একজন নারীর স্বপ্নপূরণের গল্প, হোক বিবাহিতা কিংবা অবিবাহিতা

মেয়েদের কোনটা আগে? বিয়ে? নাকি আগে স্বনির্ভরতা?

.

মেয়েদের জীবনে কখন কি নেমে আসে বলা মুশকিল। অন্তত নিজেকে আত্মনির্ভর হয়ে প্রস্তুত থাকা উচিত।

যদি প্রয়োজন হয় তাহলে সে নিজের সংসারের দায়িত্বগুলোয় সমান ভাবে অংশগ্রহণ করতে যেন পারে আর যদি প্রয়োজন না হয় তাহলে পার্টনারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে সংসারে সময় দিতে পারে, কিন্তু যেকোন বিপদকালীন সময়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

.

খুব স্বাভাবিকভাবেই কোন নারীকে বাবার বাড়ি ছেড়ে শশুড় বাড়িতে যেতে টেনশন কাজ করে। নতুন বাড়ি, নতুন পরিবেশ কতটা তার নিজের পক্ষে সহনীয় হবে, সে বাড়ির মানুষগুলো কতটা পজিটিভ মাইন্ডের হবে, সাপোর্টিভ হবে কিনা তা নিয়ে কনফিউশন কাজ করে বৈকি। আর যদি পড়াশুনা করতে থাকা অবস্থায় বিয়ে হয়, সেই পড়াশুনা শেষ করার সম্ভাব্যতা থাকবে কিনা। সবার আগে প্রয়োজন মিনিমাম গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে রাখা। কারণ নিজের বিপদে নিজেকে হেল্প করতে পারবে ঐ গ্রাজুয়েশনের সার্টিফিকেট যা দিয়ে একটা কোয়ালিটি সার্ভিস হোল্ডার হওয়া সম্ভব। এছাড়া কেউ যদি সার্ভিস হোল্ডার হওয়া অবস্থায় বিয়ে নিয়ে ভাবে, তার কর্মজীবি লাইফের বিষয়টাও যেন টিকে থাকে সেই সম্ভাবনাটাও ভেবে দেখতে গিয়ে বিয়ে নিয়ে ইনডিসিশন আসে বৈকি।

.

একজন নারীর যখন বিয়ের পর হাজবেন্ডের সাথে কোনভাবে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় কিংবা মেয়েটা যখন বিধবা হয় তখন তার থাকার জায়গা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। সে কোথায় যাবে? বাবার বাড়িতে ফিরে যাবে? নিজেকে নিয়ে একা কোন বাড়িতে থাকবে? নাকি থেকে যাবে শশুড়বাড়িতেই?

.

নিজেকে তাই যেকোন সমস্যার জন্য প্রস্তুত রাখা জরুরি। আমি যদি এই মুহুর্তে জামাই বাড়িতে অবস্থান করি, সাংসারিক কাজকর্ম, স্বামী সন্তানের জন্য সময় ব্যয় করার পরে একটা নির্দিষ্ট সময় রাখা উচিত আমার নিজের জন্য। যে সময়টা শুধুই আমার নিজের। এই নিজের সময়টায় আমি নিজের মনের খোরাকে ব্যয় করতে পারি। বই পড়া, কিংবা এক কাপ কফি খেতে খেতে মুক্ত আকাশে মেঘের লুকোচুরি উপভোগ করার জন্য যে একান্ত সময় নারীর বা একজন গৃহিণীর প্রয়োজন তা খোদ ওই নারীটিই একসময় ভুলে যায় সংসারের যাতাকলে পড়ে।

.

আমরা হাজবেন্ডকে বুঝিয়ে একটা অফিস জব করতে পারি। অথবা ঘরে বাইরে সময় মেলাতে গিয়ে যদি বাচ্চাদের উপর তার নেগেটিভ প্রভাব পরতে পারে এই ভাবনায় বাসায় বসে অফিসিয়াল কাজ করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারি। এজন্য সর্বাগ্রে কী করা প্রয়োজন? একটা কোয়ালিটি কোর্স খুব উপকারে আসে। আজকাল অনেক শর্টকোর্স বেরিয়েছে। ডিপ্লোমা কোর্সের আওতায় অনেক দীর্ঘ সময়ের কোর্স যেমন উপকারী, তেমনি দীর্ঘ সময়ের কোর্সে ধৈর্য ধরে রাখা মুশকিল বলে অনেকের পক্ষে অসম্ভব হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে কারিগরী শিক্ষাবোর্ডের আওতায় শর্ট কোর্স গুলো করা যেতে পারে। কোর্সগুলো দু-তিন-চার-পাঁচ-ছ মাসের। বাসা থেকেই অনলাইনে এ ধরনের কোর্স কমপ্লিট করার জন্য অনেক বেসরকারি ইন্সটিটিউট কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়াও কাজ করছে ব্যক্তিমালিকানায় অনেকেই, তার জানা স্কিল বিষয়টি নিয়ে শর্ট কোর্সের মাধ্যমে নির্ধারিত একটা চার্জের বিনিময়ে মানুষকে শেখাচ্ছে। এতে করে কিন্তু কম মানুষ উপকৃত হচ্ছে না। প্রকাশ্য প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ক্লাস করতে আবার অনেকেই শাই ফিল করেন সেক্ষেত্রে এইসব অনলাইনে ব্যক্তিগত ভাবে যারা শেখাচ্ছে তাদের কাছে শেখা ভালো হয়।

