ফ্রেম

খাদিজাতুল কুবরা ২৫ অক্টোবর ২০২২, মঙ্গলবার, ১২:৪৯:০৫পূর্বাহ্ন গল্প ১ মন্তব্য

ঋতু ঘুরেফিরে দেখছে সেলফটা। খুব সুন্দর লাগছে!হরেক রঙের মলাটে সজ্জিত বইগুলো আপন ঠিকানায় সংসার পেতেছে! ঋতুর চোখে মুগ্ধতা! নতুন বৌ লালপেড়ে বাসন্তী শাড়ির সাথে সোনার গয়না পরলে যেমন সুন্দর লাগে তেমন। বুকসেলফটা অনলাইনে অর্ডার করেছে অব্দি এ মুহুর্তটার জন্য তর সইছিলোনা। কত অপেক্ষার পর এই প্রাপ্তি! সেই স্টুডেন্ট লাইফের স্বপ্ন ছিল, কোনো একদিন একান্ত নিজের একটা বইয়ের লাইব্রেরী হবে।পড়ে ফেরত দেওয়ার শর্তে এর তার কাছ থেকে বই চেয়ে নিয়ে পড়তে হতো। কখনো প্রিয় বইটি নিজের কাছে রাখার সামর্থ্য ছিলোনা। সেই থেকেই জেদ চেপেছিলো স্বপ্নটা, কখনো সামর্থ্য হলে কিনবে মনের মতো সব বই। বই পড়াটা ছিল প্রথমে কৌতুহল,পরে শখ, তারপরে নেশা। নেশার ঘোরে জল ঢেলেছিলো বিয়ে। উদয়াস্তু সংসারের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হওয়া , স্বামীর অলিখিত নিয়মনীতি অনুসরণ হয়ে উঠেছিল একমাত্র করণীয়।সংসার, পরিবার অবশ্যই মানুষের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। তা স্বত্তেও সে সংসার যখন বিধি নিষেধের শেকলে বেঁধে ফেলে একজন সৃজনশীল নারীকে, তখন সংসার তার কাছে যাঁতাকলই ঠেঁকে। সংসারের শৈল্পিক সুখ তার আর পাওয়া হয়না। আমাদের চিরচেনা সদ্যতরুণী  ঋতুর ও স্বপগুলো চাপা পড়ে গিয়েছিল পঞ্চাশ বছর বয়সী শরীফুল সাহেবের গোঁড়ামির তোপের মুখে। ঋতুর বিয়েটা ছিল পারিবারিক সিদ্ধান্তে। গ্রাজুয়েশন করা ঋতু ইচ্ছে করলে আপত্তি করতে পারত। কিন্তু সে তা করেনি।ইমেডিয়েট ছোটবোন সেতু বিবাহযোগ্যা।ঋতুর চেয়ে সেতু দেখতে ভালো হওয়ায় আত্মীয় স্বজনকে বলতে শুনেছে বড় মেয়েটার জন্য ওর বিয়েটা আটকে আছে। তাছাড়া বাবার কথা অমান্য করে ঋতু অভ্যস্থ নয়, শুধু বাবা কেন বড়দের অবাধ্যাচরণ সে কখনো করতে পারেনা। নিজের কথা না ভেবে অপরের ভালোর জন্য সে সদা প্রস্তুত। তাইতো বয়সের বিশাল ডিফারেন্স স্বত্তেও মধ্যবয়সী লোকটাকে বিয়ে করতে দু’বার ভাবেনি।বিয়ের পর ঋতু ধীরে ধীরে বুঝতে পারে যার সাথে বিয়ে হয়েছে সে দুর্বল পৌরুষ বিশিষ্ট পুরুষ, বলা যায় প্রায়  নপুংসক। বাঙালি নারীর একবারই বিয়ে হয়। যে বাড়ীতে লালশাড়ী পরে ঢোকে সেখান থেকে সাদা কাফন পরেই বেরুতে হয়। ছোটবেলা থেকে এগুলো শুনেই সে বড় হয়েছে।ঋতুর সাথে স্বামী শরীফ সাহেবের সম্পর্কটা ছাত্রী শিক্ষকের মতো। শরীফ সাহেব গুরু গম্ভীর মানুষ। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কথা বলেন না, শুনতে ও পছন্দ করেননা।