ফ্রিদা কাহলোর পিতা গিলার্মো কাহলো হাঙ্গেরিয়ান বংশোদ্ভূত জার্মান ইহুদী ছিলেন। মা ছিলেন মেক্সিকান ইন্ডিয়ান বংশোদ্ভূত মেস্টিজো। ছয় মেয়ের মধ্যে সব চেয়ে বেশি পছন্দের জনকে ডাকতেন প্রিয়তমা ফ্রিদা নামে। গিলার্মো শৌখিন মানুষ ছিলেন, পিয়ানো বাজাতেন, দর্শন চর্চা করতেন, ছবি আঁকাতেন, ফটোগ্রাফিও করতেন। ছয় বছর বয়সে পোলিওতে আক্রান্ত হলে ফ্রিদার ডান পা শুকিয়ে যায়। এই বিকলাঙ্গতা তার আজীবনের কষ্টের কারণ হয়েছিল। স্কুলের অন্য ছাত্র ছাত্রীরা এটা নিয়ে হাসাহাসি করত, তাকে ডাকত ‘পাটা ডি পালো’ বাঁ ‘কাঠের পা’! প্রচন্ড একাকীত্ব আর নিঃসঙ্গতার এই সময়ে মনে মনে কল্পনায় খেলার সাথী বানিয়ে খেলতেন! অবস্থার উন্নতির জন্য ফ্রিদার বাবা তাকে ছেলেদের খেলাধুলায় অংশ নিতে উৎসাহ দিতেন। যদিও তাতে পায়ের তেমন কোন উন্নতি হয়নি। ফ্রিদা বাবার প্রকৃতি প্রেম ও শিল্প প্রেম কে বংশগতির উত্তরাধিকার সুত্রে পেয়েছিলেন! বাবার একান্ত ইচ্ছাতেই তৎকালীন ন্যাশনাল প্রিপারেটরী স্কুলে ভর্তি হন, যদিও স্কুলে ছেলেদের সাথে পড়তে দেয়ার বিষয়ে মায়ের মত ছিলনা। এখানেই তার জানার আগ্রহ এবং শিল্পের প্রতি ভালোবাসা পূর্ণতা পায়।

খুবই বিদ্রোহী স্বভাবের কিশোরী ছিলেন, নিজস্ব স্টাইলে সাজতেন ও পোশাক পড়তেন। এই স্টাইল পরবর্তী জীবনেও চলমান ছিল। তবে তা জীবনের বিভিন্ন অধ্যায় ও মুড অনুসারে বদলেছে অনেকবার। স্কুলজীবনে ছেলেদের পোশাক পড়তেন বেশি, কমিউনিজমে আগ্রহী হওয়ার পর লাল জামা আর বিয়ের পর মেক্সিকোর মাতৃতান্ত্রিক তেহুয়ানা সম্প্রদায়ের মেয়েদের মতো পোশাক পড়তে ভালোবাসতেন। জড়ানো কুচকানো স্কার্টের সাথে হাতের কাজ করা উজ্জ্বল টপস, গলায় জড়ানো শাল। মাথায় বেণী করে ফুল দিয়ে সাজতেন।

স্কুলে পড়ার সময় চাচুচাস নামে দলের সাথে জড়িয়ে যান, যারা মেক্সিকান জাতীয়তাবাদ ও সাম্যবাদের প্রতি আগ্রহী ছিল। তারা খুবই ডানপিটে স্বভাবের ছিল। ফ্রিদার স্কুলে মুর‍্যালের কাজ করতে এসেছিলেন বিখ্যাত শিল্পী দিয়েগো রিভেরা ও তার দল। চাচুচাসদের মজার প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠল তাদের জ্বালাতন করা। ফ্রিদা এমনকি সিড়িতে সাবান ঘষে রাখতেন যাতে রিভেরা পিছলে পড়েন, মডেল নিয়ে কাজ করার সময় তাকে দূর থেকে নানান মন্তব্য করে নাজেহাল ও করতেন! এইসময় বয়স মাত্র পনেরো হলেও সহাপাঠিনীদের বলেছিলেন তিনি রিভেরার সন্তানের মা হতে চান! যদিও নিয়তি তাকে কখনোই মা হওয়ার সুযোগ দেয়নি! চাচুচাস গ্রুপের মধ্যমণি ছিল আলেজান্দ্রো। সাহিত্য, দর্শন নিয়ে আলোচনায় সবাইকে মাতিয়ে রাখত সে। জাতীয়তাবাদী চেতনায় সবাইকে মেক্সিকোর নিয়তি নির্ধারণের জন্য কাজ করতে অণুপ্রাণিত করত। স্কুলজীবনে প্রথম বারের মতো তার সাথেই প্রেমে পড়েছিলেন ফ্রিদা। আলেজান্দ্রো ফ্রিদার চেয়ে উঁচু ক্লাসের ছাত্র ছিল। ফ্রিদা সবসময়ই তার চেয়ে বয়সে বড় ও অভিজ্ঞ ব্যক্তির প্রতি আকৃষ্ট হতেন। স্কুলজীবনে মেডিসিনে ক্যারিয়ার গড়ার কথা ভাবতেন কিশোরী ফ্রিদা।

