এক্সপ্লোরার । তিনি সেখানে থাকা কালিন তিব্বতের কালচার এবং ধর্ম নিয়ে অসীম আগ্রহী হয়ে উঠেন। তিনি যখন তিব্বতের  প্রত্যন্ত অঞ্চলে বৌদ্ধ বিহারগুলো ঘুরে ঘুরে  বেড়াতেন এবং সেখান থেকে বিভিন্ন বৌদ্ধ ধর্মের বই নিয়ে গবেষণা করতেন  এবং সব বই নিজ সংগ্রহে আনতে থাকলেন। এই জন্য তাঁর জীবন অনেক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছিল। তিব্বতের রাজা তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখা আরম্ভ করল এবং রাজনীতির দৃষ্টিতে তাঁকে  খারাপভাবে নিতে থাকলো । তিনি অনেকবার তিব্বত গিয়ে ছিলেন শুধু মাত্র দীপঙ্করের উপর গবেষণা করার জন্য।

তিনি যখন তিব্বত থেকে ভারতবর্ষে ফিরে আসলেন সঙ্গে করে নিয়ে আসলেন এক বিরাট মূল্যবান সংগ্রহ। যা কিনা  আমাদের বাংলাদেশের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যকে পরিবর্তন করে দিলো। যাকে আমরা ভুলতে বসেছিলাম তাঁকে তিনি তুলে  আনলেন সুদূর তিব্বত থেকে।

তিনি দুটো অতুলনীয়  মূল্যবান বই পাবলিশ করলেন। সে দুটো হলো :

১)  Indian Pundit In The Land Of Snows, সালটা হলো ১৮৯৩ , পাবলিশার , এশিয়াটিক সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া ।

২) Travel Accounts of Tibet প্রকাশিত হলো British Geographical Society,  London এর মাধ্যমে।

আর এই বই দুটোর মাধ্যমেই আমাদের ঢাকার বিক্রমপুরের অতীস দীপঙ্কের নক্ষত্রটিকে জীবন্তভাবে তুলে আনলেন তিনি।   তিব্বতের ইতিহাস এবং এতে দীপঙ্করের অবদান সুন্দরভাবে প্রকাশিত হলো।

কীভাবে দীপঙ্কর স্মৃতির আড়ালে চলে যায় :

১৩ / ১৪  শতক থেকে আস্তে আস্তে দীপঙ্করকেকে মানুষ  ভুলতে শুরু করে। কারণ তখন থেকে বৌদ্ধ ধর্ম বিলুপ্ত হতে শুরু করে এবং তার সাথে সাথে দীপঙ্করও স্মৃতির আড়ালে চলে যেতে  শুরু করে। পাল আমল ছিল ( ৭৫০-১১৭৪) বৌদ্ধ ধর্মের প্রসারিত হওয়ার সময়। তারপর আসলো সেন আমল । তারা ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী ।

বাল্যকাল :

বৌদ্ধ পণ্ডিত ধর্মগুরু এবং দার্শনিক অতীস দীপঙ্কর ৯৮০ খ্রিস্টাব্দ ঢাকার বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী  গ্রামে ( বর্তমানের মুন্সিগঞ্জে) গৌড়ীও  রাজ পরিবারে  জন্মগ্রহণ করেন।

পিতা কল্যাণ শ্রী এবং মাতা প্রভাবতী দেবী। বাল্যকালে তাঁর নাম ছিল আদিনাথ  চন্দ্রগর্ভ। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় । আর বাকি দুই ভাইয়ের নাম পদ্ম গর্ভ এবং ত্রিগর্ভ ।

শিক্ষা :

প্রাথমিক শিক্ষা তিনি মায়ের কাছ থেকে পান এবং মাত্র ৩  বছর বয়সে সংস্কৃতি ভাষা শিখেন। ১০ বছর বয়সে বৌদ্ধ এবং অবৌদ্ধ শাস্ত্রের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে শিখে বিরল প্রতিভা অর্জন করেন।

এই সময় তিনি সংসারের প্রতি বিরাগ হন এবং গারহস্ত জীবন পরিত্যাগ করেন এবং ধর্মীও জ্ঞান অর্জনের পরিকল্পনা করেন।

