বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ এদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার অন্যতম দলিল, এটা নিয়ে বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই। বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এবং সেসব সংগঠনের বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা, ঘোষক ও তারিখ সম্পর্কে অনেকেই নিজেদের মতো করে এই প্রজন্মের সামনে উপস্থাপন করছেন যা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। তাই পাঠকদের প্রকৃত ইতিহাস জানাতেই আমার এই ছোট্ট প্রয়াস।

বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা নতুন নয়। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও আমরা এদেশের স্বাধীনতার ঘোষনা এবং ঘোষক নিয়ে যে ধূম্রজালের আবহ তৈরী করেছি তাতে করে আমাদের নতুন প্রজন্ম এদেশের স্বাধীনতার সত্যিকারের ইতিহাস জানা থেকে বিরত হচ্ছে। এখন আমরা ইতিহাস জানতে গুগলের সাহায্য নেই কিন্তু একবারো ভাবিনা আসল এবং তথ্যগত দালিলিক প্রমাণ থেকে আমাদের সত্যিকারের ইতিহাস জানা উচিত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নানা মুনির নানান মতে এদেশের ইতিহাস বিকৃতি হচ্ছে বারবার। মনে প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশের ইতিহাস কি আরও একবার মার খেতে যাচ্ছে? এই আশঙ্কা আজ আমাদের একার নয়। সত্যিকারের দেশপ্রেমিক এবং ইতিহাস সন্ধিৎসু ব্যক্তিমাত্রই জানতে চাইবেন সঠিক ইতিহাস।

বাংলাদেশের যে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ১৯৭১ সালে এসে চূড়ান্ত রূপ পায় তার ইতিহাস আজ বিস্মৃত হতে চলেছে। কতক ক্ষেত্রে তা বিকৃতরূপও পাচ্ছে। এই আশঙ্কা বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ফলশ্রুতি। ১৯৭১ সালে হঠাৎ করেই সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল এমন ধারণা সঠিক নয়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম, এমনকি সশস্ত্র প্রসস্তুতি এবং অনেক মনীষা ও সংগঠনের মেধা ও স্বপ্ন ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের জন্ম লাভের সম্ভাবনা হিসেবে কাজ করেছে।

পাকিস্তানি সৈন্যরা ২৫ মার্চ রাতে কামান, রাইফেল, মর্টার ইত্যাদি নিয়ে অতর্কিতে বাঙ্গালীদের উপর যখন ঝাঁপিয়ে পড়ে, বঙ্গবন্ধু তখন গ্রেপ্তার হওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে তাঁর সর্বশেষ বাণী বাংলায় মানুষের কাছে পাঠান এই বলে- “This may be my last message. From today Bangladesh is independent. I Call upon the people to Bangladesh wherever you might be and with whatever you have, to resist army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved. (এই-ই হয়তো তোমাদের জন্য আমার শেষ বাণী। আজকে থেকে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। যে যেখানেই থেকে থাকো, যে অবস্থায় থাকো, হাতে যার যা আছে, তাই নিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত প্রতিরোধ গড়ে তোল। ততোদিন পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে, যতোদিন পর্যন্ত না দখলদার পাকিস্তানিদের শেষ সৈনিকটি বাংলাদেশের মাটি থেকে বহিস্কৃত হচ্ছে এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হচ্ছে।”

বার্তাটি পরে ২৬ মার্চ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে পড়ে শোনানো হয়। জেনারেল টিক্কা খানের জনসংযোগ অফিসার সিদ্দিক সালিক লিখেছেন- “পাকিস্তান রেডিওর সরকারি তরঙ্গের কাছাকাছি একটি তরঙ্গ থেকেও ২৫ মার্চ রাতে শেখ মুজিবের এই ঘোষণা ক্ষীণকণ্ঠে ভেসে উঠেছিল। তাতে শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানকে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ হিসেবে ঘোষণা করলেন।”

বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যখন ই পি আর ওয়ারলেসে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করছিলেন, তখন সবে পাক বাহিনী ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হচ্ছে। এরা ফার্মগেট এসে পৌঁছামাত্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। এরপর তারা পিলখানায় ই পি আর ও রাজারবাগে পুলিশের দুর্গ দুটিতে আক্রমণ চালায়। বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তার হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে এ খবর পেয়েছিলেন। ফলে বঙ্গবন্ধু আরেকটি বার্তা ঢাকার টি এন্ড টি মারফত পাঠান। তাতে বলা হলো- “পাকিস্তানি সৈন্য বাহিনী পিলখানায় পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস এর সদরদপ্তর আর রাজার বাগ পুলিশ লাইনের উপর আক্রমণ করেছে। সমস্ত শক্তি জড়ো করে প্রতিরোধ করুন আর স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুতি নিন।”

