বদলে যাবার গল্প

হালিম নজরুল ১৬ মার্চ ২০২০, সোমবার, ১২:১৯:৫৫পূর্বাহ্ন ছোটগল্প ১৯ মন্তব্য

টুম্পার মনটা আজ ভীষণ খারাপ। সকালবেলা বাগানে এসে বুকের ভেতর হু হু করে কেঁদে উঠছে তার। অনেক যত্নে গড়া বাগানটা দিন দিনই শূন্য হতে চলেছে। অথচ শেষবার যখন বন্ধু নন্দীভূত এসেছিল, তখনও তার বাগানটি ফুলে-ফলে টইটুম্বর ছিল। গোলাপ, চামেলী, বেলী, শিউলীসহ হাজারো ফুলের গাছগুলো ছিল নানান রঙের ফুলে পরিপূর্ণ। আর ফলের গাছগুলোতে ঝুলছিল হরেক রকম ফল। আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল, তাল, পেয়ারা, কামরাঙা, আপেল, আঙুর সবই ছিল অফুরন্ত। তার বাগান দেখে ভীষণ খুশি হয়েছিল প্রিয় বন্ধু নন্দীভূত। যাবার সময় সে বলে গিয়েছিল খুব শীঘ্রই আবার এই বাগান দেখতে আসবে। কিন্তু এবার এলে সে কি ভাববে! এইসব ভেবে মনটা আরও খারাপ হয়ে যাচ্ছে তার।

কিছুক্ষণ নীরবে বসে থেকে একটু উঠে দাঁড়ালো টুম্পা। আস্তে আস্তে বেদানা গাছটার কাছাকাছি গেল। গাছের দিকে তাকিয়ে সে অবাক হয়ে গেল। গতকালও গাছটিতে অনেক সুন্দর সুন্দর বেদানা ঝুলছিল। অথচ আজ সেগুলো নেই! নিশ্চয়ই ফলগুলো কেউ না কেউ চুরি করে নিয়ে গাছে। তা না হলে এক রাতের মধ্যে এতগুলো বেদানা গেল কোথায়!

আনমনে এসব কথা ভাবতে ভাবতে টুম্পার চোখে জল চলে আসলো। হঠাৎ সে খেয়াল করলো তার পিছন থেকে কেউ তার কাঁধে হাত রাখলো। পিছনে তাকিয়েই সে অবাক হয়ে গেল। এতক্ষণ যে বন্ধুর কথা সে ভাবছিল, সেই নন্দীভূতই কি না চলে এসেছে ! নন্দীভূতকে জড়িয়ে ধরে সে কেঁদে ফেললো। নন্দীভূত তাকে শান্ত্বনা দিতে লাগলো। সে বললো “কেঁদো না টুম্পা, কি হয়েছে আমাকে খুলে বলো। ধৈর্য্য ধরো, ঈশ্বর নিশ্চয়ই তোমার মঙ্গল করবে।”

নন্দীভূতের শান্ত্বনা পেয়ে টুম্পা কিছুটা শান্ত হলো। সে তাকে সব কথা খুলে বললো। সব কথা শুনে নন্দীভূত বললো “তুমি ভেঙে পড়ো না টুম্পা, দুনিয়াতে যারা ভাল কাজ করে ঈশ্বর তাদেরকে মঙ্গল করেন। তোমার ভাল কাজের প্রতিদান তুমি পাবেই। এই যে তুমি তোমার বাগানের এত ফলমূল এলাকার মানুষকে দান করো, দুস্থ অসহায় মানুষের জীবিকা দান করো, এর প্রতিদানও তুমি পাবেই।”

এরপর প্রতিরাতে নন্দীভূত গোপনে টুম্পার বাগানে পাহারা দিতে লাগলো। এক রাতে সে দেখলো টুম্পাদের গ্রামের আরেকজন অসাধু লোক টুম্পার বাগানে এলো। সে বাগানের বেশকিছু ফুল, ফল ও গাছ তুলে নিয়ে গেল। তারপর সে গাছগুলোকে নিজের বাগানে লাগালো। আর ফুলগুলো দিয়ে নিজের বাড়িঘর সাজালো। ফলগুলো নিজের পরিবারের লোকদের নিয়ে মজা করে খেলো। নন্দী বুঝতে পারলো টুম্পার মত ভাল মানুষদের সাজানো বাগানকে সাবাড় করে সে নিজে ধনবান হবার চেষ্টা করছে। এটা দেখে তার সহ্য হলো না। সে মনে মনে ভাবলো এখন তার কিছু একটা করা উচিৎ।

এরপর নন্দীভূত প্রতি রাতে ঐ অসাধু লোকটির বাগান থেকে চুরি করা গাছগুলোকে তুলে এনে আবার টুম্পার বাগানে লাগিয়ে দিল। ধীরে ধীরে টুম্পার বাগানটি আবার সতেজ গাছগাছালি ও ফুলে-ফলে ভরে উঠলো। টুম্পার মুখে পূণরায় হাসি ফুটে উঠলো। কিন্তু ঐ লোকটির বাগান খালি হয়ে পড়লো। তার সংসারে অভাব অনটন দেখা দিল। কিন্তু টুম্পা এর কোন কারণ বুঝতে পারলো না।

অসাধু লোকটি আবার চুরি করার চেষ্টা করলো। সে আবারও রাতে টুম্পার বাগানে গেল। দুই তিনটা ফল ছিড়তে না ছিড়তেই লুকিয়ে থাকা পাহারারত নন্দীভূত তাকে পাকড়াও করে ফেললো। তারপর তাকে ঘাড় মটকাতে গেল। লোকটি এবার অনুনয় বিণয় করে ক্ষমা চাইতে লাগলো। নন্দীভূত বললো “আমি তোমাকে ক্ষমা করতে পারি, যদি টুম্পা তোমাকে ক্ষমা করে দেয়।” এই কথা বলে নন্দী টুম্পাকে ডেকে আনলো।

টুম্পাকে দেখে লোকটি মাথা নীচু করে ফেললো। সে টুম্পার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা চাইলো। সে সব চুরির কথা স্বীকার করলো এবং ভাল হয়ে যাবার প্রতীজ্ঞা করলো। নন্দীভূত বললো “পৃথিবীর সবাই ভাল লোকের মঙ্গল করতে চায় এবং তাকে সহযোগিতা করে। তবে তোমার মত খারাপ লোককে ক্ষমা করা যায় না।” কিন্তু টুম্পা বললো “যে কোন অসাধু লোককে ভাল হবার একটা সুযোগ দেওয়া উচিৎ। তাই আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। আশা করি তুমি এবার ভাল হয়ে যাবে”।

টুম্পার কথা শুনে লোকটার চোখে জল এসে গেল।নন্দীভূত বললো “টুম্পার মহত্ব দেখে তুমি ওর কাছ থেকে সৎ হবার শিক্ষা নাও। সততাই তোমাকে অনেক বড় করে তুলবে।” সব কথা শুনে লোকটি ভাল মানুষ হবার প্রতীজ্ঞা করলো এবং কিছুদিনের মধ্যে সেও একজন ভাল মানুষ হয়ে গেল।

১২৬জন ১১জন
4 Shares

১৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য