বহুভুজ মন

জাকিয়া জেসমিন যূথী ১২ ডিসেম্বর ২০২০, শনিবার, ১১:৫১:৫৩অপরাহ্ন উপন্যাস ১২ মন্তব্য

#পর্ব-০৩
.

গুটিগুটি পায়ে বড় গোপনে একটু একটু করে এগিয়ে আসছে শীত এ নগরে। মাত্র সন্ধ্যা। উপরে নীল আকাশ। এখনো সন্ধ্যার অন্ধকারে আকাশ ছেয়ে যায়নি। শুধু নীলের ঘনত্ব যেন খানিকটা বেড়ে যেয়ে ধীরে ধীরে হালকা কালোর সাথে মিশে রাত নামতে শুরু করেছে। মাঝেমাঝে একটা দুটো তারা ছুটে এগিয়ে যাচ্ছে অন্য তারাকে ছুঁয়ে দিতে। তারাগুলি যেন বরফ পানি খেলায় মেতেছে। ছেলেবেলার কথা মনে পরলো। এ খেলাটা অবনীর ভীষণ প্রিয় ছিলো। কয়েকজন মিলে খেলতো। একজনকে চোর হতে হয় খেলাটায়। রাতুল সবসময় নিজেই চোর হতে চাইতো। ছোট মানুষের আবদার রাখতে ওকেই বেশিরভাগ সময়ে চোর বানানো হতো। সে দৌড়ে দৌড়ে শুধু অবনীকে ছুঁয়ে দিতে আসতো। ছোট ছিলো। বুঝতো না। ভাবতো ওর বুঝি শুধু আপুকেই ছুঁতে হবে। দৌঁড়ে এসে হাঁটুর কাছে এসে জামা চেপে ধরে বলতো, বলফ, বলফ!
সে একটা ঘরে বন্দি থাকতো, সেই ঘরের আশেপাশে বাকিরা চেষ্টা করতো তাকে ছুটিয়ে নিতে। আর চোর বাকিদের ধরার ট্রাই করবে এটাই নিয়ম ছিলো। কিন্তু রাতুল শুধু বোনের দিকেই ছুটে যেতো। প্রায় দিনই রাতুলের কারনে খেলা ভেস্তে যেতো। অন্যরা বিরক্ত হতো। সব খেলা একা রাতুলই খেলবে নাকি। রাগ করে বাসায় ফিরে আসতো অবনী। ছোটখালার কাছে এসে বলতো, কাল থেকে আর ওকে সাথে নেবো না। একটুও মজা করে খেলতে পারি না। একদম ভন্ডুল করে দেয় সবটা। খালামনি বলতো, হ্যাঁ, দু ভাই বোনের এত ঝগড়া খুনসুটি। সেই তো খেলার সময় আবার তাকে ছাড়া চলেই না। এ তো রোজকার ব্যাপার। তুই নিজেই ওকে সাধাসাধি করে বাইরে যাবি। যা এখন হাত মুখ ধুয়ে দুধ খেতে বোস। তারপরে পড়তে বসবি।
খালাতো ভাই রাতুল। ছেলেবেলায় ছিলো গোবেচারা। প্রায় শান্তশিষ্ট। একমাত্র অবনী ছাড়া ওর কোন বন্ধুই ছিলো না। সব আবদার, সব বাউন্ডুলে দুষ্টুমী শুধু এই একজনের সাথে। বছর কয়েকের ছোটবড় হলেও একসাথেই স্কুলে যাওয়া আসা হতো। পড়তে বসতো একসাথে। এমনকি ঘুমতও। সেই ছেলে কিরকম ছিলো তখন আর এখন কেমন। শান্তশিষ্ট সেই গুলুমুলু আদুরে বাচ্চা ছেলেটা এখন কত বড় হয়ে গেছে। বেশ চটপটে হয়েছে। গল্প আড্ডায় সবাইকে মাতিয়ে দেয়। এখন নটা পাঁচটার অফিস যায়। অফিসে যায় অবনীও। ছেলেবেলার দিনগুলো কেমন অসাধারণ নানা রঙের আবির মাখা ছিলো। অবনীর মাঝেমাঝেই ছেলেবেলার সেই দিনগুলিতে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। কত সুখের জীবন ছিলো। ছিলো না দায়িত্ব, ছিলোনা ভবিষ্যতের ভাবনা। একটা জীবন ওরকম করেই যদি কাটিয়ে দেয়া যেতো।
এই রূপালী গীটার ফেলে একদিন চলে যাবো দূরে, বহুদূরে …
আশেপাশের কোন বাসা থেকে এবির গানের সুর ভেসে আসছে। খোলা গলায় গুনগুন করে উঠলো অবনী, সেদিন চোখে অশ্রু তুমি রেখো গোপন করে…
গানের এই অংশে এসে সত্যি কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে আসে অবনীর। চোখের কোল বেয়ে নামের জলের ধারা।
পানির ট্যাংকির উপরে আঙ্গুল দিয়ে গিটারের ছন্দ তুলতে চেষ্টা করলো অবনী। আর গেয়ে চললো গানটা। যে গান বেজে চলেছে তার সাথে ঠোঁট মেলাচ্ছে সে- এই রূপালী গীটার ফেলে একদিন চলে যাবো দূরে, বহুদূরে …