ছটফটে ঋতু ও ধীরে ধীরে ভীষণ চুপচাপ হয়ে যায়। সে কথা বলবে কার সাথে। দুজন মানুষের ঘরকন্না আর কতটুকু! সে বই পড়তে ভালোবাসত কিন্তু শরীফ সাহেব ধর্মীয় বই ছাড়া আর কিছু পড়তে নিষেধ করেছেন। পত্রিকার হেলথ কলাম ছাড়া অন্য কলাম পড়লেও তিনি আপত্তি করেন।ঋতু টিভিতে বিভিন্ন রিয়েলিটি শো দেখতে পছন্দ করে।বাসায় টিভি নেই, কেননা কর্তার ধর্মীয় অনুভূতি আহত হয়। সে এসব কিছুই মুখ ফুটে চাইতে পারেনি। শরীফ সাহেব আকারে ইঙ্গিতে তার পছন্দ অপছন্দের তালিকা দিতেন।ঋতুর ও তাঁকে বুঝতে অসুবিধা হতোনা। কিছু মানুষের কষ্ট সহ্য করার আশ্চর্য রকম ক্ষমতা থাকে। ঋতুর ও সেরকম কিছু আছে সম্ভবত। সে শৌখিন মানসিকতার মেয়ে। বিয়ের আগে কতো স্বপ্ন দেখেছিল নিজের ঘরটাকে এভাবে সাজাবে ওভাবে সাজাবে!একটা বুক সেলফ হবে,তাতে সাজানো থাকবে পছন্দের সব বই। রান্নাঘর, শোবার ঘর,বসার ঘর মনের মতো সাজানো আর হয়ে উঠেনি কেননা শরীফ সাহেব বলেছেন এসব বিলাসিতা করলে পরকালে হিসেব দিতে হবে। ঋতুকে শরীফ সাহেব কখনো কিছু কিনে দেননা তাই বাধ্য হয়েই হাত পেতে টাকা চাইতে হতো। পাঁছশ টাকা চাইলে তিনি দুশ টাকা দিতেন। তাড়াহুড়ো করে ঘরোয়া ভাবে বিয়ে হয়েছে শরীফ সাহেব বর সেজে আসেননি, সাধারণ বেশে এসেছেন, ঋতুর জন্য ও সাদামাটা সাজসজ্জা এনেছিলেন তাতে সোনার গহনা কিছু ছিলোনা। বিয়ের পর থেকে তাই  আর কোন অনুষ্ঠানে যেতে পারেনি ঋতু। কারণ বিবাহিতা মেয়ে কোন অনুষ্ঠানে যথাযথ সাজসজ্জা ছাড়া যেতে পারেনা। এসবের জন্য খারাপ যে লাগত না তা নয়। কিন্তু সে কি করতে পারে, পাথরে মাথা ঠুকলে যেমন নিজের কপাল ফাটা ছাড়া আর কিছু হবার নয়। শরীফ সাহেব ও পাথরের মতোই দৃঢ়। এতো কিছুর পরও ঋতু এই আজব মানুষটাকে ছেড়ে যাবার কথা কখনো ভাবেনি। কোথায় যাবে সে? চার ভাই বোনের মধ্যে সে বড়। বাবা ছা -পোষা মানুষ, সহজ সরল মা। অবস্থা সম্পন্ন যথেষ্ট ভদ্রলোক সজ্জন ব্যাক্তির সাথে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন অনেক আশা নিয়ে। ঋতু কেমন করে সবাইকে নিজের দুঃখের কথা বলবে ভেবে পায়না।

শরীফ সাহেব তাকে নিয়ে কখনো বেরুতেন না। যেতে চাইলে বলতেন আয়নায় নিজেকে দেখেছ? তোমার প্রকৃত বয়সের চেয়ে ও তোমাকে কতো ছোট দেখায়। আমি লোক হাসাতে পারবোনা। তুমি একা গিয়ে নিয়ে এস কি লাগবে। তাঁর ধারনায় ঋতুর প্রয়োজনীয়তার পরিধি সে জানে, তাই সীমালঙ্ঘন কখনো করেনা। একদিন ঋতু খুব কাঁদলো, কান্নার হেঁচকির আওয়াজ শরীফ সাহেব শুনলেন। কিন্তু চোখ মুছে দিলেননা। মাথায় হাত রেখে কিছুৃ জানতে চাইলেন না। শুধু বললেন আমি তোমাকে জোর করে বিয়ে করিনি। তুমি চাইলে চলে যেতে পার। ঋতু মাথা নিচু করে নিল।