সত্তুরের দশকে যারা প্রবাসী হলেন তখন যে বাংলাদেশ রেখে এসেছিলেন তা ছিল যুদ্ধ বিধ্বস্ত ভগ্ন অর্থনীতির দরিদ্র এক বাংলাদেশ।

পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে গরিব দেশ সে সময় ছিল ইথিওপিয়া, তার উপরেরটাই ছিল বাংলাদেশ ।  

বাংলাদেশে সে সময় এয়ারপোর্টে নামলেই দেখা যেত ভুখা  নাংগা সারি সারি ভিক্ষুক। বাচ্চা কাকলে  মা হাত পাতছে যেখানে সেখানে। সে সময় উত্তরায় কোন শহর গোড়ে  উঠেনি। গুলশান ধানমণ্ডিতে ছিল  দুই তলা বাড়ি ।ছিলনা হাইরাইজ বিল্ডিং। রাস্তায় ছিলনা এতো এতো কার বা বাস।মফঃস্বলের অবস্থা আরও করুন। ইলেকট্রিসীটি ছিলনা। রাস্তা ঘাট সব কাচা। ফার্নিচার ছিল বিলাসিতা। টিভি ছিলনা কোন বাড়িতে । দোকানেই   টিভি তখন বিক্রি হতনা।  হাত পাখা ছিল বাতাসের জন্য। অতিথিকে আপ্যায়ন করতে গেলে পান থাকলে সুপরি থাকতো না,  সুপরি থাকলে পান থাকতো না।  

১৯৭২ যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি 

যুদ্ধ শেষ হয়েছে মাত্র। সব কিছু এলোমেলো। সব জায়গাতে অরাজকতা। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শূন্য। মাথাপিছু ইনকাম মাত্র ১১২ টাকা। অর্থনীতির আকার মাত্র ৪ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। বাজেট ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকার। ৮০% লোক দরিদ্র ছিল। ১৯৭২ সালে খাদ্য শস্য উৎপাদন ছিল মাত্র ১ কোটি টোন। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জি ডি পি প্রবৃদ্ধি ছিল ২.৭৫ % 

৭৪ এর দুর্ভিক্ষ  

খাওয়ার সময় খাবার শেষ না হতেই চটের বস্তা পরা ভিক্ষুক প্লেটের খাবার নিয়ে যেত। বাইরে রোজ  আসতো এক ভিক্ষুক দুই বাচ্চা নিয়ে ,পা ফোলা পুষ্টির অভাবে। কদিন পর সে নিজেই আসতো বাচ্চা ছাড়া । জিজ্ঞেস করলে জানালো খাওয়ার অভাবে দুই জোনেই মারা গেছে। তাদের মা কই? জানালো খাবার অভাবে সেও মারা গেছে। 

রাস্তায়  রাস্তায়  কাফন পরা লাস। পয়সা ভিক্ষা চেত কবর দেয়ার জন্য।কবর দেয়ার জন্য টাকা ছিলনা। নোঙ্গর খানা খোলা হল চার  দিকে।  পরনে কাপড় ছেঁড়া। দোকানে ঔষধ নাই, বাচ্চার দুধ নাই,থালা বাসন, সাবান ,কাপড় কিছুই নাই।পুরো সত্তুর দশক জুড়ে ছিল হাহাকার। পুষ্টিকর খাবার ডিম, দুধ, মাংস এগুলো পাতে পড়তো খুব কম পরিবারে। তখন ছিলনা আধুনিক ডেইরী ফার্ম বা পোলট্রি ফার্ম এখনকার মতো। পুকুর ছিল ঠিকই কিন্তু জানতো না মাছের চাষ। 

১৯৭৫ সালের এপ্রিল বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর সব থেমে যায়। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সময় মুখ থুবড়ে পড়ে অর্থনীতি ।