বিদেশী লেখক রবার্ট পেইন খুব অবাক হয়ে এ সম্পর্কে লিখেছেন- “খবরটি কিভাবে কোত্থেকে এলো তা ভেবে কেউ বসে থাকলো না। সারা পূর্ব পাকিস্তানের শহরে-বন্দরে খবরটি ছড়িয়ে গেল। এটাই ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর প্রথম মারাত্মক ভুল যে তারা টেলিফোন এক্সচেঞ্জ দখল না করেই পিলখানা আর রাজারবাগে আক্রমণ চালায়।”

২৫ মার্চ রাতেই পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে নিহত হয় অসংখ্য ছাত্র, পুলিশ ও ই পি আর বাহিনীর বাঙালি স্বাধীনতাকামী সদস্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন জহুরুল হক হল, রাজারবাগ পুলিশ লাইন এবং পিলখানা সদর দপ্তরে এইসব যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

ই পি আর এর ওয়ারলেস যোগে ২৫ মার্চ গভীর রাতে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার এই ঘোষণা কোনো কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে সারাদেশে পাঠানো হয়েছিল এবং ঘোষণাটি ওয়ারলেস এর মাধ্যমে পাঠাতে যারা সেদিন তা গ্রহণ করেছিলেন, তার বিবরণ ও তাঁদের নাম বাংলাদেশ সরকারের গণভবনে খোদাই করে লেখা ছিল। বঙ্গবন্ধুর প্রচুর ‘সোর্স’ ও গোপন যোগাযোগ ছিল এবং সেটা থাকারই কথা। স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ ঘোষণার বিষয়টি একটি ‘গোপন’ বিষয়। শত্রু পক্ষের অগোচরে একান্ত ঘনিষ্ঠজন ছাড়া তিনি তা শেষ পর্যন্ত গোপন রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন। যে যুদ্ধ ঘোষণাটি তিনি ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাঠিয়েছিলেন তা তিনি শুরু করতে চেয়েছিলেন পাকিস্তানিরা আক্রমণ শুরু করার পর পরই।

প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ সালের ২ মার্চ, ৩ মার্চ এবং পুনরায় ৭ মার্চ বাংলার স্বাধীনতা চূড়ান্তভাবে ঘোষিত হয়েছিল এবং এই নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। কারণ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু তখনো সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করেননি। বিতর্ক হওয়া উচিত ছিল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন কি না? সেই কাজটি করার সময় তিনি পেয়েছিলেন কি না? যেসব দলিল পাওয়া যাচ্ছে, তার থেকে দেখা যাচ্ছে, ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু যুদ্ধই ঘোষণা করেছেন। তাই স্বাধীনতার ঘোষণা সংক্রান্ত বিতর্কটি ২৫ মার্চকে ঘিরে আবর্তিত করা একেবারেই অবান্তর। কারণ ২৫ মার্চের অনেক আগেই বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতি স্বাধীনতা ঘোষণা করে ফেলেছিল। ২ মার্চ, ৩ মার্চ, ৭ মার্চ এবং এর পরবর্তী দিনগুলোর ঘটনাবলী প্রমাণ করে স্বাধীনতা ঘোষণার বাকি ছিল না। বাকি ছিল শুধু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার। বিতর্ক উঠতে পারে এ নিয়েই যে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণার পর আদৌ শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ ঘোষণার বার্তা দিয়ে যেতে পেরেছিলেন কি না। পূর্বে উল্লেখিত ঘটনার বিবরণ প্রমাণ করে বঙ্গবন্ধু যুদ্ধ ঘোষণা করে যেতে পেরেছিলেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত একজন লেখক মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসি জানাচ্ছেন- ” ওয়ারলেস যোগে প্রেরিত বঙ্গবন্ধুর বাণী প্রথম ধরা পড়েছিলো চট্টগ্রাম উপকুলে নোঙর করা এক বিদেশী জাহাজে। জাহাজের ক্যাপ্টেন সাথে সাথেই বঙ্গবন্ধুর এই বাণী টেলিফোনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমেদ চৌধুরীকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। জহুর আহমেদ চৌধুরী রাতের মধ্যেই প্রচারপত্র ছাপেন এবং সকাল থেকে বিলি করা শুরু করেন। একইসাথে তিনি আরেকটি কাজ করেন, তা হলো প্রত্যেক জেলায় টেলিফোন করে জেলা প্রশাসকদের বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ পৌঁছে দেন।”

