একবার মেহেদি রাঙানো চুলের একজন আমায় প্রেমপত্র দিয়ে সাথে একখানা কবিতা লিখে উপহার দিয়েছিলো যার প্রথম চরণটি ছিলো-

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে;
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধুসর জগতে সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন, আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।”

আহা প্রেম! গোপন প্রেম যেন শরীরে দোলা দিয়ে যায়। মনকে করে আন্দোলিত। চিঠিদাতা কি বিবাহিত? মনে হয়না। বিবাহিত হলে কি আর প্রেমপত্র দিতো? ধুর! আগে চিঠি পড়ি, তারপরে ভাববো।

একলাইনের ঠিকানা সম্বলিত খামটি দিশাহারা হয়ে খুলে প্রেমপত্রটি হাতে নিতেই টুক করে বিছানায় লাল গোলাপের চারটি পাপড়ি ছড়িয়ে পরেছিলো সেদিন, সাথে মেহেদী রাঙা একটি চুল। চারটি পাপড়ি মানে কি? দুটির মানে হলো একটি তুমি অন্যটি আমি। কিন্তু চারটি?

আবার চুল দিয়েছে কেন? লিখতে গিয়ে নিজের অজান্তেই মাথা থেকে ঝরে পরেছে নাকি? হতেও পারে আমাকে উপহার দিয়েছে। সদ্য যৌবনে পা দেয়া আমার প্রতি কারও নজর পড়েলো তাহলে! খুশিতে আত্মহারা আমি ইয়াহুউ বলে কিন্নর কন্ঠে সেই যে সেদিন চিক্কর দিয়েছিলাম সেটা যারা শুনেছে তারা আজও মুচকি মুচকি হাসে।

আচ্ছা সে বুড়িটুড়ি নয়তো? ক্যামনে বলি? আজকাল যুগ জমানা ভালোনা। দুই সন্তানের মা, পাশের বাসার কলিম চাচার বউ লজিং মাস্টারের সাথে পালিয়েছে প্রেমের টানে; কাউরে বিশ্বাস নাই। বুড়ি কিংবা ছুড়ি যেই হোক, সবাই শুধু ফুসলায়। প্রেম যেন উপচে পরে ফুলঝুড়িতে।

আমি কিন্তু চেহারা না দেখে এই প্রেমে সাড়া দেবনা; সিদ্ধান্তে অটল। স্কুল কলেজ জীবনে সুন্দরী মেয়েরা আমার দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসি দিলেই ভাবতাম প্রেমে পরেছে। কিন্তু আজ একেবারে চিঠি এসেছে হাতে! এ নির্ঘাত চরম প্রেম। তবুও গুরুজনেরা বলেন, আগে দর্শনধারী তারপর গুনবিচারি। আজকাল বুড়িরাও চুল রঙিন করে। ধুর ধুর! বিশ্বাস এখন ধোয়া তুলসীপাতা।

ছাইপাঁশ এসব ভেবে চিঠিখানা ড্রয়ারবন্দি করে রেখেছিলাম সেদিন। একসপ্তাহ দু’ সপ্তাহ করে একমাস কেটে গেলো। আবার আরেকখানা চিঠি! নাহ! সে কি মশগুল হলো আমার প্রেমে? আমার রুপ নাই, রঙ নাই। ফেয়ার এন্ড লাভলীও ব্যবহার করিনা। যা আছে শুধু যৌবন! এতেই বনলতা অন্ধ হলো কি? বলা যায়না, ঘোর কলিযুগ এখন। থাইল্যান্ডে মেয়েরাই নাকি ছেলেদের কিডন্যাপ করে নিয়ে যায়। এদেশে এমন শুরু হওয়া বিচিত্র নয়।

প্রেমের টানে বিয়ের আসর থেকে পূর্ব প্রেমিকার লোকজন বরকে তুলে নিয়ে গেছে এমন নজিরও আছে। কিন্তু তারা হয় মহিলা না হয় যুবতী মেয়ে। কিন্তু আমাকে চিঠি দেয়া বনলতা! সে কে? বন্ধুদের কেউ তার দাদীর চুল আমায় পাঠিয়ে উপহাস করছেনা তারইবা কি গ্যারান্টি?