বিখ্যাত বৌদ্ধ গুরু জেত্রীর নিকট বৌদ্ধ শাস্ত্র এবং দর্শনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।

বৌদ্ধ পণ্ডিত জেত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী তিনি নালন্দাতে শাস্ত্র শিক্ষা করতে যান। মাত্র ১২ বছর বয়সে  আচার্য বোধী  ভদ্র তাঁকে শ্রমণ রূপে শিক্ষা দেন আর তখন থেকে তাঁর নাম হয় দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান হিসাবে।

বর্তমানের ইউরোপের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় কেমব্রিজ ১২০৭, অক্সফোর্ড ১১৫৭, প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় ১১৫০,  সেই সময়ে তখন এইসব ছিল না, তখন ভারতবর্ষের বিশ্ববিদ্যালয় ছিল নালন্দা,  সোমপুর  মহাবিহার  (বর্তমানের পাহাড়পুর), মহাস্থানগড়, ময়নামতি, অজান্তপুরি বিহার এবং  বিক্রম শিলা বিহার । এই সব বিহার স্থাপিত হয়ে ছিল মায়ুরা, গুপ্তা এবং পাল আমলে এবং অতীস দীপঙ্কর এই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে আচার্য নিযুক্ত হয়ে ছিলেন।

১২ থেকে ১৮ বয়স পর্যন্ত তিনি বোধি ভদ্রে গুরুদেব অবধুতির নিকট সর্ব শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন এবং ১৮ থেকে ২১ বয়স পর্যন্ত বিক্রমশিলা বিহারের দ্বারা পণ্ডিত  নাম পদের নিকট তন্ত্র শিক্ষা গ্রহণ করেন।

মগধের উদন্তপুরী বিহারের মহাসাঙ্ঘিক আচার্য সিলারক্ষীতের   নিকট উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।

তারপর তিনি ধর্মীয় জ্ঞানের জন্য পশ্চিম ভারতের কৃষ্ণগীরী বিহারে গমন করেন এবং রাহুল গুপ্তের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন, সেখানে তিনি বোধি শাস্ত্রের ‘গুহ্য জ্ঞান বজ্র‘ উপাধি পান।

৩১ বছর বয়েসে তিনি আচার্য ধর্ম রক্ষী কত্রিক সর্ব শ্রেষ্ঠ ভিক্কুকদের শ্রেণিভুক্ত হন এবং মগধের শ্রেষ্ঠ আচার্যদের নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেন। ১০১১ খ্রিস্টাব্দে শতাধিক শিষ্যসহ মলয় এর সুবর্ণ দ্বিপে (ইন্দোনেশিয়া)  গিয়ে আচার্য চন্দ্রের নিকট নানা বিষয়ে অধ্যয়ন করেন এবং ৪৩ বছর বয়েসে মগধে ফিরে আসেন।

ক্যারিয়ার :

মগধে তিনি অন্যান্য পণ্ডিতের সাথে মত বিনিয়োগ করেন এবং নানা বিষয়ে বিতর্ক চালাতে থাকেন। বিতর্কে তাঁর পাণ্ডিত্যে ,বাগ্মিতা এবং যুক্তির কাছে তারা পরাজিত হয় এবং ক্রমশ তিনি অপ্রতিদ্বন্দি   পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি লাভ করেন।

এই সময় পাল রাজ প্রথম মহীপাল স্বসন্মানে তাঁকে বিক্রমশীলার প্রধান আচার্য পদে নিযুক্ত করেন। পরবর্তীতে তিনি ১৫ বছর বিক্রম শিলাসহ ওদন্তপুরি এবং সোমপুরীতে অধ্যাপনা করেন এবং ‘মধ্যম ক্রর রত্ন প্রদীপ’ গ্রন্থের অনুবাদ করেন।

মহীপাল

যুদ্ধ থামাতে মধ্যস্থতায়  অতীস দীপঙ্কর :