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে স্বাধীনতার যে বার্তাটি পাঠিয়েছিলেন তা ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এর (ইপিআর) ওয়ারলেস যোগে প্রথম পাঠানো হয় চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামের বার্তাটি গ্রহণ করেছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান। কালুরঘাটস্থ চট্টগ্রাম রেডিও ট্রান্সমিটার সেন্টার (পরে এটি স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র নামে পরিচিত হয়েছিল) থেকে ঘোষণাটি ২৬ মার্চ দুপুর আড়াইটায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে প্রচার করেন চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান। রেডিও স্টেশনের মাধ্যমে এই প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা। আর এর মধ্য দিয়েই স্বাধীন বাংলাদেশ বেতার কর্মসূচির প্রথম সূত্রপাত।

কিন্তু চট্টগ্রামের বাঙালি সৈন্যদের মধ্যে ঐক্যমত্য হলো না। ইপিআর এডজুটেন্ট রফিকুল ইসলাম তার সৈন্যদের ক্যান্টনমেন্টের পেছনে জড়ো হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে মেজর জিয়াউর রহমান তাদের নিয়ে যান কালুরঘাট সেতুর দিকে। ফলে বাঙ্গালী সৈন্যরা বিভক্ত হয়ে পড়ে। পরে আওয়ামী লীগ নেতারা মেজর জিয়াকে রেডিওতে এসে সংগ্রামরত সৈন্যদের উদ্দেশ্যে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করে ডেকে আনেন। ২৭ মার্চ ১৯৭১ মেজর জিয়া চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে অনুরুদ্ধ হয়ে ভাষণ দিতে এসে নিজেকে প্রথম ‘প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে ঘোষণা করেন। ফলে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।

মেজর জিয়াকে স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণা সংশোধন করতে বলা হলে তিনি ঘোষণাটি নতুন করে বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচার করেন। তিনি বলেন – “I Major Ziaur Rahman do hearby declare independence of Bangladesh on behalf of our Great national leader Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman.”

বেলাল মোহাম্মদ ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। এই কেন্দ্রের প্রথম দিন, প্রথম ঘণ্টা, প্রহর থেকে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থেকে তিনি মুক্তিযুদ্ধের দ্বারোদঘাটন করেন। দেশের স্বাধীনতা ঘোষণার ইতিহাসে মেজর জিয়াউর রহমানের ঘোষণা যে অবিস্মরণীয় অবদান রাখে, তারও রূপকার ছিলেন এই বেলাল মোহাম্মদ। এ প্রসঙ্গে তাঁর স্মৃতিচারণ এক অমর ইতিহাসের দলিল।

স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন- “২৭ মার্চ সকালবেলা… অফিস কক্ষে শুধু আমরা দু’জন আমি ও মেজর জিয়াউর রহমান। বলেছিলাম- আচ্ছা মেজর সাহেব আমরা তো সব ‘মাইনর’, আপনি ‘মেজর’ হিসেবে স্বকন্ঠে কিছু প্রচার করলে কেমন হয়।… আমি একটা কাগজ এগিয়ে দিয়েছিলাম। তিনি নিজের পকেট থেকে কলম হাতে নিয়েছিলেন। প্রথমে তিনি লিখেছিলেন – “I Major Zia do here by declare independence of Bangladesh.”

আমি (বেলাল মোহাম্মাদ) তখন বলেছিলাম- দেখুন, বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে বলবেন কি?

তিনি বলেছিলেন হ্যাঁ ঠিকই বলেছেন।- নিজের নামের শেষে তীর-চিহ্ন দিয়ে তিনি লিখেছিলেন- “on behalf of our Great national leader Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman….”