বুঝতে পারলো মনের অজান্তে সে অনেক বড় অন্যায় করে ফেলেছে। এরপর আর কখনো তার কান্না কেউ দেখেনি। সে স্কুলের সার্কুলারে আবেদন করে, এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়, অবশ্য এতে তাঁর স্বামী আপত্তি করেন নি। কিন্তু তিনি রোজই কনসিভ কেন হচ্ছে না এনিয়ে আক্ষেপ করেন! ঋতু তাঁর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে বুঝতে পারে তার সংসারটা বোধ হয় এবার ভেসে যাবে। শরীফ সাহেব তাঁর এক ভাতৃস্থানীয় বন্ধুর সাথে ঋতুকে গাইনোক্লোজিস্টের কাছে পাঠায়। ভদ্রলোক তাকে ছোটবোন স্নেহে সযত্নে ডাক্তারের কাছে আনা নেওয়া করতেন।সে ও তাকে ভীষণ শ্রদ্ধার চোখে দেখে আর ভাবে এ জগতে কতো রকমের মানুষ আছে। ডাক্তার সবশুনে ঋতুকে খুব বকলেন, “তুমি একটা বাচ্চা মেয়ে অমন বয়স্ক লোককে কেন বিয়ে করেছ? নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবলেনা কেন”? ঋতু মাথা নিচু করে বলল, বাবা বলতেন মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়েছি জ্ঞান অর্জনের জন্য চাকরি করার জন্যে নয়। তখন ডাক্তার বললেন, “আচ্ছা দেখি তোমার জন্য কি করতে পারি।পরের বার আসার সময় বরকে নিয়ে আসবে।শরীফ সাহেবকে বলার পর তিনি জানিয়ে দিলেন তাঁর সময় হবে না। প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ঋতু মেডিসিন নিল,ফলাফল কিছু হলোনা। শেষ পর্যন্ত ঋতুর কোন সরকারী স্কুলে চাকরি হলোনা। তাই সে একটা কিন্ডার গার্টেন হাইস্কুলে চাকরি নেয়। এভাবে পাঁচবছর কেটে গেছে। ঋতু মাতৃত্বের হাহাকার আর নির্মম শুন্যতার সাথে পেরে উঠছিলোনা, একটি বাচ্চা দত্তক নেওয়ার জন্য শরীফ সাহেবের কাছে অনুমতি চাইলে তিনি আপত্তি করেননি। মেয়ে নেহাকে পেয়ে ঋতুর নতুন জন্ম হলো মা হিসেবে।নেহার নরম তুলতুলে হাত দুটোর ছোঁয়ায় সমস্ত অতীত একলহমায় ভুলে গেল সে। এতো সুন্দর সুখের অনুভূতি জীবনে প্রথম তাকে বাঁচার মানে এনে দিল। তার মনে তখন স্বপ্ন আর স্বপ্ন! নেহার বেড়ে ওঠার স্বপ্ন! মনে হতে লাগল জীবন সুন্দর! অবশ্যই সুন্দর! শরীফ সাহেব ও মেয়েকে আপন করে নিলেন। আদর করতেন খেলতেন ওর সাথে। এসব দেখে ঋতু সন্তান, সংসার, রুক্ষ মেজাজি স্বামীকে ও ভালোবেসে ফেলে।চাকরিটাও ছাড়তে হলো নেহাকে দেখার কেউ না থাকায়।  দেখতে দেখতে নেহা স্কুলে ভর্তির সময় এসে গেল। বাসার কাছেই স্কুল।ঋতু নিজহাতে মেয়েকে পড়ায়, স্কুলে নিয়ে যাওয়া নিয়ে আসা, ডাক্তার দেখানো, বেড়াতে নিয়ে যাওয়া সব একাহাতে সামলায়।