বছর শেষে বলতে চাই, ভালো আছি

রিমি রুম্মান ২৮ ডিসেম্বর ২০১৯, শনিবার, ০৩:১২:৪১অপরাহ্ন সমসাময়িক ৯ মন্তব্য
ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টাতেই বছর শেষ হয়ে গেলো যেন! একটি বছর বড় তাড়াহুড়ায় চলে গেল! কিছুই করা হোল না। সময়গুলো চোখের নিমিষে অতীত হয়ে যাচ্ছে। স্বদেশ, স্বজন-পরিজনদের যোজন যোজন দূরে রেখে আসার এক বেদনামাখা নামই কি প্রবাস ? নাকি জ্বলজ্বলে স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে কঠিন বাস্তবতাকে হাসি মুখে মানিয়ে নেওয়ার নাম প্রবাস ? সে যা-ই হোক না কেন, আমরা প্রবাসীরা সব কঠিনকে পিছনে ফেলে আলো ঝলমলে এই নিউইয়র্ক নগরীতে হৈ-হল্লোর করে ইংরেজি বছরের প্রথম প্রহরটি উদযাপন করে থাকি। কেউ বাহিরে রেস্তোরাঁয়, কেউবা বাড়িতেই সুস্বাদু খাবার-পানীয় দ্বারা বন্ধুবান্ধব, পরিবার নিয়ে বছরের শেষ দিনটির বিদায় এবং নতুন বছরের শুরুর সময়টি বেশ জমকালো আয়োজনে পালন করে থাকেন। কিন্তু সব হৈচৈ আর আনন্দের মাঝেও দিন শেষে, বছর শেষে অনেক না পাওয়া আর হারানোর বেদনা তাড়া করে ফিরে আমাদের।
আমার এক বন্ধুর কথা বলি। সাত বছর আগে নিউইয়র্ক এসেছিল সে। নানান ব্যস্ততায় দেশে যাওয়া হয়ে উঠেনি। আসার দু’বছর পর তাঁর বাবা মারা যায়। বাবাকে শেষ দেখাটি দেখতে পারেনি পাসপোর্ট সংক্রান্ত জটিলতায়। সেই আক্ষেপ ছিল ঠিকই, কিন্তু মা’য়ের সাথে যোগাযোগ হতো প্রায় প্রতিদিন ভাইবার, স্কাইপির কল্যানে। এই দূর প্রবাসে তাই মনখারাপ করা হাহাকার অনেকাংশেই কম ছিল তাঁর। মায়ের শ্বাসকষ্ট জনিত সমস্যা ছিল অনেকদিনের পুরনো। সময়ে অসুখটি বেড়ে গিয়েছিল। তবুও বুঝতে দেননি মেয়েকে। মা’য়েরা চিরকাল কষ্ট আড়ালে রাখেন যদিও, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর না পেরে মেয়েকে দেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন। মেয়ে তার কর্মক্ষেত্রে জমিয়ে রাখা বাৎসরিক ছুটির সাথে বসকে অনেক অনুরোধ করে আরও এক সপ্তাহ বেশি ছুটি নেয় অফিস থেকে। টিকেট কাটে। তিন সপ্তাহের ছুটিতে দেশে যাবার পরিকল্পনা ! পৃথিবীর তীব্রতম উচ্ছ্বাস ছিল তাঁর চোখে মুখে। পৃথিবীর সবচাইতে শান্তির জায়গা মায়ের বুকে ফিরবার আয়োজন ছিল তাঁর। আমার বাবা-মা বেঁচে নেই, তাই তাঁর আনন্দে আনন্দিত হয়েছি। উচ্ছ্বসিত হয়েছি। নিজের বাবা-মায়ের কথা মনে করে ভেতরে প্রলয় বইয়েছি। সেই প্রলয়ে ঘুরপাক খেতে খেতে আমার কষ্ট লুকানো বাবা-মা’য়ের হাসিমাখা মুখ আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেতে দেখেছি! একদিকে বিদেশের বাড়িতে বসে আমার বন্ধুটি বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে দেশে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। অন্যদিকে সুদূর বাংলাদেশে মেয়ের আগমন আনন্দে তাঁর মায়ের বিরামহীন প্রস্তুতি চলছিল। মেয়ের পছন্দের আচার, নারকেলের চিড়া আরও কতো কী বানিয়েছিলেন তিনি! মেয়ের রুমটি ক’দিন ধরে ঝাড়-মোছ করে ঝকঝকে করে তুলেছিলেন। অসুস্থ শরীরে খাটা-খাটুনি একটু বেশিই হয়েছিল বোধ হয়। এমনই এক রুদ্ধশ্বাস সময়ে আমার বন্ধুটি আচমকা একদিন তাঁর মায়ের মৃত্যু সংবাদ পায় এই প্রবাসে বসে ! শতাব্দীর বেদনা বুকে চেপে দীর্ঘতম পথ পাড়ি দিয়ে আমার বন্ধুটি নির্ধারিত দিনে দেশে ফিরে গিয়েছিল ঠিকই। থরে থরে সাজানো আচার, নারকেলের চিড়া, পছন্দের খাবার, সাজানো গোছানো প্রিয় রুম সবই ছিল। সাত বছর আগে ফেলে আসা শূন্য সেই রুম কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ছিল না শুধু প্রাণপ্রিয় বাবা-মা। যে কয়দিন দেশে নিজ বাড়িতে ছিল, আমার বন্ধুটি অনেক ক্ষুধার্ত ছিল, তবুও গলা দিয়ে তাঁর খাবার নামেনি। অনেক ক্লান্ত ছিল, তবুও সেই রুমটিতে দু’চোখের পাতা এক করতে পারেনি। নির্ঘুম রাত পেরিয়ে ভোর হয়েছে, আযান হয়েছে। তবুও না। এটাই বাস্তবতা।
আমার মা-ও আচমকা ঠিক এমন করে একদিন চুপিসারে আমাদের কাঁদিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। সুস্থ একজন মানুষ বুকে তীব্র ব্যাথা নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলেন। তারপর চিরচেনা ঘরে ফিরেছেন নিথর হয়ে। বিদেশের বাড়িতে বসে মায়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়েছিলাম আমিও। পেয়েছিলাম ছোটবেলার খেলার সাথী রুমির মৃত্যু সংবাদও। ঠিক এমনই এক খ্রিষ্টীয় নতুন বছর উদযাপনের লক্ষ্যে বন্ধুদের নিয়ে ম্যানহাঁটনের রাস্তায় আনন্দে মেতে থাকার সময়টাতে বন্ধু রুমির মৃত্যু সংবাদ পেয়েছিলাম। কী নির্মম বাস্তবতা! স্বজনহীন এই দূরদেশে কী এক অসহায়ত্ব ! দেশ থেকে আসা এমন নানাবিধ দুঃসংবাদ আর মানসিক চাপের কারণে মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ এবং হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এই দূরদেশে প্রবাসীদের মৃত্যুর হারও একেবারেই কম নয়। তাই তো কেউ কেউ দীর্ঘশ্বাসের সাথে বলে থাকেন, প্রবাসীরা অনেকটা সমুদ্রের কোলে অস্তগামী সূর্যের ন্যায়। না পাওয়া আর হারানোর দোলাচলে জীবন এগিয়ে চলে তাঁদের। তবুও নতুন সূর্যোদয়ের সাথে নতুন স্বপ্ন আর প্রত্যাশা থাকে তাঁদের দু’চোখ জুড়ে। থাকে বিদায়ী বছরের বিষণ্ণতা ভুলে নতুন বছরে সব প্রতিকুলতাকে জয় করার প্রত্যয়। প্রবাস জীবনে আনন্দ-বেদনা-হতাশা আছে, কিন্তু এটি তো জীবনেরই অংশ। নিউইয়র্কের রাস্তায় কণকণে শীতের দিনেও গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকা গৃহহীনের দিকে যখন তাকাই, মনে হয় আমার তো অন্তত একটি ঘর আছে। হাসপাতালের সামনে হুইলচেয়ারে বসা অসুস্থ মানুষটির দিকে তাকালে মনে হয়, আমার তো এখনো দুই পায়ে ভর করে চলার সক্ষমতা আছে। সাদা ছড়ি হাতে রাস্তা পার হতে যাওয়া অন্ধ লোকটির দিকে তাকালে মনে হয়, আমি তো এখনো দু’চোখ মেলে পৃথিবীর আলো, বাতাস, সৌন্দর্য দেখতে পাই। চারপাশে হাজারো মানুষের এমন না পাওয়াগুলোর দিকে তাকালে আমাদের হতাশা উবে যাবে নিমিষেই। নতুন বছরের শুরুতে আমরা অজান্তেই বলে উঠবো, ‘ভালো আছি, বেশ ভালো। সৃষ্টিকর্তাকে অনিঃশেষ ধন্যবাদ’।
১৩৩জন ৫২জন
4 Shares

৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য