এই সময় মহীপালের পুত্র নয়পালের সঙ্গে কালচুরী রাজ্যের যে  যুদ্ধ হয় দীপঙ্করের মধ্যস্থতায় সেই যুদ্ধের অবসান ঘটে। তাঁর মতে রাজাদের রাজ্য  আক্রমণ আর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া মানে  লোভ, অহমিকা আর ক্ষমতা দেখানোর ব্যবস্থা করা। যুদ্ধ মানুষের শান্তি আনে না, কল্যাণ করে না।

তিব্বতে যাওয়ার কারন :

তিব্বতের বৌদ্ধ রাজা লা-লামা ইওসি হট তিব্বতের বৌদ্ধ ধর্মের উন্নতি কামনায় দীপঙ্করকে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রচুর স্বর্ণ এবং পত্রসহ একজন দূত প্রেরণ করেন। দূত জানান, দীপঙ্কর  তিব্বতে গেলে তাঁকে সবচেয়ে বেশি সন্মানে ভূষিত করা হবে। কিন্তু নির্লোভ দীপঙ্কর এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখান করেন। রাজা লামার মৃত্যুর পর ভাতুষ পুত্র চ্যাংচুপ তিব্বতের রাজা হন। তাঁর একান্ত অনুরোধে ১৪৪০ খ্রিস্টাব্দে কয়েকজন বিশিষ্ট পণ্ডিতসহ দীপঙ্কর মিত্র বিহারের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন।

মিত্র বিহারের অধ্যাপক গন এই দলকে অভ্যর্থিত করেন। এইখানে আসার আগে তাঁরা বহুস্থানে অভ্যর্থিত হন। নেপালের রাজা অনন্ত কীর্তি দীপঙ্করকে সন্মানিত করেন। সেখানে তিনি একটি খান বিহার নামে একটি বিহার স্থাপন করেন এবং নেপালের রাজপুত্র পদ্মপ্রভাকে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত করেন।

তিব্বতে দীপঙ্করের রাজোকীয় অভ্যর্থনা :

বৌদ্ধ রাজা চ্যাঙ্ক চুপ  দীপাঙ্করের শুভাগমন উপলক্ষে সংবর্ধনার বিরাট  আয়োজন করেন । যার দৃশ্য সেখানকার এক মঠে এখনো সুন্দরভাবে সুরক্ষিত আছে। সংবর্ধনা দেয়ার জন্য ‘রাংতুন’ নামে এক বিশেষ বাদ্য যন্ত্রের নির্মাণ  করা হয়।

তিব্বত রাজা চ্যাংচুপ প্রজাদের উদ্দেশ্যে এক ভাষণ দেন এবং বলেন, এখন থেকে এখানে দীপঙ্করকে বৌদ্ধ ধর্মের বিশেষ শ্রদ্ধার গুরু হিসাবে মান্য  করা হবে।  বাস্তবে তাঁকে এইভাবেই সন্মানের আসনে রাখা হয়ে ছিল।

তিব্বতের হলিং বিহার ছিল দীপঙ্করের প্রধান বিহার। এই বিহারে তিনি দেবতার মর্জাদায়  অধিষ্ঠিত ছিলেন। এখান থেকেই তিনি সমস্ত  তিব্বত ঘুরে ঘুরে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করেন।

তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাভিচার দূর হয়। তিব্বতে তিনি মহাজানি প্রথায় বৌদ্ধ ধর্মের সংস্কার করেন।

তিব্বতের একটি মন্দিরে দীপঙ্করকে যে অভ্যর্থনা দেয়া হয়ে ছিল তাঁর চিত্র

দীপঙ্করের সন্মান :

তিনি সেখানে বৌদ্ধ ধর্মের এক সম্প্রদায়ের সৃষ্টি  করেন।  তাঁর এই সম্প্রদায়ের  নাম ‘বৌদ্ধ কদম’ । দালাই লামা এই সম্প্রদায়ের অনুসারী।

তিব্বত বাসীরা বৌদ্ধের পরেই দীপঙ্করকে স্থান দেন,  সন্মান করেন এবং মহা প্রভু হিসাবে অর্চনা করেন। তিব্বতের লামারা নিজেদেরকে দীপঙ্করের অনুসারী বলেন। তিব্বতের সংস্কৃতিতে  দীপঙ্করের সন্মান এখনও তেমনই বিদ্যমান এবং ভবিষ্যতেও তাঁকে সেভাবেই সন্মানিত করে রাখা হবে। দীপঙ্করের প্রভাব এবং সন্মান তিব্বতে আজ পর্যন্ত বিদ্যমান।

জনকল্যাণ :

তিব্বতের একটি নদী বন্যার সময় অনেক ক্ষতি সাধন করত। দীপঙ্কর বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নদীটিতে বাঁধ দেন এবং বন্যা থেকে রক্ষা করেন। তাছাড়া তিনি তিব্বতের কৃষিতে নিজ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিব্বতের  কৃষির উন্নতি করেন। এই জন্য তাঁকে জনহিতকর বলে সন্মানিত করা হয় । তিনি মানব কল্যাণে  নানা রকম ঔষধ প্রযুক্তির  উৎভাবন করেন।

তাঁর রচিত গ্রন্থ :

ধর্ম, রাজনীতি এবং  জীবনী নিয়ে তিনি এক বিশাল গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর নাম ‘তন্ত্র নামা তঞ্জুর’। এই গ্রন্থ রচনা করে তিনি অনেক খ্যাতি অর্জন করেন। তাই অতীত তিব্বতের আলোচনা দীপঙ্কর ছাড়া অসম্ভব । তিনি ২০০ এর বেশি বই রচনা এবং সম্পাদনা  করেন। এই সব গ্রন্থ তিব্বতে ধর্ম প্রচারে সাহায্য করে ছিল। তিনি গ্রন্থ ছাড়া অনেক পুঁথি,  সংস্কৃতি ভাষায় রচনা করেন এবং তিব্বতি ভোট ভাষায় অনুবাদ করেন। ভোট হলো তিব্বতি ভাষা। তাছাড়া তিনি তিব্বতি ভাষায় চিকিৎসা বিদ্যা, কারিগরি বিদ্যা, বৌদ্ধ শাস্ত্রসহ অনেক পুস্তক রচনা করেন। তাঁর মূল রচনা কালে ক্রমে বিলুপ্ত হলে তাঁর অনূদিত তিব্বতি ভাষায় লেখা গ্রন্থগুলো এখনো বিদ্যমান আছে এবং সংরক্ষীত আছে।

তাঁর রচিত গ্রন্থ সমূহ :

০ বোধি প্রদ প্রদীপ ০ চর্যা সংগ্রহ প্রদীপ ০ সত্য দয়াবতা ০ বোধি স্বত্বা মনবলি ০ মধ্যম রত্না  প্রদীপ ০ মহাযান পথ সাধনা ০ উচ্চ সমচায় ০কবি কাম্য ০ প্রজ্ঞা পারমিতা ০ পিদান্ত প্রদীপ ০ বিমল রত্ন লেক ( মগধ রাজা নয় পালের উদ্দেশ্যে লেখা দীপঙ্করের চিঠির সংস্কৃত সমন্বয় ) ০ এক বীর সাধন ০ অভিধর্ম বিভাষা ০ জ্ঞান প্রস্থান এবং আরও অনেক। 

দীপঙ্করের দর্শন,  ভাবনা এবং যুক্তি :

অবিদ্যা :

সবকিছু কার্জ কারণ সম্পর্ক যুক্ত। অবিদ্যা, সংস্কার, বিজ্ঞ্যান, নামরূপ, স্পর্শ, বেদনা, তৃষ্ণা, উপাদান, ভর, দুঃখ এগুলো একটি থাকলে আর  একটি থাকবে। একটি চলে গেলে অপরটি নির্বাপিত হবে। এই কার্জ  কারন শৃঙ্খলা না জানার নাম ‘অবিদ্যা’। আর এই অবিদ্যা থেকেই পাপ-পুণ্য চলমান থাকে।

সমাজে, মানুষে মানুষে এবং দেশে অনক্যের  সূত্রপাত :

দীপঙ্করের মতে,  যারা  বুদ্ধিমান, ক্ষমতাবান, তাঁরা যখন অহমিকার বজ্রকীট দংশনে পরস্পর পরস্পরকে আক্রমণ করে তখন সেই অপ্রেম ও  বিভেদের মধ্যে দিয়ে মানুষের মধ্যে  সমাজে এবং রাষ্ট্রে  অনৈক্যের  সূত্রপাত হয়। তৎকালীন ভারতবর্ষে এক রাজ্য আর এক রাজ্যকে আক্রমণ করত, শাসকদের মধ্যে ছিল বিভেদকামী তারই ফলস্বরূপ মারা মারি কাটাকাটি লেগেই থাকতো ।

দীপঙ্করের দর্শন :

একটা  ১ এর  অবস্থান বিভিন্নভাবে বিভিন্ন স্থানে থাকার জন্য তাঁর একেক রূপ ধারণ হয় এবং মূল্য ধারণ করে। যেমন : ০০১, ০১০, ১০০ । কোনো জায়গাতে সে শুধু ১, কোনো স্থানে ১০, কোনো স্থানে ১০০। ঠিক মানুষও বিভিন্ন স্থানে, স্থান বদলের কারনে রূপ বদল হয়। যেমন একজন নারী পিতৃগৃহে কন্যা, স্বামীগৃহে স্ত্রী, সন্তান জন্ম দেয়ার পরে জননী হয়।

একজন মানুষের মধ্যেই অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সমভাবে অবস্থান করছে। সুতরাং অতীত বিগত, ভবিষ্যৎ অনাগত, এ ধারণা পরিত্যাগ করে, অতীত বিলাপ এবং ভবিষ্যৎ বিদায় করুন। তাঁর মতে কথাও কেউ যায়না। সকলেই সমানভাবে অবস্থান করে।

ফলে সকল সম্ভাবনা বীজেই নিহিত থাকে। বীজ অতীত ফল ভবিষ্যৎ।

‘শুন্য থেকে জগৎ এর উৎপত্তি’ ,  ‘ শুন্য বাদ‘  তাঁর আর একটি দর্শন। যা  আমরা  আধুনিক বিজ্ঞানেও দেখতে পাই।

আমি :

তাঁর মতে ‘আমি’  বলতে কিছুই  নাই।  পেঁয়াজের খোসা এক এক করে অপসারণ করলে সর্বশেষে  কিছুই  অবশিষ্ট থাকেনা।এই ‘আমি’  তারও সংজ্ঞা দেয়া যায় না। আমাদের দেহ বা যে কোনো বস্তু সকলেই রুপময়। একেকটা একেক রূপে থাকে।

Observations of his philosophy: The above are similar to what quantum mechanics and astrology indicate.

  1. universe was created from vacuum ( in Big Bang theory) 2) Basic structure is probabilistic  wave energy entity. 3) Past, present and future can be thought to be quantum superposed states, where an electron can be found to have at 0 and 1 states at the same time based on probability.

দীপঙ্করের বাণী :

তাঁর বাণী সমস্ত মানব কূলের জন্য।  সর্ব কালের সর্ব যুগের মানুষের জন্য ।

০ যেখানে আপনার মূল্যায়ন হয় না সেখান থেকে দূরে থাকুন।

০ মনের বিরক্ত লাগা পরিস্থিতির স্থান পরিত্যাগ করুন।

০ পরের সমালোচনা না করে আত্ম সমালোচনা করুন।

০ অপরের ভালো অর্জনকে হিংসা না করে বরং তার সেই  গুণাবলি নিজের মধ্যে আনার চেষ্টা করুন।

০ জীবন চালনার জন্য যেটুকু ধন-দৌলত দরকার সেটুকুই থাকা ভালো। মনে রাখতে হবে সবকিছু ফেলে দিয়ে খালি হাতেই চলে যেতে হবে।

০ অপরের দোষ ধরার আগে নিজের দোষ খুঁজুন।

তিব্বতে যাওয়ার পর সমাবেশে তিনি বলেন, ‘বন্ধুগণ তোমরা অনেক জ্ঞানসম্পন্ন এবং পরিষ্কার বোধসম্পন্ন মানুষ, আমি একজন অল্প জ্ঞানী এবং গুরুত্বহীন, আমার সামান্য বোধ থেকেই আপনাদের বলছি, নিচের উপদেশগুলো যা আমার হৃদয় থেকে এসেছে।’