কিছু দুর্ঘটনা মানুষের জীবনের নিয়তিকে পালটে দেয়! সাথে পালটে দিতে পারে শিল্প ও সাহিত্যের ইতিহাসকেও! ১৯২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ফ্রিদা কাহলো এবং তার প্রেমিক আলেজান্দ্রো গোমেজ আরিয়াজ যখন নতুন মডেলের উজ্জ্বল রং এর বাসে চেপে বসেছিলেন বাসায় ফেরার জন্য তখন হয়তো তাদের মনেও মেক্সিকো সিটির প্রাণবন্ত উচ্ছলতা ঢেউ তুলছিল। তবে বেশিক্ষণের জন্য নয়। চালকের মারাত্মক ভুলে সরাসরি এগিয়ে আসা ট্রামের সাথে ধাক্কা খেল বাসটি, একটা ওয়ালের সাথে পিষে গেল, বলতে গেলে বিস্ফোরিত হলো! লোহার হ্যান্ডরেইল গেঁথে গেল ফ্রিদার শরীরে। রক্তে ভেসে যাওয়া শরীরের উপর অন্য যাত্রীর ব্যাগ ছিড়ে পড়া গোল্ড ডাস্ট ঝকমক করছিল তখন। উদ্ভ্রান্ত আলেজান্দ্রো তাকে বের করে আনার জন্য লোহার হাতলটা টেনে বের করার সময় ফ্রিদার চিৎকার এম্বুলেন্সের সাইরেনকেও স্তব্ধ করে দিয়েছিল। চিকিৎসকরা তার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। মেরুদন্ড ভেঙ্গেছিল তিন জায়গায়, বুকের পাঁজর ভেঙ্গেছিল, ডান পায়ে এগারোটা ফ্রাকচার, ডান পায়ের পাতা, আর বাম সোলডার জয়েন্ট ডিসলোকেটেড, পেল্ভিস ভেঙ্গে তিন টুকরো হয়েছিল।


এই দুর্ঘটনা তার জন্য আজীবন অসহনীয় ব্যাথা আর মানসিক অস্থিরতার কারণ ছিল। শেষ জীবন পর্যন্ত অসংখ্যবার অপেরশন টেবিলে উঠতে হয়েছিল, ব্যর্থ হয়েছিল সব প্রচেষ্টা! প্রচন্ড ব্যাথাকে সাথে নিয়েই বাঁচতে হয়েছিল। তার নিজস্ব বিশ্বাস ছিল এই লোহার রড জরায়ুকে নষ্ট করে দিয়েছে এবং আর হয়তো মা হতে পারবেন না। যদিও আঘাতটা জরায়ুর বেশ উপরে ছিল। এই দুর্ঘটনাই তার মেডিসিনে পড়ার স্বপ্ন শেষ করে দিয়েছিল।

দীর্ঘ কয়েক মাস শরীরে প্লাস্টার নিয়ে বিছানায় পড়েছিলেন। এই সময়েই ছবি আঁকানো শুরু করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে এটা তার জন্য থেরাপির মতো ছিল। অবশ্য আগে থেকেই আঁকাতে জানতেন, স্কুলেও শিখেছিলেন। বেশি নড়াচড়া করতে পারতেন না তাই তার মা বিছানার চার কোণায় চারটি আয়না লাগিয়ে দিয়েছিলেন। সেখানে তাকিয়ে প্রথম নিজের আত্মপ্রতিকৃতি আঁকান। তার আঁকানো অধিকাংশ ছবিতেই আছে আত্মপ্রতিকৃতি; যা মেক্সিকান রৌদ্রকরোজ্জ্বল সূর্য্যের মতোই শক্তিমান, জীবনী শক্তিতে ভরপুর! চিত্রটি আলেজান্দ্রোর জন্য উপহার হিসেবে আঁকিয়েছিলেন!