সংসারের যাবতীয় কাজ ঘরে বাইরে যাবতীয় কাজ ঋতুকেই দেখতে হয়। শরীফ সাহেব নিজের ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকেন। বাসায় যতক্ষণ থাকেন ইবাদত করেন নিউজ শোনেন। খেতে বসে নেহার সাথে খুনসুটি করেন তারপর নিজের রুমে ঘুমুতে চলে যান। উল্লেখ্য যে নেহা আসার পর থেকে শরীফ সাহেব আলাদা রুমে থাকতে শুরু করেন।ঋতু মেয়েকে নিয়ে থাকে।এভাবেই বেশ কেটে গেছে কয়েক বছর। নেহা প্রাইমারি স্কুল ফেরিয়ে হাইস্কুলে পড়ছে। সেই প্লে ক্লাস থেকে নেহাকে ক্লাসে ঢুকিয়ে দিয়ে রিতু বসতো গার্ডিয়ান ওয়েটিং রুমে। ধীরে ধীরে বাচ্চাদের মায়েরা একে অপরের বন্ধু হয়ে গেছে। সবাই নিজেদের সুখ দুঃখের গল্প বলে, ঋতু নিরব শ্রোতা, তার বলার মতো গল্প নেই। কারুর সাথে বিশেষ বন্ধুত্ব করে না। রোজকার রুটিনে চলছে জীবন। এভাবেই হয়ত সারাজীবন কেটে যেতো যদি না ঋতুর জীবনে নতুন অধ্যায় যোগ হত।মেয়ে নেহা তখন ক্লাস এইটে পড়ে । সে ব্যস্ত পড়াশোনা নিয়ে। মায়ের সাথে শিশুসুলভ বন্দন ক্রমশঃ শিথিল হয়ে আসে। ঋতু ও যেন কেমন বুকের ভেতরের খাঁ খাঁ হাহাকার শুনতে পায়! মেয়ে বড় হচ্ছে তাকে স্পেস দিতে হবে নিজেকে তৈরি করার জন্যে। কিন্তু তার যে নিজেকে খুব একলা লাগে।ইচ্ছে করে গল্প করতে।মেয়েকে ছোট্ট অবয়বে বুকের মধ্যে গুঁজে রাখতে ও ইচ্ছে করে । কষ্ট হলেও সে ইচ্ছেকে দাবিয়ে রাখে ওর ভালোর জন্য। নেহার স্কুল বেশি দূরে হওয়ায় ঋতু চাকরি ও করতে পারছেনা। কেননা নেহাকে নির্দিষ্ট সময়ে আনা নেওয়া করতে হয়।  একদিন নেহা স্কুল থেকে এসে অব্দি লক্ষ করল মা কেমন যেন হয়ে গেছে। ওর খুব খারাপ লাগল। সে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল মা তোমার কি হয়েছে? রিতু বললো কিছু হয়নিতো, এমনি ভালো লাগছেনা।নেহা বললো মা আমার বন্ধুদের মায়েরা অনেকে স্মার্ট ফোন ব্যবহার করে তুমি ও একটা স্মার্ট ফোন নাও।যেই ভাবা সেই কাজ। ঋতু জমানো টাকা দিয়ে একটি স্মার্ট ফোন কিনলো। ফেসবুক একাউন্ট খুলল ছদ্মনামে।নিজের নাম ব্যবহার করার সাহস হলোনা। শরীফ সাহেব জানতে পারলে দফারফা করে ছাড়বেন। ছোট বোন সাহায্য করলো সে নিজেতো কিছুই জানেনা।

মনের অবচেতনেই ঋতু একটি নাম ইংরেজি অক্ষরে লিখে সার্চ করতেই ভেসে উঠলো  সেই চোখ, মুখ, মাথার ক্যাপ। একলহমায় চিনতে পারলো, বয়সের ছাপ ও ঝাপসা করতে পারেনি সেই প্রিয় আদল, চোখ থেকে গড়গড় করে ঝরলো তপ্তাশ্রু। তখন ও বাংলা টাইপিং শেখা হয়নি। ইংরেজি অক্ষরে বাংলা লেখার কৌশল ও পুরোপুরি রপ্ত নয় তবুও ইনবক্সে লিখে দিল “আমি ঋতু”। কেমন আছ তুমি? ” সেন্ড করে মনে মনে ভাবলো সে কি আমায় চিনতে পারবে? নাকি নিজের বৌ বাচ্চা নিয়ে সুখের সংসারের মোহে ভুলেই গেছে ঝিলে ফোটা অখ্যাত শালুক পাতাকে । একসময় রনি তাকে আদর করে শালুক পাতা ডাকত। আজ হয়ত তার মনেই নেই ঋতু বলে কেউ কখনো ছিলো! চিনলেই বা কি? একদিন একবাক্যে যে জীবন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল শেষবারের মতো ও পিছু ফিরে দেখেনি তার কাছে…….? তবুও কেন যেন জানতে ইচ্ছে করে সে কেমন আছে?ছেলে মেয়ে পরিবার নিয়ে সুখের সংসারে তার অনেক গল্প আছে নিশ্চয়ই। আড্ডাবাজ রনি এখন কি আর তেমন আছে? ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে, ঋতু। চোখের তলায় জলের দাগ শুকিয়ে যায় প্রতিদিনের মতোই। ঋতু আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিত্যকার অভ্যেসে। চার-পাঁচদিন বাকী কুরবানির ঈদের। বাজার সদাই থেকে শুরু করে কতকাজ! এই ঈদে নেহাকে নিয়ে বাড়িতে মানে মায়ের কাছে গিয়ে ক’টা দিন থাকবে এমনই ইচ্ছে মা মেয়ের। শরীফ সাহেব বিবাহিত জীবনের প্রায় কুড়ি বছরে একটি ঈদ ও ঋতু ও নেহার সাথে কাটাননি। তিনি তাঁর গ্রামের বাড়িতে গিয়ে ঈদ উদযাপন করেন। গোটা গরু কোরবানি করে পাড়া প্রতিবেশি ও আত্মীয় স্বজনকে বিলিয়ে দেন।  প্রথম প্রথম খারাপ লাগলেও ঋতুর এখন সয়ে গেছে। সে মেয়ে নেহাকে ঘিরেই নিজের জগতে ভালো আছে। শহরের ইট কংক্রিটের মতোই কঠিন আস্তরণে ডাকা পড়ে গেছে আবেগ অনুভূতি, ভালো লাগা মন্দ লাগা।ঈদের আগের দিন রাতে ঋতুর বোন মিতু বলল আপা কি কাউকে এসএমএস পাঠিয়েছেন?ঋতু বললো হ্যাঁ স্টুডেন্ট লাইফের বন্ধু রনিকে। কি হয়েছে? সে বললো উনি রিপ্লাই দিয়েছেন। কাজের চাপে এ ক’দিন আর ফোন হাতে নেওয়া হয়নি। অন্য সেলফোনেই কল আসে সাধারণত। ফোন হাতে নিয়ে দুচোখ বিস্ফারিত! সে কি স্বপ্ন দেখছে?  এতো বছর পর রনি ওকে চিনতে পারলো! তাড়াতাড়ি রিপ্লাই দিল। কে কেমন আছে জানতে চাইলো?জিজ্ঞেস করতে ভুললোনা দুজনের পরিবারের বাকীদের কথা? ওর বাবা গত হয়েছেন, ছেলে মেয়ে সম্পর্কে জানতে চাইলে ঋতু  নিজের মেয়ের কথা বললো। রনি জানালো সে কোনদিন বিয়ে করবেনা। এ কথা শুনে ঋতুর পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে যাচ্ছে। শূন্যে ভাসতে লাগল সে। মনে হল এটা শোনার আগে কেন মৃত্যু হলোনা, তবে কি সে রনিকে ভুল বুঝেছিল?  জিজ্ঞেস করল কেন বিয়ে করবেনা? রনি বললো, একা ভালো আছি। মা, ভাই -ভাবী , ভাতিজা এই নিয়েই আমার পৃথিবী। ঋতু বললো নামের পাশে প্রশ্নবোধক দেখে বুঝেছি এট লিস্ট মনে ও রাখনি! রনি আহত হয়ে উত্তর দিল এ ভাবে বলোনা। তুমি ছিলে, আছ, থাকবে!