১৯৭১ সালে ক্যাপ্টেন অলি আহমেদ ছিলেন মেজর জিয়ার সার্বক্ষণিক অনুসারী। ২৭ মার্চ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়া যখন ঘোষণাটি প্রচার করেন তখন তিনি ছিলেন এর অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী এবং পরবর্তীকালে যখন জিয়াউর রহমান দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতাসীন, তখনও কর্ণেল অলি আহমেদ তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের একজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

লে. কর্ণেল (অবসরপ্রাপ্ত), বীর বিক্রম অলি আহমেদ এ বিষয়ে একটি প্রবন্ধও লেখেন। ১৯৯২ সালের ৩০ মে তারিখে বিএনপি দলীয় পত্রিকা ‘দৈনিক সকালের খবর’- এ তাঁর “স্বাধীনতার ঘোষণা এবং জিয়া” শীর্ষক উক্ত প্রবন্ধের ভাষ্যে তিনি বলেন- “শহীদ জিয়াউর রহমান কেন এবং কি পরিস্থিতিতে ২৭ মার্চ ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন, সে সম্বন্ধে কিছু তথ্য তার একজন ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হিসেবে দেশের জনগণকে আমি জানাতে চাই।…. ২৫-২৬ মার্চ রাত্রে প্রায় আনুমানিক ১১ টার দিকে মেজর জিয়ার নেতৃত্বে আমরা কয়েকজন সামরিক অফিসার এবং অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের মাত্র ৩’শ অন্যান্য পদবীর সৈন্যদের নিয়ে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করি।… তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, রেডিও-র মাধ্যমে এদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করতে হবে। জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য আহবান করতে হবে এবং ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। নচেৎ পাক সেনারা হত্যাকান্ড চালিয়ে এদেশকে শাসন ও শোষণ করবে। বাইরের জগতের পক্ষে কিছুই জানা সম্ভব হবে না, আমরাও স্বাধীন হতে পারব না।

সেদিনের মেজর জিয়া তার নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র দখল করে ২৭ মার্চ বিকেলবেলা এদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণের আহ্বান জানালেন দেশবাসীকে।”

জনগণ গ্রহণ করবে কার কথা? জিয়ার সাথে সেদিন ছিলেন যিনি তার কথা নাকি যিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি তার কথা?

জিয়াউর রহমান হচ্ছেন একমাত্র বাঙালি সৈনিক যিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের পটভূমি ব্যাখ্যা করে ৭ মার্চ রেসকোর্স প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে একটি গ্রিন সিগন্যাল বলে উল্লেখ করে প্রবন্ধ লিখেছিলেন। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর ইতিহাসে জিয়াউর রহমান হচ্ছেন প্রথম রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিত্ব, যিনি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রথম থেকেই লেখালেখি করেছেন।

কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের অভ্যুদয়কে প্রথম থেকে আওয়ামী লীগ নেতিবাচক মনোভাব গ্রহণ করায় এই সুযোগে একদল স্তাবকের জন্ম হয়, যাদের প্রাথমিক প্রয়াস চলে জিয়াউর রহমানকে তাঁর প্রয়োজনের তুলনায় বড় করে তোলা এবং আওয়ামী রাজনীতির পাল্টা প্রয়াস হিসেবে শেখ মুজিবের উপর তাকে প্রতিষ্ঠিত করা। বস্তুত এভাবেই একজন মুক্তিযোদ্ধা যিনি ১৯৭১ সালে দেশের সংকটকালে রাজনৈতিক কর্মীদের মনে সাহস জাগিয়ে তুলেছিলেন, কালের চক্রে তিনিই ইতিহাস বিকৃতিকারীদের হাতে পড়ে দেশের যিনি স্থপতি সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কৃত্রিম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ব্যবহৃত হন।

মেজর জিয়ার ঘোষনার এই রাজনৈতিক তাৎপর্যের উপলব্ধিহীনতার কারণেই তাঁর পক্ষের লোকেরা কেউ কেউ তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলতে ব্যস্ত। আর বিপক্ষের লোকেরা আবার একইভাবে তাকে খাটো করে তুলতেও সচেষ্ট। বস্তুত সেই সময় কেউ কারো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নামেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। এই জন্য বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের রেসকোর্সের ভাষণের দুই লাইন- “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম” শীর্ষক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিদিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বাজিয়ে শোনানো হতো।