   

কিন্তু এরমধ্যেই আলজান্দ্রোর বাবা মা তাকে পোড়াশোনার জন্য ইউরোপে পাঠালেন। ধারণা করা হয় সন্তানকে এই সম্পর্ক থেকে সরাতেই এরকম সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তারা! দূরত্ব বাড়তে বাড়তে আলেজান্দ্রোর সাথে সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় ফ্রিদার। ফ্রিদার আঁকানো প্রায় একশত পঞ্চাশটি ছবির মধ্যে পঁয়ষট্টিটিই আত্মপ্রতিকৃতি! সেলফি শব্দটি সাম্প্রতিক কালের হলেও শিল্পীরা বহুকাল থেকেই তাদের নিজের ছবি আঁকাতেন! কিন্তু ফ্রিদা কেন এতবার নিজেকে আঁকিয়েছেন? আসলে দূর্ঘটনা, বারংবার অপারেশনের কারণে নিঃসঙ্গ হয়ে বিছানায় আটকে ছিল তার জীবন। তার মতে তিনি নিজেকেই সবথেকে বেশি চিনতেন, আয়নায় নিজেকেই দেখতেন। হয়তো এটাই তাকে প্রভাবিত করেছিল। তবে ছবিগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায় এগুলো কোনমতেই ফটোগ্রাফের সাথে তুলনীয় নয়, বরং আরো অনেক বেশি তথ্যবহুল, যেখানে উঠে এসেছে তার নিজস্ব বিষণ্ণতা, একাকীত্ব আর সর্বোপরি শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা! বাবা ফটোগ্রাফার হওয়ায় ছোটবেলায় ফটোগ্রাফের মধ্যে দিয়ে নিজের আমিত্বকে আবিষ্কার করার একটা উপায় পেয়েছিলেন, যেই অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে কাজে দিয়েছিল। ফ্রিদা কাহলো এর আত্মপ্রতিকৃতি আঁকানোর প্রবণতার সাথে হয়তো এ যুগের সেলফি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেয়ার প্রবণতার মিল থাকতেও পারে। দুক্ষেত্রেই আছে মানুষের নিজস্বতাকে জাহির করার সহজাত প্রবণতার প্রকাশ। প্রশ্ন হচ্ছে তার মধ্যে নারসিসিজমের কোন বৈশিষ্ট্য ছিল কিনা! যখন কারো শরীরে বিকলাঙ্গতা আসে, দুর্ঘটনায় স্থায়ী বিকৃতির মুখে পড়ে তখন নারসিসিটিক আঘাত আসে। আর তার প্রতি মানসিক ডিফেন্স থেকে আসে নারসিজম! হয়তো একারণে ফ্রিদা নিজের প্রতি একটু বেশিই আগ্রহী ছিলেন!