দলে দলে দেশ ছাড়া 

সত্তুরের দশকে যারা দেশ ছেড়েছিল অভাবে তারা  উন্নত দেশ গুলোতে এসে আকাশ পাতাল তফাৎ দেখল। কোন ভিকেরী  নাই, রাস্তায় পাগল দেখা যায়না কারন পাগলের জন্য সুব্যাবস্থা আছে।  বৃদ্ধ আর পঙ্গু চলাফেরা করে হুইল চেয়ারে।হুইল চেয়ার  চলাফেরার জন্য সুন্দর ব্যাবস্থা। বেসিক খাবার দাবার সরকার থেকেই কম মূল্যে রাখা হয়েছে যাতে সবায় সস্তায় কিনতে পারে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা আর শিক্ষা সবার  জন্য। কেউ না খেয়ে থাকেনা। বেকার হলে ভাতা আর সবার জন্য পেনসন। 

এই অবস্থার সাথে নিজ দেশের পার্থ্যক্য প্রকট ভাবে চোখে পড়ে। তারা ভাবতো কেন আমরা এতো দরিদ্র !  

‘বাংলাদেশ’  বললে কেউ চিনতো না সে সময়ে। যারা চিনতো তারা বলতো খাদ্যের অভাবের দেশ, বন্যার দেশ আর সাইক্লোনের দেশ। 

ইন্ডিয়া  চিনতো সবায়, কিন্তু তখন তাকে বলা হতো বস্তির (SLUM) দেশ। এখন সেই ইন্ডিয়া ধনী দেশ গুলোর একটা। আর বাংলাদেশ  এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতির একটি দেশ হিসেবে।এখন বাংলাদেশ চিনে  ক্রিকেট, গার্মেন্টস আর অভিবাসী  বাঙ্গালীর জন্য।

 

অভিবাসী বাঙ্গালী 

মানুষ কখন দেশ ছাড়ে, অভাবে যখন পিঠ এসে দেয়ালে ঠেকে । ‘অভিবাসী’ হওয়ার   ইতিহাস থেকে জানা যায় মানুষ এক স্থান থেকে আর এক স্থানে যায়  সৃষ্টির প্রথম থেকেই । নিজ দেশের দুরাবস্থা, দারিদ্র, বেকারত্ব মানুষকে অভিবাসী করে। প্রবাসে গিয়ে বাঙ্গালী যে কাজ পেল তাতেই ঝাঁপিয়ে পড়লো। সকাল সন্ধ্যা পরিশ্রম করে নিজে বাঁচল এবং রেখে আসা পরিবারকে উদ্ধার করতে চেষ্টা চালাতে লাগলো। 

‘ঘরকুনো বাঙ্গালী’  আর তাকে বলা যাবেনা। বুকে সাহস নিয়ে পৃথিবীর সকল প্রান্তে আজ বাঙ্গালী ছড়িয়ে গেছে। আজ তারা ‘রেমিটেন্স যোদ্ধা’ ।  

গার্মেন্টস কর্মী বা সেলাই দিদিমনি  

এই সেলাই দিদিমনিরাই গার্মেন্টসে বেশি সংখ্যক,প্রায় ৮০%। । এই গার্মেন্টস কর্মী দের ঘামঝরা  পরিশ্রম আমাদের আর এক বিরাট অবদান অর্থনীতির চাকা ঘোরানর ব্যাপারে । গ্রাম থেকে দরিদ্র পরিবার থেকে আসা মেয়েরা দলে দলে যোগ দিলো এই গার্মেন্টসে । ১৯৮০ সালের আগে পাট আর পাট জাত পণ্য ছিল প্রধান রফাতানি পণ্য। বর্তমানে পোশাক শিল্প সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে অর্থনীতিতে। বাংলাদেশ অর্থনীতি তে ৪৩ তম দেশ। দ্রুত বর্ধনশীল দেশের মধ্যে পঞ্চম। 