কাঁপা হাতে চিঠিখানা খুললাম। যা লেখা আছে তা পড়েতো আমার আক্কেলগুড়ুম। সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা বেশ বড় একটা চিঠি। গোটা চিঠিতেই শুধু একটাই বাক্য- “আমি তোমাকে ভালোবাসি, ভালোবাসি ভালোবাসি।” সাথে সেই মেহেদি রঙা একটা চুল! দ্বিতীয়বার সে চিঠি পড়ে আমার প্রেমিক মন হলো উতলা। পুরুষ মানুষ যে আমি!!

আবার সেই লালচে চুল! নাহ, নিশ্চিত এ ছেলেমানুষ না হয়ে যায়ই না। আজকালকার ছেলে ছোঁকড়ারা বড্ড পাজী। বুড়ো ধামড়ারাও কম যাননা। সবাই নিষিদ্ধ প্রেমে অন্ধ। আমার জীবনে অশান্তি আনতে পুরাতন কোন প্রেমিকাও এ চিঠি লিখতে পারে।

এর রহস্য আমাকে উদ্ধার করতেই হবে এই চিন্তা মাথায় নিয়ে আমিও চিঠির উত্তর লিখতে বসলাম-

বনলতা,
হিমালয় থেকে আল্পস পর্বতমালা খুঁজেও যে প্রেম পায়নি লাইলীর দেখা, আড়ালে আবডালে না থেকে পাণিগ্রাহী আমাকে দাও পূর্ণতা। তোমার মেহেদি রাঙা চুলের ঘ্রাণে মাতোয়ারা এই মজনুকে একটিবার দর্শন দিয়ে ধন্য করো প্রিয়তমা।”

কতদিন প্রেমপত্র লিখিনা, না জানি সে কি মনে করে! হাসলে হাসুক, আমার কি? যেমন লংকা তেমন ঝাল! শুধু এতটুকুতে কি তার মন গলবে? দেখাই যাক।

গোলাপী কাগজে নিজের একটা সাদা চুল চিঠিতে মুড়িয়ে পাঠিয়ে দিলাম সেই এক লাইনের ঠিকানায়। সেও দেখুক আমার পাকা চুল। যদি সে ভালোবাসে তাহলে এই পাকাচুলে তার আপত্তি থাকার কথা নয়। নাকি আমিও দাদার মেহেদি লাগানো একটা চুল দেব? নাহ থাক। যদি সত্যি সত্যি তরুনী হয় তবে লজ্জাস্কর ব্যাপার হবে। তার মেহেদি রাঙানো চুল আর আমার সাদা চুল, জমবে বেশ।

দু’দিন পরেই এসেছিলো উত্তর। বনলতা দেখা করবে। তবে কোন রেস্তরায় নয়, শান বাঁধানো শ্যামা পুকুর ঘাটে। তাই সই। করবো দেখা; জানতেই হবে এ কে? বুড়ি নাকি ছুঁড়ি?

দেখা আমি করতে গিয়েছিলাম সেদিন ঠিকই। তবে, আড়াল থেকে তাকে দেখবো বলে লুকিয়ে যাকে দেখেছি সে আর কেউ নয়, ছিলো আমার বুড়ী দাদী!! দাদাকে লেখা তার প্রেমপত্রখানি দাদা আমার কাছেই পাঠিয়ে দিয়েছিলো – ওরে নাতী দ্যাখ, বুড়ির প্রেম এই বয়সে উথাল পাতাল করছে!

চিঠিতে দেয়া গোলাপের চারটি পাপড়ির অর্থ এবার মাথায় এলো- দাদা,দাদী আর দুই সন্তান। দাদী আমার বড্ড রোমান্টিক। পুকুরপাড়ে বসে দুই বুড়ো লাইলী মজনু গভীর প্রেমে মগ্ন। এহ্! বুড়ির কি খিলখিলে হাসি; হিংসে হলো খুব।

ভগ্ন হৃদয় নিয়ে ফিরতি পথে হাঁটা ধরলাম আমি। এই নিয়ে ছয়বার প্রেম করেছে উপহাস। মিছেমিছি সব প্রেমিকার নাম দিয়েছি বনলতা! আমার উদাসী প্রেমিক মন আজ একটা গানই গুণগুণিয়ে গাইছে –

জীবনানন্দ হয়ে সংসারে আজও আমি
পরাজয় মেনে নিয়ে করিলেম দেন,
তবুওতো বেশ আছি ভালোই আছি,
কবিতায় পড়া সেই বনলতা সেন আর-
বনলতা সেন।

৫২৭জন ১৮৮জন
82 Shares

৬৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