বিশ বছর বয়সে কিছুটা সুস্থ হলে তার ছবিগুলো মূল্যায়ন করানোর জন্য বিখ্যাত মুর‍্যালিস্ট ডিয়েগো রিভেরার কাছে নিয়ে যান। রিভেরা ফ্রিদার ছবিতে শক্তির প্রকাশ দেখে যেমন মুগ্ধ হোন তেমনি আকৃষ্ট হোন সোজাসাপটা কথা বলা আকর্ষণীয় চরিত্রের প্রতিও। যদিও দুই জনের মধ্যে বিপরীত দিক ছিল প্রচুর তবুও রিভেরার প্রতিভা ও শিল্পের প্রতি ভালোবাসায় মুগ্ধ হন ফ্রিদা। এছাড়া দুজনেই কমিউনিজম, মেক্সিকান জাতীয়তাবাদ, লোক সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবনে আগ্রহী ছিলেন। তবে রিভেরার জীবনে ফ্রিদা প্রথম নারী ছিলেন না, আরো অনেকের সাথে সম্পর্ক ছিল তার। এক অদ্ভুত ধরনের আচরণ ছিল রিভেরার- কোন একজনের সাথে স্থিতিশীল সম্পর্কে থাকা অবস্থায় হুট করে অন্য কোন নারীর আকর্ষণে জড়িয়ে পড়ে আবার আগের সম্পর্কে ফিরে আসতেন! ১৯২৯ সালে বিয়ের সময় রিভেরার বয়স ছিল তেতাল্লিশ আর ফ্রিদার উনিশ। রিভেরার বিশালাকার আকৃতির পাশে উজ্জ্বল পাখির মতো লাগত ফ্রিদাকে! ফ্রিদা মজা করে তাকে ডাকতেন ফ্রগ-টোড! বিয়ের দিনটা বেশ হট্টগোল পূর্ণ ছিল, রিভেরার আগের স্ত্রী উপস্থিত হয়ে ফ্রিদার চেহারা নিয়ে বাজে মন্তব্য করে যথেষ্ট অপ্রীতিকর অবস্থা তৈরি করেছিলেন। ফ্রিদার বন্ধুমহলে এ বিয়ে অনেক রকম কানাঘুষা চলছিল, অনেকে ব্যাঙ্গ করে বলেছিল সুন্দর একটা ছোট্ট পাখি আর কদাকার হাতির বিয়ে এটা! তবে এই বিয়ের ফলে ফ্রিদার আর্থিকভাবে দৈন্যদশায় থাকা পরিবার রিভেরার সাহায্যের হাতকে কাছে পেয়েছিল। আর ফ্রিদাও রিভেরার সৌজন্যে ইউরোপ আমেরিকার শিল্পী ও বুদ্ধিজীবি মহলে মেশার সুযোগ পেয়েছিলেন। প্রথম দিকে রিভেরা তাকে শিল্পকর্মে আত্মনিয়োগ করার জন্য তাগাদা দিলেও ফ্রিদা চেষ্টা করেছিলেন গৃহিণী হওয়ার!


ছবিঃ ফ্রিদা ও দিয়েগো রিভেরা।

প্রচন্ড শখ ছিল মা হওয়ার। কিন্ত প্রথমবার সাড়ে তিন মাস পর গর্ভপাত হয়ে যায়। প্রচন্ড কষ্ট আর হতাশা নিয়ে তিনি আঁকলেন ‘হেনরী ফোর্ড হসপিটাল’! এই ছবিতে ফুটে উঠেছে- বেডে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন ফ্রিদা, চারপাশে ভাসছে একটি ভ্রূণ, অর্কিড, একটি শামুক। শামুকে প্রকাশ পাচ্ছে অপারেশনের ধীরগতি যা তাকে প্রচণ্ড কষ্ট দিচ্ছিল। এরপর আরো বেশ কয়েকবার গর্ভধারণের চেষ্টা করলেও বারবার একই পরিণতি হয়েছিল। বেশ কয়েকবার হাসপাতালেও ভর্তি হতে হয়েছিল! ধারণা করা হয় এই গর্ভধারণের সমস্যার জন্য দায়ী ছিল আশেরম্যান সিনড্রোম, যা তার আগের দূর্ঘটনার কারণে জরায়ুতে হওয়া ক্ষত থেকে হয়েছিল। এই এবরশনের সময় জানতে পারলেন রিভেরা তার সহকারীর সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছেন। এটা এক প্রচন্ড মানসিক আঘাত ছিল, একদিকে মনে ছিল তিনি আর হয়তো মা হতে পারবেন না এই দুঃশ্চিন্তা; অন্যদিকে তার পক্ষে যে আর কখনোই রিভেরাকে বিশ্বাস করা সম্ভব নয় এই মানসিক ভার!


ছবিঃ হেনরী ফোর্ড হাসপাতাল ( কিছু অংশ অস্পষ্ট করা হয়েছে। মূলছবিঃ ইন্টারনেট)

রিভেরা ফ্রিদার বোন ক্রিস্টিনার সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে তাদের সম্পর্ক ক্রমশ খারাপ হতে থাকে। ফ্রিদা ইজেলের কাছে ফিরে গিয়ে আঁকালেন ‘এ ফিউ স্মল নিপস’। যেখানে দেখা যায় একজন নারী রক্তাক্ত শরীরে পড়ে আছেন, পাশে ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে খুনী। রিভেরা তার নিজস্ব আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন- ‘যে নারীকে আমি যতো বেশি ভালোবাসি, তাকে ততো বেশি কষ্ট দিতে চাই!’ তার এই বাজে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সহজ লক্ষ্য ছিলেন ফ্রিদা! রিভেরার ছায়ায় থাকার কারণেই হয়তো ফ্রিদার শিল্পী পরিচিতি আসতে দীর্ঘ সময় লেগে গিয়েছিল। ফ্রিদা তাকে বলতেন ‘মাস্টার’, ঘরের পাশাপাশি তাদের সৃষ্ট প্রতিটি শিল্পকর্মের ও! মৃত্যুর এত বছর পর তিনি যেভাবে নারীবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছেন তা জানতে পারলে হয়তো নিজেই প্রচন্ড বিস্মিত হতেন।


