সপ্তাহের ব্যবধানে প্রদীপের বাপি শারীরিকভাবে বেশ অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠলেন যদিও মানসিকভাবে ততটা নয়।ছেলেকে ঘিরে উনার মানসিক যাতনা যেন বিষাক্ত পোকার মত খুরেখুরে খাচ্ছিল মনটাকে।ছেলেটাকে সুপথে ফেরানোর আশাবাদিতার ব্যাপারে উনি ছিলেন অনেকাংশেই সন্ধিহান।অন্যদিকে বাপির স্বাস্থ্যের দৃশ্যমান উন্নতিতে প্রদীপ বাড়ি ছেড়ে ফের শহরে যেতে মনঃস্থির করল।প্রতিবারই যাবার প্রাক্কালে চলন পড়নের খরচার জন্য তাকে প্রয়োজনেরও বেশি টাকা পার্স ব্যাগে মুষ্টি করে পুরে দেন দেন বাপি,মা দু’জনেই।এবার বাপি অসুস্থ হয়ে পড়া সত্ত্বেও পরিবারের খরচা সংক্ষিপ্ত হয়ে বাচানো টাকা তার পকেটে পুরতে দেখে তার মনটা যেন বিষাদ সিন্ধু হয়ে উঠল।তাইতো সেই টাকার সিংহভাগ রঙ খসে পড়ে মলিন হয়ে যাওয়া আলমিরায় গোপনে  রেখে যাত্রা শুরু করল প্রদীপ।

শহরে পৌছানোর সাথেই সে যেন ব্যস্ততার মোড়কে ঢেকে যেতে লাগল।মার্কেটের উপরে যে বোর্ডিং এ থাকে,সে বোর্ডিং এর সংলগ্ন রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিভিন্ন বয়সের মানুষের আনাগোনা থাকে।এখন দ্বায়িত্ব হাতে পাওয়ায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সময় দেয়া যেন আবশ্যিক বিষয়ে পরিনত হয়েছে।এটাও বলা সমীচীন যে জীবনের অনেক অজানা বিষয় জানা ও শেখার সুযোগ হচ্ছিল তার।একটা বিষয় তার শ্রুতিগোচর হচ্ছিল যে তার সমমনা ও সম আদর্শের অগ্রজ,অনুজ যারাই আছেন সবাই দেশপ্রেম,মানবতা আর আদর্শ বুকের পাজরে ধারন করে এগিয়ে যাওয়ার কথা প্রায়শই বলেন।

বইপড়ার ব্যাপারে তার অগ্রজ নেতাকর্মীরাও তাকে বেশ পরামর্শ দিত।তবে সে বইগুলোর অধিকাংশই হচ্ছে রাশিয়া,চীনের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব,আদর্শ,সংগ্রাম নির্ভর বই।লেনিন,স্টালিন,কাল মার্কস,চে গুয়েভারাকে নিয়ে লেখা হরেকরকম বই তরে তরে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল রাজনৈতিক কার্যালয়ে স্থাপিত নতুন বই রাখার তাকে। ওই বইয়ের তাক থেকে প্রদীপ,পরিমল বই নিয়ে নিয়ে পড়তে লাগল।একটা অন্যরকম অনূভুতি কাজ করতে লাগল তখন থেকে তাদের মধ্যে।তারা তাদের অর্জিত জ্ঞান থেকে বিপন্ন জীবনের সকল সমস্যা,ব্যাধি,সংকট ও তার নিরসনের বিভিন্ন পথ বাতলে দিতে লাগল বিভিন্ন সভা,পথসভা,আলোচনায়।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নেতাকর্মীদের সাথে মাঝে মাঝেই দেখা সাক্ষাৎ হত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে।এই পরিচয় যেন এক নতুন জীবনের আমন্ত্রণ জানাল প্রদীপকে।বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা আলোচনার মধ্য দিয়ে জীবনের অনেক জটিল জট খুলে ফেলছিল রুদ্ধদ্বার বৈঠকে।যদিও বুঝতে পারছিল বাস্তব সেতো সুদূরে।সমাজতান্ত্রিক আদর্শের কথা শুনারই যেখানে আমজনতার সময় হয় না,সেখানে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ বুর্জোয়া রাজনীতির প্রতিস্থাপক হওয়া যে সুদীর্ঘ পথ সেটা বুঝতে পারল বেশ।