তার বাণী চিরকালে জন্য বিবেচিত হবে।

একুশ শতকের liberate mankind এর অহেতুক ভয়, যুদ্ধ, বিপদ থেকে সরে এসে কীভাবে শান্তিতে থাকা যায় তার চেষ্টা করবে।

তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন গুণী ব্যক্তির মন্তব্য :

একজন জার্মান স্কলার যার নাম ‘koppen’ তিব্বতে গিয়ে তাদের ধর্ম নিয়ে গবেষণা করেন ১৮৫৯ সালে। তিনি দেখতে পেলেন যে সমস্ত ধর্মীও কথা তারা  উচ্চারণ করছেন গানের মাধ্যমে তা দার্শনিক চিন্তাতে ভরপুর এবং তার প্রত্যেকটি আমাদের অতীস দীপঙ্করের বাণী । তা তিনি তুলে এনে প্রচার করতে থাকেন।

নিহার রঞ্জন রায় তাঁর বিখ্যাত বই ‘History of Bengal’ এ  লিখে গেছেন ‘Dipankara is among the brightest luminaries of Bengal and India by virtue of his character, scholarship erudition  and  spiritual eminence.Among those who had established bridge of amity and fraternity between Eastern India and Tibet. Dipankara’s name deserves to be remembered as the first and foremost. “

অর্থাৎ, ‘দীপঙ্কর  বাংলা এবং ভারতের এমন একজন ব্যক্তি যার অগাধ জ্ঞান পাণ্ডিত্য, বিচক্ষণতা, এবং মানবিক গুণাবলি যা অন্য মানুষকে সহজেই অভিভুত করে। আর এই জন্য  তিনি বিশেষভাবে বিখ্যাত হয়ে থাকবেন এবং তাঁকে  মনে রাখাটা তাঁর জন্য  যে-কোনো কিছুর চেয়ে বেশি  গুরুত্বপূর্ণ।’

রাত্নাকার  বলে গেছেন,  ‘দীপঙ্কর অন্ধকারে আলোর রোশনি’  তাঁর জন্যই বৌদ্ধ ধর্মের মরালীটি তিব্বত চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, মঙ্গোলিয়া, সাইবেরিয়া, মায়ানমার এবং কম্বোডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। তাঁকে বলা হয় ‘আই  অফ এশিয়া‘ ।

হিউ এন সাং :

সাম্প্রতিক কালে বিক্রমপুরে  আবিষ্কৃত বৌদ্ধ মন্দির

হিউ এন সাং ৬২৯ সালে ভারতবর্ষে আসেন। উদ্দেশ্য বৌদ্ধ ধর্মের পবিত্র স্থানগুলো পরিদর্শন করা এবং পাল ও  সংস্কৃতি  ভাষার অনূদিত বৌদ্ধ ধর্মের মুল সূত্রগুলো পাঠ করা। কারণ চায়না ভাষায় অনূদিত টেক্সটগুলো নিয়ে তাঁর  অসন্তোষ ছিল । তিনি ৬৫৭টি বৌদ্ধ গ্রন্থ চীনে নিয়ে যান। তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে পুণ্ড্রবর্ধনে ২০টি, সমতটে ৩০টি  এবং এই ঢাকার  বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী  গ্রামের বিহারের উল্লেখ করেন।

মহারাজ ধর্ম পালের সময় ৩০টি বিহার নির্মাণ হয়। তাঁর মধ্যে একটি ছিল  এই বজ্রযোগিনী গ্রামের বিহার। এটা দীপঙ্করের জীবনের সাথে জড়িত। এখানে তিব্বত, নেপাল, এবং থাইল্যান্ড থেকে শিক্ষার্থী  শিক্ষা নিতে আসতেন। বর্তমানের মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ি উপজেলার সোনারঙ্গ ইউনিয়নের নটেশ্বর গ্রামের মাটির নিচে এর সন্ধান মিলে হাজার বছরের পুরানো এই বৌদ্ধ বিহারের এবং তার সাথে এক বৌদ্ধ নগরীর।