ছবিঃ এ ফিউ স্মল নিপস, (কিছু অংশ অস্পষ্ট করা হয়েছে  পাঠকের কথা বিবেচনা করে। মূল ছবিঃ ইন্টারনেট) 

ফ্রিদা ও রিভেরা আলাদা থাকা শুরু করেন। ফ্রিদা নিজেও আরো সম্পর্কে জড়ান। ১৯৩৭ সালে নির্বাসিত রাশিয়ান নেতা লিওন ট্রটস্কির সাথেও সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সম্পর্কে জড়ান। যোসেফ স্টালিন কর্তৃক বিতাড়িত হয়ে আসা ট্রটস্কি নারীদের ব্যাপারে বেশ আগ্রহী ছিলেন। প্রথমে ফ্রিদার বোন ক্রিস্টিনার প্রতি আগ্রহ দেখালেও সাড়া মেলেনি। কিন্তু কমিনিজমে বিশ্বাসী ফ্রিদা এই বিপ্লবীর আকর্ষণ কে প্রত্যাখান করতে পারেননি। অল্পকাল পরে ট্রটস্কি আরো দূরে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে চলে গেলে এই সংক্ষিপ্ত সম্পর্কের অবসান হয়। ট্রটস্কিকে নিজের একটি আত্মপ্রতিকৃতি পাঠিয়েছিলেন যেখানে লেখা ছিল- For Leon Trotsky with all love I dedicate this painting’। এতো কিছুর পরও সত্যিকার অর্থে রিভেরাকেই ভালোবাসতেন সবসময়। তাকে নিয়েই দুঃশ্চিন্তায় থাকতেন।

ফ্রিদা ও ট্রটস্কি
ছবিঃ ফ্রিদা ও ট্রটস্কি


ছবিঃ ফ্রিদা ও মুরে।

১৯৩৮ সালে আমেরিকা থেকে ডাক পেলে রিভেরার কাছ থেকে মুক্তি পান অনেকটাই। এই সময় হাঙ্গেরিয়ান ফটোগ্রাফার নিকোলাস মুরের সাথে সম্পর্কে জড়ান। বর্তমানে ফ্রিদার যেসব আইকনিক ছবি দেখতে পাওয়া যায় তা মুরেরই তোলা। ১৯৩৯ সালে প্যারীসে প্রদর্শনীর সময় পুনরায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। উপরন্তু মুরে তাকে ছেড়ে চলে যান আর রিভেরার সাথে ডিভোর্স হয়ে যায়। রিভেরা সম্ভবত ট্রটস্কির সাথে তার সম্পর্কের কথা জেনে গিয়েছিলেন। এমনো হতে পারে বিভিন্ন গুজব তার কানে আসছিল! ফ্রিদা এ সময় আঁকালেন ‘টু ফ্রিদা’ যেখানে একজন ফ্রিদা প্রথাগত পোশাকে ভগ্ন হৃদয়ে বসে আছেন, পাশে আধুনিক পোশাকে আরেকজন। অস্তিত্ব একটাই কিন্তু শরীর দুইটা, অস্তিত্ব বিভক্ত হয়ে আছে! এক পাশে ইউরোপীয় সত্তা, অন্যপাশে মেক্সিকান! মেক্সিকান ফ্রিদাকে রিভেরা ভালোবাসেন তাই তার হৃদপিন্ড সুস্থ, আর ইউরোপিয়ান ফ্রিদা প্রত্যখ্যাত হয়েছে তাই রক্তাক্ত! ছবিটার আকুতি এরকম যে ভালোবাসার মানুষকে ছাড়া বাঁচতে পারবেন না শিল্পী!


