আমি চলে এলাম ঢাকায়। বরিশালে এক বিরাট সভার আয়োজন হল। শহীদ সাহেব ঢাকায় এসে নাজিমুদ্দিন সাহেবের কাছেই থাকতেন। আমরা স্টিমারে বরিশাল রওয়ানা করলাম। কলকাতা থেকে প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষও এসেছেন। বরিশালে বিকালে সভা শুরু হল, কয়েকজন বক্তৃতা করেছেন। আমাকেও বক্তৃতা করতে হবে, রাত তখন আট ঘটিকা হবে, এমন সময় একটা টুকরা কাগজ আমার হাতে দিল। আমি শহীদ সাহেবের পাশে বসেছিলাম। তাতে রব সাহেব (আমার ভগ্নিপতি) লিখেছে, “মিয়াভাই, আব্বার অবস্থা খুবই খারাপ, ভীষণ অসুস্থ। তোমার জন্য বিভিন্ন জায়গায় টেলিফোন করা হয়েছে, যদি দেখতে হয় রাতেই রওয়ানা করতে হবে। হেলেন (লেখকের ছোটবোন) চলে গিয়াছে তোমাদের বাড়িতে।” আমি শহীদ সাহেবকে চিঠিটা পড়ে শুনালাম। তিনি আমাকে রওয়ানা করতে হুকুম দিলেন। তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্লাটফর্ম থেকে নেমে রব সাহেবকে দেখলাম, দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞাসা করলাম, “কখন খবর পেয়েছ? বলল, গতকাল খবর পেয়েছি। হেলেন রওয়ানা হয়েছে, আমি তোমার জন্য দেরি করছি। কারণ, জানি শহীদ সাহেব যখন আসবেন, তুমিও আসবে।” আমি সোজা মালপত্র নিয়ে রওয়ানা করলাম স্টেশনে আর আধা ঘন্টা সময় আছে স্টিমার ছাড়তে। স্টিমার ধরতে না পারলে আবার আগামীকাল রাতে স্টিমার ছাড়বে।

আমি স্টিমারে চড়ে বসলাম, সমস্ত রাত বসে রইলাম। নানা চিন্তা আমার মনে উঠতে লাগল। আমি তো আমার আব্বার বড় ছেলে। আমি তো কিছুই বুঝি না, কিছুই জানি না সংসারের। কত কথা মনে পড়ল, কত আঘাত আব্বাকে দিয়েছি, তবু কোনোদিন কিছুই বলেন নাই। সকলের পিতাই সকল ছেলেকে ভালবাসে এবং ছেলেরাও পিতাকে ভালবাসে এবং ভক্তি করে। কিন্তু আমার পিতার যে স্নেহ আমি পেয়েছি, আর আমি তাঁকে কত যে ভালবাসি সে কথা প্রকাশ করতে পারব না।

ভোরবেলা পাটগাতি স্টেশনে স্টিমার এসে পৌঁছাল। আমার বাড়ি থেকে প্রায় আড়াই মাইল হবে। স্টেশন মাস্টারকে ও অন্যান্য লোকদের জিজ্ঞাসা করলাম, তারা কিছু জানে কি না আমার আব্বার কথা? সকলেই এক কথা বলে, “আপনার আব্বার খুব অসুখ শুনেছি।” নৌকায় গেলে অনেক সময় লাগে। মালপত্র স্টেশন মাস্টারের কাছে রেখে হেঁটে রওয়ানা করলাম। মধুমতী নদী পার হতে হল। সোজা মাঠ দিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা করলাম। পথঘাটের বালাই নাই। সোজা চষা জমির মধ্য দিয়ে হাঁটলাম। বাড়ি পৌঁছে দেখি আব্বার কলেরা হয়েছে। অবস্থা ভাল না, ডাক্তার আশা ছেড়ে দিয়ে বসে আছে। আমি পৌঁছেই ‘আব্বা’ বলে ডাক দিতেই চেয়ে ফেললেন। চক্ষু দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা। আমি আব্বার বুকের উপর মাথা রেখে কেঁদে ফেললাম; আব্বার হঠাৎ যেন পরিবর্তন হল কিছুটা। ডাক্তার বলল, নাড়ির অবস্থা ভাল মনে হয়। কয়েক মুহূর্তের পরেই আব্বা ভালর দিকে। ডাক্তার বললেন, ভয় নাই। আব্বার প্রস্রাব বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। একটু পরেই প্রস্রাব হল। বিপদ কেটে যাচ্ছে। আমি আব্বার কাছে বসে রইলাম। এক ঘন্টার মধ্যেই ডাক্তার বললেন, আর ভয় নাই, প্রস্রাব হয়ে গেছে। চেহারাও পরিবর্তন হচ্ছে। দুই তিন ঘন্টা পরে ডাক্তারবাবু বললেন, আমি এখন যাই, সমস্ত রাত ছিলাম। কোন ভয় নাই বিকালে আবার দেখতে আসব।

আমি বাড়িতে রইলাম কিছুদিন। আব্বা আস্তে আস্তে আরোগ্যলাভ করলেন। যে ছেলেমেয়েরা তাদের বাবা মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত তাদের মত হতভাগা দুনিয়াতে আর কেউ নাই। আর যারা বাবা মায়ের স্নেহ আর আশীর্বাদ পায় তাদের মত সৌভাগ্যবান কয়জন!

অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান। (পৃষ্ঠা নং- ৮৬ ও ৮৭)

গতকাল ‘বাবা দিবস’ গেলো। আর আজ বাবাকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর নিজের অভিব্যক্তি এখানে উঠে আসলো। বয়সকালে একজন পিতা কতোখানি সন্তানের উঞ্চ ছোঁয়া আশা করেন, এ লেখাটি পড়লে তা স্পষ্ট হবে। জন্মদাতা পিতা শ্রম-ঘাম এবং বুক নিশ্রিত সমস্ত ভালোবাসা উজার করে দিয়ে আমাদের বড় করেন অথচ শেষ জীবনে শুধু এতোটুকু উঞ্চতার আবেশ দিলেই তারা চরম প্রশান্তি অনুভব করেন। পিতামাতার প্রতি কর্তব্য আমাদের জন্মঋণ, শোধযোগ্য নয়, তবুও চেষ্টা। তাদের মানসিক প্রশান্তিই আমাদের পাথেয়।

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৭৩)

৪৮৩জন ৪৮৩জন
0 Shares

৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