তুমিই প্রথম এবং শেষ। ঋতুর খুব রাগ হলো, তাই জানতে চাইলো, তবে সেদিন আমাকে না বললে কেন? রনি বললো তোমার বাবার ঠিক করা বিয়ে ভেঙে দিয়ে দায়িত্ব নেওয়ার মতো অবস্থা তখন আমার ছিলোনা। আমাকে ক্ষমা করো। ঋতু বললো আমার খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে! রনি বললো কাঁদবেনা একদম!এবার ঘুমাতে যাও। ভুলে যেওনা তুমি বিবাহিতা।সেদিন ঋতু সারারাত চোখের পাতা এক করতে পারলোনা।একটি  মিথ্যে চিঠির পরিনামে নিজের জীবন তছনছ করার পাশাপাশি আরেকটি জীবন ও নষ্ট হয়ে গেল বহুদূরের শহরে। তবে কি সে এতোদিন নিজের বানোয়াট গল্পের নতিজা ভোগ করছে? নিজের সাথে চোখ মেলাতে পারেনা। আজ থেকে বাইশ বছর আগে একদিন রনির ভালোবাসার পরীক্ষা নেওয়ার জন্য ঋতু একটি চিঠি লিখেছিল রনিকে, এই মর্মে যে, বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছেন এখন আমি কি করবো তাড়াতাড়ি জানাও। উত্তর এলো __”বাবার পছন্দে বিয়ে করে নাও, আমি হয়তো তোমার শরীর পাবোনা কিন্তু আমি জানি তুমি আমাকেই ভালোবাস। আমার বাবা মার পরেই তোমার স্থান।আমি কখনো বিয়ে করবোনা। ” চিঠি হাতে পেয়ে ঋতুর এতো কষ্ট হলো যে টানা তিনদিন শুধু কাঁদলো, কারুর সাথেই কথা বলতে পারলোনা! তার মনে হল সবছেলে গুলোই একরকম ফ্রড যাক বাবা অন্তত বড় কোন ক্ষতি হওয়ার আগেই চুকেছে। সে আশা করেছিল রনি বলবে কোনভাবেই তোমাকে হারাতে পারবোনা। তুমি অপেক্ষা করো আমি এসে কথা বলছি। দুটো লাইন লিখেই তিনবছরের সম্পর্ক শেষ করে দেবে ভাবতেই পারেনি।এভাবেই রাতের আঁধার ঋতুর সব কষ্ট শুষে নিল। ঈদের দিন তার সবটুকু জৌলুশ নিয়ে হাজির হল। মেয়ের হৈ হৈ আনন্দে ভরে উঠল ঋতুর জোড়া তালির সংসার। সাথে বোন মিতু ও আছে। সারাদিনের খাটুনি শেষে রাতে ঋতু বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বোন মিতুকে সবটা বললো। শুনে তার মুখে কালো মেঘ নেমে এল কিন্তু সে চুপ করে রইল। ঋতু কিছুই বুঝতে পারলোনা। ঘুম এসে গেল। সকালে সবাই মিলে বাড়ির দিকে রওনা হল। পথে বাসের গতির সাথে ঋতুর মস্তিষ্ক ও ছুটছে বহুবছর পিছনে। জীবন তাকে এ কোন পরীক্ষায় ফেললো?বাড়িতে পা দিয়েই মা’র সাথে দেখা করেই সোজা টিউবওয়েল চেপে পানি খাওয়া ঋতুর বরাবরের অভ্যেস। আঁজলা ভরে পান করে আকন্ঠ! এ পানির স্বাদ আর কোনো পানিতে নেই। আজ ঋতু উদ্ভ্রান্ত!  