বাংলাদেশের ঐতিহ্য অন্বেষণ একটি আরকেওলজী  গ্রুপ এবং ২০১৩  চীনের হুয়ান প্রদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান খনন কার্জ চালু করে। ৬ হাজার বর্গ কিলোমিটার জুড়ে এই প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা চলছে।২০২৪ সালের দিকে এটা সর্ব সাধারণের দেখার  জন্য খুলে দেয়া হবে। যা  কিনা  প্রায় ১০০০ বছরের পুরানো । যার সাথে জড়িত অতীস দীপঙ্কর এবং হিউ এন সাং ।

অতীস দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান এর মৃত্যু :

সুদীর্ঘ ১৩ বছর তিব্বতে অবস্থানের পর ৭৩ বছর বয়েসে দীপঙ্কর তিব্বতের লাসা শহরের নিকটে লেথান পল্লীতে ১৫৫৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন। লেথান এখন তিব্বতিদের নিকটে অতি পবিত্র স্থান এবং তীর্থ  ভূমীতে পরিণত হয়েছে ।

১৯৭৮ সালের  ২২জুন  তাঁর চিতা ভস্মের কিছু ঢাকার ধর্ম রাজিক বৌদ্ধ বিহারে আনা হয় এবং সংরক্ষিত করা হয়।

অতীস দীপঙ্কেরের ভিটা :

অতীস দীপঙ্করের জন্ম ভিটার আশপাশের মানুষ এখনো তাঁর জন্ম ভিটার কথা মনে রেখেছে,  এক জেনারেশন থেকে আর এক জেনারেশন লোক  মুখে প্রচলিত হয়ে চলেছে তাঁর ভিটার পরিচয়। ‘নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা’ বলে সবাই এটাকে চিনে । ঢাকার মুন্সিগঞ্জে বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী  গ্রামে তাঁর জন্ম ভিটা। এখন সেখানে একটা বৌদ্ধ মন্দির করা হয়েছে । বেশ  কিছু ভিক্ষু  সেখানে নিয়োগ আছে ।

আমাদের অবশ্যই আমাদের অতীত ইতিহাসকে জানতে হবে । আমরা নিঃস্ব নই । আমাদের একজন অতীস দীপঙ্কর আছেন  । যিনি কিনা আমাদের দেশের একজন সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান । যিনি আমাদের  ঐতিহ্যকে পূর্ণতা  দিয়েছেন । বাংলাদেশকে অনেক উপরে নিয়ে গেছেন। আমরা গর্বিত আমাদের দেশে তাঁর জন্মের জন্য। আমাদের অতীত জানতে হবে,  কারণ অতীতের উপরে  ভবিষ্যৎ দাঁড়িয়ে। প্রাচীন কালের পণ্ডিত ও মহাচারজদের  মধ্যে অতীস দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান সর্বাধিক আলোচিত ও সর্বাধিক শ্রদ্ধেয় ব্যাক্তি, যাকে বৌদ্ধ ধর্ম অনুসারীগণ দ্বিতীয় বৌদ্ধের স্থানে স্থান দিয়েছেন।

কালজয়ী এই বাঙালি চীনের অর্থনৈতিক উন্নতির অন্যতম রূপকার। চীন এবং বাংলাদেশের সু-সম্পর্কের সেতুবন্ধন।

এই লেখার মাধ্যমে আমি আমাদের হারিয়ে যাওয়া এই দার্শনিক, চিন্তাবিদ এবং জ্ঞানী মহাপুরুষ কে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছি।

আবার জেগে উঠুক বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী  গ্রামের অতীস দীপঙ্করের জন্ম ভিটা, তীর্থ ভূমীতে পরিনত হোক তাঁর জন্ম  স্থান। ঠিক  যেমন তিব্বতের লেথান পল্লীতে হাজার হাজার ভ্রমণকারি  ভ্রমণ করতে আসে তেমন আসুক এখানে এবং পরিপূর্ণতা দেক বাংলাদেশের ঐতিহ্য কে।

 

তাঁর জন্ম ভিটা বিক্রমপুর

তথ্যসূত্রঃ

নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা অতীস দীপঙ্করের পৃথিবীঃ স্নমাত্রানন্দ

তিব্বতে সওয়া বছর, রাহুলসাংক্রিতায়ন

উইকিপেডিয়া

ফোটো ক্রেডিট , উইকিপেডিয়া

৩৩৫জন ১৯জন
0 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য