আর যদি এমনটা হয় যে পরিবারের কর্মজীবি ব্যক্তি হিসেবে হাজবেন্ড একাই একশো তাহলে ওয়াইফ তার নিজস্ব সময়টায় কোন শৈল্পিক কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে পারেন। লেখালেখি, পটারি, এমব্রয়ডারি, পেইন্টিং, ফটোগ্রাফী, রন্ধনশিল্প ইত্যাদি ছাড়াও যার যার নিজ জায়গা থেকে যিনি যেটা পেরে ওঠেন। তবে, আশার কথা হচ্ছে ফ্রিল্যান্সিং – আউটসোর্সিং একটা কোয়ালিটি জব পর্যায়ের একটা পেশা হয়ে উঠেছে।

ইদানীং অনেক নারী পুরুষ ঘর থেকেই কাজ করছে। না, এটা শুধুই করোনা ইস্যু নয়। করোনারও বহু আগে থেকে ফ্রিল্যান্সিং , আউটসোর্সিং বিষয়টা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ তো বটেই বাংলাদেশও এখন এই সেক্টরে দারুন এগিয়ে আছে।

.

অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী ফ্রিল্যান্সিংয়ে ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। অর্থাৎ বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে আছি আমরা। বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সার ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (বিএফডিএস) এর তথ্য মতে, দেশে সক্রিয় ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা দেড় থেকে দুই লাখ। ২০১৭ সালে অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউট বলেছিল, বাংলাদেশে সাড়ে ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সার আছে। সংখ্যাটা একদম কম নয়।

.

আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে “হাউজ হাজবেন্ড” বিষয়টি হাস্যকর হলেও অনেকে এখন এরকম বিষয়ে নিরবে নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছেন। বিষয়টা বুঝতে পারলেন না তো? কর্মজীবি ওয়াইফ আর কর্মহীন হাজবেন্ড। এই হাজবেন্ড গতানুগতিক গৃহিণী নারীদের মতো বাসায় বসে রান্নাবান্না, ঘরকন্না আর বাচ্চাকাচ্চার লালন পালন করেন। আর নারীটি সার্ভিস হোল্ডার হয়ে অর্থের যোগান দিয়ে থাকেন। এই বিষয়টি এই করোনাকালীন সময়ে হয়তো অনেকের চোখে পরে থাকবে, যখন হাজবেন্ড ওয়াইফ দুজনের কর্মজীবী অবস্থা থেকে হাজবেন্ড কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। তখন কি ‘ইগো’ কে প্রাধান্য দিতে নারীটিও জবলেস (কর্মহীন) হয়ে যাওয়া উত্তম সমাধান? বিষয়টি সত্যিকার অর্থেই নতুন সম্ভাবনা আর দৃষ্টিভংগীর জন্ম দিচ্ছে।

তো এরকম সামাজিক অবস্থানে স্বজ্ঞানে যেতে অনেকেই আগ্রহী হবেন না তাও জানা কথা। সামাজিক প্রেক্ষাপটে হাসাহাসির রোল পরে যাবে শুধুমাত্র এই ভয়ে নিজের যোগ্যতার স্থান কি ছেড়ে দেবে দেয় কেউ?

.

যাক সে কথা। অনেক তো হলো তত্ত্বকথা। এবার আমি নিজের কথা বলি।

আমার নিজের দিক থেকে কর্মজীবি হওয়ার প্রয়াস শুরু হয়েছিলো সংসারের নাজুক অবস্থা থেকেই। টিউশনী, এম্ব্রয়ডারি এটা সেটা করে এক সময় নিজের পারিপার্শিক নাজুক অবস্থার সামাল দিতে সক্ষম হলেও জীবনযুদ্ধের এই পর্যায়ে এসে আমি একটা আইটি কোর্স করে ফেলি। আলহামদুলিল্লাহ, তারপর আমাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। দশটা-ছয়টার ধরাবাঁধা ছকে বাঁধা জীবনের নিয়মের বন্ধনের চাকরি করতে গিয়ে আমাকে অযথা অফিসে আরও ঘন্টা দুই-তিন বেশি সময় দিতে হলেও স্যালারি পাইনি যথোপযুক্ত। তারপর চার মাসের একটা আইটি কোর্স আমার জীবনটাকেই পালটে দেয় অভুতপূর্ব ভাবে। যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়েও অনেক বেশি সাফল্যের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছি আলহামদুলিল্লাহ।

২৯৫জন ১৫জন
0 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