সুযোগ্য নেতা হওয়ার পথেই প্রদীপ যখন স্বপ্নের বীজ বুনছিল,তখন সে অর্থ সংকটের এক নতুন অধ্যায় পাড় করছিল।তার বাপি আর আগের মত আয় করতে পারছিলেন না।তদুপরি বাপিকে টাকার জন্য চাপ দেয়া যেন তার মন থেকে সায় দিচ্ছিল না।তাই সে সুনীলকে একদিন সব খোলাসা করে বলল তার আর্থিক সংকটের কথা।মধ্যবিত্ত পরিবারের সুখ,দুঃখ যেন নদীর জোয়ার ভাটার খেলা।অতঃপর সুনীল তাকে দুই-তিনটি টিউশন করার পরামর্শ দিল।যে টাকা সম্মানী হিসেবে পকেটে আসবে,সে টাকা দিয়ে থাকা-খাওয়ার সংস্থানে তেমন কোন সমস্যা আর হবে না।

প্রদীপ ভেবে দেখল যে এটা বেশ ভালো প্রস্তাব।কিন্ত শহরে ভাল সম্মানীতে টিউশন পেতেও যে নাম-ধাম থাকতে হয়,প্রচারমুখি হতে হয়।প্রদীপতো সেখানে  অনেকটাই অর্বাচীন।তার এমন চিন্তার ভাজ কপাল থেকে সরিয়ে দিতে সুনীল বলল আসছে মাসেই নতুন টিউশন এর ব্যবস্থা করে দিবে।প্রদীপকে প্রস্তুতি নিতে বলল এই সময়টার মধ্যে।সুনীল প্রদীপকে সজোরে বুকে টেনে নিয়ে সাহস যোগাতে লাগল।

বন্ধ শেষে কলেজ আবার খুলল।সুনীল,প্রদীপ,পরিমল আবারো ক্লাস ধরতে সময় করে যেতে লাগল কলেজে।যদিও আগের মতো তারা কলেজে ক্লাসে ততটা নিয়মিত ছিল না,তবে দেশব্যাপী বিভিন্ন সহিংসতার প্রতিবাদে মানববন্ধন,মিছিলে ছিল সোচ্চার।এভাবেই পাঠগ্রহণ,ছাত্র রাজনীতি দুটির মাঝে কম-বেশি সমতা বিধান করেই এগিয়ে যাচ্ছিল প্রদীপ।

 

একদিন ক্লাসে সুন্দরী এক সহপাঠীর চোখে আচমকা চোখ রাখতে গিয়ে প্রদীপের আনাড়ি মন আনন্দে তা তা তৈ তৈ করে নেচে উঠল।তার রঙধনু ভাবনাময় দৃষ্টি নিবদ্ধ হল প্রিয়দর্শিনীর চাঁদ বদনের উপরে।ইতিপূর্বে জীবনের এই চোরাগলি পথে খুব একটা পথ পাড়ি দেয়নি। নতুন যোগদানকৃত এক স্যার সবার সাথে পরিচয় পর্বে উনার প্রথম ক্লাসটা টেনে নিচ্ছিলেন সানন্দে।জানা গেল সুদর্শণার নাম সূচি,কালেভদ্রে ক্লাস করতে ডিপার্টমেন্টে আসে।ক্লাসের কেউই প্রদীপের ফিসফিস করে জিজ্ঞাসার প্রতিত্তোরে মেয়েটির বিস্তারিত পরিচয় দিতে পারছিল না।বেশ হাসি আর আনন্দে যখন ক্লাসের সবার পরিচয় পর্বটা এগিয়ে যাচ্ছিল,প্রদীপ কৌতূহলবশত তার দিকেই ফিরে ফিরে তাকাচ্ছিল।তারও যে একটা মন রয়েছে ভালবাসা দেনা পাওনার মত সেদিনই তার ঠাহর হল।নির্ধারিত সময়সূচির সময়সীমা পাড় হয়ে যাচ্ছিল,তবুও ক্লাস ফুরাচ্ছিল না বলে একটা মিষ্টি যন্ত্রণা দোল খাচ্ছিল তাকে ঘিরে।তাইতো ক্লাস শেষে যেচে যেচে সূচির কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় জানান দেয়া আর তার সম্পর্কে জানার অন্তহীন ইচ্ছাকে প্রশমিত করতে পারছিল না কোনভাবেই।

২৬৫জন ১৮৮জন
10 Shares

১৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য