কৃষক ভাই 

কৃষক ভাইদের নিরলস খাটুনি কৃষির ক্ষেত্রে এনেছে এক বিরাট  বিপ্লব। আগে বিঘা প্রতি ১২ মন ধান হতো। এখন ৩০ মন ,চেষ্টা করা হচ্ছে ৫০  মনের । ১৯৭২ সালে খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিল মাত্র ১ কোটি টন। বর্তমানে ৪ গুন বেশি ,৫ কোটি টন। দুধ উৎপাদন ১০.৬৮ মিলিওন মেট্রিক টন,  মাংস ৭.৬৭ মেঃ টন, মাছ ৪৪.৮৮ মেত্রিক টন। যা দেখা যায়  উন্নত দেশ গুলোতে এখন তা নিজ দেশে। 

 

কখন থেকে অর্থনীতির চাকা ঘুরতে থাকেঃ 

পুরো সত্তর দশক জুড়ে ৩ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হয়। আশির দশকেও পরিবর্তন হয়নি। নব্বই দশক থেকে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহন  বৃদ্ধি পায়,  প্রবিদ্ধির চাকাও ঘুরতে শুরু করে। আর তা ছিল ৪-৫ শতাংশ হারে। 

২০০০ সাল থেকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ থেকে ৬ শতাংশ  হারে বৃদ্ধি পায়। ২০১০ -১১ অর্থবছরে ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে  যায়। 

২০১৫-১৬ সালে ৭.১১ শতাংশ  হার এবং ২০১৮-১৯ সালে  ৮.১৩ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হয়। করনা কালে ৫.২৪ তে  নেমে আসে। ২০২০ সালে কভিডের কারনে কিছুটা বাধা প্রাপ্ত হলেও জিডিপি হয়েছে ৬.৬ শতাংশ হারে। 

চলতি বাজার মূল্যের হিসাবে বাংলাদেশ ৩৫ তম বৃহৎ অর্থনিতির দেশ। গত ৫০ বছরে অর্থনীতির ক্ষমতা বেড়েছে ১৭১ গুন। অবশ্যই এতে  আছে বর্তমান সরকারের নেতৃত্বের কৃতিত্ব। 

রূপকল্প  ২০২১ 

মধ্যম আয়ের ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মানের স্বপ্ন আমাদের অর্থনীতির পথচলার এক মাইল ফলক। কতখানি এগুতে পারবো জানা নাই। তবে দেশের মানুষ বিশ্বাস করে যেতে পারবো এবং স্বপ্ন দেখে। আমরা স্বল্পউন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তির্ন হয়েছি এটা অনেক।অনেক মেগা প্রোজেক্ট হাতে নেয়া হয়েছে, তা চোখে দেখা যাচ্ছে। রাস্তা,সমুদ্র বন্দর,গভির সমুদ্র বন্দর , এক শতটি স্পেশাল ইকনমিক জোন , মেট্রো রেল ,ফ্লাইওভার, রূপপুর আণবিক কেন্দ্র এবং পদ্মা ব্রিজ ।

 

৫০% তরুণ প্রজন্ম 

আমাদের জনসংখ্যার অর্ধেক এখন তরুণ সমাজ। তাদের আছে অফুরন্ত জীবনী শক্তি এবং সম্ভাবনা । তারা কাজ করছে প্রবাসে এবং দেশে। তারা ডিজিটালাইজড  এবং গ্লোবালাইজড । ICT , কৃষি, শিল্প ব্যাবসা সব স্থানে তরুণের আগমন এগিয়ে নিয়ে যাবে বাংলাদেশকে। 

বাংলাদেশে এখন সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে পেছনে কারন অন্যদেশ 

