ফ্রেম ( দ্বিতীয় পর্ব)

খাদিজাতুল কুবরা ৯ নভেম্বর ২০২২, বুধবার, ০১:২৯:১৪পূর্বাহ্ন গল্প ৩ মন্তব্য

পরের দিনের সূর্যোদয় ছিল একেবারে নতুন। আলোকচ্ছটা হারানো এক গ্রহণ লাগা সূর্য যেন ঋতুকে তিরস্কার করতে আকাশ ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে। মা, ভাই -বোন সবাইকে আজ বড় অচেনা লাগছে। বাড়ি ঘর, পুকুর পাড়, গাছপালা সব যেন আজ বড্ড পর। সবাই কেমন ব্যঙ্গ দৃষ্টিতে যেন চেয়ে দেখছে ঋতুকে। সে যে অপরাধী। নিজের জন্য একফোঁটা বন্ধুত্বের খোঁজ করেছে সে বহুবছর পর। যদি ও রনির বন্ধুত্ব পাওয়া উদ্দেশ্য ছিলোনা তার, যা ছিল তা নিতান্ত কৌতুহল! এ পৃথিবীর সব শব্দ সংকট তখন ঋতুর মনে। কথা বলার ইচ্ছে মরে গেল। শহরে ফিরে এসে ও আর সংসারে মন লাগলোনা। শুধু মা ফোন করে কিছু জিজ্ঞেস করলে সে উত্তর দেয়। মেয়ে নেহা যেন এ ক’দিনে বেশ বড় হয়ে গেছে। সে ও খুব একটা মাকে ঘাটায়না। শরীফ সাহেব এসবের কিছুই জানতে পারেননি কোনোদিন। কেননা ঋতুকে তিনি সেভাবে কখনো লক্ষ করেননা। দৃশ্যত লক্ষনীয় অনেক কিছুই ছিল। যেমন ঋতুর কাজের গতিতে সেই আগের ক্ষিপ্রতা আর নেই। ভাই বোনদের সাথে একটি শব্দ ও আর বলেনা সে। যদি ও নৃত্যপ্রয়োজনীয় সব কাজই সে করছে কিন্তু চোখ দিয়ে অনর্গল টপটপ করে পানি পড়ে যায়। সে মোছার চেষ্টা ও করেনা। অদ্ভুত ব্যাপার হল ঋতু ছোটবেলা থেকেই কাঁদতে পারেনা। কাঁদলে তার হেঁচকি উঠে। কিন্তু এখন যে প্রায় দিনে-রাতে চোখ দিয়ে পানি পড়ছে অথচ আওয়াজ হচ্ছেনা। হেঁচকি উঠছেনা। এই নিরব কান্না কার জন্য সে জানেনা!অবশ্যই রনির জন্য নয়। সম্পর্কগুলোর সৌন্দর্যহানি হয়েছে সেজন্য ও নয়। খুব সম্ভবত তাঁর নিজের জন্য। এতগুলো বছর নিজেকে বুঝতে না পারার জন্য, ভুলে থাকার জন্য।ঝরা পাতার মর্মর ধ্বণি সবাই শোনে কিন্তু কান্নার প্রতিধ্বনি শুধু এক বাঁধন ছেঁড়া আত্মাই জানে। ঋতু ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে সে বিষন্নতার গহীনে তলিয়ে যাচ্ছে। অন্য সব প্রতিকুল পরিস্থিতিতে যেভাবে সে ঘুরে দাঁড়াতে পারত এবার তা সম্ভব হচ্ছেনা। মায়ের মুখের হাসি, বোনের সাফল্যকে জীবনের লক্ষ হিসেবে নিয়ে যে আনন্দে সে দিনগুলো সহজ সরল মনে যাপন করতে পেরেছিল বছরের পর বছর এখন তা কঠিন হয়ে পড়েছে। মনের ভেতর অসংখ্য জিজ্ঞাসা। নিজের কাছে নিজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মত সামর্থ্য তার নেই। তবুও সে নিজেকে সুধায় পৃথিবীতে সব মানুষই কোনো না কোনোভাবে অপূর্ণতা নিয়ে বাঁচে। তাকে ও বাঁচতে হবে মেয়ের জন্য। কিন্তু ঋতু কোনোভাবেই বিষন্নতার ছোবল থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারলোনা। এ দিকে মা ভাই বোনদের চোখে সে এখন নৈতিকতা বিবর্জিত মানুষ! এটা ও তাকে কষ্ট দেয় কেননা সে বুঝতে পারে ওরা তাকে সন্ন্যাসীর মত শ্রদ্ধা করা শিখেছে, দোষ গুণ সম্পন্ন মানুষ হিসেবে পরিবারের একজন হিসেবে ভালোবাসেনি। ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ঔষধ খেয়ে ও কোনো লাভ হয়নি। হয়ত বাকী জীবন এভাবেই জীবনের ঋণ শোধ করতে হবে। একসময় ঋতু কষ্টগুলো মেনে নেয় তখন শুরু হয় নতুন বিপত্তি, শরীরে বাসা বাঁধছে নানাবিধ অসুখ বিসুখ। বয়স চল্লিশের কোঠা ছোঁবে আর জানান দিবেনা তা কি করে হয়? ঋতু কাজের মধ্যে ডুবে থাকার চেষ্টা করে। যতক্ষণ কাজ করে মোটামুটি কেটে যায়, কিন্তু অবসর অসহনীয় হয়ে উঠে। দিন যায় মাস যায়, বছর গড়ায় তার আর শূন্যতা থেকে বেরুনো হয়না। একদিন হুট করে মা চলে গেলেন, হঠাৎ হার্ট এট্যাক হয়, কয়েক ঘন্টার মধ্যে সবশেষ। দোষ পড়ল ঋতুর ঘাড়ে। কেননা সে শরীফ সাহেবের সাথে তর্ক করায় তিনি মায়ের কাছে বিচার দিয়েছেন, ভালো মন্দ বলেছেন। মা সহ্য করতে না পারায় উনার হার্ট এট্যাক হয়ে গেছে। মায়ের মৃত্যুর দায় সে এড়াতে পারেনা নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়। সে যদি আরেকটু সহিষ্ণু হত তাহলে হয়ত মা আজ বেঁচে থাকত। যদি ও হায়াত মউত পূর্ব নির্ধারিত। তবুও অবুঝ মন নিজেকে ক্ষমা করতে পারেনা। মা’কে হারিয়ে ঋতু একেবারে  উদ্দেশ্যহীন হয়ে পড়ে। সে জানে তাকে তাঁর মেয়ের জন্য বাঁচতে হবে তবুও মনের ভেতর যমদূত কড়া নাড়ে প্রতিনিয়ত! ভালোলাগার উৎস নেই কোথাও, প্রিয় বইয়ে নেই, প্রিয় কবিতায় নেই, প্রিয় সিনেমায় নেই, এমনকি নেহার হাসিতে ও আর প্রাণ খোলেনা। দুর্বিষহ দিনাতিপাতের বছর না ঘুরতেই শরীফ সাহেব ব্রেইন স্ট্রোক করলেন। বেঁচে ফিরলেও কথা বলা, হাঁটাচলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললেন। ঋতু তার দেখাশোনা করে নিয়মিত। শরীফ সাহেব অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকেন তার মুখের দিকে। ঋতু মৃদু হেসে বলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তিনি চোখের পানি ছেড়ে দেন। ঋতু বুঝতে পারে এই চোখের জলের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা। কিন্তু মন আজ বিদ্রোহী কোনো অনুশোচনা গ্রহণ করার মত স্থিরতা তার নেই। নিজের ভেতর অচেনা প্রতিপক্ষকে পুষতে হচ্ছে, সহ্য করতে হচ্ছে নিত্য নতুন কষ্টের অনুপ্রবেশ। এক শুক্রবার সকালে শরীফ সাহেব চিরতরে ঘুমিয়ে পড়লেন। রোগ-শোক, দুঃখ দলবেঁধে নেমে এল ঋতুর জীবনে। বাবা অন্তঃপ্রাণ মেয়েটা কিছুতেই বাবার শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ঋতু নিজেরও শরীর মন ক্রমশঃ ভেঙে পড়ছে। সে ইদ্দত পালন শেষে জীবনধারায় পরিবর্তন আনতে চেষ্টা করে। সারাদিন কাজে ব্যস্ত থেকে বিকেলে হাঁটতে বেরোয়। মাঠের এ মাথা ঐ মাথায় হাঁটে। ঘন্টার পর ঘন্টা হেঁটে ও সে ক্লান্ত হয়না তার ঘুম পায়না। কখনো কখনো পুরো রাতই নির্ঘুম কাটে। সকাল হলে মেয়ের স্কুল, যাবতীয় কর্তব্য পালনে দিন কেটে যায়। ঋতু বুঝতে পারেনা মেয়েটা যে ধীরে ধীরে চুপচাপ হয়ে গেছে। এক সকালে মেয়ে প্রচন্ড কান্নাকাটি শুরু করে। এলোমেলো কথা বলে। তাড়াতাড়ি সাইক্রিয়াট্রিস্ট দেখিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয় কিন্তু কোনো ঔষধেই নেহা স্বাভাবিক হয়না। কয়েকমাসের ধারাবাহিক চিকিৎসা এবং নানারকম উপসর্গের উপস্থিতি দেখে ডাক্তার জানালেন নেহা সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। আকাশ ভেঙে পড়ে ঋতুর মাথায়।