চলে যাবো বলে চলেই গেলেন আইয়ুব বাচ্চু। সেই ছোট্ট থেকে শুনে আসছে তার গান। টিনএজ বয়েসের পুরো অধ্যায় কেটে গেছে এই একজনের গান উপভোগ করে। এখনো আছে সে গানের সাথে। দুঃখ পেলে মনের মধ্যে যে বেদনার সুর বেজে ওঠে তার জন্য চাই আইয়ুব বাচ্চুর গান। সুখে মাতোয়ারা? তখনো চাই তারই গান। বন্ধুদের আড্ডায় চাই তার গান। এমনকি যেকোন উৎসবেও। আইয়ুব বাচ্চু ছাড়া কি একদিনও ভাবা যায়? সে মানুষ টা এত অল্প বয়েসেই চলে গেলেন ওপারে। আচ্ছা অল্প বয়েসে কেন এইসব খ্যাতির শীর্ষে থাকা মানুষগুলো চলে যায়? লাখো, কোটি ভক্ত হৃদয়ের ভালো থাকা মন্দ থেকে বেঁচে থাকার জন্য যে মোটিভেশন ক্ষমতা দেয় গানগুলো, সেই গানের শিল্পীরা কেন নিজেদের একটু যত্ন নিতে পারে না?
প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে সন্ধ্যায় ছাদের পানির ট্যাংকির কাছে বসে থাকতে অবনীর খুব ভালো লাগে। সন্ধ্যা নামে ধীরে। আর ও বসে উপভোগ করে একটু একটু করে সন্ধ্যার বুকে রাতের নেমে আসা। পানির ট্যাংকি টা ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মাঝেমাঝে। মনে হয় যেন চারদিকের অসহ্য গরম গুমোট পরিবেশ থেকে হঠাত করে ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোন রুমে ঢুকে পড়েছে। শীতের আগমন সময় বলে ট্যাংকিটা আরও ঠান্ডা হয়ে থাকে। তাই ভালোলাগাটাও বেশি হয়।
বেদনা আমার হয়েছে সাথী,… হঠাত ছেলে কণ্ঠের গান বেজে উঠলো খুব কাছেই। রাতুল! হ্যাঁ তাইতো পানির ট্যাংকির ওপাশ থেকে রাতুলের মুখ দেখা গেলো, অবনীর গানের গলা পেয়েই নিজেও গানের লাইন মিলিয়ে গাইতে গাইতে চলে এসেছে ছাদে। চলে গেছি আমি কোন স্মৃতিপূরে … গেয়ে থেমে গেলো।
উঁকি দিলো আরেকটা মুখ। ভাইয়া এসে দাঁড়ালো ওদের সাথে। বললো, কিরে থেমে গেলি কেন দুজনে? ভালোই তো লাগছিলো। তারপরে তিনজনে একসাথে গান টা আবার শুরু করলো।
ভাইয়া আর রাতুলের সাথে অবনীর ভালোই সময় কাটে। এ দুজন ছাড়া ওর জীবনে পুরুষ মানুষের আনাগোণা নেই বললেই চলে। যেকোন কনসার্টের নাম শুনলেই ওরা যায় একসাথে উপভোগ করতে। আইয়ুব বাচ্চুর লাইভ শো তেও অনেকবার ধানমণ্ডির ওদিকে গিয়েছে তিনজনে। টিভির রেকর্ড করা গানের প্রোগ্রামের চেয়ে সামনে বসে প্রিয় শিল্পীর গান উপভোগের বিষয়টা বলে বুঝানোর নয়। যে জানে সেই জানে এ কত বড় সৌভাগ্য।
রাতুল বললো, দেবী সিনেমাটা খুব চলছে। অনেকেই দেখে ফেলেছে। সবার মুখে মুখে ফিরছে এর নাম। হিট হয়ে যাবে খুব। আমরা কবে দেখবো? বলেই ভাইয়ার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো। ভাইয়া বললো, অবনীর সময়ই আমার সময়। যেকোন এক শুক্রবারে করা যায়। অথবা সন্ধ্যার প্রোগ্রামে দেখা যেতে পারে।
রাতুল বললো, কে কে দেখবে? সবাইকে জানাই তাহলে? দলবেঁধে সিনেমা দেখতে যাওয়ার মজাই তো অন্যরকম, তাইনা?
অবনী বললো, আমার বান্ধবীদেরকেও জানাবো? ভাইয়া সাথে যাবে শুনলেই দেখা যাবে ওরা আবার বায়না বাঁধাবে যে ওদের টিকেটও কেটে দিতে হবে।
ভাইয়া বললো, আরে ওটা কোন সমস্যা না। একদিনেরই তো ব্যাপার। বলিস কাকে কাকে বলবি। আগে থেকে বলে রাখিস। তাহলে আমিও অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বের হয়ে যাবো।