একটা যুদ্ধ যখন আরম্ভ হয় তখন সেটা শুধু মাত্র দুই দেশর মধ্যে থাকেনা। সমস্ত পৃথিবীতে তার প্রভাব পড়ে। বিশ্বের পরাশক্তির  বিরোধ বাংলাদেশে যাতে ক্ষতি না হয় তার জন্য বাংলাদেশ কে নিরেপেক্ষ থাকতে হবে। যুক্ত রাষ্ট্রের কড়া নিষেধাজ্ঞা দিলে সেটা আমাদের মানতে হবে এবং রাশিয়ার সাথেও যে ব্যাবসা আছে তা চালিয়ে যেতে হবে।

সমস্যা ( চোখের সামনে নুতুন ঘটনা ) 

 

যে সমস্যা এখন দেখতে হচ্ছে তা হল ১) ডলারের উঠা নামা, ডলারের দাম বৃদ্ধি হওয়ার জন্য ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে টাকার পরিমাণ বেশি দিয়ে। ২) ইউরোপ আমেরিকায় ইনফ্লেসান বেশি হওয়ার ফলে তাদের ক্রয় ক্ষমতা কমে গেছে। পোশাক না কিনে খাদ্যের পেছনে অর্থ বরাদ্দ ঠিক রাখছে। পোশাকের ক্রয়াদেস কম পাচ্ছে বাংলাদেশ। যা এফেক্ট করছে গার্মেনট  শিল্পকে। ৩) জ্বালানির দাম বৃদ্ধি হওয়াতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবাহ কম হওয়াতে পোশাক তৈরি কারখানা এবং অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রিতেও উৎপাদনে ব্যাহত হচ্ছে।  ৪) ঋণ পরিশোধে ভাটা

 

 ‘বেঙ্গল’  অনেক আগে 

এই সেই সমুদ্রগামী প্রাচীন  নৌযান যাতে করে বাঙ্গালী এক সময় বঙ্গোপসাগর, আরব সাগর, চীন সাগর এবং ইন্ডিয়ান সাগরে ব্যাবসা বাণিজ্য চালাত

একসময় বাংলা ছিল একটি ঐতিহাসিক প্রসপারাস দেশ।বহু আগে থেকেই এই বদ্বীপ ছিল উর্বর এক অঞ্চল। উর্বর মাটি,মাইল্লড টেম্পারেচার এবং  প্রচুর পানির জন্য এখানে প্রচুর ফসল ফলতো । ১৩ শত শতাব্দী থেকে এই অঞ্চলের অর্থনীতি ছিল কৃষি ভিত্তিক। দক্ষিণ ‘সিল্ক রোডের’  কেন্দ্রস্থল ছিল বেঙ্গল । ইউরোপ বেঙ্গল কে মনে করতো সবচেয়ে ধনী অঞ্চল ব্যাবসা বাণিজ্য চালনার জন্য। 

উত্তর ভারতে সাথে বেঙ্গলের যোগ ছিল ‘Grand Trunk Road’  দ্বারা এবং তার সাথে যোগ ছিল সেন্ট্রাল এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য। উত্তরে গুজরাট এবং দক্ষিণে বেঙ্গল ছিল প্রধান সামুদ্রিক বন্দর। যার সাথে যোগাযোগ ছিল বহির বিশ্বের বাণিজ্য। 

মডার্ন বাংলা আবার জাগতে শুরু করুক। বিপদ বাধা বিপত্তি কেটে যাক। আমাদের হৃত গৌরব আবার ফিরে আসুক। দেশের মাটি এবং বিদেশের মাটিতে যে বাঙ্গালী চলাফেরা করছে তারা যেন মাথা উঁচু করে চলতে পারে। পেছনে যেন আমাদের আর যেতে নাহয়। 

   ফটো ক্রেডিটঃ  উইকিপেডিয়া 

তথ্য সূত্র: World Bank Country and Lending Group ,World bank retrieved,29

Rita Mukherjee Pelagic Passageways.The Northern Bay of Bengal Before colonialism.

Prothom Alo

wikipedia

নিজ চোখে দেখা ঘটনা প্রবাহ  

 

৫৬০জন ১৮৫জন
0 Shares

২০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