“২৫ মার্চ রাতে চট্টগ্রামের ঘটনা নিয়ে যে নতুন উপাখ্যান শুরু হয় এই উপখ্যান সম্পর্কে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত কেউ কোনদিন প্রশ্ন করেনি, প্রশ্ন ওঠার মতো সুযোগও উপস্থিত হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন উঠানো শুরু হয় ১৯৭৫ সালের আগস্টে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর থেকে। আগস্ট ক্যু করে যারা ক্ষমতায় এসেছিল তারা জনগনের ভোটে ক্ষমতায় আসেনি, এসেছিল বন্দুকের জোরে। যদিও দেখা গেল মন্ত্রিসভা, রাষ্ট্রপতির আসনে বসে আছে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ যেমন- খন্দকার মোশতাক ও শাহ মোয়াজ্জেমের মত রাজনীতিবিদ। এরাই মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। শুধু তাই নয় খন্দকার মোশতাক ছিলেন নেতৃত্বের লড়াইয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে এক পরাজিত রাজনীতিক। বহুদিন পরে খন্দকার মোশতাক বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার কঠিন প্রতিশোধ নেয়। শেখ মুজিব হত্যাকান্ডের পর থেকে একটি গোষ্ঠী উদ্দেশ্যমূলকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ঘোষক নিয়ে বিতর্কটি বারবার উষ্কে তুলেছে। ১৯৭৫ সালের পর তারা শুধু মুজিব বিরোধীতার নামে ঈর্ষাকাতর হয়ে হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য এই বিতর্ক জিইয়ে রাখছেন।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল অলি আহমেদের লেখা প্রবন্ধ এবং বেলাল মোহাম্মদের স্মৃতিচারণ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় মেজর জিয়া যেদিন স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কিত ঘোষণাটি বেতারে পাঠ করেন সেদিন ছিল ২৭ মার্চ বিকেল, কথিত ২৬ মার্চ নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ কিন্তু জিয়া ২৭ মার্চ ঘোষণা দিলে ‘স্বাধীনতার ডাক’ দেয়ার ক্ষেত্রে তার অবদান খাটো হয়ে যেতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই একদল অতি উৎসাহী জিয়ার ঘোষণাটি ২৬ মার্চ দেয়া হয়েছে বলে প্রচারণা চালাচ্ছেন।”

তথ্য বিশ্লেষণ করলে আরও দেখা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাটি প্রথম এসেছে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকেই ২৫ মার্চ রাতে এবং তিনি প্রথম স্বাধীনতার ঘোষক এটা নিয়ে বিতর্ক কোন সুযোগ নেই। তেমনি মেজর জিয়ার ঘোষণাটি যে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দেওয়া হয়েছে তা কোনদিনই ম্লান হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে যে কোনো কিছুরই অতিরঞ্জন, পরবর্তীকালে সংশ্লিষ্ট ঘটনার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সুতরাং দায়িত্বশীল সকল দেশবাসী এবং মুক্তিযোদ্ধা যারা মুক্তিযুদ্ধকে ভালোবাসেন তাদের সকলেরই বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাসের সত্যানুসন্ধানে স্বার্থেই সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর এ বছরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক ও ঘোষণা বিতর্কের অবসানে ফিরে আসুক জাতীয় ঐক্য।

৭ মার্চ ১৯৭১ সেদিন ছিলো রবিবার, আজ ২০২১ সালের ৭ মার্চও রবিবার!

কৃতজ্ঞতা- ডঃ মোহাম্মদ হাননান কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বইটি থেকে লেখার তথ্য সংরক্ষিত।

ছবি- সংগৃহীত

তথ্যসূত্রঃ

★ স্বাধীনতার দলিল, প্রথম খন্ড।

★ বঙ্গবন্ধুর ৭ ই মার্চের ভাষণ, স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র- দ্বিতীয় খন্ড।

★ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, দলিলপত্রঃ তৃতীয় খণ্ড, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, তথ্য মন্ত্রণালয় ১৯৮২ সাল।

★ সিদ্দিক সালিক- নিয়াজীর আত্মসমর্পণের দলিল, ভাষান্তর- মাসুদুল হক, ১৯৮৮ সাল।

★ রবার্ট পেইনঃ ম্যাসাকার, বাংলাদেশ- গণহত্যার ইতিহাসে ভয়ঙ্কর অধ্যায়, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড।

★ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে- মেজর রফিকুল ইসলাম, বীর উত্তম।

★ সাক্ষাৎকার- কর্নেল অলি আকবর হোসেন, বাংলাবাজার পত্রিকা ১১ ডিসেম্বর ১৯৯২।

★ কর্নেল অলি আহমেদ, বীরবিক্রম- ‘স্বাধীনতার ঘোষণা এবং জিয়া’ দৈনিক সকালের খবর ৩০ মে ১৯৯২।

★বেলাল মোহাম্মদ – স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র।

২২৯জন ২২৯জন
0 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