অবনী ঘরের দিকে চললো। আফরিন আর অঞ্জনাকে জানাতে হবে। মেসেজ দিবে হোয়াটসএপে। ওদের কবে সময় হবে সেটাও তো মেলাতে হবে। পেছন পেছন নেমে এলো রাতুল আর ভাইয়া।
খালামনি বললো, এই, তোরা গান ধরেছিলি ছাদে বসে?
ওরা তিনজন হেসে উঠতেই খালামনি বললেন, নে চা করেছি। সবাই হাতে হাতে নিয়ে নে। সবাই বারান্দায় বসে যাই। আর গানটা আবার ধর তো। খুব শুনতে ইচ্ছে করছে।
সবাই অবনীদের সাথে বসে গেলো একপাশে। বারান্দার মেঝেতে খালামনি মাদুর বিছিয়ে দিয়েছে। অবনী বারান্দার রেলিং এর সাথে হেলান দিয়ে রেলিং এর ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখতে দেখতে গাইতে লাগলো। দুই ভাই গলা মেলালো ওর সাথে। ধীরে ধীরে বারান্দায় বের হয়ে এলো অবনীর মা, বড় মামা, খালু আর খালাতো বোন রাইসা। একজন সদস্য অনুপস্থিত। সে আর কোনদিন এখানে বসবে না। কখনো কি বসেছিলো এমন আসরে? মায়ের কাছে বাবার অনেক গল্প শুনেছে অবনী। বাবা খুব রোমান্টিক মানুষ ছিলেন। মাকে সাথে নিয়ে প্রায়ই ছাদে চলে যেতেন। একসাথে বসে কফি খাওয়া চলতো। অফিস থেকে ফেরার পরে নিজ হাতে কফি বানিয়ে বউকে নিয়ে ছাদে চলে যেতেন। আর সারাদিনের রাজ্যের দুনিয়াদারির খবর বউয়ের সাথে না বললে তার যেন হৃদয় তৃপ্ত হতো না।
বাবা, দূরের বাবা, তুমি কোথায়? কেন তোমায় যেতে হলো অত দূরে? অবনীর চোখ ভরে এলো জলে। অবনী গান শেষ করে নিজের চোখের জল আড়াল করতে বারান্দার অন্ধকারে মিশে যেতে লাগলো।

.
.

চলবে…

আগের_পর্বঃ

২১৬জন ১০৬জন
0 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য