আজ সে সোজা ঘরে ঢুকে চুপচাপ শুয়ে পড়ল। বোনকে বলল নেহার খেয়াল রাখতে। মা হতবাক হয়ে দেখছে আর ভাবছে ঋতুর আবার কি হল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন জামাই বকেছে? ঋতু মাথা নেড়ে না বলল। আর বলল মা আমাকে একটু একা থাকতে দাও, কথা বলতে ইচ্ছে করছেনা। মা তবুও বললেন মানুষটাতো এমনই কেন তার কথায় কিছু মনে করিস? এই এক কথা শুনে শুনে ঋতুর কান পঁচে গেছে। পুরো পরিবারের একই কথা তার কথা গায়ে মেখোনা। তাই ঋতু ও তা রপ্ত করেছে অগত্যা! কিন্তু সে যে মাকে বলতে পারেনি সেদিন, মা আমার ভালোবাসা বেঁচে আছে এখনো! পুরো দিন মা তাকে নজরে রেখেছেন কারণ এর মধ্যে বোন মিতু মাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে রনির কথা বলে। ঋতু কিছুই জানেনা। ঋতুর ভেতরের ঝড় বাহিরের দুনিয়া থেকে আজ তাকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। সন্ধ্যায় রনি মেসেজ দিল নাম্বার চেয়ে। সে কথা বলতে চায়? ঋতু নাম্বার দিয়ে বলল রাত দশটায় কল দিও। ততক্ষণে নেহা ঘুমিয়ে পড়বে এই ভেবেই বলেছে। ঠিক দশটার সময় ফোন এল। ঋতু রিসিভ করে উঠোনে বেরিয়ে এল, রনি হ্যালো হ্যালো বলেই যাচ্ছে কিন্তু ঋতু শত চেষ্টা করে ও গলা দিয়ে স্বর বের করতে পারছেনা, গলায় কান্না দলা পাকিয়ে আসছে! ক’বছর পর শুনল প্রিয় কন্ঠস্বর! প্রায় বাইশ বছর পর। রনি বারবার জিজ্ঞেস করছে ঋতু কেমন আছ? কোনমতে সে অস্ফুটে উত্তর দিল, ভালো আছি আমি। তুমি কেমন আছ? ততক্ষনে মা তারস্বরে চিৎকার শুরু করেছে, শিগগির ঘরে আয়, তোর এতবড় সাহস কার সাথে কথা বলিস? ঋতু তাড়াতাড়ি রনিকে বলল মা ডাকছে আমি রাখছি। শোনা হলোনা আর রনি কেমন আছে। মিতু এসে ফোন কেড়ে নিয়ে নেয়। ঋতু হতভম্ব! সে বুঝতে পারছেনা সে আসলে কি অন্যায় করেছে? এই চল্লিশ বছর বয়সেও পুরনো বন্ধুর সাথে দুটো কথা বলা যাবেনা? গজগজ করতে করতে ঋতু ওয়াশরুমে গেল। ফিরে এসে দেখল, মিতু চিৎকার করে বলছে কে সে? আপনার কন্ঠস্বর ও চিনে, আমি ফোন রিসিভ করলে কেটে দেয়। এরই মধ্যে রনি কয়েকবার কল দিয়েছে। মিতু রিসিভ করলেই কেটে দেয়। তখনই আবার রনির কল এল, ঋতু ফোন রিসিভ করতেই মা ফোন কেড়ে নিয়ে রনিকে বলল, বাবা তুমি যে-ই হও আমার মেয়ের সংসারটা নষ্ট করোনা। লাইন কেটে দিয়ে শুরু হল মিতু আর মায়ের অকথ্য ভাষায় চিৎকার! নেহা জেগে গেছে ততক্ষণে সে-ও সব শুনছে। ঋতুর মরে যেতে ইচ্ছে করছে তখন, তার সারাজীবনের ত্যাগের  বিনিময়ে গোটা পরিবার টিকে আছে। স্বামীর অবাধ্য হতে দ্বিধা করেনি বোনদের উচ্চশিক্ষিত করতে যেয়ে। কখনো নিজের শখ আহ্লাদ পূরণ করেনি, পাই পাই করে জমানো টাকা পয়সা সব ওদের জন্য ব্যায় করেছে। নিজে পরেছে পুরনো জামা ছিড়ে না যাওয়া পর্যন্ত। পরেছে হাওয়াই চপ্পল!  আজ তার এই প্রতিদান মিলল?

