সতেরজন সদস্য নিয়ে কমিটি করা হল এবং কো-অপ্ট করার ক্ষমতা দেওয়া হল। হিসাব করে দেখা গেল আমাদের মতাবলম্বী লোকই সংখ্যাগরিষ্ঠ। কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন লোকও কয়েকজন কমিটির সভ্য হলেন। কয়েকদিন পরে কার্যকরী কমিটির এক সভায় ড্রাফট কার্যসূচি পেশ করা হল, যাকে পরিপূর্ণ একটা পার্টির ম্যানিফেস্টো বলা যেতে পারে। আমি ভীষণভাবে বাধা দিলাম এবং বললাম কোনো ব্যাপক কার্যসূচি এখন গ্রহন করা হবে না। একমাত্র ‘কমিউনাল হারমনি’র জন্য কর্মীদের ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া আর কোনো কাজই আমাদের নাই। দুই মাস হল দেশ স্বাধীন হয়েছে। এখন কোন দাবি করা উচিত হবে না। মিছামিছি আমরা জনগণ থেকে দূরে সরে যাব। কমিউনিস্ট নেতারা তখন ভারতবর্ষে স্লোগান দিয়েছে, ‘স্বাধীনতা আসে নাই, সংগ্রাম করে স্বাধীনতা আনতে হবে।’ আমাদের দেশের কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন সহকর্মীরা সেই আদর্শই কর্মসূচির মধ্যে গ্রহণ করতে চায়। এই সকল কর্মসূচি নিয়ে এখনই জনগণের কাছে গেলে আমাদের উপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলবে এবং যে কাজ এখন বিশেষ প্রয়োজন, সাম্প্রদায়িক মিলনের কথা বললেও লোকে আমাদের কথা শুনতে চাইবে না। প্রথম সভায় পাশ করতে পারল না, আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলাম। তবে হক সাহেব মধ্যপন্থা অবলম্বন করায় আমাদের অসুবিধা হতে লাগল।

এই সময় আমি কিছুদিনের জন্য কলকাতায় যাই। আমাদের রেস্টুরেন্টটা বিক্রি হয়েছে কি না, না হলে ঢাকায় কোনো দোকানের সাথে বদল করা যায় কি না সে বিষয়টা দেখতে। কলকাতায় যেয়ে দেখি, রব সাহেব রেস্টুরেন্ট বিক্রি করে দিয়েছে। যাক বাঁচা গেল। শহীদ সাহেব পূর্ব পাঞ্জাব, দিল্লি, জয়পুর, আলোয়ার ঘুরে কলকাতায় এসেছেন; তিনি খুবই চিন্তিত, এই সমস্ত জায়গায় ভয়াবহ দাঙ্গা হয়েছে। ভারতবর্ষ এবং পাকিস্তানে তিনিই একমাত্র মুসলিম নেতা যিনি সাহস করে এই সমস্ত জায়গায় গিয়ে সচক্ষে সকল অবস্থা দেখে এসেছেন। আমাকে দেখে খুবই খুশি হলেন এবং বললেন, “সত্যিই পূর্ব বাংলার মুসলমানরা কত সভ্য ও ভাল, কোনো দাঙ্গাহাঙ্গামা হচ্ছে না। তবে হিন্দুরা চলে আসছে, এরাই বিপদ ঘটাবে। আমি শীঘ্রই পূর্ব বাংলায় যাব এবং কয়েকটা সভা করব, যাতে হিন্দুরা না আসে।” শহীদ সাহেব ঢাকা হয়ে খাজা নাজিমুদ্দীনের সাথে পরামর্শ করে বরিশালে সভা করতে যাবেন ঠিক হল।

অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান। (পৃষ্ঠা নং- ৮৫)

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-৭২)

৫৩৯জন ৫৩৯জন
0 Shares

৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