ছবিঃ দ্য টু ফ্রিদা।

ঐ সময় ফ্রিদা তার শৈশবের কাসা আজুল বাঁ নীল বাড়িতে ফিরে যান। অধিকাংশ ছবিতেই তিনি নিজেকে দেখাতেন ঐতিহ্যবাহী মেক্সিকান পোশাকে আর লম্বা চুলে। কিন্তু বিচ্ছেদের পর নিজেকে আঁকালেন ছোট চুলে, শরীরে পুরুষের জ্যাকেট, পায়ে বড় সাইজের জুতা পড়া অবস্থায়! আসলে এগুলো রিভেরার পোশাক যা পড়ে বসে আছেন ফ্রিদা! ছোট ও চুল দিয়েও রিভেরাকেই বুঝিয়েছিলেন। এর অর্থ বিচ্ছেদের পরও তিনি নিজেকে রিভেরার সাথেই কল্পনা করতেন। তার অচেতন মনে বিচ্ছেদ তীব্র প্রভাব ফেলেছিল। হারানো মানুষকে এভাবেই ছবিতে কল্পনার মাধ্যমে পেতে চেয়েছিলেন। অনেকটা আইডেন্টিফিকেশন বলা যায় এটাকে।

ফ্রিদার শরীর ক্রমশ খারাপ হতে থাকলে রিভেরা পুনরায় তার কাছে ফিরে আসতে চাইলেন। ১৯৪০ সালে তাদের পুনর্বিবাহ হলো। তবে ফ্রিদার শর্ত ছিল সম্পর্ক হবে প্লাটোনিক। স্বাধীন জীবন যাপনের জন্য বাবার পৈত্রিক বাসায় থাকতেন। বিছানার পাশে ঝোলানো ছিল একটা কংকাল যার সাথে প্রতিদিন সকালে উঠে করমর্দন করতেন আর পাশের টেবিলে ফরমালিন পূর্ণ জারে রাখা ছিল মানব শিশুর মৃত ভ্রূণ, যেটা ছিল তার গর্ভপাত হওয়া সন্তানের প্রতীক। ১৯৪৪ সাল থেকে শরীরের দ্রুত অবনতি হতে শুরু করেছিল। বারবার অপারেশন করাতে হচ্ছিল মেরুদন্ডে। প্রায় আটাশ রকমের বন্ধনী ব্যাবহার করতে হতো স্পাইনের ব্যাথা কমানোর জন্য। এই সময় আঁকানো ‘উইদআউট হোপ, দ্য লিটল ডিয়ার, দ্য ব্রোকেন কলাম’ ছবি গুলোতে তার কষ্ট, যন্ত্রণা ও ভোগান্তি প্রকটভাবে প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে বহুল আলোচিত দ্য লিটল ডিয়ার ছবিতে তীরবিদ্ধ হরিণের শরীরে তার মুখাকৃতি মূলত এইসব অপারেশনের ব্যর্থতায় তার হতাশা এবং প্রচন্ড শারীরিক ব্যাথা ও মানসিক কষ্টেরই প্রকাশ। ছবির এক কোণায় লিখেছেন ‘কার্মা’ মানে বোঝাতে চেয়েছিলেন নিয়তিকে বদলাতে পারেন নাই!


ছবিঃ দ্য লিটল ডিয়ার

১৯৫০ সালে প্রায় এক বছর মেক্সিকো সিটির একটি হাসপাতালে কাটাতে হয়েছিল। এসময় দিয়েগো রিভেরা পাশে রুম নিয়ে থাকতেন। গল্প করতেন, দুজনে মিলে প্রোজেক্টরে মুভি দেখতেন। ১৯৫৩ সালে ফ্রিদার ডান পা কেটে ফেলতে হয়। সেই প্রথম তার জীবনী শক্তি কিছুটা কমে এসেছিল হয়তো। তবুও তিনি আঁকাতে থাকেন। জীবনের শেষ পেইন্টিং এ লিখেছিলেন- ‘জীবন দীর্ঘজীবি হোক!’ ১৩ জুলাই, ১৯৫৪ সালে মাত্র সাতচল্লিশ বছর বয়সে মারা যান এই মহান শিল্পী!