বিয়ের আগেও সেলাই করেছে দিনরাত। আঙুলে কড়া পড়ে গিয়েছিল কেঁচি চালিয়ে। ঋতু রাগ করে বলল আমি যার সাথে ইচ্ছে কথা বলব। দেখি তোমরা কি করতে পার। কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে তারা যে ভয় পাচ্ছে ঋতু তা চিন্তা ও করেনি। তার স্বামী বর্তমান। মেয়ে বড় হচ্ছে।সারাজীবন বলতে গেলে একাই কেটেছে। প্রাক্তনের সাথে এতবছর পর দুএকবার কথা বলে তার সাথে আবার প্রেম হয়ে যাবে? কিভাবে সম্ভব? প্রেম কি এতই সহজ অনুভূতি? ঋতু ভাবতেই পারছেনা কেন তার পরিবার এক মুহুর্তে বদলে গেল। ঋতুর প্রতি তাদের উছলে পড়া ভালোবাসা এখন কোথায়? বারবার মানসম্মানের দোহাই দিয়ে তাকে কথার ঘাইয়ে রক্তাক্ত করতে তাদের এতটুকু বাঁধছেনা। ঋতুর চোখের পানি আর বাধ মানলোনা! সন্তান স্নেহে বড় করা বোন ; তার ও মায়া হলোনা, জন্মদাত্রী মায়ের ও না? মেয়ের সামনে তাকে এভাবে ছোট করল তারা! ঋতুর  নিঃসঙ্গ বিকেল, আর হাহাকার করা রাতগুলোর হিসেব এদের কঠোর হৃদয়কে কখনো ছোঁয়নি। শুতে গিয়ে ফোন অন করেই দেখতে পেল। রনির এসএমএস ” ভালো থেকো “। সিন করতেই ব্লক করে দিল, ইনবক্স, নাম্বার সব জায়গা থেকে। সে মুহুর্তের অপমানের কষ্ট লিখে বোঝানো সম্ভব না। রনি তাকে ব্লক করে প্রমাণ করল সে কাপুরষই রয়ে গেছে। জীবন মানুষের শুধু বয়স বাড়ায়না সাথে কিছু জ্ঞানের আলোর সন্ধান ও দেয়। ঠোকর খেতে খেতে আজ তার ভেতরটা প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ সেখানে রনির মত মেরুদণ্ডহীন এ্যমিবাকে একেবারেই প্রয়োজন নেই। ঋতুর কষ্ট হচ্ছে এই ভেবে তার লাশ দেখতে গোটা পরিবার প্রস্তুত কিন্তু সামাজিকভাবে হেয় হওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব না।

ঋতুর জীবন্ত লাশের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে তাদের আজকের সামাজিক অবস্থান। রাতের আঁধার আর শিথানের চিটচিটে বালিশ জানে, আর জানে অন্তর্যামী কেমন করে ঋতুরা বেঁচে থাকে।

***পাঠকের ভালো লাগলে দ্বিতীয় পর্ব লিখব।

৩২৫জন ১০৯জন
0 Shares

একটি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