“বাবুদের তালপুকুরে হাবুদের ডাল কুকুরে,

সেকি বাস করলে তাড়া!

বলি থাম একটু দাঁড়া!”

ঋতুর কানে বাজে নেহার আবৃত্তি! ছন্দে ছন্দে দুলতো কোনো একদিন মেয়ের চোখের ভঙ্গি, গলার স্বরের উঁচু নিচু নোট। কেউ শেখায়নি, কেবল মায়ের মুখে আবৃত্তি শুনেই মেয়েটা চমৎকার আবৃত্তি শিখে ফেলেছিল। ক্লাস টুয়ে পড়ার সময় পহেলা বৈশাখে “দামোদর শেঠ”কবিতা আবৃত্তি করে রীতিমত হই চই ফেলে দিয়েছিল। প্রিন্সিপাল ম্যাম বলেই ফেললেন, “আমার স্কুলের সেরা সুন্দর শুদ্ধ  উচ্চারণে কথা বলা বাচ্চা তুই। আয় তোকে একটু আদর করে দিই!” দর্শকের আসন থেকে ঋতুর চোখ থেকে তখন আনন্দাশ্রু  গড়িয়ে পড়েছিল। আজ সেসব শুধুই স্মৃতি! এখন তাকে দশবার ডাকলে একবার সাড়া দেয়। তারপর নিয়মিত ব্রাশের অভাবে হলদেটে দাঁতগুলো বের করে ভুবন ভুলানো মায়াকাড়া হাসি দিয়ে যখন তাকায়, ঋতু দেখতে পায় একটি সুন্দর অবয়ব! শরীরটার বয়স পনেরো কিন্তু এর মনের বয়স বড়জোর পাঁচ থেকে সাত!  বুক ফেটে চৌচির হয়! বুকের ভেতরের কান্না দলা পাকিয়ে গলায় এসে আটকে যায়। কারণ মেয়ে তার  চোখে জল দেখলে জিজ্ঞেস করে মাম্মা কাঁদছ কেন? আমার কি খারাপ কিছু হয়েছে? এ প্রশ্নের উত্তর ঋতুর জানা নেই হয়ত,নতুবা সে বলতে পারেনা মা রে এর চেয়ে খারাপ আর কিছু নেই। ঋতুর সাথে জীবনে অনেক অমানবিকতা হয়েছে কিন্তু এত ভয়াবহ পরিণতি এর আগে হয়নি। পৃথিবীটা আস্তে আস্তে অন্ধকারে ছেয়ে যেতে লাগল। আর তখনই প্রিয় বোনেরা মাথায় শান্তনার হাত না রেখে মেয়ের অসুস্থতার জন্য ঋতুকেই দায়ী করল। সে তাদেরকে কোনোমতেই বোঝাতে সক্ষম হলোনা যে জেনেটিক কারণে ও মানসিক অসুস্থতা হতে পারে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী খোঁজ নিয়ে জানা গেছে নেহার বংশানুক্রমিক কারণ ও রয়েছে, সাথে প্রিয় বাবার বিয়োগ।মা হিসেবে ঋতু ও অপরাধবোধে ভোগে, কেননা দিনশেষে তার মনে হয় আমার গাফিলতিতেই কি আমার মেয়ের এমন পরিণতি? ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছেন এ কথার ভিত্তি নেই। সিজোফ্রেনিয়ার নির্দিষ্ট কারণ আজ পর্যন্ত জানা যায়নি। চিকিৎসা করালে ও মোটামুটি ভালো থাকবে। ঋতু চেম্বার থেকে বেরিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনস্থির করে নেয়। কে কি বলল তাতে কিছু এসে যায় না,মেয়েকে সে ভালোবাসে!  মেয়ের জন্যই বাঁচবে যত কষ্টই হোক। সে বোঝে সময় গড়িয়েছে যথারীতি, তার দিন ফুরনোর পথে। আজ তার সব পদক্ষেপে ছোটবোনেরা ভুল দেখতে পায়। শুনেছি বাঘের বল নাকি বারো বছর, মানুষের কত? আঙুলের কড়া গুণলে দেখা যায় অবসরপ্রাপ্ত সাবেক সৈনিক। স্থলাভিষিক্ত হয় নতুন কমান্ডো! হীনতার কিছু নেই নতুনের জয়গানকে যে অভিনন্দন জানাতে হয়।সময় ঘুনপোকার মতই খেয়ে নেয় মানুষের সার। অফুরন্ত অবসরে আনন্দিত হবে নাকি প্রভিডেন্টের জন্য ধর্না দিতে গিয়ে পরিত্যক্ততার স্বাদ পাবে মানুষটি জানেনা। সবকিছু ধোঁয়াশা ঠেকে। জীবন কখন দেশদ্রোহীর মত বেঈমান হয় টের পাওয়া যায় না। এ সময়টায়  নিজেকে অচেনা লাগে । বলিরেখার ভাঁজে হারিয়ে যায় সব প্রয়োজন আর তেজস্বী সব প্রাপ্তি! জীবন হয়ত ক্ষনস্থায়ী গোধূলির মত! কেবল পালায় ছুটে মুখোমুখি দাঁড়ায়না।

 

ফিরে আসি ঋতুর জীবনে। শরীফ সাহেবের মৃত্যর পর ঋতু চেয়েছিল আবার সংসারী হতে কিন্তু যার সাথেই আলাপ হয়েছে, তার সম্পর্কেই মনে হয়েছে মানুষটার ভেতর বাহির এক নয়।কোথাও একটা ফাঁকি আছে।  হাঁড়ি পাতিলের টুংটাংয়ের মত ঝগড়া করার মানুষটাকে হারিয়ে ফেলা সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে বড় হারানো ক্ষত! যার সাথে রাগ করা যায় না, যাকে অভিযোগ করা যায় না, যার সাথে মেজাজ দেখানো যায় না। অকারণ মন খারাপে যাকে ঝাড়ি দেয়া যায় না সে আসলে কল্পনার বনলতার মত কবিতার। জীবনের কেউ নয়।

শুধু কাগজে সিগনেচার করলেই মানুষটা নিজের হয়না। মেয়ের অসুস্থতার পর আর কোনো ইচ্ছে নেই। ইচ্ছেরা মরে গেছে। মেয়ের পড়াশোনা হচ্ছেনা। স্বপ্নগুলো চোখের সামনে ধূলিস্মাৎ হয়ে গেছে। ঋতু আজ চিরবন্দি ম্যালানকোলিয়ার ফ্রেমে।

২১৬জন ৮৬জন
0 Shares

৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