ছবিঃ ফ্রিদা ও রিভেরা

সাইকোএনালাইটিকালি বিবেচনা করলে তিনি একজন অন্তর্মুখী মানুষ যিনি নিজের মনের লুকানো অবস্থাকে খুঁজে বেড়াতেন! আত্মপ্রতিকৃতিতে নিজস্ব আকাঙ্ক্ষা, ইচ্ছা আর হতাশা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোয় দেখা জীবনকে, বিশেষ নারীজীবনে মুখোমুখি হওয়া যন্ত্রণাকে চিত্রায়িত করেছিলেন। ছবিগুলো দেখে বোঝা যায় জীবনকে তিনি কিভাবে দেখেছেন আর তা কতোটা জটিল ছিল! এটা নারীত্বকে প্রকাশের নারসিসিস্টিক ধরন যা এর আগে কেউ করেনি। ফ্রিদা বেড়ে উঠছিলেন মেয়েলী পরিবেশে, গৃহযুদ্ধ থেকে সবে সেরে উঠা সমাজ ছিল চারেপাশে। সময়ের সাথে সাথে ছবিতে ব্যাবহার করা মেক্সিকান আদিবাসী রং ও প্রতীক থেকে বোঝা যায় ফ্রিদার ব্যক্তিসত্তায় ক্রমশ দ্বৈত প্রভাব আসছিল, যা মূলত তৎকালীন মেক্সিকোর বদলানো সমাজের দ্বৈত অবস্থানের কারণে। একদিকে ছিল বিগত শতাব্দীর ঔপনিবেশিক সংস্কার আর অন্যদিকে মেক্সিকান এজটেক সংস্কৃতিকে পুনুরুত্থিত করার সাংস্কৃতিক আন্দোলন। বারবার আঁকানো পৌরাণিক প্রতীক- মাটি বাঁ ধরিত্রী মা, শিকড়, রক্ত, নখ ইত্যাদি মূলত তিনি যে মনোস্তাত্ত্বিক ভাবে বুর্জোয়া আগ্রাসনের বিরোধী ছিলেন তারই প্রকাশ।

তার শিল্পকে বুঝতে হলে এটা জানা দরকার সারাজীবন তিনি তীব্র শারীরিক ব্যাথাকে সাথে নিয়ে কাটিয়েছেন। ব্রোকেন কলাম ছবিতে স্পষ্টতই দেখিয়েছেন একতা ধাতব খন্ড তার শরীরের ভিতর দিয়ে চলে গিয়েছে; যা ভয়াবহ দূর্ঘটনারই স্মৃতি!


ছবিঃ ব্রোকেন কলাম ( কিছু অংশ পাঠকের কথা বিবেচনায় রেখে অস্পষ্ট করা হয়েছ)

ল্যাডস্কেপ ছবিতে দেখিয়েছেন শরীরটা এমন বিকৃত হয়ে আছে যে বোঝা যাচ্ছেনা তা পুরূষের না মহিলার, জীবিত নাকি মৃত! বারবার অপারেশনে বিদ্ধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলেন! হতাশা, ব্যাথার তীব্র চাপে বেশ কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন!


ছবিঃ ল্যান্ডস্কেপ

অন্যদিকে ছবি আঁকানো তাকে তীব্র ব্যাথা থেকে মুক্তি দিয়েছিল। শরীরের যন্ত্রণা ছবিতে ফুটিয়ে তুলে মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করতেন। চিকিৎসকরা ব্যাথা কমানোর জন্য মরফিন দিয়েছিলেন, তিনি নিজেই এলকোহলের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এই সবের প্রভাবে তার শিল্প প্রতিভার অবনতি ঘটেছিল। সুরিয়ালিজম বাঁ পরাবাস্তবতায় স্বপ্ন ও কল্পনাকে মিলে নিজস্ব বাস্তবতা তৈরি করা হয়। মূলত সিগমুন্ড ফ্রয়েডের অবচেতন মনের ধারণা দ্বারা এই স্টাইল প্রভাবিত। অনেকে ফ্রিদা কাহলোকে সুরিয়ালিস্ট ঘরানার শিল্পী বলে আখ্যা দিলেও তিনি নিজে তা অস্বীকার করতেন। বলতেন- আমি কখনো আমার স্বপ্ন আঁকাই নাই! আমি আমার বাস্তবতাকেই আঁকিয়েছি!

সমাপ্ত

ছবিঃ কৃতজ্ঞতা ইন্টারনেট।

পাঠকের জ্ঞাতার্থেঃ কিছু ছবির কিছু অংশ পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গীর ভিন্নতা বিবেচনায় রেখে অস্পষ্ট করা হয়েছে। 

 

 

 

 

 

 

 

৩০৯জন ১০৩জন
0 Shares

১৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য